শিশু-০০১a
ছয় বছরের এক শিশু। বাবা ছিলো সরকারী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত। টেকনোলজিস্ট, নানা রকম প্যাথলজি টেস্ট, প্রেগনেন্সি টেস্ট ও করতে হয়। সে যথেষ্ট নিষ্ঠার সাথে কাজগুলো করেই যায়। কিন্তু নিয়তি কখনো বাঁধ সাজে। নিয়তির খেলায় সব কিছু হয় তছনছ। নিয়মের সংসারে আসে অনিয়ম। বাচ্চাদের পড়াশুনা, সবকিছুর উপরই পড়ে প্রভাব। যাই হোক যে কাহিনী লিখতে বসেছি।

হাসপাতালে নানারকম রোগীর আগমন হয়। বর্তমানে অপরিণত প্রেগনেন্সির বিষয়ে আমরা সবাই অবগত। অর্থাৎ অবৈধ প্রেগনেন্সি, অপ্রত্যাশিত প্রেগনেন্সি। তেমনিই গ্রামের এক নববধূ প্রথম অপ্রত্যাশিত প্রেগনেন্সি নষ্ট করতে গ্রামের কবিরাজি মোতাবেক, প্রচুর পরিমানে কাঁচা পেঁপে এবং রসুন খেলো, গাছ গাছালির ওষুধ খেলো। অতঃপর যা হবার তাই হল। প্রচুর রক্তপাত শুরু হল। একে তো অল্প বয়েসি কিশোরী বউ, তার উপর অপুষ্টি। সব মিলিয়ে অবস্থা খারাপের দিকে গেলো।

যাই হোক, ঐ মেয়ের শশুর বাড়ির লোক চাচ্ছিল অবশ্যই বাচ্চা হোক। শাশুড়ি যখন জানতে পারলো, ছেলের বউ তার বাচ্চা নষ্ট করতে এইরকম পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, সাথে সাথে কান ধরে বাপের বাড়ি ফেরত দিলো। মেয়ের পরিবার গ্রাম পলিটিক্স ভালো জানতো। তাদের মাথায় এলো দীর্ঘ পরিকল্পনা। তারা সরকারি হাসপাতালে প্রেগনেন্সি টেষ্ট করতে গেলো, যেহেতু বাচ্চা আগেই পেটের ভিতর মারা গেছে, তাই রিপোর্ট আসলো, নেগেটিভ। কিন্তু তারা থেমে থাকলো না। আল্ট্রাসনোগ্রাফি করলো। সেখানে রিপোর্ট আসলো পেটে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাবার কারনে রক্তপাত হচ্ছে। মেয়েটি এক সপ্তাহের মাথায় অতিরিক্ত রক্তপাতে মারা গেলো। কিন্তু মেয়েটি ও  তার পরিবার মামলা করে ছেলেপক্ষকে ফাসানোর পরিকল্পনা বাদ দিয়ে যদি , মেয়েটির চিকিৎসা করতো তবে সে বেঁচে থাকতো। তো  মেয়েপক্ষ মামলা সাজিয়ে ফেললো।

মামলা হল এমনঃ নারী ও শিশু নির্যাতন। স্বামীর হাতে নির্যাতনের ফলে গৃহবধু ও তার পেটের সন্তানের মৃত্যু। এই ব্যাপারে আসামি করা হল ঐ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ভুল রিপোর্ট দেয়ার জন্য। যেহেতু মার্ডার কেস। মামলা জোরালো হল। আসলে বাদী পক্ষের উদ্দেশ্য ছিলো আপোষ করে টাকা নেবার। কিন্তু বাধ সাধলো  টেকনোলজিস্ট। তার কথা অন্যায়ের সাথে আপোষ নয়। মামলা চলতে লাগলো। অ্যারেস্ট হল টেকনোলজিস্টে। তছনছ হয়ে গেলো চার মেয়ের ভবিষ্যত। বড় মেয়ে, মনোরমা অর্থাৎ রেক্সোনা পড়াশুনা, লেখালেখি রুপে গুনে চারগ্রামের সেরা। সামনে তার এস এস সি। কিন্তু এই মামলায় তার ধারাবাহিক জীবনে প্রভাব পড়লো। চলে গেলো গ্রামে, নানাবাড়িতে। এক বছর লস দিয়ে ভর্তি হল ফয়লা স্কুলে। সাথে নিলো চার বছর আর দুই বছরের দুই ছোটবোন। মায়ের সাথে থাকলো ছয় বছরের এক শিশু। কারণ মায়ের সাথে দৌড়াতে হবে জীবনের বীভৎস কিছু দিক দেখতে। তার বাবাকে এই অবস্থা থেকে বের করতে হবে। জেল থেকে তাকে বের করতে হবে। এই আবেদন সেই আবেদন নিয়ে সরকারি নানা অফিসে দৌড়াতে হবে। তখন ছোট ঐ শিশু দেখেছে উচ্চ পদস্থ মানুষের নীচ আচরন। একটা সই কররে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা। কাড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে সামান্য ন্যায্য একটা সই এর আশায়। ছোট শিশুটি দেখেছে তার মায়ের নিরব কান্না। বড় সাহেবদের বিনয়ের সুরে অনুরোধ করতে। হাতে টাকা গুজে দিতে দেখেছে। কারন এই ঘুষের টাকা না দিলে তার স্বামি যে জেলে থাকবে।

