বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-১০) তিনি সভাপতি হলেন ছাত্রলীগের। আমি হলাম সম্পাদক। মুসলিম লীগ গঠন হল। ——শেখ মুজিবুর রহমান

iDxJmGLYdGEv

১৯৩৯ সালে কলকাতা যাই বেড়াতে। শহীদ সাহেবের সাথে দেখা করি। আবদুল ওয়াসেক আমাদের ছাত্রদের নেতা ছিলেন। তাঁর সাথেও আলাপ করে তাঁকে গোপালগঞ্জ আসতে অনুরোধ করি। শহীদ সাহেবকে বললাম, গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করব এবং মুসলিম লীগও গঠন করব। খন্দকার শামসুদ্দীন সাহেব এমএলএ তখন মুসলিম লীগে যোগদান করেছেন। তিনি সভাপতি হলেন ছাত্রলীগের। আমি হলাম সম্পাদক। মুসলিম লীগ গঠন হল। একজন মোক্তার সাহেব সেক্রেটারি হলেন, অবশ্য আমিই কাজ করতাম। মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটি একটা গঠন করা হল।আমাকে তার সেক্রেটারি করা হল। আমি আস্তে আস্তে রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করলাম। আব্বা আমাকে বাধা দিতেন না, শুধু বলতেন, লেখাপড়ার দিকে নজর দেবে। লেখাপড়ায় আমার একটু আগ্রহও তখন হয়েছে। কারণ, কয়েক বৎসর অসুস্থতার জন্য নষ্ট করেছি। স্কুলেও আমি ক্যাপ্টেন ছিলাম। খেলাধুলার দিকে আমার খুব ঝোঁক ছিল। আব্বা আমাকে বেশি খেলতে দিতে চাইতেন না। কারণ আমার হার্টের ব্যারাম হয়েছিল। আমার আব্বাও ভাল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন। আর আমি মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। আব্বার টিম ও আমার টিমে যখন খেলা হত তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত। আমাদের স্কুল টিম খুব ভাল ছিল। মহকুমায় যারা ভাল খেলোয়াড় ছিল, তাদের এনে ভর্তি করতাম এবং বেতন ফ্রি করে দিতাম।

১৯৪০ সালে আব্বার টিমকে আমার স্কুল টিম প্রায় সকল খেলায় পরাজিত করল। অফিসার্স ক্লাবের টাকার অভাব ছিল না। খেলোয়াড়দের বাইরে থেকে আনত। সবই নামকরা খেলোয়াড়। বৎসরের শেষ খেলায় আব্বার টিমের সাথে আমার টিমের পাঁচ দিন ড্র হয়। আমরা তো ছাত্র; এগারজনই রোজ খেলতাম, আর অফিসার্স ক্লাব নতুন নতুন প্লেয়ার আনত। আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আব্বা বললেন, “কাল সকলেই খেলতে হবে। বাইরের খেলোয়াড়দের আর রাখা যাবে না, অনেক খরচ।” আমি বললাম, “আগামীকাল সকালে আমরা খেলতে পারব না, আমাদের পরীক্ষা।” গোপালগঞ্জ ফুটবল ক্লাবের সেক্রেটারি একবার আমার আব্বার কাছে আর একবার আমার কাছে কয়েকবার হাঁটাহাঁটি করে বললেন, “তোমাদের বাপ ব্যাটার ব্যাপার, আমি বাবা আর হাঁটতে পারি না।” আমাদের হেডমাস্টার তখন ছিলেন বাবু রসরঞ্জন সেনগুপ্ত। আমাকে তিনি প্রাইভেটও পড়াতেন। আব্বা হেডমাস্টার বাবুকে খবর দিয়ে আনলেন। আমি আমার দলবল নিয়ে এক গোলপোস্টে আর আব্বা তাঁর দলবল নিয়ে অন্য গোলপোস্টে। হেডমাস্টার বাবু বললেন, “মুজিব, তোমার বাবার কাছে হার মান। আগামীকাল সকালে খেল, তাদের অসুবিধা হবে।” আমি বললাম, স্যার, আমাদের সকলেই ক্লান্ত, এগারজনই সারা বছর খেলেছি। সকলের পায়ে ব্যথা, দুই-চার দিন বিশ্রাম দরকার। নতুবা হেরে যাব।” এ বছর তো একটা খেলায়ও আমরা হারি নাই, আর ‘এ জেড খান শিল্ডের” এই শেষ ফাইনাল খেলা। এ, জেড, খান এসডিও ছিলেন, গোপালগঞ্জেই মারা যান। তাঁর ছেলেদের মধ্যে আমির ও আহমদ আমার বাল্য বন্ধু ও সাথী। আমির ও আমি খুব বন্ধু ছিলাম। আমিরুজ্জামান খান এখন রেডিও পাকিস্তানে চাকরি করেন। ওর বাবা মারা যাবার পরে যখন গোপালগঞ্জ থেকে চলে আসে তখন ওর জন্য আমি খুব আঘাত পেয়েছিলাম। হেডমাস্টার বাবুর কথা মানতে হল। পরের দিন সকালে খেলা হল। আমার টিম আব্বার টিমের কাছে এক গোলে পরাজিত হল।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান। (পৃষ্ঠা নং-১৩ হতে ১৫)

 বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (পর্ব-০৯)

মোট পড়েছেনঃ ৮৯৩জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

১৬টি মন্তব্য

  1. খেলাধুলার গল্প সিনেমা আমাকে খুব টানে। আর এতো একেবারে বাস্তব দৃশ্যগুলো দেখতে পাওয়া। প্রতিভাবানরা সবদিকেই তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। জানতে পারলাম, গোপালগঞ্জের মুসলিম লীগ আর মজার ফুটবল হিস্ট্রি গুলো। বঙ্গবন্ধুর মা কোন টিমকে সাপোর্ট করতেন? 🙂

    1. ভালো লাগছে একটু একটু করে কিংবদন্তি চরিত্রের কুটিনাটি জানতে পারছি আর জানাতে পারছি। পাশাপাশি অনুভব করছি কি ধরনের গুণাবলী একজন মানুষকে পাহাড়সম উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

      ধন্যবাদ।

      1. হাহাহা……..
        একি! চঞ্চলা চপলা নীলাঞ্জনার মন্তব্যের প্রতি উত্তর শুন্য শুন্যালয়ে গিয়ে ঠেকেছে!!!
        ও শুন্যাপু! একটু ফিরিয়ে দাও না গো!

        এর থেকে বেশি কিছু বলা এখানে (আত্মজীবনী আলোচনায়) সমীচীন হবে না।

    1. আমারও ভীষণ ভালো লেগেছে বাপ-ছেলের আবেগময় বন্ধুত্বপূর্ণ অথচ খেলায় প্রতিপক্ষ হিসাবে আবির্ভূত হওয়া সম্পর্কটিকে। মজা পেয়েছি।

  2. বাপ বেটার টিমের মাঝে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশটুকু এ পর্বের বিশেষ আকর্ষণ ছিলো। 🙂
    লিখতে থাকুন আপু। সাথেই আছি, জানছি অনেক কিছুই।

মন্তব্য করুন