ছায়াসংগী

মামুন ১৯ ডিসেম্বর ২০১৫, শনিবার, ০৯:০১:৪০পূর্বাহ্ন বিবিধ ৬ মন্তব্য

শীতের এক রাত। দশটা পার হয়েছে। ওভারব্রিজ দিয়ে এপারে আসে আমান। আজকাল ওভারব্রিজগুলো বড্ড নি:সংগ। ব্যানার-ফেস্টুন আর বিলবোর্ডের ভারে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়া বুকের হাহাকারে ভারি ওদের আকাশ। আর অনুক্ষণ কল্পনায় মূল রাস্তা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পার হওয়া পথচারিদের নির্বুদ্ধিতার দৃশ্য। কেন যে মানুষগুলি নিয়ম মানে না! অবহেলা আর আক্রোশে ওগুলো মূর্তিমান নি:সঙ্গতার প্রতীক হয়ে দাড়িয়ে থাকে। নির্বিকার।
ঠিক আমানের মত।

রাস্তায় আর কোনো মানুষ নাই। দু’একটি বাস হুশ করে চলে যাচ্ছে। থামছে না। ট্রাক আর কাভারড ভ্যানগুলি পাশ কাটানোর সময়, দু’পাশকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে যেন।
একটা বাস থামে। একজন নামে। স্ট্যান্ডটি আলোছায়ায় মাখামাখি। নেমেছে যাত্রী একজন। একা । হাতে ব্যাগ। মহিলা। বেশ ভারি। মোটা। মুখ দেখা যায় না কুয়াশায়। আমান তাকে দেখে একপলক। ফের সামনে অনেকদূর পর্যন্ত দেখার চেষ্টা করে। যত দূর দৃষ্টি। কুয়াশায় শূণ্যতা। রিক্সা পাওয়া যাবে না। যেতে হবে আরো কিছুদূর। অচেনা জায়গা। আসতে দেরী হলো বলে উদ্বিগ্ন হয় একটু। সামনে আগায়। কিছুদূর যেতেই পিছনে পায়ের আওয়াজ। ফিরে তাকায়। রোড লাইন নেই এই এলাকায়। লম্বা রাস্তাটির দু’পাশের গাছগুলি ছায়ায় নিজেদের কায়া বিসর্জনের শোকে মৌণ। বিষন্ন। পরিবেশটা কেমন যেন। আমানের মনে হল, নি:সংগতাকে কুয়াশায় মেখে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হাঁটার গতি একটু কমিয়ে অপেক্ষা করে সে।
পিছনের মানুষটির জন্য। মেয়েমানুষ বললে রুচিহীন মনে হয় নিজেকে আমানের। নারী! হ্যা! অচেনা পথে অচেনা এক নারী, নীরব পথে অজানা সময়ের ক্ষণিকের সাথী! হলে মন্দ কি? একা একাই তো হাঁটছে সে এতোদিন। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে গেছে বলতে পারবে না। ওর সামনে মৃদু হাসির সাথে জলতরংগ হয়ে বের হওয়া,’ এক্সকিউজ মি’ -আমানকে পলকের তরে দেহমনে বিবশ করে দেয়। সরে দাড়ায়। অচেনা নারী থামে না। আমান অনুসরণ করে। দুজনের পথ একই দিকেই দেখা যাচ্ছে।

একটু হেঁটেই সাময়িক পিছিয়ে পড়াটুকু অতিক্রম করে আমান। এখন পাশাপাশি। হাজার বছরের পথ চলার ক্লান্তি ভর করেছে যেন ঐ অচেনা নারীর দেহমনে। শ্রান্ত.. ক্লান্ত.. শরীরের ভারবহন করায় অতিরিক্ত মেদ, ভীষণ জেদী- একগুঁয়ে মনোভাবের বোধহয়। রাতের অন্ধকারে কিছুটা আলো কিভাবে যেন থেকেই যায়। পুরাপুরি আঁধার বোধহয় কখনোই থাকে না। দুজন ছায়ামানব-মানবী নিঃশব্দে সেই আঁধার ফুড়ে পথ চলে।
হাতে বাজারের ব্যাগ। অবাক হয় আমান। এতো রাতে একা একজন নারী ব্যাগ হাতে! পাশে এসে আমান ভদ্রতা করে বলে,
‘কিছু মনে না করলে, প্লীজ অ্যালাও মি। ব্যাগটা আমি নেই?’
ছায়ামানবী একটু কি অবাক হয়। তাঁর হাঁটার তালে তালে শরীর দুলছে। অনুভব করে আমান। নিঃশ্বাস ঘন প্রশ্বাসগুলি কুয়াশার মত বের হয়। সে বলে,
‘ধন্যবাদ। না, তাঁর দরকার পড়বে না । এই সামনেই আমার বাসা।‘

