তবুও বেঁচে থাকা

ক্ষোভে উত্তেজনায় শায়লা বলে চললো__ “এভাবে সংসার হয় না। হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত গায়ে হাত তুললো ? আমার বাবা-মা’ও কোনদিন গায়ে হাত তুলেনি। আমাকে ধাক্কা মেরে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিলো। আমি তো মারাও যেতে পারতাম, পারতাম না ?” জিজ্ঞাসু দৃষ্টি আমার দিকে। আমি ধীর, স্থির কণ্ঠে বলি, “তুমি তাঁর মেজাজ খারাপ করেছিলে ?” শায়লার উত্তর, ” আমার বাবা-মা তুলে কথা বললে আমি স্থির থাকতে পারি না, ওর বাবা-মা নিয়েও বলতে থাকি মুখে যা আসে তা।” আমি বুঝে নিলাম, এভাবেই বিবাদ জটিল থেকে জটিলতর দিকে এগিয়ে যায়।

 

সেদিন আবারো সেই রাগত স্বর__ ” অনেক কিছুই মেনে নেয়া যায়। গায়ে হাত তোলাও মেনে নেয়া যায়। কিন্তু পরনারীতে আসক্তি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। নাহ্‌ আর একসাথে নয়। এমন পরিস্থিতিতে পড়লে তুমি কি করতে ?” আমি উত্তর করি না। বাইরে ব্যাকইয়ার্ডে দৃষ্টি ফেরাই। শায়লার একমাত্র পুত্র আর একমাত্র কন্যা খেলা করছে বাইক নিয়ে। ছোট বোনটি বাইক থেকে পড়ে গেলো, ভাইটি পরম মমতায় হাত ধরে টেনে তুলল। কি অদ্ভুত মায়াময় দৃশ্য ! সৃষ্টিকর্তা রহমান-শায়লা দম্পতিকে দু’হাত ভরে দিয়েছেন। সুস্থ দু’টি সন্তান। আর কি চাই ! অনেকের তো অনেক অপূর্ণতাই থাকে। থাকে না ? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি একাকি।

চা’য়ের কাপে চামচের টুংটাং শব্দে ফিরে চাই। শায়লা চা এগিয়ে দিতে দিতে বলে_” এবার আর কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। স্বামী রাগ করে সেই যে গেলো, তিনদিন বাড়ি ফিরেনি। এমন করে একটি সম্পর্ক আর কতদূর টেনে নিয়ে যাবো ? বাচ্চাদের মানসিক অবস্থার কথা, ভবিষ্যতের কথা ভেবে নয়’টি বছর কাটিয়ে দিলাম। বিচ্ছেদের দিকে এক পা এগোলে তিন পা পিছিয়ে আসি। এবার ওদের সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠবার কথা ভাবতে হচ্ছে। ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নো ওয়ে। এটাই ফাইনাল। একজন উকিলের সাথেও কথা হয়েছে এ ব্যপারে।”

কথাগুলো বলার সময় রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা ঝরে পড়ছিল যেন দু’চোখ বেয়ে। দিনের পর দিন অনিদ্রার শিকার প্রাণহীন চোখজোড়ায় চারপাশে কালো দাগ স্থায়ী হয়ে উঠেছে যেন। চা’য়ের কাপ হাতে বেলকোনীতে এসে বসি আমরা। কোন অযাচিত প্রশ্ন করি না। অন্যবারের মত উপদেশ কিংবা অনুরোধের ধার ধারি না। সূর্য তখন  খুব দ্রুতই টুপ করে হারিয়ে যায় দিগন্তের ওপাশে। সন্ধ্যা ঘনায়। নিরিবিলি এইদিকটায় হঠাৎ গাড়ির শব্দে নিচে রাস্তায় তাকাই। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর উস্কো চুলে উদ্ভ্রান্তের মত একজন নেমে এলো। গাড়ির শব্দে ব্যাকইয়ার্ড থেকে বা-বা বলে আনন্দে চিৎকার করতে করতে ছুটে এলো দু’ভাই-বোন। জড়িয়ে ধরলো। আদরে আদরে ভরিয়ে দিলো। আমি পৃথিবীর সবচাইতে তীব্র বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থাকি ! যেন কত জনম প্রতীক্ষার পর এই মিলন ! পিতার সাথে সন্তানদের মিলন।

