বারমুডায় বক্সী – ৭

[ আঠাশে মে ,বারমুডা আইল্যান্ড, বেলা বারোটা সতেরো মিনিট  ]

                আকাশপথে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের চৌহদ্দিতে ঘুরে ঘুরে এলাকার বিশেষত্ব বুঝে নিতে স্থানীয় এল এফ ওয়াডে এয়ারপোর্ট থেকে সাত সকালেই জেট প্লেনে বেরিয়ে পড়েছি। এখানে সাত সাতটি এয়ারলাইন্স মোট পনেরটা রুটে সরাসরি উড়ান চালায়। আমরা অবশ্য প্রাইভেট প্লেনে সমুদ্রের উপর চক্কর দিতে বেড়িয়েছি। মনমোহন গেজেটে আমার কথাগুলো আপনা থেকেই রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে।  ছোট্ট এই সেভেন সিটার ডিএ-সিক্সটি টু  ফ্লাইটে আমরা সাকুল্যে চার জন আছি। পাইলট কো-পাইলট ছাড়া রিচার্ড ও আমি।

সকাল থেকেই চমৎকার আবহাওয়া। উজ্জ্বল সূর্যের আলোয় দশদিক ঝলমল করছে। আমরা এখন থেকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের সীমানা বরাবর উড়ে যাবো পুয়ের্তো রিকোর সান জুয়ান সি প্লেন বেসে ।  আকাশপথে পনেরশ একাত্তর কিলোমিটার দূরত্ব । আমি মনে মনে হিসাব করলাম এই দূরত্বটা দমদম থেকে বেঙ্গালুরুর দূরত্বের প্রায় সমান। কারন কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরুর এয়ার ডিসট্যান্স প্রায় পনেরশ ষাট কিলোমিটার।

ফ্লাইটে বসে বসে নিচের সুন্দর ও শান্ত মাঝ সমুদ্রকে দেখছি। একটু আগে উপকূলের কাছে ঢেউগুলোকে ছলকাতে দেখেছি। অথচ এখন কত শান্ত। কিন্তু এক নিমেষে শান্ত সাগরও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। উজ্জ্বল পরিষ্কার আকাশও কালো মেঘে ছেয়ে যেতে পারে।  এই সব ভাবতে ভাবতে আমরা দক্ষিণ পশ্চিম দিকে ক্রমশ কর্কটক্রান্তি রেখার সীমঘেঁষা উষ্ণমন্ডলের দিকে এগিয়ে চলেছি। পাইলট প্লেন ছাড়ার আগেই বলেছিলেন এই দূরত্ব অতিক্রম করতে আমাদের মোটামুটি আড়াই ঘন্টা লাগবে। উড়ানে পর্যাপ্ত জ্বালানি আছে। অতএব চিন্তার কিছু নেই। লাইফ সেভিং ডিভাইস বা জ্যাকেটেরও খামতি নেই। জানিনা বিপদ আপদ কখন আসে তাই সব ফ্লাইটেই আপৎকালীন ব্যবস্থা থাকে। এখানেও আছে।

আমাদের যাত্রার প্রথম এক ঘন্টা বেশ নির্বিঘ্নে কাটলো। প্রথম হাজার খানেক কিলোমিটার পথ বেশ শান্তিতে অতিক্রম করলাম। এরপর দূর থেকে সান জুয়ানের দিকে চেয়ে দেখি হটাৎ আকাশ মেঘে  মেঘে ছেয়ে আছে। আমাদের প্লেন যতই তার গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে চার পাশে মেঘের সংখ্যা বা পরিমান বেড়ে যাচ্ছে। একটু আগে অদ্ভুত একটা জিনিষ আমাদের নজরে এল। জিনিষটা কি ভালোভাবে বোঝার জন্যে বাইনোকুলার দিয়ে যা দেখলাম তাতে চমক লাগার কথা।

কি দেখছি আমি ?

রিচার্ড কে জিজ্ঞেস করলাম ,”আমি যা দেখছি ,তুমিও কি তাই দেখছো ?”

