মোমবাতির আলোতে যা প্রথম দেখা গিয়েছিল

 

 

“কিছু কি দেখতে পাচ্ছ ?”

“হ্যাঁ দেখতে পাচ্ছি,  আশ্চর্য এবং অদ্ভুত  সব জিনিস”

 

এই দুইটি লাইন বিখ্যাত হয়ে আছে পৃথিবীর সেই  সব মানুষে কাছে যাদের অসীম আগ্রহ  মিশরীয় সভ্যতা নিয়ে।

বন্ধ কবরের দরজা  কিছুটা ভেঙ্গে  মোমবাতির আলোতে হাওয়ারড  কার্টার যখন উঁকি দিয়ে যা দেখেছিলেন তার বর্ণনা এভাবেই তিনি লর্ড কারনারভন কে দিয়েছিলেন ।আর সাল টি ছিল  ১৯২২ সাল,নভেম্বরের ৪ তারিখ ।

lord Carnarvon একজন  ব্রিটিশ   এবং  বিরাট ধনী মানুষ । যার  কিনা অসীম আগ্রহ প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা নিয়ে,  আর ঠিক যেমন ছিল Howard Carter এর । দুই জনের  অনেক অমিল থাকলেও এই এক ব্যাপার অর্থাৎ প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা নিয়ে  তাদের আগ্রহে অনেক মিল ছিল ।

তাই Carnarvon এই তুতেনখামনের   ডিসকভারি করার সমস্ত খরচ বহন করতে রাজী হন যখন কার্টার তার কাছে বললেন যে তিনি তুতেন খামনের নাম লেখা একটি সিল পেয়েছেন এবং তিনি আরও বললেন তিনি একটি পাত্র পেয়েছেন যার  উপরে তুতেন খামনের নাম কার্তুসের মধ্যে লেখা আছে ।

তাছাড়া কর্নাক টেম্পেলে ফ্যারো হিসেবে তুতেন খামনের নাম লেখা আছে ।তার মানে তার কবর কোথাও লুকিয়ে আছে যা এখনো পাওয়া যায়নি।সব ফ্যারোদের কবর পাওয়া গেলেও তুতেন খামনের কবর মিসিং ছিল ।অনেক দিন ধরেই কার্টার মিশরে আর্কেওলজিক্যাল কাজ নিয়ে সময় অতিবাহিত করেছিলেন। তাই তার অনেক বিষয়ে অভিজ্ঞতা ছিল।‘টুটেনখামনের ‘কবর প্যালেসের’   চারটি ঘর এবং ঘর ভর্তি দামি সামগ্রী’

তিনি ইতিহাসে বিশেষ করে আর্কেও লজিক্যাল ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন তুতেন খামনের কবর আবিষ্কারের জন্য। যেদিন এটি ডিসকভার হয় সারা পৃথিবীতে বিশেষ সাড়া  পড়ে যায় এবং সমস্ত খবরের কাগজের শিরনামে এই খবর ছাপা হয়।  বছরের পর  বছর পার  করলেও তার কবর টি পাওয়া যাচ্ছিল না। তারপর একদিন  তারি এক লেবার ছোট একটি ছেলে বালতি ভরা পানি নিয়ে যাওয়ার সময় কিছু একটা পাথরে ধাক্কা খায় এবং কিছু পানি পড়ে একটা সিঁড়ির ধাপ বেরিয়ে আসে। এবং সেই ধাপটিই ছিল তুতেন খামনের কবরে যাওয়ার সিঁড়ির কিছু অংস  । কার্টার তার লেবার দিয়ে সব রাবল এবং বালু সরিয়ে লম্বা একটা সিঁড়ি পান যার শেষে  ছিল একটা দরজা যেটা  ভেঙ্গে একটা ছিদ্র দিয়ে মোমবাতির আলতে যা দেখতে পেলেন  তাই ছিল সারা  পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দেয়া তুতেন খামনের বিখ্যাত কবর ।

সলিড গোল্ডের মুখোশ যা  মমির উপরে ছিল

কে এই টুটেন খামন

তুতেন খামন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না কারন তিনি ছিলেন একজন মাইনর কিং। তবে বছরের পর  বছর গবেষণা চালিয়ে ইজিপ্টোলজিসট ,আরকেওলজিসট এবং ইতিহাসবিদ নানা রকম বিষয় যোগাড় করে তার জীবন সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারনা পান। এবং তা হল, তিনি ১৮ ডাইনেসটি তে জন্ম গ্রহণ করেন ।মাত্র নয় বছর বয়েসে তিনি সিংহাসনে বসেন ।  যা মোটামুটি ভাবে ১৫৫০- ১২৯৫ BC , টাট এর ( অল্প বয়স হওয়াতে সংক্ষেপে তাকে ‘বয় টাট’  বলে ডাকা হয়) জন্ম গত নাম ছিল টুটান খামন  । ক্ষমতা গ্রহনের সময় তার রাজত্বের অবস্থা স্থিতিশীল ছিলনা । কারন তার পিতা এমেনহটেন ৪  প্রচলিত ধর্ম পরিত্যাগ করে নুতুন ধর্ম এটেন বা সান গডের উপাসনা আরম্ভ করলে ধর্মগুরু এবং প্রজাদের বিরুদ্ধে চলে যান। এমনকি তার ছেলের নামে সংযোগ করেন ‘এটেন এর দেবতা’ ।