শায়লা আমার দিকে তাকায়। আমি তাঁর দিকে। এই প্রথম শায়লার দু’চোখ বেয়ে অশ্রুজলের গড়িয়ে যাওয়া দেখি। যেন নায়াগ্রা জলপ্রপাত। আমি উঠে দাঁড়াই। চলে আসবো বলে আলতো জড়িয়ে ধরি। ভারী নিঃশ্বাস কানে এসে লাগে। ছলছল চোখে এক পৃথিবী হতাশা নিয়ে শায়লা বলে, ” তুমিই বলো, এদের আমি পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করি কেমন করে ?”

আমারও নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। বাইরের মুক্ত বাতাসে এসে দাঁড়াই। সন্ধ্যার আকাশে একঝাঁক পাখি ডানা মেলে উড়তে উড়তে নীড়ে ফিরে যায়। পথের দু’ধারের ঝরাপাতা মাড়িয়ে আমিও ফিরি বাড়ি। আমাদের মাঝে অনেক মিল, তাই না ?

 

শায়লা’রা এভাবে নিজের সকল সুখ, আনন্দ বিসর্জন দিয়ে তিল তিল করে মরেও বেঁচে থাকে সন্তানদের কথা ভেবে। বিচ্ছেদের মত চূড়ান্ত কঠিন সিদ্ধান্ত’টি নিতে গিয়ে এক পা এগিয়ে গেলেও তিন পা পিছিয়ে আসে, সে-ও সন্তানদের কথা ভেবে। শায়লা’রা বারংবার হেরে গিয়েও বেঁচে থাকে।

 

স্বামী হিসেবে রহমান সাহেব ভালো না হতে পারেন, কিন্তু একজন বাবা হিসেবে ?

মোট পড়েছেনঃ ৮৬৪জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

২৭টি মন্তব্য

  1. বাবা হিসাবে ভালো হলেও ভালো নয়। মানুষ পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। হয়ত বাচ্চাগুলো এখন বুঝতে পারে না কিন্তু শিক্ষা নিচ্ছে। পরবর্তী জীবনে এর প্রভাব পড়তেই পারে।

    1. ঠিক বলেছেন। বাবা হিসেবে সে-ই ভাল, যে তাঁর বাচ্চাদের মা’কে ভালোবাসে। আবার একই ভাবে উল্টোটাও বলা যায়।
      ভাল থাকুন সব সময়। শুভকামনা। -{@

  2. //স্বামী হিসেবে রহমান সাহেব ভালো না হতে পারেন, কিন্তু একজন বাবা হিসেবে ?//

    নারী পুরুষের বিভাজন দূরে রাখি বরং! বিবেচনায় নেই শুধু মানুষকে।

    এবং হিসেবের বিষয় এক্ষেত্রে গৌণ ভীষণ, কারণ, মানুষ কেবলমাত্র দুভাগেই বিভক্ত হতে পারে, ভালো অথবা মন্দ।

    শুভকামনা অনিঃশেষ।

    ভালো থাকবেন। সবসময়।

    1. এমন করে শুধু নারীরাই যে সব সয়ে যায়, মানিয়ে নেয় তা কিন্তু নয়। পুরুষদেরও এমন মানিয়ে নেয়ার উদাহরন আছে। সে নিয়ে লিখবো আরেকদিন। মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করি আমরা __ভাল মানুষ, মন্দ মানুষ …
      শুভকামনা থাকল।

  3. মানুষ!!

