কবির দুঃখ

রোকসানা খন্দকার রুকু ৮ মার্চ ২০২৩, বুধবার, ০৫:১১:৩৫পূর্বাহ্ন রম্য ৩ মন্তব্য

পাউরুটি জেলী মাখা নরম সকাল। শেষ ফেব্রুয়ারীর কুয়াশার ফোঁটা; শরীরে শীতের সামান্য আমেজময় রোমান্স এনে দেয়। ভোরবেলায় অসভ্য কাঁচামরিচের ঝালের মতো হয়ে যাওয়া পিরিয়ডের খিস্তি মেজাজ বাইরে বের হয়েই ভালো হয়ে গেল। আমরা বেড়িয়েেছি কলেজ থেকে বনভোজনে। এ বছর কোথাও যাওয়া হয়নি। ইহা মোটামুটি ইতিহাস, এ ইতিহাস ভাঙতে।

গাড়িতে ওঠার মুখে সকালের নাস্তা আর কবিতার সমারোহে তৈরি তিনপাতার ” বসন্ত বিলাস” হাতে পেলাম। মন মোটামুটি ফুরফুরা হয়ে আয়োজক বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপককে অনেক কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও ধন্যবাদ দিলাম। কবিতা বলে কথা, লিখতে যেমনই খারাপ পারি না কেন ইহা মনের খোরাক তো বটেই!
আম্মির জন্য খুব যত্ন করে ব্যাগে রেখে দিলাম। মেয়েরা গাড়িতে উড়াধুনা নাচছে। আমাকেও টানছে। পায়ের কাছে কি যেন লাগল। দেখি তিনপাতার সেই ‘ বসন্ত বিলাস’ পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আহারে! আমাদের কবিতা। কারও হয়তো ভালো লাগেনি, ফেলে দিয়েছে। দারুন ভালোলাগা নিয়ে গাড়িতে  মুখ হাসিহাসি করে বসে ছিলাম, সমস্তই মুহূর্তে অমাবস্যায় পরিনত হলো।

আমাদের সময় ঠোঙ্গা পড়তেও ভালো লাগত। আমাদের ছেলেমেয়েদের আর পড়তে ভালো লাগে না। বইমেলায় এবার খুবই কম বই বিক্রি হয়েছে। মনে করা হয়েছিল করোনার কারনে গত বছর বই কম বিক্রি হয়েছিল। আসলে তা নয়, আমরা এখন বইমেলায় যাই বেড়াতে আর আইসক্রিম খেতে। বই কিনতে নয়।

আমার খুব কাছের একজন বইমেলা থেকে ফোন দিয়েছেন, তিনি কাজে ঢাকায় এসেছেন; এখন মেলায়। আমাদের স্টলের নাম, ঠিকানা। পরে খোঁজ নিলাম তিনি শুধু জানতেই চেয়েছেন,  বই কেনেননি। হুহু করে চাইনিজ রেস্তোরাঁর বিল দিতে আমাদের কষ্ট হয় না,  শুধু বই কিনতেই যতো পয়সা নষ্টের ভাবনা। তাছাড়া বহু টাকায় কেনা ফোন আর ওয়াই- ফাই এ তো বই পড়ার সময় থাকে না।

ভিন্নজগতে আম্মির জন্য কিছুই কেনা হয়নি। শুধু তার পছন্দের গুড়ের কড়কড়ে জিলাপী আর তিনপাতার ‘ বসন্ত বিলাস’  নিয়ে বাড়ি এলাম।
আম্মি জিলাপী মুখে দিয়ে তিনপাতা খুললেন। তার মুখ থেকে জিলাপীর বসন্ত আভা হারিয়ে গৌরবর্ণ; বিবর্ন হয়ে গেল।
– এ কি?
– মা, কবিতা। বাকি দুজন সহকারী অধ্যাপক বাংলা ও ইংরেজি।  অবশ্য ওনারা ভালো লেখেন।
– শুধু শুধু এরা কবি/ লেখক হবার জন্য কেন যে টাকা খরচ করে। এর চেয়ে খাবারে একটা আইটেম বাড়াতে পারত।
তোর মেজ খালুও কবিতা লিখতেন, শেষ বয়সে পাগল হয়েছিলেন মনে নেই? তার কবিতা,
“পনাক পনাক; ঝনাক ঝনাক,
আপনির তনকে ঘাও।
এনবেল্লা পেনপেল্লা; এল্লাবেল্লার মাও”। এ সব বাদ দিয়ে মনোযোগ দিয়ে সংসার কর। এখনও বাড়ি করতে পারলে না। মামা আর মায়ের বাড়িতে কতোদিন? মেজ খালুকে মনে পড়ল। স্কুল শিক্ষক, পাকিস্তান পিরিয়ডে বিএসসি,স্পষ্টবাদী ও আপোষহীন একজন মানুষ ছিলেন। মেধাবী মানুষরা পাগলই হয়।

আমার সীতা হতে মন চাইল কিন্তু মাটিও তো জায়গা দেয় না। কবির সমস্ত পিকনিকটাই মায়ের অপমানে মাটি হয়ে গেল। মেয়েদের সাথে নেচে আর হেঁটে যে ব্যাথা হয়েছে তা দারুণভাবে অপমানের সাথে মাথা চাড়া দিল। নাপা ট্যাবলেট কি মন ব্যাথা কমাতে পারে? টপাটপ দুটো খেয়ে ঘুমোতে গেলাম।

পাশের বাড়ির রিকশাঅলার পড়াশোনা কতদুর জানা হয়নি তবে বোঝা গেল সে ‘ মহাগ্যানী ‘। সে আমারে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠিয়েছে। আমার একসেপ্ট করা হয়নি। তবুও তিনি কিছু লিখলেই মন্তব্য করেন – ” এটা কি আপনার নিজের জীবন কাহিনী”?
উত্তর – কবির কবিতা জনাব?
– আপনি আবার কবি হলেন কবে?
তাও কথা! কবি হলাম কবে? মনের আঁকিবুঁকি করি ফেসবুকে। দুএক ফর্দ বই আকারেও বেরিয়েছে। তা বলে নিজেকে লেখক/ কবি তো দাবী করা যায় না।
বই বিক্রি কয়কপি হলো জানতে চাইলে প্রকাশক মেলার বাইরে থেকে বলেন,
– আপু ভালোই, পরেরটা রেডি করেন। ভালো তো বটেই। তার তো কোন ইনভেস্ট নেই, সো টেনশানও নেই।

আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু / পরিবার/ আত্নীয়দের যাদের বই ফ্রী পড়তে দিয়েছি, আমার ধারনা তারা খুলেও দেখেননি। কারন কখনই লেখা নিয়ে কোন কথা বলেননা।
কৌশলে অনেক কথাই বলেন। আমি আশায় বসে থাকি আমার সমস্ত ব্যর্থতার মধ্যে অন্তত লেখালেখির আলোচনাটাও কিছুটা হোক! হয়তো ভাবেন, সবসময়ই তো আমাকে দ্যাখেন। তো বই দেখার কি আছে। আমার মতো অগোছালো,  বাউণ্ডুলে মানুষের কাছে আর কিইবা আশা করা যেতে পারে।

আলোচনা হয়, সমাজের সফল মানুষদের নিয়ে। যারা বৈধ- অবৈধ যে কোন উপায়ে প্রচুর টাকার মালিক। তারপরও সারাসময় টাকার পেছনেই ছুটে মরেন।
যারা সময় অসময় প্রচুর আবেগহীন সেক্স, পরোকীয়া করতে ভালোবাসেন। আবেগ যেখানে যন্ত্র হয়ে যারা মোটামুটি গন্ডা খানেক বাচ্চার বাবা- মা।
সফল তারা যারা জীবনভর দূর্নীতি, ঘুসে, অন্যায়ে গড়াগড়ি করে হজ্জব্রত পালন করে, টুপি/ বোরকায় নিজেকে আবৃত করে, নামাজে বসে বেহেস্ত লাভের আশায় মত্ত হয়।
আমার মতো তাদের সময় নেই প্রেম, প্রকৃতি, আবেগনীতি নিয়ে গালে হাত দিয়ে ভাববার। এসব আমার মতো অসফল, ব্যর্থ মানুষদের কাজ।

আম্মি হুঙ্কার দিচ্ছে। আমার কোন ভুলের বিচার করবে বোধহয়! এদিকে আমার মাথায় একখানা কবিতা ইঁদুর কামড় দিচ্ছে। গালে হাত দিয়ে উদাস হওয়া দরকার। কি করি বলুন তো!!!

ছবি- নেটের

৩৪৮জন ২৯৬জন
0 Shares

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