রিচার্ড বলল ,”আপনি কি দেখছেন জানিনা কিন্তু আমি একটা ইউএফও দেখছি বোধ হয়। ”

আমি বললাম ,”রিয়েলি ইট সিমস অ্যান ইউএফও – আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট – এত দিন ধরে যেমন তা গল্পের বইতে কিংবা সায়েন্স ফিকশনে পড়ে এসেছি। ”

রিচার্ড তার চোখ থেকে বাইনোকুলার সরাতে সরাতে বলল ,”অবিশ্বাস্য ! কি দেখছি আমরা ?”

পাইলট স্মিথ হ্যারিসন হঠাৎ পাবলিক এডড্রেস সিস্টেমে ঘোষণা করলেন,” আপনারা খেয়াল করুন এক অপার্থিব ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছি আমরা। মনে হচ্ছে আমাদের সামনে যেন কোন অতিকায় ফ্লাইং সসার বা উড়ন্ত চাকি। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন ওটা একটি মেঘ। কিউমুলোনিম্বাস ক্যাপিলেটাস। প্লিজ ভয় পাবেন না। ”

রিচার্ড বলল ,”বাঁচলাম ,সত্যিই ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। ”

আমি হাসলাম ,”হা হা হা ”

 

[ ঊনত্রিশে মে , সানজুয়ান,পুয়ের্তো রিকো  : সকাল ৭টা ]

 

এখানে সুন্দর সকাল । রৌদ্র উজ্জ্বল দ্বীপভূমিতে এক রকম প্রশান্তি নেমে এসেছে যেন। সবকিছুই  স্বাভাবিক। সকালের এই মায়াময় পরিবেশে সাগর সারসের ওড়াউড়ি আর প্রায় নিস্তরঙ্গ জীবনের মাঝে কোথাও যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্য লুকিয়ে আছে তার সামান্যতম  ইঙ্গিতও  নেই ।

তবুও রহস্যের মুখোমুখি হতে রূপকথার গল্পের সাত সমুদ্র তেরো নদী না হোক অনেক দূরের এশিয়া মহাদেশের অন্যতম একটা দেশ থেকে উড়ে এসেছি যে দেশে রহস্য আর জাদুর চর্চা হয় অবিরত।  মধ্য-এশিয়া ও ইউরোপ কিংবা মধ্য-প্রাচ্যের মানুষ বারবার যার প্রতি নানান আকর্ষনে ছুটে গিয়েছে। ধনরত্ন,সোনা-দানা,মশলা কিংবা নতুন নতুন বাজারের সন্ধানে বণিক ও সৈনিক সমান তালে তাল ঠুকে ঢুকে পড়েছে দেশের অন্দরমহলে।  আমি যেন ঠিক তার বিপরীতমুখী বা কেন্দ্রাতিগ বেগে অথবা আবেগে সেই আকর্ষণ কাটিয়ে ছুটে গিয়েছি পৃথিবীর নানান প্রান্তে । কখনো প্রবেশ করেছি আমাজনের গভীর জঙ্গলে কিংবা আমাজন নদীর উৎস সন্ধানে আন্দিজ পর্বতের গিরিকন্দরে ঢুঁড়ে ফিরেছি (এই লেখকের আমাজনের উৎস সন্ধানে উপন্যাস দ্রষ্টব্য )। কখনো বা রক্তনদী কিংবা রক্ত ঝর্ণার সন্ধানে বন্ধু পলের সঙ্গে ছুটে গিয়েছি অ্যান্টার্কটিকার বরফশীতল মহাদেশে (লেখকের রক্তনদীর সন্ধানে দ্রষ্টব্য ) । এমনকি হিমালয়ের প্রায় নির্জন প্রান্তে প্রায় অজানা ও গোপন পথ পিন পার্বতী পাসে পা রাখতেও ভয় পাইনি ( লেখকের বি কিউব অ্যাট পি কিউব দ্রষ্টব্য ) তাছাড়া পলিনেশিয়ার উর্বর ও পরিত্যক্ত  দ্বীপ বানাবায় আমার জীবন প্রায় যেতে বসেছিল (লেখকের বানাবায় বকসী দ্রষ্টব্য) কিন্তু প্রকৃতির রহস্য সামনে থেকে দেখতে  বা তার সমাধানের জন্যে আমি কখনোই পিছপা নই।  নো নেভার। কক্ষনো না।  আমার এই জীবনের মন্ত্র ‘চরৈবেতি’।

রবিঠাকুরের ভাষায় বলি,”আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ।”