    এমন একটি প্রশ্ন করলেন যার কোন সদুত্তর নেই কারণ একমাত্র সময়ের হাতে এর উত্তর… আমি উত্তর দিতে পারছি না। এই প্রথম কোন দ্বিধায় ফেলে দিলেন মানুষ হিসেবে মানুষকে ভাবতে।

    আপনি পারেনও বটে… -{@

  4. অধিকাংশ মেয়েরা এই একটি জায়গাতেই মার খায়। তাদের আবেগ। নিজের জীবনের ৯৯ ভাগ না-পাওয়া নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয় শুধু সন্তানদের কথা ভেবে। সমাজের চারপাশে এমন দেখছি, তবে এমনও দেখেছি সন্তানই বাঁচিয়ে নেয় তাদের মাকে অমন চরিত্রহীন স্বামীর থেকে। খুব সত্যি কথা চরিত্রহীন স্বামীর ঘর করার চেয়ে বেড়িয়ে আসা ভালো। ওখানে কোনো কম্প্রোমাইজ বা স্যাক্রিফাইস নয়। রিমি আপু আপনি ওই আপুকে বলবেন আমি এ কথাটি বলেছি। একটা মেয়ে সবকিছু ছেড়ে স্বামীর সংসারে যায় আর স্বামী পরনারী আসক্ত। ভালো না লাগতেই পারে, কেন তাহলে ডিভোর্সে যায়না? এদের মতো মানুষ ঘরেও খায়, বাইরেও। এমনই এরা।

      1. আপু আমি আশা করবো শায়লা আপু এ ব্যাপারে কিছুতেই কম্প্রোমাইজে যেনো না যায়।

        তুমিও বেঁচে থাকো সুস্থভাবে আপু। -{@

  5. আপু কি লিখবো ঠিক বুঝতে পারছিনা। এ লেখায় মন্তব্য আসছেনা আমার। একটা কথাই মনে হচ্ছে, নিজে ভালো না থাকলে কতদিন কাউকে ভালো রাখা যায়!! কতটা শেষ কর দেয়া যায়!! শায়লার প্রতিদিনের এক একটা যন্ত্রণা আসবে কি লেখাতে? লেখাটি আমি প্রিয়তে নিলাম, কেন নিলাম সে হয়তো আমি ছাড়া কেউ-ই জানবেনা।

    1. আমাদের সমাজে এমন শায়লা আছে অনেক অনেক। খুব নিরবে বেঁচে থাকে তাঁরা। মরতে মরতে বেঁচে থাকা। তবুও কেউ জানতেও পারে না সেসব কথা।
      ভাল থাকুন। শুভকামনা। -{@

    1. সন্তানকে ভাল রাখার জন্যই এমন ত্যাগ অনেক মায়েরা কিংবা বাবারা করে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ভাল রাখতে পারে কি ? এটিই এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে থাকলো …
      ভাল থাকুন প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে। -{@

      1. আপনার এ প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেয়া কঠিন।
        তবে সন্তানের দিকে তাকিয়ে এই ত্যাগের ফল অনেক সুন্দর যেমন দেখেছি,
        উল্টোটাও দেখেছি, সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি।

  6. কিছু বলার নেই আপু | শুধু এটুকুই বলব প্রতিটি মানুষেরই সম্মানের সহিত বেঁচে থাকার অধিকার আছে| শায়লার জীবনে সুখ ফিরে আসবেনা | 🙁

  7. কিছু লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে। আবার তিন পা পিছিয়ে দিচ্ছে কি যেনো।
    “সুস্থ দু’টি সন্তান”। আমার ইচ্ছে করে এই বাক্যের মাঝে যেতে।
    সুস্থ সন্তান দু’টি মানসিক ভাবেও সুস্থ থাকুক, বেঁড়ে উঠুক।

    1. সেই কামনা আমারও। যদিও জানি সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে হলে সুস্থ পরিবেশ জরুরী।
      তবুও শুভকামনা। ভাল থাকুন আপনিও প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে। -{@

  8. আপু !! বাস্তব জীবনের গল্প দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখনীতে —– অনেক মেয়েই আছেন যারা নাম মাত্র সংসার টিকিয়ে রেখেছেন- কেউ সমাজ ও পরিবারের কথা ভেবে / কেউবা সন্তানের জন্য / অনেকেই আছেন যাদের কোথাও যাবার জায়গাটুকু নেই বলে !!!! আবার অনেকেই আছেন যারা হয়তো সুখের অভিনয় করে যান / খুবই অল্প কেউ হয়তো সত্যিই সুখী !!!!
    গল্পটা পড়ে সত্যিই মনের কোনে ব্যাথা ফুটে উঠেছে —–

