ভোরের আলো ফুটল। সকলেই ঘুম থেকে জেগে দেখতে পেল নতুন বৌ সবার আগে উঠে বসে আছে।চাচী শাশুড়ি এগিয়ে এসে জানতে চাইলেন রোহান কোথায়? তার মানে বাড়ির লোকেরাও জানেনা রোহান কোথায়, রিয়া বুঝে নিল।কিন্তু একঘর লোকের সামনে সে এটা কি করে বলবে যে রোহান কোথায় সে জানে না? তাই মাথা নিচু করে রইল।সকলে ভেবে নিল নতুন বৌ লজ্জা পাচ্ছে। তাও এ বেলায় রক্ষা পাওয়া গেল।এভাবেই বিয়ে বাড়ির হৈচৈ চলতে লাগল।এসময় নাশতা খাওয়ার সময় হয়ে এল এবং সেই সাথে রোহান এসে উপস্থিত।সকলেই তাকে চেপে ধরল,কেন সে নতুন বৌকে রেখে এত সকালে বেরিয়ে গেল।কিন্তু রোহান মনে মনে জানে যে সে সারারাত বাড়িতেই ছিল না।তবে ঘরভর্তি লোকের সামনে এটা প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করল না। তাই কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে নিল।চারপাশে এত মানুষ, তাই রিয়া তাকে আলাদা ভাবে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছে না।
.
বেলা বাড়ছে।আগামী কাল বৌভাত।সকলে বৌভাতের আয়োজনে ব্যাস্ত। কজন ননদ দেবর বসে আছে রিয়াকে ঘিরে।তারা নানা দুষ্টামি আর আমোদ প্রমোদে মেতে আছে।রিয়া এই সবকিছুর মাঝে থেকেও যেন কোথাও নেই।তার মনে অন্য চিন্তা ঘুরছে ফিরছে।ইতোমধ্যে চিন্তারা ডানা মেলে উড়ছে আবার পাখা ঝাপ্টাচ্ছে।সেই ঝাপ্টা যেন রিয়ার বুকে দরাম দরাম করে আওয়াজ তুলছে।সে ভেবেই পাচ্ছে না কি হল রোহানের।রাতের খাবার খেয়ে রোহান রিয়ার সাথেই ঘরে গেল।কিন্তু আরো অনেকে তখন ছিল বলে রিয়া কিছু বলতে পারছিল না।শুধু ভাবছিল কখন ঘরটা ফাঁকা হবে,কখন সে রোহানকে সকল কিছু জিজ্ঞেস করবে।কিন্তু তা আর হল না।যখন সকলে যার যার জায়গায় ঘুমোতে গেল,তখন রোহান ও ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।সারা রাত আর ফিরল না।এই অস্বস্তি নিয়ে আরো একটা রাত কেটে গেল। তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।সে আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বজ্রপাতের একেকটা আওয়াজ তার পুরো অস্তিত্বকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। বাসর রাতে তার স্বামী সজ্জা ত্যাগ করেছে,এ কথা সে কাকে বলবে?সারা জীবন ধরে কত কথা সে জমিয়েছে স্বামীকে বলবে বলে।একটু একটু করে কথাফুল কুড়িয়ে গেঁথেছে কথার মালা।এ মালা যে বাসরের একাকীত্বের বেদনায় ঝড়ে পড়ছে চোখে,চোখ বেয়ে কপোলে।তারপর ঠিকানা হারাচ্ছে।
পরদিন বৌভাত। রিয়াকে আবার পার্লারে নিয়ে সাজানো হল।বৌভাতের খাওয়া দাওয়া বাড়িতেই হল। অতপর রিয়ার বাবা মা মেয়ে ও জামাইকে কিছুদিনের জন্য নিয়ে যেতে চাইলেন।শশুড় বাড়ির লোকেরাও সম্মতি দিলেন।
.
রিয়ার বাড়িতে পৌঁছে শ্যালক ও শ্যালিকাদের সাথে রোহানের খুব জমে গেল। কিন্তু রিয়ার সাথে কোন কথাই বলছে না।আর কেউ সেটা খেয়াল না করলেও রিয়ার মা ঠিকি খেয়াল করেছেন।তিনি আড়ালে ডেকে নিয়ে রিয়াকে নানা প্রশ্ন করলেন।মাকে আশ্বস্ত করার জন্য সে বলল সব ঠিকি আছে।আসলে কিচ্ছু ঠিক নেই।দুপুর বেলা খেয়ে যখন সকলেই বিশ্রাম নিচ্ছিল, রোহান তখন বাড়ান্দায় বসে আছে। তার পাশে আরেকটি চেয়ার নিয়ে বসল রিয়া। তারপর সোজাসুজি জিজ্ঞেস করল, “বলতো কি হয়েছে?”
“কই,কি হবে?”
“আমি বেশ বুঝতে পারছি,কিছুতো একটা হয়েছে।নইলে এভাবে আমাকে এড়িয়ে চলছ কেন?”
“কিচ্ছু হয়নি। ও তোমার মনের ভুল।”
“মোটেও না। আমি ছোট খুকি নাকি?”
