প্রথিবীর পথে পথেঃ মিশর , সময় কাল ২০০৬ ( প্রথম পর্ব )

“Egypt gave birth to what later would become known as ‘Western Civilisation’ long before the greatness of Greece and Rome”

 

আমাদের পরিবার টিম যাত্রা আরম্ভ করলাম সেই প্রাচীন সভ্যতা দেখার জন্য । কায়রোর সাকারা,  গিজা  থেকে আরম্ভ করে আমরা গিয়েছি লাক্সর, নিমুবিয়ার সীমানায়  ‘টুম্ব অব নোবেল’ এবং   আবু সিম্বল পর্যন্ত ।

সব গুলো সাইট দেখার জন্য আমরা ইন্টারপিডের  ট্র্যাভেল এজেন্টকে  ব্যাবহার করেছিলাম।

কায়রোতে দুই দিন ছিলাম প্রথম দিন আমাদের গ্রুপ গিজায় গেলাম সারিবদ্ধ বিখ্যাত কুফু কাফ্রে আর ম্যানকাওরের পিরামিড দেখতে । কিছু দূর যেতেই দৃষ্টিতে আসলো  পিরামিডের দৃশ্য । যা কিনা একটা  বিরাট বিস্ময় কারন এতদিন এটা ছিল বই আর টিভি র পর্দায় দেখা ।কিন্তু আজ সেটা চোখের সামনে।

আমাদের গাইড একজন ইংলিশ speaking  মিশরীয় নারী । পিরামিডের পাশ দিয়েই রাস্তা চলে গিয়েছে। তাই গাড়ি তার কাছে চলে যেতে পারে। আমরা নেমে তার পাশে গেলাম ,কিছুদূর উঠলাম। তারপর টিকিট কেটে ভিতরে কোমর বাঁকা  হয়ে যাওয়া আরম্ভ করলাম। বেশ কিছু দূর কোমর বাঁকা করে যাওয়ার পর সামনে একটা গ্রানাইড পাথরের হল আসলো । একটা পাথরের টুম্ব পড়ে আছে খালি। এটাই কুফুর মমি রাখার টুম্ব । কবে কারা সব কিছু চুরি করে নিয়ে গেছে । কারন এটা তো আর আজকের নয়। ৪৬০০ বছর আগের। নিশ্চয় কত দামী দামী জিনিস দিয়ে এই হল বা তার বেসমেন্ট ভরা ছিল একসময়। সেই কবে থেকে সব শূন্য ।

মানুষের হাত থেকে তাদের মমি এবং ধনরত্ন  রক্ষা পাওয়ার জন্য ফেরোরা কত কিছু করে ,যেমন গোপন কুঠুরি,  গোপন ফলস গেট কিন্তু কিচ্ছু রক্ষা করতে পারেনি তারা। আজ সেখানে হাজার হাজার মানুষ আসছে দেখতে ।

পিরামিড নিয়ে সর্বপ্রথম লেখে একজন  গ্রীক লেখক ‘হেরডেটাস ‘ নামে একজন ইতিহাসবিদ ।তখন পিরামিডের বয়স অলরেডি আড়াই হাজার বছর হয়ে গেছে। তিনি তার বই ‘Histories’ এ উল্লেখ করেন এক লাখ স্লেভ কে কষ্ট দিয়ে পিরামিড বানানো। যা ছিল তার মনগড়া । কারন পিরামিডের সিলিইং  কুফুর নাম লেখা কার্টুস পাওয়া গেছে । যা লিখে রেখেছিল তার ওয়ার্কার রা । সেখানে আরও লেখা ছিল ‘কুফুর ফলোয়ার’।

তাছাড়া পিরামিড সংলগ্ন ওয়ার্কার ভিলেজ পাওয়া গেছে ।সেখানে অনেক গরু ছাগলের হাড় পাওয়া যায়  যা তাদের খাবারের মেনুতে ছিল। তাদেরকে ভালো মতো খাবার দেয়ার এটাই  প্রমাণ। আমরা তা দেখতে গেলাম। সেখানে আমরা ওয়ার্কারদের থাকার এবং শোবার ঘরের ফাউন্ডেসান  দেখলাম ।