বাসা শব্দটাতে কি একটু জোর দিলো? তবুও আমান ভদ্র দূরত্ব রেখে হাত বাড়িয়ে থাকে। নারী হাসে। আলতো করে অচেনা এক পুরুষের বাড়ানো হাতে ব্যাগটি তুলে দেয়।
যুগে যুগে নারীরা এভাবেই কি নিজেদের বোঝা পুরুষের হাতে ধরিয়ে দেয়? তবে জীবনভর পুরুষের বোঝা ও কি বহন করে না? ওদের দায় কি বয় না। গ্লানিকর মুহুর্তগুলি যা পুরুষের পক্ষ থেকে ‘উপহার’- তা সয় না?
ঘামে ভিজে গেছে নারী। রাস্তার দু’পাশে বুনো ফুলের ঘ্রাণ ছাপিয়েও অন্য এক ঘ্রাণে আমান কিছুটা উদ্বেলিত হয়। নারী শরীরের বুনো ঘ্রাণ কি? নারী হৃদয়ের সৌরভে মাতোয়ারা হবার সময় সে অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছে। তবে নিস্তব্ধ একটি রাত… নিঃসঙ্গ এক নারী.. তাঁর সাবলীল আচরণ কি এক প্রগাড় রহস্যময়তায় আমানকে ঘিরে রাখে। অচেনা নারীর দেহের মাদক সুরভি ওকে সময়ের বুকের আরেক সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এমনই এক রাতে সে আর পারু! হেঁটেছিল পথ.. কেটেছিল ক্ষণগুলি নিঝুম নিমগ্ন সুখে! আজ সেই ঘ্রাণ- সময় ফিরিয়ে দিলেও, পারু এখন অন্য কারো বুকে!

মুহুর্তে ‘ইলেক্টিক ব্লু’ বেদনায় আমান কেঁপে কেঁপে উঠে। হাতের ব্যাগ শক্ত করে ধরে। পাশের জনের উপস্থিতি ভুলে যায়। কেবল নির্জন রাস্তাটি কুয়াশায় মৌণ মগ্ন এক যোগীর আবিষ্টতায় আঁধারের অস্পষ্টতায় এক রেখার মত দেখা যায়।

এখন ঈদের বন্ধ। আপাত নির্জন একটি আধা গ্রাম- আধা শহর টাইপের এলাকা এটা। পোষাক শিল্পের সাথে জড়িত মানুষগুলি এই এলাকার বাসিন্দা। সবাই এখন যার যার এলাকায়- নিজ বাড়িতে। এজন্যই এলাকাটিকে কেমন সুনসান নিরব মনে হয়েছে আমানের। সে পুরনো এক বন্ধুর খোঁজে এসেছে। এভাবে প্রায়ই আয়নায় বিস্মৃত বন্ধুদের মুখ খোঁজায় বেরিয়ে পড়ে আমান। আজ পথে জ্যামে অনেক দেরী হওয়াতে এতোটা রাত হলো।

– এই আমার বাসা।
কিন্নরী কন্ঠের শ্রুতিমধুর আওয়াজ জলতরঙ্গের মত উছলে উঠে আমানের চিন্তামগ্নতা কাটায়। একটি একতলা পুরনো মডেলের বাড়ি। প্রকান্ড একটি গেট। বাড়ির ভিতরে একটি বাতি জ্বলছে। সেই আলোয় আমান এতোক্ষণের অচেনা নারীর দিকে তাকায়। একটু ধাক্কা খায়।
এমন কমনীয় মুখশ্রী- নিখুঁত এক মুখের অধিকারিনী ওর দিকে তাকিয়ে একটু একটু হাসছে। তাঁর সমগ্র দেহমনে সেই হাসির আলোক বিচ্ছুরণের জ্যোতির্ময় আভা, তাকে উদ্ভাসিত করে তুলছে। চোখ হাসছে। ভ্রু কাঁপছে। হৃদয় নাচছে। কিন্তু কালো চোখের মনিতে নেই কোনো আলো – নির্বাক নিরানন্দ নৈঃশব্দের গোলকধাঁধায় এক বন্দী নারী যেন কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু শোনার মত তাঁর কেউ আশাপাশে নেই। তাই নিরাশার আঁধারে অভ্যস্ত হতে হতে এখন রাজ্যের অবসাদ সেই চোখের গভীরে।
একজন অনুভূতির কারিগর আমান- স্বল্প সময়ে এতো কিছু দেখে বিহ্বল হয়।