খুব চাপা স্বরে কথা বলছে দুজনে।
অনেকক্ষন কথা বলেও কিছুই বের করতে পারল না রোহানের পেট থেকে।বরং সে বুঝতে পারল রোহান বিরক্ত হচ্ছে।
কারো পেট থেকে কথা বের করার মত এই মহৎ গুনটি রিয়ার নেই বললেই চলে।তবে সে মনে মনে খুব হতাশ হল।ধীরে ধীরে তার মাথায় ভেঙে পড়া আকাশ যেন আরো ভারী হতে লাগল।রাতে যদিও তারা একি বিছানায় ঘুমোতে গেল, কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলছে না।দুজনে দুদিক ফিরে শুয়ে আছে। রিয়া কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না।যদি রোহান বিরক্ত হয়,যদি তাকে পাত্তা না দেয়। পৃথিবীতে এই একটা জিনিস রিয়া সহ্য করতে পারে না,সেটা হল পাত্তা না দেয়া।কেউ যদি তাকে কোনদিন অবহেলা করছে তো তার ছায়াও আর কোনদিন মারায়নি রিয়া।কিন্তু এ যে তার স্বামী,যে কোন কেউ তো নয়।এই রোহানের সাথেই কাটবে তার বাকি জীবনটুকু।তাই রোহানের বেলায় নিজের ইগোকে একটু দূরে সরিয়ে রাখাই যায়। এই ভেবে রিয়া ওপাশ ফিরল। ফিরে দেখল রোহান ওপাশ ফিরে শক্ত হয়ে পরে ঘুমোচ্ছে। এখন ঘুমন্ত লোকটাকে আর ডাকে কি করে।তাই সেও ওপাশ ফিরে নীরবে চোখের জলে বালিশ ভেজাল।আজ তার হৃদয়ের আর্তনাদ শুধু বালিশটাই শুনতে পাচ্ছে, আর কেউ নয়।
পরদিন খুব ভোরে রোহান উঠে পরল।রিয়ার বাবা খুব সকালে ওঠেন। তাই তার কাছে বলল যে একটা জরুরী কাজ আছে বলে তাকে ঢাকা ফিরতে হবে।সকলে জাগেনি বলে তাদের কাছে বিদায় নেয়া সম্ভব হল না।রিয়ার যতদিন খুশি সে থাকতে পারে।এই বলে সে বেরিয়ে গেল।রিয়ার বাবা ভাবলেন,জামাই নিশ্চই রিয়াকে সব বলে গেছে।তাই আর কিছু বললেন না। হোটেলে নাশতা খাইয়ে রোহানকে বিদায় দিলেন।
সকালে উঠে রিয়া জানতে পারল রোহান চলে গেছে। রিয়াও দুদিন পর তার বাবার সাথে ঢাকায় রওনা হল।এর মাঝে শাশুড়ি ফোন করলেও রোহান করেনি।রিয়া তাকে ফোন করেছিল।রোহান ব্যাস্ততা দেখিয়ে কেটে দিয়েছে। রিয়াকে ঢাকায় রেখে তার বাবা চলে গেছেন।শশুড়বাড়ি ফিরে সে খুব স্বাভাবিক আচরন করল সকলের সাথে।রাতে রোহানকে আর বাহিরে যাবার সুযোগ দিল না।ভালমত চেপে ধরল।এবার রোহান সব খুলে বলল।
রোহান যা বলল তার সার্মর্ম হলো,সে নিজে খুব সত্যবাদী। তার কোন প্রেম বা মেয়েঘটিত ইতিহাস নেই।খুব স্বচ্ছ তার জীবন যাপন।তাই সে শুধু তার নিজের মত একটা জীবনসাথী চেয়েছিল।খুব বেশি কিছু তো চায় নি!তাহলে কেন সে তার উল্টোটা পেল?রিয়া তার পূর্বের প্রেমিকদের কথা কেন বিয়ের আগে রোহানকে জানাল না?
রিয়া তার কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না। সে বারবার রোহানকে বলছে যে কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। কিন্তু রোহান কিছুই বুঝতে চাচ্ছে না।তার একটাই কথা,তার বাল্যকালের বন্ধুরা কি তাকে মিথ্যা বলবে?তাছাড়া রিয়ার সাথে তো তাদের শত্রুতা নেই,তবে কেন তারা বানিয়ে বলবে? সে এই চরিত্রের কোন মেয়েকে তার জীবনে স্থান দেবে না। রিয়া চাইলে এখান থেকে চলে যেতে পারে।সে আর কিছুই শুনতে চায় না,কিছুই বুঝতে চায় না।
রিয়া ভেবেই পাচ্ছে না সমস্যাটা কোথায়?কেন রোহানের বন্ধুরা এটা করল? কেইবা তাদের এসব তথ্য দিল।রিয়ার যদিও শত্রুর কোন শেষ নেই।সৎভাবে চলার অনেক জ্বালা। সত্যবাদীতা আর স্পষ্টবাদিতার কারণে অনেকেই তাকে দেখতে পারে না।কিন্তু তাই বলে কেউ এভাবে তার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে,এটা সে ভাবতেও পারছে না। তার দুচোখ অন্ধকার হয়ে আসছে।সারারাত সে বাড়ান্দায় বসে কেবল ভেবেই যাচ্ছে কি করবে সে এখন?