অপার কৌতূহল নিয়ে ঘুরিফিরি দিকবিদিকে। ছোটছোট পোকামাকড় থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের তামাম বিষয়ে আমার কৌতূহল। একটাই জীবন তাই দেখতে চাই আমাদের চারপাশ ,সে ভুবনডাঙা  হোক কিংবা অনন্ত মহাকাশ – আকাশ গঙ্গা। এক সঙ্কটের সময়ে প্রথম বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলাম ইউক্রেনের কিয়েভ। সমস্যা সমাধান করে বিজয়ীর মত ফিরেছিলাম  ( ছোটগল্প কিয়েভে কিস্তিমাৎ )।

সেসব অনেকদিন আগের কথা। তবে এইতো বছর দুয়েক আগে আগে অন্তরীক্ষ থেকে ঘুরে এলাম ( বনবিহারীর গগনবিহার ছোটগল্প দ্রষ্টব্য)। মীরা নক্ষত্রজগতে পাড়ি দিতে দিতে আবারো পৃথিবীতে ফিরে আসা।     তাই গতকাল অতিকায় ফ্লাইং সসার বা উড়ন্ত চাকি নয় বরং কিউমুলোনিম্বাস ক্যাপিলেটাস মেঘ দেখে আমি একটু কৌতূহলী হয়েছিলাম ঠিক কিন্তু ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছিলাম তা বলা যায় না  । তবে রিচার্ডের কথা বলতে পারিনা। রিচার্ড ডাকাবুকো ধরনের হলেও শিশুর মত সরল। গড় আমেরিকানদের সঙ্গে তার মেলে না। এমআইটিতে অধ্যাপনা ও গবেষণা করার সময় থেকে দেখেছি তাকে। সে মোটেও হামবড়া ধরনের নয় বরং অনেকটাই সাদাসিধে মধ্যবিত্ত মানসিকতার। সে এখনো উত্তর আমেরিকা মহাদেশের বাইরেই  যায়নি। সম্ভবত যাওয়ার কথা এখনো ভেবে উঠতে পারেনি। কিন্তু সে সারা দুনিয়ার খোঁজখবর রাখে। সে মুচকি মুচকি হাসে আর বলে ,”খবর রাখতে হয়, সবার খবর রাখতে হয়,নইলে । ”

ওর ভাবগতিক দেখে মনে হয় , বিশ্ব সংসার সম্পর্কে ওর অপার কৌতূহল এবং সেই সব বিষয়ে পড়াশুনো  আমি ওকে মনে মনে খুব প্রশংসা করি। সে সাদা চামড়ার  জাতিবিদ্বেষহীন  একজন মানুষ যে বিশ্বাস করে, একজন মানুষ  কোথায় জন্মেছেন সেটা বড় কাজের কথা নয় বরং তার কাজটাই তার বড় পরিচয়।

সে যাই হোক , প্রাতরাশের পর আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলো রিচার্ডের পরিচিত স্থানীয় সাংবাদিক রিকি লুগো। রিকির বয়স রিচার্ডের মতই পঁয়তাল্লিশ বছর। মাঝারি গড়ন। কাঁচাপাকা চুল। লম্বায় প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট। হাফহাতা সাদা জামা আর ফেডেড জিন্সে তাকে বেশ স্মার্ট আর বিজ্ঞ লাগছিল।

রিকির সঙ্গে পরিচয় করে বেশ ভালো লাগলো। রিকি বেশ খোঁজ খবর রাখে দেখলাম। সাংবাদিকদের  এমনিতেই সব বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে হয় তবে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্য সম্পর্কে তার বেশ জ্ঞান ও কৌতূহল আছে দেখলাম। কথায় কথায় রিকি জানালো ,” ডক্টর বক্সী , পুয়ের্তো রিকো বেশ ঝড়প্রবণ দ্বীপ। পরিসংখ্যান দেখে বলা যায় বিগত পঞ্চাশ বছরে অন্তত পঁচিশবার এই দ্বীপ টর্নেডোর কবলে পড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় ঝড় এসেছিল আমার জন্মের বছরে। সেটা চুয়াত্তর সাল। সে বছর আগস্ট মাসের ত্রিশ তারিখে কাগুয়াস এর কাছে টর্নেডো প্রবল হয়ে ওঠে। প্রায় দুই মাইল লম্বা ও পঞ্চাশ গজ চওড়া সেই এফ ওয়ান ঝড়ে দ্বীপের সবকিছু তছনছ হয়ে গিয়েছিল। তবে পরবর্তী ঝড়গুলিতে দুচার জনের আহত হওয়ার ঘটনা ছাড়া মারাত্বক তেমন কোন খবর নেই।”