কিন্তু ১৩৩০ BC টে মাত্র ১৮ বছর বয়েসে তিনি মারা যান। মাত্র ৯ বছর বয়েসে পিতার মৃত্যুর পর ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বিখ্যাত রানী নেফারতিতি ছিলেন তার সতালো মা। নেফারতিতির ৬ টি কন্যার মধ্যে একটি কন্যা এয়াংকেসুনামুন এর সাথে তার বিয়ে হয় । ষে সময় ফ্যারো দের মধ্যে ভাইবোনের বিয়ে প্রচলিত ছিল। DNA টেস্টে দেখা যায় তার মা তার পিতার বোন ছিল। তার পিতা পুরানো ধর্ম পরিত্যাগ করে সান ধর্ম প্রচলনের জন্য রাজধানী সরিয়ে আমারনায় চলে আসেন। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর  তিনি পুনরায় আগের ধর্মে ফিরে যান এবং করনাকে নিজের নামে মন্দির স্থাপন করেন এবং ‘Nebkheperure” নাম নেন অর্থাৎ পিতার ধর্ম পরিত্যাগ করে আগের ধর্মে প্রত্যাবর্তন কারি ।

তার কবরে  জন্মের পরপরেই মারা যাওয়া দুটি কন্যা শিশুর মমিফাইড দেহ পাওয়া যায় । যা ছিল তার ঔরস জাত  । তিনি মাত্র নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন। কেউ কেউ বলেন তার উপদেশ দাতা বা ধর্ম গুরু তাকে হত্যা করেছিল  । তার পিতা অন্য ধর্মের ছিল বলে তারা রাগান্বিত ছিল।

সে  যাইহোক না কেন এই ক্ষণস্থায়ী অল্প বয়সী একজন  মাইনর বা গুরুত্ব হীন রাজা  শেষ পর্যন্ত আজকের পৃথিবীতে  সবচেয়ে  আলোচিত রাজা হিসেবে পরিচিত । কারন তার কবরটি অক্ষত ছিল এবং তা  ছিল ছয়  হাজার জিনিস দিয়ে পরিপুর্ন এবং তার সাথে ছিল মহা মূল্যবান ট্রেজার।তার কবরে যে সমস্ত সোনা দিয়ে তৈরি সামগ্রী পাওয়া যায় তার ওজন ছিল ২৬০ পাউন্ড। তার কফিন টি ২০০ পাউন্ড ওজনের সোনা দিয়ে তৈরি ছিল আর তার মমি মাস্ক টি ২০ পাউন্ড   ওজনের সোনা দিয়ে তৈরি ।

পর পর তিনটি সোনা দিয়ে মোড়া  কফিন ছিল,  তার উপরে ছিল আরও চারটি সোনার পাত দিয়ে ঢাকা কাফন বাক্স । এছাড়া খাঁটি সোনার পাত দিয়ে সিংহাসন , ফিনারেল খাট , ঘুমানোর জন্য সোনার পাতে মোড়ানো খাট,  চেরিয়োট এবং মমির কাপড়ে মোড়ানো বিভিন্ন স্তরে পাওয়া গেছে সোনা এবং মূল্যবান পাথরের তৈরি ২০০ টি জুয়েলারী এবং ড্যাগার ।

এই সমস্ত জিনিসপত্র থেকে জানা যায় হাজার হাজার বছর আগে তাদের জীবন যাত্রা কেমন ছিল ।তার কবরটির নাম্বার ১৬২ এবং ভ্যালি অব দি কিং তা অবস্থিত ।

‘বয় টাট’ বা  ‘বালক টাট’  এর মৃত্যু

অনেকদিন ধরে ইতিহাসবিদ এবং স্কলার দের কাছে তার মৃত্যুর কারন ‘পাযল’  হয়ে  ছিল,অর্থাৎ ঠিক কি ভাবে মৃত্যু তা নিয়ে না না মত ছিল । কেউ বলেন তাকে পেছন দিক থেকে হত্যা করা হয় ,কেউ বলেন বিষ দিয়ে মেরে ফেলা হয় অথবা ম্যালেরিয়া মারা গেছেন। এক্সরে দ্বারা দেখা যায় বুকের পাঁজরের একটা রিব নায় তার মানে হয়তো কোনো  দুর্ঘটনা গাড়ি থেকে পড়ে মারা গেছেন।