সে হেসে ব্যাগটা ফিরিয়ে দেয়। ওপাশ থেকে একটি কোমল হাত নিজের শ্বেত-শুভ্রতার চমক দেখিয়ে যায় একপলক! এতো স্থূল দেহধারী কেউ এতোটা সুন্দর-কমণীয়-মোহনীয় হতে পারে! আমানের ভিতরে কি একটা জেগে উঠতে চায়। সেই নারীর গলার কাছে এবং শরীরের আরো কয়েক জায়গা এতোদূর হেঁটে আসাতে ঘামে ভিজে গেছে। কয়েক গাছি ভেজা চুল কপালের ওপর অবহেলায় পড়ে আছে। আমানের ইচ্ছে করল ওগুলোকে একটু ছুঁয়ে দেয়! বুকের চাদর যে সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখতে পারেনি, একটু অবিন্যস্ততার সুযোগে আমানের চোখের প্রশান্তি এনে দিতে চাইলো বুঝি… একপলক।
‘সিমপ্লি বিঊটিফুল!!’
এমন এক নারী আমানের চোখে তাকায়। মুহুর্তের তরে তারও চোখের কালো মনির গভীরে কিছু একটা জ্বলে উঠে। আমানের চোখে মুহুর্তখানিকের জন্য সে এক পুরুষকে অনুভব করে। পরক্ষণেই নিজেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে নেয় সে। বলে,
– এই বাসায় আমি একা থাকি। আপনাকে একটু চা পানের অনুরোধ করতে চাইছে মন। কিন্তু সেটা এই মুহুর্তে শালীন হবে কিনা ঠিক বুঝছি না।
তাঁর মুখে স্মিত হাসি আমানকেও হাসায়। তবে সহজ হবার পরিবর্তে সে আরো কেন জানি অচেনা নারীর আরো কাছে যাবার উন্মত্ততা অনুভব করে। কষ্ট পায়। এক নিষিদ্ধ লোবানের প্রতি একাধারে মন আকর্ষিত হয়.. পরক্ষণেই সেই আসক্তি ওর আর এক আসক্তি- ওর ‘পারু’র কথা মনে করিয়ে দেয়। ব্যথা বাড়ে। হৃদয় নড়ে। স্মৃতি ঘিরে ধরে.. ধীরে ধীরে। কেবল পারু ফিরে আসে না নীড়ে।