চলবে……..
লেখক:নীরা সাদীয়া
১৯টি মন্তব্য
চাটিগাঁ থেকে বাহার
গল্পটিতে জীবনের প্রতিচ্ছবি আছে….
নীরা সাদীয়া
ধন্যবাদ। পাশেই থাকুন। শুভকামনা। 🙂
ইঞ্জা
আশা করি রোহানের ভুল দ্রুত ভাঙ্গবে।
ভালোই লিখে চলেছেন, আমরাও অপেক্ষায় থাকি, আরেকটা কথা বলি, এইখানে গল্পের সাথে সাথে কবিতা, সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা সহ একান্ত অনুভূতিও দিতে পারেন কিন্তু খেয়াল রাখবেন যা লিখবেন তা যেন কন্ট্রোবার্শিশিয়াল যেন না হয়।
হ্যাপি বল্গিং। (y) -{@
নীরা সাদীয়া
ধন্যবাদ। পাশেই থাকুন। শুভকামনা। 🙂
ইঞ্জা
শুভকামনা
মনির হোসেন মমি(মা মাটি দেশ)
লেখাটি মন ছুয়ে গেলো।লেখার পূর্বের পর্বের লিংক দিলে ভাল হয়।
নীরা সাদীয়া
ধন্যবাদ। পাশেই থাকুন। শুভকামনা। 🙂
নীরা সাদীয়া
https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a6%be-%e0%a7%a7/
প্রজ্ঞা ১
নীরা সাদীয়া
https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a6%be-%e0%a7%a8/
প্রজ্ঞা ২
নীরা সাদীয়া
https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a6%be-%e0%a7%aa/
প্রজ্ঞা ৪
লিঙ্কে গিয়ে পড়তে পারলেন কিনা জানাবেন। জানালে খুশি হব। ধন্যবাদ।
মনির হোসেন মমি
পড়ছি।
নীলাঞ্জনা নীলা
একেবারে অন্য ধাঁচের গল্প আগেও বলেছি। ভাবাও যায়না পরের পর্বে কি হতে পারে! ঠিক এমন টাইপ।
ভালো লিখছেন।
আর হ্যা ইঞ্জা ভাইয়ার সাথে আমিও একমত, “বিবিধ”তে না রেখে “গল্প” বিভাগে রাখুন এই পোষ্টটি।
নীরা সাদীয়া
কি করে এটাকে গল্প বিভাগে নিতে হয় তা আমার জানা নেই।ব্লগে আমি নতুন তো। আশা করছি ধীরে ধীরে শিখে যাব। পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। পরের পর্ব দেয়া হয়েছে। ধন্যবাদ। পাশেই থাকুন। শুভকামনা। 🙂
নীলাঞ্জনা নীলা
আপনি যখন একটি নোট লিখবেন একেবারে স্ক্রল করে নীচে টেনে নেবেন। যেখানে “প্রকাশ” লেখা, তার ঠিক নীচেই দেখবেন লেখা আছে “বিভাগসমূহ।” বিভাগসমূহর আবার দুটি ভাগ। একটি হলো “সব বিভাগগুলি” আর অন্যটি “সর্বাধিক ব্যবহৃত।” আপনি করবেন কি “সব বিভাগগুলি”তে ক্লিক করলেই পেয়ে যাবেন এক এক করে। যেমন, “একান্ত অনুভূতি, বিবিধ, কবিতা, গল্প” ইত্যাদি। গল্প লিখছেন যখন, আপনি গল্পকেই সিলেক্ট করুন।
ব্যস হয়ে গেলো। জানিনা বোঝাতে পারলাম কিনা! তা না হলে অন্য আর যে কারুকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন।
নীরা সাদীয়া
সকলের জন্য পরবর্তী পর্বের লিঙ্ক দেয়া হলোঃ
https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9e%e0%a6%be-%e0%a7%aa/
প্রজ্ঞা ৪
আবু খায়ের আনিছ
পোষ্ট করার পূর্বে নিচের দিকে দেখবেন বিভাগ অপশন আছে, সেখানে গেলেই সাহিত্য, গল্প পেয়ে যাবেন।
আপনার লেখা দেখে মনে হচ্ছে আপনি পুরাতন লেখক, দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন লেখায়।
অবজ্ঞা বা অবহেলা কেউ সহ্য করতে পারে না, পয়েন্ট অফ ভিউ এই গল্পের।
কাহিনী কি সেটা জানিনা, তবে কিছুটা অনুমান করছি। যাইহোক পরের পর্বে দেখি কি হয়।
নীরা সাদীয়া
অসংখ্য ধন্যবাদ। ব্লগে আমি নতুন। পরবর্তী পর্বগুলোতে আমন্ত্রণ রইল।
ফারহানা নুসরাত
গল্পটি ভাল লাগছে। দেখি পরের পর্বে কি আছে।
নীরা সাদীয়া
ধন্যবাদ আপু। পাশেই থাকুন।