কুফুর পিরামিডের পাশে পাওয়া বোট যা কিনা তার মমি বহন করে ছিল সেই বোট সংরক্ষণে রাখা মিউজিয়াম দেখলাম। বোট টি পেয়ে  ছিল একজন ফ্রেঞ্চ আরকেওলজিস্ট ।

আমরা একে একে কাফ্রে,  ম্যানকাউরে আর তাদের রানী আর রয়াল পরিবারের কবর গুলো দেখলাম। আশপাশে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে নিয়ে গেলে যেমন শুধু ফাউন্ডেসান থাকে তেমন চারদিকে ছড়িয়ে আছে। গাইড বলে দিলেন এগুলো একেক টা মাসতাবা অর্থাৎ কবর । যার নিচে  দুই তিনটা করে কবর আছে । যারা বেশির ভাগই কুফু,  কাফ্রে আর ম্যাঙ্কাউরের কাছের লোক আর তাদের পরিবারের। পুরো গিজা এলাকা জুড়ে শুধু কবর আর কবর ।

পিরামিডের তাকিয়ে ভাছিলাম এমন নিখুঁত সেপ দিয়ে এতো বিরাট স্থাপনা কি ভাবে মানুষ করেছিল।  যার কোনো ফাউন্ডেসান নাই। ২.৩ মিলিয়ন ব্লক ৫.৫ মিলিয়ন টন লাইম স্টোন, ৮,০০০ টন গ্রানাইট কে ভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ? সত্যি একটা অতি আশ্চর্য ব্যাপার।  এটা আমাদের মতো সব ভিজিটরের ভাবনা।

প্রত্যেক পিরামিড সংলগ্ন একটি করে মরচিউরি ট্যাম্পেল সেটা আবার লম্বা পথ ধরে চলে গেছে স্পিনিক্স পার হয়ে । সেখানে আবার মন্দির। কাছা কাছি একসময়ে থাকা জেটির সন্ধান পাওয়া গেছে। বিরাট স্ফিনিক্স থাবা মেলে বসে আছে। মাথা সিংহর মতো না করে ফ্যারর মতো করা।অনেকে বলে এটা কুফুর মুখমণ্ডলের আদল ।

সব কিছু দেখে আমরা ফটো তুললাম এবং তারপরের দিন গেলাম  সাকারা দেখতে।আমাদের গাইড সাকারার বেন্ড পিরামিড( স্নেফুর )  ,  স্টেপ পিরামিড (দাসুর) আর পেপির পিরামিড সহ ছোটো বড়ো আর যত পিরামিড আছে সব দেখলাম সারা দিন ধরে। এখানে ১১৮টি পিরামিড আছে।১৮৪২ সালে কারল ‘রিচআর্দ লেপসিয়াস’ এই পিরামিডের লিস্ট করেন।

৪.৩ by ৯  মাইল জুড়ে এই নেক্রপলিস । পিরামিড ছাড়াও শত শত মাস্তাবা আছে। আছে টলেমিক এবং রোমান যুগের কবর। বর্তমানে এটা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের আওতায় পড়েছে,  গিজার মতোই।

আমরা দেখতে গেলাম বর্তমানে পাওয়া অর্থাৎ ২০২১,২০২২,২০২৩ সালে পাওয়া ৪,৩০০ বছরের পুরানো কবরে পাওয়া সোনায় মোড়ানো মমি এবং তার সাথে দেয়া আর্টইফ্যেক্ট ।

এই জন্যই বলা হয়   “Every time I visit Egypt, I discover something new” .

লেখকঃ হুসনুন নাহার নার্গিস, লন্ডন

 

 

 

 

১৯৯জন ২০০জন
0 Shares

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