    1. আমাদের পাড়ার এক খালার কথা মনে পড়ে গেল আপনার মন্তব্য পড়ে। পারিবারিক কলহ শেষে রাতে সকলের অগোচরে বিষ খেয়েছিলেন তিনি। গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় পরিবারের অন্যদের। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে জরুরি চিকিৎসা দেয়ায় তিনি বেঁচে যান। এরপরও তাঁরা সংসার করে গেছেন তিনটি সন্তানের কথা ভেবে। তবে… স্বামী-স্ত্রী সেই যে কথা বন্ধ করেছিলো, আর কথা বলেনি কোনদিনও। কেউ কারো মুখ দেখেনি এক ঘরে থেকেও। বিশাল এক প্রাচীর নিয়ে সংসার নামক ভেলা ভেসে চলেছে শেষ অবধি।
      এটাও জীবন, তবুও জীবন।
      ভাল থাকুন আপু। -{@

  9. জীবনের সাথে কম্প্রোমাইজ আমরা সবাই কম বেশী করি
    তবে নারীদের মেনে নেয়াটা অনেক বেশী
    মেনে নেয়া ব্যতীত কিছুই করার থাকেনা, একা চলার শক্তি সবার থাকেনা।

    মন খারাপ হয়ে গেলো আপনার লেখা পড়ে
    কেমন একটা অসহায়ত্ব …………

    শুভ কামনা।

  10. লেখায় মন্তব্য করা কঠিন।এর কোন সমাধান নেই আসলে।আপনিও লেখায় সমাধান দিতে পারেননি।আমরা সমাধান দিতে পারবো,আমাদের অবস্থানে থেকে।একজন ভুক্তভোগী নারীই বুঝবেন কেন তিনি এই অবস্থাকে মেনে নেন।মৃত হয়েই বেঁচে থাকেন সবাই সন্তানের কথা ভেবে।
    লেখাটি মনে দাগ কেটে গেলো আপু।প্রিয়তে নিলাম।

    1. ঐ যে বললাম, তিনি এক পা এগিয়ে তিন পা পিছিয়ে আসেন বাবার প্রতি সন্তানদের ভালোবাসা দেখে। এমন উদাহরন আমাদের সমাজে অনেক। যদিও এ দেশে একা চলতে পারাটা একজন নারীর জন্যে কোন ব্যপার না। সরকার থেকে সব রকম সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। তবুও সন্তানদের জন্যে পিতৃ স্নেহ কোথায় পাবেন ?
      তবে অন্য একজন আপুকে জানি, যিনি এতদিন অপেক্ষা করছিলেন সন্তানদের বড় হয়ে উঠবার। নিজের পায়ে দাঁড়াবার। তাঁরা বড় হয়েছে। নিজেরা জব করছে। এখন সেই আপু আলাদা থাকছে স্বামীর কাছ হতে।
      হায় জীবন ! জীবন এত ছোট, তবুও কত জটিল করে তুলি আমরা।

  11. দাম্পত্যে তিক্ততা আসতে দিতে নেই। যদি একবার গেড়ে বসে তবে আর রক্ষা নেই। হয় ক্লোজ করতে হবে না হয় বয়ে বেড়াতে হবে। আর বাচ্চা-কাচ্চা হয়ে গেলে বয়ে বেড়ানোতে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার মনে হয় নারীকেই করতে হয়।
    এজন্য আমি মনে করি জীবনের শুরুতেই আগে বুঝে নেয়া উচিৎ সারাজীবন হাঁটা কতোটা সম্ভব,যদিও এটাও সত্য ঝড় জীবনের যেকোন সময়েই উঠতে পারে।

    1. অনেক আগে যখন আমরা এ দেশে নতুন আসি তখনকার কথা। এক আংকেল ঠিক এই রকম উপদেশ দিয়েছিল আমাদের। আপনার মন্তব্যে সেই আংকেলের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি নিজের জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা, অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন আমাদের সাথে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত সারাটি জীবন কেমন করে তাঁকে তিল তিল করে শেষ করে দিয়েছিল।

      শুভকামনা …

মন্তব্য করুন