শেষ বর্ষা

রোকসানা খন্দকার রুকু ১৭ মার্চ ২০২৩, শুক্রবার, ০৬:৫৩:৫০অপরাহ্ন রম্য ১ মন্তব্য

আদা চায়ে কলিগ খুনসুটি চলছিল। এ সময় ফোন রিসিভ করা মানে, আগুনে ঝাঁপ দেয়া। কারন আমি যে কান্ড ঘটিয়ে বসে আছি ইহা লোকচক্ষে চরম লজ্জার।

আরও সমস্যা হলো, বাধ্যতামূলক ” লাভ ইউ বাবুসোনা ”  বলে ফোন রাখতে হবে। না হলে ফারাক্কার বাঁধ অসময়ে খুলবে আর মোটামুটি জাতিসংঘের বিচারক কমিটির আহ্বান ছাড়া পানি বন্ধ করা অসম্ভব!

অথচ ডাইনীকে একবারের বেশি আই লাভ ইউ বললে, বিরক্ত হয়ে যেত। রিপিট শুনতে চাইলে বলার বদলে বলতো – আর একবার আতলামী করলে তোমারে জুতা পিটা করবো। আমার ক্লায়েন্ট সামনে বসা আর তোমার ঢং!

ঢংই তো! ডাইনী করে ব্যাংকে চাকরী, আর আমি দুপয়সার মাস্টারী। সারাদিন দুটা ক্লাস নিয়ে আর কাজ নেই করবোটা কি! তাই ওকেই বিরক্ত করি।

বেশিদিন বিরক্ত করতে হলো না। কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণ দেখে ডাইনী অন্যকারও ক্যাশিয়ার হয়ে গেল। আমার সামান্য পয়সার ক্যাশিয়ারী করবে না তাই ম্যানেজারের গলায় আই লাভ ইউ মালা পড়ালো।

এখন আমার মাস্টারী পয়সা গোনার বয়স মোটামুটি ৩৫ ছুঁই ছুই! জীবনে আর কারও আগমনের সম্ভাবনা খুঁজে না পেয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে মেয়েদের দিকে আড়চোখে তাকানোই বন্ধ করে দিলাম।

আর মাঝেমধ্যে তাকালেই মেয়েরা বলে, – আঙ্কেল কিছু বলবেন?

তখন আমার নিজের জন্য ভীষণ দুঃখ হতে থাকে, আজীবন আঁটকুড়েই মরতে হবে মনে হচ্ছে। । ছেলে-মেয়েরা নির্দ্বিধায় এখন আমাকে মামা ডাকে, আঙ্কেল ডাকে।

ছ্যাকা খাওয়ার পর মা- বাবা, ভাই- বোনকে খুব করে মনে পড়ে। আমারও তাই হলো। মাকে মনে পড়ে গেল। লম্বা ছুটি নিয়ে হুহু করে এসে মায়ের কাছে আশ্রয় নিলাম। পত্রিকা আর অরন্ধতি পড়ার বিকেলে লিকলিকে ডাইরীয়াসম এক মেয়ে এলো মায়ের খোঁজে। প্লেটে খাবার ঢাকা আর হাতে সেলাই করা ব্লাউজ।

আমি খাবার দেখতে চাইলে রাগতস্বরে বলল, ইহা যার জন্য একমাত্র তিনিই দেখতে পারবেন।

আমি জানালাম, – তিনি তো বাসায় নেই।

উত্তর এলো, – আচ্ছা রেখে গেলাম, ব্লাউজ গায়ে কেমন লাগলো জানাতে বলবেন।

এখনকার ছেলেমেয়েরা বেশি সাহসী। আমি তো শুধু খাবার দেখতে চেয়েছি? তাতেই হাটুর বয়সী মেয়ে তার কাছে অপমান? আসলে মাষ্টার মশাইরা সব জায়গায় মূল্যহীন!

মা এলে জানা গেল, যিনি পিঠা দিয়ে গেছেন, তিনি পাড়ার নবাব ভাইয়ের ছোট মেয়ে। এবার ভার্সিটিতে গেছে। মেয়েরা কতো তারাতারী বড় হয়! সেদিনের পুচকু মেয়েটি। আজ চিনতেই পারলাম না। আমি বাইরে থাকতে বড় হয়ে গেছে।

মনে পড়লো, আমার ইন্টারমিডিয়েট রেজাল্টের দিন পাড়ায় মিষ্টি খাওয়ার লোক নেই। ঘটনা কি? পাড়ায় প্রথম মেয়ের জন্ম হয়েছে তাই নবাব এতো বেশি রসমালাই বিলিয়েছেন যে, সবাই তাই  খেয়েই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে একাকার। এ অবস্থায়  আমার কমদামী আটাযুক্ত মিষ্টি খেতে নারাজ। নবাব আসলে নবাব নামে নন। তিনি দেখতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মতো সুন্দর তাই তার বাবা- মা আদর করে নাম দিয়েছে সিরাজউদ্দীন। সবাই সিরাজ; সিরাজউদ্দীন না ডেকে নবাব বলেই ডাকে। তার মেয়েও হয়েছে নাকি অতিসুন্দর, রসমালাই এর মতো দুধবরন।

কপালে ঘাম জমলো, কি সাংঘাতিক!  এই মেয়ে তো জন্ম নিয়েই আমারে অপমান করেছে। এর থেকে দুরে থাকাই ভালো। কিন্তু থাকা গেল না কারন তার দেয়া পুলি পিঠা অসাধারণ!অন্যদিন এলে শুনে নিতে হবে কে বানিয়েছে?

বিসিএস হবার পর ভাবে পাড়ার ছেলেদের সাথে মিশতামই না। তাদের গুন্ডা বলে মনে হতো। ডাইনীর প্রেমে ফোন কানে আড়চোখে হাঁটতাম।

আজ বন্ধুহীন হয়ে পাড়াতো ভাইদের ভীষণ মনে পড়লো। এই প্রথম চায়ের দোকানে বসলাম। বেশ কদিনে সবার সাথে জমেও উঠল। সঙ্গ ভালো জিনিস ঘা সহজে পুষিয়ে তোলে। আমিও ডাইনীর ক্ষত থেকে সেরে উঠতে লাগলাম।

ছুটি প্রায় শেষ। ফিরতে হবে আগের আস্তানায়। ব্যাগ গুছাচ্ছিলাম। নবাব ভাইয়ের মেয়ে আবারও হাজির। মায়ের খোঁজে সরাসরি ডাইনিং রুমে। আমার চোখ কেবলই তার হাতে ঢাকা খাবারে। জিহ্বা লকলক করে উঠল, খাবারের লোভে।

হঠাৎই মেয়ে বললো, শুনুন সব খাবেন না। আপনি তো বেশ মোটাতাজা, নিজেই সব খান। তাছাড়া থাকেনও না, মা তাই মাঝে মাঝে খাবার পাঠায় দেন।

আমি কিছু না বলে ভাবছি, – এর মুখে কি কিছুই আটকায় না?

ফোন এলো। বাড়ি যেতে হবে মা অসুস্থ। কি কারনে নাম্বারটি সেভ না করে বেড়িয়ে পড়লাম। ফোন করেছিল নবাব ভাইয়ের মেয়ে।সেবার বেশ ধকলে আল্লাহ আমার উপর সদয় হলেন। মাকে ভিক্ষা পেলাম। আমার কথিত বড়লোক আত্নীয় ও কোটিপতি ভাই- বোন তাদের পত্নি- পতিদয়কে নিয়ে দেখতে এসে সেই গাড়িতেই ফিরে গেলেন। সাথে আমাকে একতোপ দোষারোপ ঢাললেন। আমি মায়ের খেয়াল রাখিনা। অথচ মা আমার জন্যই তাদের কাছে গিয়ে থাকেন না। সেটেল হলেই পারি। আমার বয়সের সবার ছেলেমেয়ে বড়- বড়। আমি অপরাধী তাই মাথা নিচু করে শুনলাম। আমার সাথে আরও একজন শুনলো, সে নবাব ভাইয়ের মেয়ে। তার চোখ টলটলে। যাবার সময় বলে গেল- আপনি এতো বোকা কেন? সবাই বকে, আপনি শোনেন!

মা আসলে নিজের জন্যই কোথাও যান না। বাবাকে ছেড়ে যেতে চান না। নিজের ঘর সংসার, বহুবছরের স্মৃতি ফেলে  যাওয়া তারজন্য আসলেই কঠিন। মায়ের খেয়াল রাখা দরকার। আমি এলাকায় বদলী নেবার জন্য উঠে পরে লাগলাম। মায়ের অসুস্থতার খবরে হয়েও গেল।

বদলীর মাসখানেক হয়েছে। ডাইরীয়া মেয়েটি প্রায়ই বাড়িতে আসে আর আমাকে ছোট খাট অপমান করে চলে যায়। আমি নবাব ভাইয়ের মেয়ে তাই আমারও মেয়ের মতো আর খাবারের লোভে মাফ করে দেই।

” প্রেম আমার উপরে পরেছে, না আমি পরেছি ”  আইয়ুব বাচ্চুর গানের মতো ইদানিং আমি ডাইরিয়া মেয়েটির অপেক্ষায় থাকি। সে কখন ভার্সিটির ছুটিতে আসবে। কারন ছুটি হলেই দৌড়ে আমাদের বাসায় আসে।

তার আগমনে মার চেয়ে ইদানিং আমিই বেশি খুশি হই। তাকে পড়ানোর উছিলায় আটকানোর চেষ্টা করি। প্রায়ই সে পড়াশোনায় আমাকে বোকা বানিয়ে চলে যায় । আমি হাসি দেই, চুপচাপ থাকি আর ভাবি মেয়েটি যথেষ্ট মেধাবী।