3D সিটি স্ক্যান দিয়ে দেখা যায় তার একটা পা club foot বা তিনি খোঁড়া ছিলেন । তার কবরে অনেক লাঠি পাওয়া যায় যা হাঁটার জন্য দরকার। তাই অনেকে মনে করে তিনি পঙ্গু ছিলেন এবং কর্মক্ষম ছিলেন না।

তবে বর্তমান গবেষণায় দেখা যায়  তার মৃত্যু অন্য কারনে হয়েছে।

মিশরে যে নুতুন মিউজিয়াম  বানানো হয়েছে সেখানে তার সমস্ত ৬০০০ হাজার জিনিস ডিসপ্লে করা হবে।আশা করা হচ্ছে সেখানে ৩০ মিলিয়ন টুরিস্ট আসবে তার সমস্ত জিনিস দেখতে ।  যা এতদিন বাক্স বন্দি অবস্থায় পুরানো মিউজিয়ামের স্টোররুমে রাখা ছিল ।পুরানো মিউজিয়ামে সব কিছু রাখার স্থান ছিলনা। এখন সেগুলো রেস্টরেসান করা হচ্ছে এবং সেখানে পাওয়া একটা যুদ্ধে ব্যাবহৃত চামড়ার বর্ম পাওয়া যায় । যা প্রতিপক্ষের ছুঁড়া  তীর থেকে দেহকে রক্ষা করে।  গবেষণা করে দেখা যায় সেটা  তিনি  অনেকবার পরিধান করেছিলেন।

২০২৩ সালের তার মৃত্যু নিয়ে সর্ব শেষ গবেষণায় বিখ্যাত আরকেওলজিসট ,মিশরের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ‘ সেলিনা ইকরাম’  বলেন,তিনি মোটেও বালক  ছিলেন না , তিনি যুদ্ধ করতে গিয়ে মৃত্যু বরন করেন। যুদ্ধে গিয়েছিলেন ,প্রতিপক্ষ শত্রুকে মুকাবিলা করার মতো সাহসী ছিলেন। তার চেরিওট,সিংহাসন সব জায়গায় আঁকা আছে যুদ্ধ মোকাবিলার গল্প । বর্ম পরা ছবি এবং বাক্সে পাওয়া বর্ম  বলে দায় তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন।

‘সেলিনা ইকরাম’  একজন মমি বিশেষজ্ঞ ,তিনি তার মমি পরীক্ষা করে দেখেন মমিটিতে দুইবার রিজেনের প্রলেপ দেয়া। তার মৃত্যু অনেক দূরে হয়েছিলো এবং সেখানে যারা প্রথম  মমি করেন তারা মমি করাতে অভিজ্ঞ না হওয়াতে নিয়ম মেনে মমি করেন নি।  মমির পেটের এক পাস কেটে ভিতরের অরগ্যান বের করা হয়নি, মাজখানে কেটে বের করা হয়েছে। মৃত্যুর বেশ কিছু দিন পরে মৃত দেহটিকে নিয়ে এসে পুনরায় রেজিনের প্রলেপ দেয়া হয়ে ছিল।

সেলিনা ইকরাম বলেন তিনি রীতিমত পুর্ন বয়স্ক ছিলেন কারন সে সময় ১৪ বছর বয়স কেই বয়স্ক ধরা হতো । তিনি ১৮ শেষ করে ১৯ বছর বয়সে মৃত্যু বরন করেন।

তার কবরে পাওয়া ছয়টি চেরিয়েট( যুদ্ধ পরিচালনা করা গাড়ি),কোমরে গোঁজা ড্যাগার সহ আরও চারটি ড্যাগার ,শত শত তীরধনুক, আট টি চামড়ার গলা থেকে হাঁটু অবধি বর্ম বা শিল্ড প্রমাণ করে তিনি অন্য দেশ কে  পরাজিত এবং নিজ দেশের  সীমানা বৃদ্ধি করার যোদ্ধা ছিলেন।

‘ বয় টাট’  বলে তাকে আদর করে ডাকা হলেও তিনি পুর্ন বয়স্ক ভাবেই মৃত্যু বরন করেছিলেন।

তথ্য সূত্রঃ

King Tutankhamun Fact and information, National Geographic

The Discovery of King Tut’s Tomb, Today in History

King Tut’s Tomb was Discovered ,Rodepoort  Record

Photo, Wikipedia

ইতিহাস ও ঐতিহ্য , প্রবন্ধ

লেখক এবং গবেষকঃ হুসনুন নাহার নার্গিস

৬০৪জন ৬০৩জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