বদ্‌লে যাওয়া সময়

মুখোমুখি দু’টো বাড়ি। মাঝে শহরের মেইন রাস্তা। ওবাড়ির খালাম্মা সৌখিন ভাবে সাজিয়েছেন বাড়িটি। তাঁর হাতের পায়েস না খেলে আমাদের ঈদ পরিপূর্ণ হতো না। আমাদের টিভি কেনার আগ অবধি আমরা সে বাড়িতে “এসো গান শিখি” কিংবা “এইসব দিনরাত্রি” দেখি।

বাড়িটির পিঠেপিঠি বয়সী তিন কন্যা সব সময় একই রকম জামা পরে। একজনই শিক্ষক। ডাইনিং টেবিলের চারপাশে গোল হয়ে বসে বাংলা, ইংরেজি, অংক, ধর্ম__ সবই পড়ান তিনি। পড়া দেয়। পড়া নেয়। না পারলে হাতের তালুতে ঠাস্‌ঠাস্‌ করে মারেন লাঠি দিয়ে। সন্ধ্যার পর পাড়ার অন্য খালাম্মারা বেড়াতে গেলে সে বাড়ির খালাম্মা যখন গল্পে মশগুল, কিংবা আপ্যায়নে ব্যস্ত, তখন তিন কন্যা একযোগে “ভাত খাবো” ” ভাত খাবো” বলে কাঁদতে থাকে। খালাম্মা অগ্নিচোখে শুধু তাকায়। কিছু বলেন না। অতিথি’রা চলে গেলে তিন কন্যাকে প্লেটভর্তি ভাত দিয়ে লাঠি নিয়ে সামনে বসেন। ওরা খায়। জোর করেই খায়। কিন্তু সব শেষ করতে পারে না। শাস্তি স্বরূপ__ ঠাস্‌ঠাস্‌ মার !

আমরা পাশাপাশি বেড়ে উঠি। একটা সময় ওদের বিয়ে হয়ে যায়। সবশেষে আমারও। নতুন জামাইকে নিমন্ত্রন করেন খালাম্মা। টেবিল ভর্তি সুস্বাদু খাবার। নিজ হাতে রেঁধেছেন। শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা, শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও রক্তসম্পর্কহীন, অনাত্মীয়, পাশের বাড়ির কন্যাসম আমার জন্যে এতো আয়োজন !অতঃপর একবার যখন দেশে যাই, তাঁরা নেই। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে খালাম্মা- খালু দু’জনই ছেড়ে যান পৃথিবী। বিদেশের একলা ঘরে বসে আমি সেসব সংবাদ পাই যদিও। তবুও যাই প্রতিবারের মতোই। বাড়ির নতুন পুত্রবধু নতুন আসবাবে সাজিয়েছেন নিজের মত করে। জন্মাবধি আমি যেমনটি দেখে অভ্যস্ত তেমনটি আর নেই। আমার সোনালি অতীত চাপা পরে আছে আধুনিক সব আসবাবের নিচে। আমার ছুটোছুটির শৈশব, কৈশোরের আনন্দের স্মৃতিগুলোর মাখামাখি যেখানে, সেখানকার প্রতিটি ইট, পাথর আমার চেনা। একদিকে সাজসজ্জার পরিবর্তন দেখছিলাম, অন্যদিকে মন ভেঙ্গে খান্‌খান্‌ হচ্ছিলো…
শেষবার যখন আমার শহরে যাই, আপা বলে, “খালাম্মাদের বাসায় যাবি না ?”
বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে অজান্তেই। নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বরে বলি__ “না”। ভেঙ্গেচুরে আসা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াই। ও বাড়িতে খালাম্মা-খালু, আর এ বাড়িতে আমার বাবা-মা___ কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। শুধু মুখোমুখি দু’টো বাড়ি দাঁড়িয়ে, কালের সাক্ষী হয়ে।

আমাদের ছোট্ট জগতটা কেমন দ্রুত খালি হয়ে যায়। সবকিছু কেমন দ্রুততার সাথে বদলায়। কিছুই থাকে না আগের মতো। যেমন এই শহরে কাল ঝকঝকে রোদ ছিল, আজ ঝুম বৃষ্টি। অবিরাম শহর ধুয়ে যাওয়া বৃষ্টি…

জানি, বৃষ্টি শেষে ধরণী হবে স্নিগ্ধ, সতেজ, নির্মল,
তবে কেন কান্না শেষে মানব প্রান হয়না শান্ত, শীতল ?

মোট পড়েছেনঃ ৪৯৯জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

৩৩টি মন্তব্য

  1. পুরানো স্মৃতিরা আটকা পড়ে যায় দেয়ালের নতুন রঙের আড়ালে, সেখানেই তৈরি হয় নতুন গল্প নতুন স্মৃতি। আর যা ছিল পুরনো তা মনের ভেতর পিষ্ট করতে থাকে জীবনভর। কেউ আপনার মতই অভিমান করে স্মৃতিদের চোখের আড়ালে রাখতে চায় চিরতরে। আর কেউ নতুন স্মৃতির ভেতরে পুরানো স্মৃতিকে হারাবার চেষ্টা করে।

    আপনার স্মৃতিচারণ দেখে রীতিমত মুগ্ধ হচ্ছি।
    শুভকামনা নিরন্তর 🙂

  2. কোথাও কেউ নেই। শুধু মুখোমুখি দু’টো বাড়ি দাঁড়িয়ে, কালের সাক্ষী হয়ে। আরো কিছু আছে স্বাক্ষী হয়ে, আরো আরো কিছু। পরিবর্তনের নামই তো এইসব দিনরাত্রি আপু। মানব মনে স্মৃতির স্থায়িত্ব এত কম হলে আমরা যে বেঁচে থাকতাম না। এত টাচি কেমন করে লেখেন?