কিছু বলতে হয়। ভদ্রতার প্রতিউত্তর।
‘আপনি একা থাকেন! যদিও প্রশ্ন করাটাও শোভন নয়। তবে জানার ইচ্ছেটা একটু বেশীই এই মুহুর্তে।‘
হাসিটাও চমৎকার। সুন্দর দাঁতের ঝিলিক আমানের হৃদয় একটু কি চিরে দেয়? হেসে হেসেই উত্তর দেয় সেই অপরিচিতা-
– যাকে নিয়ে এই বাসাকে বাড়ি বানাতে চেয়েছিলাম, সে একা রেখে চলে গেছে। তাই একা থাকি।
হাসির সাথে বলা হলেও তাতে কান্নার পরশে আমান ভিজে যায়। এই কথার উত্তরে কি বলা যায়? কিছু বলার আছে কি? নিরব থাকে আমান। মৃদু স্বরে ‘স্যরি’ বলেছিল কি?
নারী তাকায় ওর দিকে। পুর্ণদৃষ্টি মেলে। জানতে চায়-
– আপনার দুঃখ পাবার কারণটা জানতে পারি?
আমান তাকায়। হোচট খায়। কমনীয় এক নারীর দেহের সৌরভ রাতের নির্জনে শিউলি ফুলের সুবাসের মত লাগে। সারা শরীরে অনেক আগের উপলব্ধিতে জেগে উঠা তরল আগুনের ছোটাছুটি অনুভব করে ক্রমেই সে উষ্ণ হয়। নিজের ভিতরে এই অনুভূতি! আমান বেশ অবাক। ওর দেহমন পারুর ভালোবাসা আর ভালোলাগাদের জাগিয়ে তোলার অদ্ভুদ দক্ষতায় কেমন বিবশ হয়ে যেত- এই মুহুর্তে অনুভবে কল্পনায় সেই তীব্রানুভূতি আমানকে প্রগলভ করে তোলে। সামনের নারী যেন পারু। চেনা অচেনার গন্ডী পার হয়ে এক অচেনা পথে অজানা রহস্যকে উন্মোচনে অধীর!
নিজেকে সামলায় আমান। দশটি বছর চলে গেছে। পারুর সাথে সাথে। নিজের দেহমনে এখনো যে এই অনুভূতি.. কামনার বহ্নিশিখা রয়ে গেছে.. ভেবে অবাক হয়। একটা ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করার প্রয়াস পায়। এরপর সেই অচেনা পারুর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে,
‘ একজন পুরুষের বাড়ি বানাবার ব্যর্থতা আমাকে দুঃখ দিয়েছে। আমার মনে হয়েছে, এর দায় আমারও কিছুটা। কিন্তু কিভাবে জানতে চাইলে এই মুহুর্তে বলতে পারব না।‘
আবারও হাসি। অবদমিত কান্নাকে ঢেকে রাখে যেন সেই নারী।
– যদি কখনো আপনার মনে পড়ে, আবার আসবেন কি বলে যেতে?
এবার আমানের হাসার পালা। একজন রামগরুরের ছানা আজ অনেক বছর পর হাসবার অনুমতি পেল যেন। রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশ এক হৃদয়বান পুরুষের হাসির গমকে গমকে কেঁপে উঠতে থাকে। অচেনা নারী অবাক হয়। সে তাকিয়ে থাকে। ওর দেহমনের কোথায় যেন কিছু একটা খুলে যায়। ভদ্রতাবোধ- শালীনতা- সামাজিকতার বেষ্টনী- ধর্মের নিষেধাজ্ঞা এসব কিছুকে দূরে ফেলে দিয়ে অচেনা এক হৃদয়বান পুরুষকে নিজের নির্জন বাসায় এক কাপ চা’র নিমন্ত্রণে এক গোপন রাত্রির পরম পাওয়া কিছু অণুক্ষণ লাভে তাঁর মন বড্ড উচাটন হয়। সে হয়তো স্খলিত এক নারীর মর্যাদায় নিজেকে ভুষিত করেই ফেলতো। অচেনা এই পুরুষটির চোখে সে নিজেকে পোড়াবার মত যথেষ্ট এক ‘ফায়ারপ্লেসের’ সন্ধান তাঁর নারী মন অনুভব করে নিয়েছে। কিন্তু আমান হঠাৎ নিরবতা ভেঙ্গে বলে উঠে-
‘ অনেক ভালো লাগলো আপনার সাথে এই ক্ষণিকের পথ চলায়। আমি আমান। এখানে এক বন্ধুর বাসায় যাচ্ছি। অনেক সময় নষ্ট হল আপনার। আসি তাহলে।‘

নারী সব সময় দুর্বোধ্য। তাঁর নিজের মনের গতিও তাঁর কাছে সময়ে সময়ে অবোধ্য- অগম্য। এই মুহুর্তে এমনই অনুভবে সিক্ত এক নারী আমানের কথার উত্তরে হাসি দিয়ে বিদায় জানায়। এক নিরব উষ্ণ বিদায়চুম্বন হয়ে তাঁর অধরকোণের সেই হাসিটুকু অচেনা এক পুরুষের হৃদয়মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলবে.. দীর্ঘদিন! নারী ও কি তা জানে?

রাতের আঁধারে অপসৃয়মাণ এক হৃদয়হারা হৃদয়বান পুরুষের পেছনটা দীর্ঘক্ষণ সে দেখতে থাকে। নিজের বাস

৪২১জন ৪২১জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