 

ফেব্রুয়ারীর শেষ দিক, ভ্যালেনটাইন পার হয়েছে। আমার এসবের বয়স নেই তবুও কেমন যেন বাঁ পাশটা মোচর দিচ্ছিল। আজ ডাইনীকে ভীষন মনে পড়ছে। যদিও আমাদের কাটানো সুখসৃতি খুব একটা নেই তবুও মনে হলো বসন্ত তো শেষ হয় না। প্রতিবছর ফিরে- ফিরেই আসে। ধুলো বাতাসে কারও মন আনন্দিত হয় কারও বিষাদিত তবুও বসন্ত আসে।

 

বারান্দায় হালকা বাতাসের সাথে উড়ে আসা মিহি ধুলো। বেশিক্ষণ বসে থাকা যায় না, শরীর কিচকিচ করে। আমি তবুও বসে আছি। ভালো লাগছে বসতে। একাকিত্বতাও মাঝেমধ্যে ভোগ্য হয়ে ওঠে।

এসময় আননোন ফোন এলো। রিসিভ করে দেখা গেল সেই ডাইরিয়া মেয়েটি। মায়ের অসুস্থতায় ফোন দিয়েছিল, আমি কতে বড় বেইমান সেভ করিনি। এসব শুনিয়ে তার জটিল প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইল। তার ধারনা আমি সবজান্তা। আমি আসলে গরীব গ্যানী।

আমি গায়ের ধুলো না ঝেড়ে তার সলুশান নিয়ে ব্যস্ত হলাম। আমার মনের বারান্দা তার শাসনে, ফোনে কেমন চিকচিক করে উঠলো। মনে হলো, পৃথিবীর সব ধুলা উড়ে আসুক আমি তাতে গড়াগড়ি দেই।

এরপর অপেক্ষা কখন সে ফোন দিয়ে কিছু জানতে চাইবে। আমি ভুলে গেলাম তার বাবাকে আমি ভাই ডাকি। আমি তার থেকে দ্বিগুণ বয়সী। তাকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে ভাবি। ফোন এলে খুশি হই। অকারন আমিও ফোন দেই। কথা বাড়তে থাকে, স্বপ্ন ডালপালা মেলতে থাকে। সেও আমার বয়সের তোয়াক্কা করে না। দিব্যি শাসন করে, ঝগড়া করে, বকা দেয়। আমি ভালোবাসার চোরাবালিতে ডুবে যেতে থাকি।

মা আবারও অসুস্থ হলো। ভাই- বোনেরা এসে সেই বকাবকি। আজও সে সাক্ষী। একসময় তার পাতলা মুখ খুলেই ফেললো, – আপনারা তো কখনোই আসেন না। নিজেদের লাইফ স্যাটেল করতে ব্যস্ত। একজন একা পুরুষ মানুষ কিভাবে বয়স্ক মানুষকে সামলাবে। তিনি এ বয়সে বিয়ে করেননি তা নিয়েও তো মাথা ব্যাথা নেই। শুধু বকেন।

বোন রাগে ফুঁসছে। বাইরের এক পিচ্চি মেয়ে তাকে অপমান করছে, এ মোটেই সহনীয় নয়। সে বলেই ফেললো, – তা বুড়োকে তুমি বিয়ে করে নাও, এতো যখন দরদ!

স্বপ্রতিভ উত্তর,  – হ্যাঁ আমাকে বললে তাই-ই করতাম।

মুহুর্তেই ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল। আর সে বলা শেষ করেই দৌড় দিয়েছে।

পরদিন সে মাকে দেখতে এলে জানতে চাইলাম- কাল যা বললে তা কি সত্যি ছিল?

উত্তর দিলো- আপনি সত্যিই বোকা, কিছুই বোঝেন না দেখছি। আপনাকে ভালোবাসি বলেই প্রশ্নের বাহানায় ফোন দেই। ওসব আমি আপনার চেয়ে ভালো জানি। নিজে তো ডুবে ডুবে মরছেন? আমাকে আগে বললে কি মহাভারত উল্টে যেত?

– না, আমি তোমার থেকে,,,,সে আমার মুখ টিপে ধরলো।

ভালোবাসাহীন দীর্ঘজীবন আমার প্রয়োজন নেই, আমার একজন প্রিয়মানুষ প্রয়োজন। তো, সেই প্রিয়মানুষের বয়স দিয়ে কি করবো? তাছাড়া আপনাকে আমার মোটেও বয়সী লাগেনা। পরীক্ষা শেষ করে আসি তারপর বউ হয়ে আসবো। এরমধ্যে কোনরকম ভেজাল পাকালে বিপদ হবে বলে দিলাম।

বাপরে! রীতিমতো বৃটিশ শাসন জারী হলো। কি সাংঘাতিক!

ছবি – নেটের।

৩৪০জন ২৭২জন
0 Shares

একটি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