মোংলা থেকে খুলনার দূরত্ব অনেক। প্রতিদিন যেতে হত ছোট শিশুটিকে তার মায়ের হাত ধরে। গরমের দিন। পিপাসা, খুদা সবই যেন জাপটে ধরত শিশুটিকে। কোর্টের বারান্দায়, অসহায় মাকে বসে থাকতে দেখে শিশুটি খুদার কথাই ভুলে যেতো। পড়ে থাকা কলে মুখ লাগিয়ে পানি খেয়ে নিত। আসলে খুদার অনেক কষ্ট। দোকানে সাজিয়ে রাখা খাবারগুলো তখন বড় লোভনীয়। খুব খেতে ইচ্ছা করতো। কিন্তু জানতো এই টাকা এখন খরচ করা যাবে না। বাবাকে গারদ হতে বের করতে হবে। মামার কাছ থেকে যখন মা টাকা নিত, দেখেছে মামার চোখেমুখে সে এক তিরস্কার। যেন মহা অপরাধী তার বাবা। সারাদিনের অভুক্ত শিশুটিকে মা পাওরুটি আর কলা দিতো । বাসে বসে তৃপ্তি নিয়ে খেত। মায়ের মুখে জোর করে পাও রুটি গুজে দিতো। মা তার চোখ ছল ছল চোখে শিশুটিকে জড়িয়ে ধরত। অনেক দুরের কোর্টের কাজ শেষ করে গ্রামে আসতে প্রায় অনেক রাত হত। গভীর রাত নির্জন রাস্তা সাথে ছোট শিশু পরিচিত বাড়ির কামলা ছেলের ভ্যান নির্ভয়ে যেতো ঠিকই। কারণ এই গ্রাম তার বাপের বাড়ির। নামকরা পরিবার তাই ভয় ছিলো না। কিন্তু অতো রাতে কবরস্থানের পাশ দিয়ে যেতে শিশুটির ভীষন ভয় করতো। চোখ বন্ধ করে মাকে জড়িয়ে থাকতো। বাড়ির গাছি কিয়াম মামাকে বলতো, ” বুড়ো লাঠি শক্ত করে ধরো, ভুত যেন আমাকে ধরতে না পারে”। শুনে কিয়াম মামা হাসতো খুব। বলতো,”বুগো ভয় নেই”।

কিন্তু শিশুটির বাবার আপিল হারিয়ে ফেলল দুবার পেশকার। আসলে আপিলের তো হাত পা নেই। এমনিতে সে একা হেটে কোথাও যায় না। পেশকাররা ই এই আপিলের নথি টাকা খেয়ে গায়েব করে দেয়। পুনরায় আপিল করে অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়, ঐ মেয়ের লাশ পুনরায় সাতদিন পর পোস্টমর্টেম করে সঠিক রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সেই সঠিক রিপোর্ট জায়গামতো পৌছাতে, রিপোর্টটি হাতে পেতে কেটে গেছে ছ’টা মাস। সেই রিপোর্ট পেয়ে মামলা নিষ্পত্তি হতে একবছর কেটে যায়।

বাবার সাথে ঐ মেয়েটির স্বামী শাশুড়িরাও রেহাই পায়। আজও তারা শিশুটির মাকে বাবাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে আসে।

পরে সরকারি ভাবে শিশুটির বাবা বিভাগীয় মামলা করে মেয়েটির বাবা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে। ক্ষতিপূরণ বাবদ। সরকারি চাকরিটা ফিরে পেতেও অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে।

আজ এই শিশুটি অনেক বড় হয়েছে। স্বামীর কর্মসূত্রে যখন কোর্টের বারান্দায় কাউকে বসে থাকতে দেখে, অবাক হয়ে দেখে পরিবারটির করুন অবস্থা।

 

অনেক আরো লেখার ছিলো কিন্তু। লেখা হলো না।

৪৬৭জন ৪৬৬জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