সেবার দেশ থেকে ফিরবার সময় পরিচিত একজন তার প্রবাসী স্বামী’র জন্যে কিছু দিতে চাইলেন। আমার সমস্যা হয় কিনা ভেবে সংকোচে প্যাকেটটি দিলেন। তাকে আশ্বাস দিলাম জিনিষগুলো তার স্বামী’র হাতে পৌঁছে দিবো বলে। যথাসময়ে আমি ফিরি। ভদ্রলোককে ফোন করি। তিনি সেইদিনই সন্ধ্যায় এসে হাজির। টুকটাক কথা হয়। দেশে রেখে আসা ছোট্ট মেয়ে দু’টিকে খুব মিস্ করেন। কথার অধিকাংশ জুড়েই ছিল তার কন্যাদ্বয়। এরই মাঝে প্যাকেটটি তাকে বুঝিয়ে দিলাম। তিনি দেরী না করে খুললেন সেটি। বেশ অনেকগুলো অডিও ক্যাসেট। প্রতিটি গানের ক্যাসেটেই স্ত্রী কিছু না কিছু লিখে দিয়েছে। তিনি বেশ আনন্দ নিয়ে তা পড়ছিলেন। চোখ মুখ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছিলো। তিনি এতোটাই আনন্দিত হয়ে জিনিষগুলো দেখছিলেন যেন তারা দু’জন আছেন ছুঁয়ে দেয়া দূরত্বে। দৃশ্যটি আমার যারপরনাই ভালো লেগেছে। স্বামী-স্ত্রী’র এই ভালোবাসায় দূরত্ব যেন কোন বাঁধা নয়। কোন এক মৌন সুতোয় তারা বেঁধে রেখেছেন একে অপরকে।
ভদ্রলোকের সাথে আমার সেই প্রথম এবং শেষ দেখা। শেষ কেন__ বলছি……
অনেকদিন পর একরাতে দেশ থেকে ফোন এলো। গগনবিদারী কান্না রিসিভারের অন্যপ্রান্তে। সেই ভদ্রমহিলা। আমার হেল্প চাচ্ছেন। সব শুনে আশ্বাস দিলাম, আমার দ্বারা সম্ভব সব রকম সহযোগিতা আমি করবো তার জন্যে। ফোনটি রেখে স্তব্দ হয়ে বসে থাকলাম। অতঃপর কোন কারন ছাড়াই অন্ধকারে ঘরময় হেঁটে বেড়ালাম ভোর অবধি। প্রতিদিনের মতন খুব ভোরে কাজে যাবার প্রাক্কালে বাড়ীর পাশেই ব্রঙ্কসের পার্কচেষ্টারে রাস্তা পারাপারের সময় লোকটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। মাদকাসক্ত ড্রাইভার তার গায়ের উপর দিয়ে চালিয়ে যান মিনিভ্যানটি। হাসপাতালে নেবার আগেই মৃত্যু হয় তার।
লোকটির এক আত্মীয় খবর পেয়েই ফ্লোরিডা থেকে ছুটে এলেন আমার বাসায়। পরবর্তী দুটো সপ্তাহ লাশ দেশে পাঠানো, পুলিশ রিপোর্ট আনা, আইনজীবী ঠিক করা সহ নানাবিধ ব্যস্ততায় কেটে যায়। সবশেষে তার বাসা থেকে মালামাল সরাবার পালা। বাড়ীওয়ালা নতুন ভাড়াটিয়া ঠিক করেছে, বিধায় মালামাল আনতে যাই সেই বাড়ীটায়, যেখান থেকে একজন কর্মঠ প্রবাসী খুব ভোরে বেরিয়েছিলো রুটি-রুজি’র সন্ধানে। দিনশেষে আর ফিরেনি সে, সেই ঘরে। ফিরেছে স্ত্রী সন্তানের কাছে নিথর হয়ে। আমি ছিমছাম পরিপাটি ঘরখানা দেখি। স্ত্রী আর কন্যাদের সাথে তিনি__ একটি সুখী পরিবারের ছবি দেয়ালে। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে এই ছবিখানার দিকে চেয়ে কি তার সব ক্লান্তি উবে যেতো ? হয়তোবা । দেয়ালের ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকি ক্ষণিক। থেমে থাকে আমার হৃদস্পন্দন। টেবিলের উপর নিঃসঙ্গ পড়ে আছে সেই অডিও ক্যাসেটগুলো… গানগুলো… সুরগুলো …
বেদনাবিধুর সেই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসি বাইরে। বাড়ীর সামনের লনের সবুজ দুব্বা মাড়িয়ে হাঁটি। গানগুলো… সুরগুলো করুন হয়ে বেজে উঠলো যেন। এ সুর কষ্ট ভুলে থাকবার সুর নয়… বরং আহত হৃদয়ে ক্ষত বাড়ানোর সুর। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকবার তাগিদে… জীবিকার তাগিদে লোকটি তার পরিবার থেকে দূরে ছিল যদিও, তবুও এক আকাশের নিচেই তো ছিল… ছিল তো …
## প্রতিদিনই হতে পারে আমাদের জীবনের শেষ দিন। প্রিয়জনকে ভালোবাসুন প্রতিটি মুহূর্তে।
শুভকামনা সকলকে…
১২টি মন্তব্য
মরুভূমির জলদস্যু
এমন করুন মৃত্যু কখনোই কাম্য নয়। ভাবতেই কেমন যেন লাগে, বিদেশ বিভুএ একা একা জীবনের মূল্যবান সময় কাটিয়েছেন। হয়তো অনেকটাই গুছিয়ে এনেছেন, তখনই এমন হয়……
রিমি রুম্মান
এটিই নির্মম বাস্তবতা… ভাল থাকুন সবসময়।
জিসান শা ইকরাম
কষ্ট লাগলো পড়ে
‘ পরিবার থেকে দূরে ছিল যদিও, তবুও এক আকাশের নিচেই তো ছিল ‘- কথাটি থেকে যাবে মনে বহুদিন।
প্রবাসে আপনি ভালো থাকুন।
রিমি রুম্মান
পরিবার নিয়ে ভাল থাকুন আপনিও।
মামুন
প্রতিদিনই হতে পারে আমাদের জীবনের শেষ দিন। প্রিয়জনকে ভালোবাসুন প্রতিটি মুহূর্তে।- সুন্দর কথা বলেছেন। (y)
রিমি রুম্মান
সুন্দর থাকুন। শুভকামনা জানবেন।
ছাইরাছ হেলাল
প্রতিটি ক্ষণ ই শেষ ক্ষণ কিন্তু আমাদের মনে থাকে না।
রিমি রুম্মান
মনে থাকেনা বলেই আমরা হানাহানি কিংবা বিবাদে লিপ্ত থাকি অহরহ। ভাল থাকুন ।
ব্লগার সজীব
দারুন এক শিক্ষা পেলাম আপনার লেখা পড়ে আপু।
রিমি রুম্মান
ভালবাসুন কাছের মানুষগুলোকে। ভাল থাকুন পরিবারের সবাইকে নিয়ে।
নীলাঞ্জনা নীলা
ঘটনা ভালো ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন আপনি।
রিমি রুম্মান
অনুপ্রানিত হলাম খুব। ভাল থাকুন।