  3. জানি, বৃষ্টি শেষে ধরণী হবে স্নিগ্ধ, সতেজ, নির্মল,
    তবে কেন কান্না শেষে মানব প্রান হয়না শান্ত, শীতল ? শেষের এই লাইন দুটি বেশি ভাললেগেছে।

    আর পুরু লিখাটা আমি শুধু আবেগ ঝরে পড়তেই দেখেছি।

    শুভকামনা জানিবেন নিরন্তর।

    1. আমার লেখা না পড়তে চাইলেও আমি নিশ্চিত___ আপনি ফিরে ফিরে আসবেন। কেননা, লেখাগুলো যে আপনার, আমার, আমাদের সকলেরই । শুভকামনা রইলো।

  4. কোনকিছু যে এক রকম থাকে না সবসময়–বদলাবো না আমি কোনকালে, বদলাতে দিবো না কোনকিছু–তারপরও কিভাবে জানি সব বদলে যায়——–এ যে প্রকৃতির খেলা———-সময়ে সব বদলায় এটাই হয়তো নিয়ম————তারপরও সময়ের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি আমাদেরকে খুববেশী নস্টালজিক করে তোলে….
    কোথাও কেউ নেই। শুধু মুখোমুখি দু’টো বাড়ি দাঁড়িয়ে, কালের সাক্ষী হয়ে। (y)

  5. ___ কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। শুধু মুখোমুখি দু’টো বাড়ি দাঁড়িয়ে, কালের সাক্ষী হয়ে।___ এমন ভাবে চিন্তা করিনি কোনদিন।চিন্তাটি মাথায় আসাতে কেমন স্তব্দ হয়ে গেলাম।

  6. এবার বাগানে গিয়ে ঠিক এমন লাগলো। মাত্র ৩০ মিনিটের জন্যে গিয়ে মনে হলো, কেন এসেছিলাম?

    আপনার লেখা পড়লে বুকে একধরণের যন্ত্রণা হয়, কেন অনেক কথা মনে করিয়ে দিন?
    আমার জীবনের অনেক কিছু পেয়ে যাই আপনার লেখনীতে।

    লিখুন। -{@ (3

    1. লেখাগুলো আমাদের সবার সাথেই কেমন অদ্ভুতভাবে মিলে যায়, তাই না। যন্ত্রণা দিয়ে লিখতে চাই না। যন্ত্রণা’রা আমায় ছেড়ে যেতে চায় না। আর সেসব সংক্রমিত হয় আমাদের সোনেলা পরিবারের যারা আমার লেখা পড়েন, তাঁদের সকলের মাঝে। ভাল থাকবেন,

  7. জন্ম হতে ছব্বিশটা বছর যেখানে কাটিয়েছিলাম সেখানের পৌঁছানোর রাস্তায় এলেই আজো মনে হয় ‘আমি ঘরে যাচ্ছি!’ বাড়ীর কথা মনে হলে আজো চোখে ভাসে পরপারে চলে যাওয়া সেই দাদীর কথা যিনি লাঠি হাতে দরোজায় আমার অপেক্ষায় ছিলেন সাতসকালে…ইদানীং প্রায়ই ঘুম ভেঙ্গে মন ডেকে উঠে ‘মা’ বলে আমার প্রবাসী মায়ের চেহারা দেখতে…

    এই পোস্ট খুবই খারাপ পোস্ট… এক লহমায় সব মনে করিয়ে দিলো আবার 🙁

    1. মায়া খুব খারাপ জিনিষ। মানুষের প্রতি মানুষের মায়া মমতা আছে বলেই না আমরা অতীত মনে রাখি। মনে রাখি হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে। অজান্তে দু’ফোটা জল ঝরাই। ভাল থাকবেন।

  8. “কোথাও কেউ নেই। শুধু মুখোমুখি দু’টো বাড়ি দাঁড়িয়ে, কালের সাক্ষী হয়ে।” – অনুভব করলাম যেন।

    “তবে কেন কান্না শেষে মানব প্রান হয়না শান্ত, শীতল ?” – কিছু কান্না চাপা পড়ে আছে। বেরিয়ে এলে শীতল হওয়া সময়ের ব্যাপার। ইচ্ছে করে তা বের না করলে তা রূপ নেবে তাপে। 🙂

  9. বাস্তবতা থেকে লেখাগুলো দিচ্ছেন
    আপনার দেখার দৃষ্টি আলাদা ধরনের
    অনেক ভাবেন আপনি সবকিছু নিয়ে
    আর এসব ভাবনা আমাদেরকেও ভাবায় খুব।

মন্তব্য করুন