আমি বললাম ,”তবুও শুনি। ”

রিকি ঘর ঝাঁকিয়ে শ্রাগ করে জানালো ,” যদ্দুর জানি ,ঊনসত্তর সালের মে মাসের পাঁচ তারিখের টর্নেডোতে একজন আহত হয়েছিলেন এরপর কয়েক বছর আগে সতেরোই জুলাই যে ঝড় আসে সেটাতে চার জন আহত হয়েছিল।”

বুঝলাম তাহলে পুয়ের্তো রিকোর ঝড় ঝঞ্ঝা নিয়ে এতদিন রঙ চড়ানো খবর ছড়ানো হয়েছে।

এবারে রিচার্ড মুখ খুলল ,সে রিকের উদ্দেশ্যে বলল , “রিক ,পুয়ের্তো রিকোয় তো তুমি বরাবর আছো আর তোমার মাতৃভাষাও স্প্যানিশ।”

রিক মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। এবারে রিচার্ড বলল ,”পুয়ের্তো রিকো শব্দটাও তো বোধ হয় স্প্যানিশ ,তাই না ?”

রিক ধীরে ধীরে সময় নিয়ে বলল ,”হ্যাঁ ,স্প্যানিশে পুয়ের্তো রিকো শব্দ দুটির মানে রিচ পোর্ট বা সমৃদ্ধ বন্দর। বর্তমানে পুয়ের্তো রিকো আমেরিকান যুক্ত রাষ্ট্রের অধীন কিন্তু এটা কোন রাষ্ট্র নয়। আমরা আমেরিকান হলেও দেশের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারিনা। ক্যারিবিয়ান সমুদ্র এলাকায় সান জুয়ান ,মোনা ,ভিক  ও কুলিব্রা নামের চারটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত পুয়ের্তো রিকো কমনওয়েলথে সব মিলিয়ে প্রায় বত্রিশ লক্ষ অধিবাসীর অন্তত  পঁচানব্বই ভাগ মানুষ কথা বলেন স্প্যানিশ ভাষায় । ”

আমি জানতে চাইলাম ,”মোনা আইল্যান্ডে কি জনবসতি শুরু হয়েছে ? ”

আমিও যে একটু আধটু খোঁজখবর রাখি সেটা বুঝতে পেরে রিক নড়েচড়ে বসল এবং বলল ,”না স্যার ,পুয়ের্তো রিকো ডিপার্টমেন্ট অফ ন্যাচারাল রিসোর্সেস নানা রকম খোঁজখবর নিতে মাঝে মাঝে লোকজন পাঠায়। তবে বিশেষ অনুমতি নিয়ে হাইকিং ও ক্যাম্পিং করা যায়।  ”

রিচার্ড আমার মনের কথা যেন বুঝতে পেড়েছে। সে বলল ,”ডক্টর বক্সী ,মোনা আইল্যান্ড যাবেন ? ”

আমি বললাম ,”নিশ্চয় যাবো ,তবে আগামীকাল। আজ সানজুয়ানে কিছু কাজ আছে।  ”

রিক বলল ,”নিশ্চিৎ  স্যার ,আপনারা চাইলে আমি অনুমতি নিয়ে রাখবো।  ”

রিচার্ডের সঙ্গে আমার চোখে চোখে কথা হল। সে বলল ,”রিক আমরা খুব খুশি হবো যদি তুমিও আমাদের সঙ্গে যোগ দাও। ”

আমি বললাম, “একদম। আমাদের হাতে আরো দুটো দিন সময় আছে। ”

রিক বলল ,”ধন্যবাদ স্যার। ইটস মাই প্লেজার।  ”

আমি মনে মনে বললাম ,” অনেক তথ্য ও ঘটনার বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তার আগে মোনা আইল্যান্ডে বসে মন সংযোগ করতে হবে। ”

(ক্রমশ )

 

 

মোট পড়েছেনঃ ৭৫৫জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন