বই ধার এর মাশুল…..

12308819_766421400130058_8686185313530797288_n [320x200]যারা পড়তে ভালবাসে তাদের সবার ই কম বেশি ধার করে বই পড়ার বা ধার দিয়ে বই ফেরত না পাবার অভিজ্ঞতা আছে…. আমার ও আছে…, আমরা আমাদের পছন্দের বই অনেক সময় পছন্দের পড়ুয়া কে যেচেই দিয়ে থাকি… এর মানে হচ্ছে, নিজের ভাল লাগা কে অন্যের মাঝে বপন করা….
যাই হোক… ৯৫ সালের কথা… তখন আমাদের প্রতিবেশী বান্ধবী মুক্তির কাছ থেকে বই নিয়ে পড়ি আবার পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথে ফেরত দেই… মুক্তি ও আমার কাছ থেকে বই নেয়… ভালই লেন দেন হয় আমাদের মাঝে।
এক দিন সকালে মুক্তির কাছ থেকে এক বই আনলাম… আমি নিজেই ওর বুকশেলফ থেকে বই নিলাম… ও জানলো না কি বই।

সেদিন বিকেলেই একেবারে অপরিচিত এক মানুষের কাছ থেকেও , দুইটা বই আনলাম…. একটির নাম ৭১ এর ঘাতক দালালরা কে কোথায়, আর একটি, মলাটবিহীন উপন্যাস , ভদ্রলোক নিজে থেকে আমাকে পড়তে দিল, যার বৈশিষ্ট্য হলো, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং অন্যতম বৈশিষ্ট্য, বইটি তার মা বাবার বিয়ে তে পাওয়া উপহার।যথারীতি ৭১ এর ঘাতক দের খবরাখবর এর পর শুরু করলাম নটরাজন এর লালবাজার.. এই লেখক এর নাম ও আগে শুনি নাই… কিন্তু উপন্যাস টা পড়তে পড়তে ই আমি সব গুলায়া ফেললাম… মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়া শেষ করে মুক্তির বই মনে করে মুক্তি কে বইটা ফেরত দিলাম।
বাকি দুইটি বই, সেই অপরিচিত ভদ্রলোক কে আর ফেরত দেয়া হলোনা… কারণ , প্রথমত তার বাসায় আমার আর যাওয়ার ই সুযোগ হয় নাই, আর দ্বিতীয়ত তার একটি বই এর নাম ই তো আমি ভুলে গেছি ( যা ছিল ঐ লালবাজার …. ) কেমনে তারে বই ফেরত দেই…!
পরবর্তীতে লালবাজার বইটি আমার কালেকশনে রাখার জন্য ঢাকার এমন কোন জায়গা নাই যেখানে আমি খুঁজি নাই। জীবনের প্রথম আমি বাংলা বাজার পর্যন্ত গেছি এই লালবাজার খুঁজতে.. পাই নাই…. এরই মাঝে আমার এক প্রাক্তন ছাত্র রিচার্ড এর বাবা কোলকাতা যাবে, তার সাথে দেখা… তাকে বললাম লালবাজার এর কথা… তিনি আমাকে বইটা এনে দিলেন… তার কয়েক বছর এর মধ্যেই কিছু দিনের আগ পিছে প্রথমে রিচার্ড এর আব্বা আর তার কয়েক মাস এর মধ্যে রিচার্ড ও স্ট্রোক করে মারা যায়…লালবাজার বইটা আমার কাছে ওদের স্মৃতি হয়ে থেকে যায়। ২০০৮/০৯ সনে নাসির তখন ময়মনসিংহে পোস্টেড… প্রায় ই ও আমাকে বলে, তুমি নাকি কবির এর দুলাভাই এর কাছ থেকে কি বই আইনা আর ফেরত দাও নাই…. এত বছর পর ও বই টার জন্য ভদ্রলোক এর এমন আঁকুপাঁকু দেখে আমি লজ্জিত হলাম যারপরনাই, নাসির এর কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে আমি ভদ্রলোক এর সাথে যোগাযোগ করলাম… তিনি আমাকে ক্ষোভ এর সাথে জানালেন…. তার মা বাবার বিয়েতে পাওয়া উপহার, লালবাজার এর কথা…. আমার পা এর নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল… আমি অনেকবার দু:ক্ষ প্রকাশ করে তাকে সব খুলে বললাম…. এবং দ্বিতীয় বার এর মত বইটা খুজে না পেয়ে, আমার নিজের লালবাজার বইটা নাসির এর হাত দিয়ে তাকে ফেরত পাঠালাম।বই টা হাত ছাড়া করতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে…কিন্তু শান্তি লেগেছে এই ভেবে যে, আমার চেয়ে ও অনেক বেশি স্মৃতি বিজড়িত ছিল বইটা তার কাছে।
২০০৮/০৯ থেকে ২০১৫…. এর মাঝে অনেক কেই বলেছিলাম বইটার কথা,অপরিচিত লেখকের বই, কেউ ই খুঁজে পায় নাই। অবশেষে রনজিত দে দা কে একবার কথায় কথায় বলেছিলাম…. যদি পায় তাইলে যেন আমার জন্য লালবাজার টা কিনে রাখে।দাদা ভুলেন নাই… ঠিক ই কিনে রাখসে্ন আমার জন্য আমার লালবাজার।আমি শততই আপ্লুত, ধন্যবাদ দিয়ে নিজে কে আর মহান না ই করি।
দাদা, আপনি যখন বাংলাদেশ বেড়াতে আসবেন, তখন বইটা আপনার হাত থেকে নিতেই ভাল লাগবে ,অপেক্ষায় থাকলাম….

বি:দ্র: ২০০৯ এর পর থেকে, আমি ধার করে বই পড়া বাদ দিয়ে দিসি 🙂 ,বই ধার নিয়ে, ঠিক মত ফেরত না দেয়ার মাশুল, নিজেই নিজেকে দিলাম।

# এই লেখাটি আমার জীবনের প্রথম লেখা।কিভাবে লিখতে হয় আমি জানিনা।আমি লেখক নই।গতরাতে ইচ্ছে হলো এই ঘটনা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করি।ফেইসবুকে শেয়ার দিলাম।এরপর মনে হলো, সোনেলা ব্লগের গ্রুপে আমি আছি,সোনেলা ব্লগেও শেয়ার করি 🙂 সোনেলার সকলের জন্য শুভেচ্ছা।

মোট পড়েছেনঃ ৬১৪জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

১৫টি মন্তব্য

  1. প্রথমে স্বাগতম, শুভেচ্ছা অভিনন্দন সব আপনার জন্য। সোনেলায় আপনার পদচারণা আনন্দঘন হোক এই কামনা করি।

    বই পড়া আমার কাছে নেশার মত, আমি একদিন না খেয়ে থাকলেও সমস্যা নাই যদি আমার কাছে কোন বই থাকে। আর ছোট বেলায় আমার এলাকায় এমন কোন পাঠক ছিল না যার কাছ থেকে আমি বই ধার করি নাই। সবার কাছ থেকেই বই ধার করেছি, আবার ধার দিয়েছি। সেই সময়কার বই ফেরত পাওয়া গেলেও ঢাকায় এসে বই ধার দিয়ে আর ফেরত পাইনি।

    লিখতে থাকুন, সোনেলা আপনার সঙ্গ দিবে। -{@ -{@

  2. “আমি লেখক নই”
    আপনি একেবারে ঠিক যায়গায় পৌঁছে গেছেন। সোনেলাতে কোন লেখক আছে বলেতো মনে হয়না। তবে এ ঘরের মানুষগুলো পদ্ম পাতার মত সাদা। আমাকে কিছুদিন আগে এরা অনেক ভালবাসা দিয়েই বরণ করে নিয়েছে। আজ আমি সুযোগ পেলাম কাউকে বরণ করে নিতে। স্বাগতম সোনেলা পরিবারে।
    আপনার অভ্যাসের সাথে আমার অনেক মিল আছে। বই ভাড়াও করেছি দিন হিসাবে।

    এটা বুঝি আপনার প্রথম লেখা! তাহলে সব লেখাগুলোই প্রথম থাক। অনেক ভালো ভাবেই মনের ভাব শেয়ার করেছেন। আপনিও এই সোনেলার প্রদীপে জ্বালানী দিতে পারবেন। লিখতে থাকুন, আমরা শিখে নেবো।
    অফুরান শুভকামনা।

  3. আমিও লেখক নই, আমাদের অনেকেই লেখক নই 😀

    আমি মনে হয় একেবারে ছোটবেলায় বই পেয়েছিলাম, তবে তা এক রকম ধারে। আমাদের কাজিনরা ছিলেন বইয়ের পোকা। সেই তখনকার রাদুগা প্রকাশনী থেকে বের হওয়া যত বই আসতো সবই নিতেন আর আমাদের বয়স বুঝ পড়তে দিতেন। একেবারে চকচকে নতুন বইয়ের মতো। শুরু হয়েছিল উপমহাদেশ নিয়ে আর এরপরে বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে উনাদের বই পড়তে দেওয়া।
    আমার ছোট এক কাজিন ছিল সেও বইয়ের পাগল। সে বই কিনতো আর ওর পড়া হলে আমি নিতাম এই বলে যে- আমার কাছে থাকলে তুমি যে কোনদিন বাসায় এসে নিয়ে যেও, তবুও আমাকে পড়তে দিও’ এই করে করে প্রচুর বই এনেছি কিন্তু সে কাছাকাছি থাকলেও সব বই নিতেও আসেনি। আজও কিছু বই আছে তার আবার অনেক বই অন্যরা পড়তে নিয়ে আর ফেরত দেয়নি।

    ধারে বই এনে ফেরত না দেওয়ার অভিজ্ঞতা আপনার ২০০৯তে আর আমার ২০০৮ এ একবার আর কয়েক মাস আগে আরেকবার। ২০০৮ সালে বুদ্ধদেব গুহ’র ‘ঝাঁকি দর্শন’ উপন্যাস পড়ে হাসতে হাসতে রিভিশন দিতাম সেই বইটার। খুব যত্ন করে রেখেছিলাম। শেষে এক বন্ধু চাইলো আর আমিও দিলাম কিন্তু সেই বই আমি আর নিতেই পারলাম না! আর কয়েক মাস আগে ফেবু জগতের কিছুটা নামী ভন্ড সমাজসেবী এক ভাই বাসায় এসে চারটে বই নিয়ে যায় যার মধ্যে দুইটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এবং সেই দুইটি আবার একজন মুক্তিযোদ্ধা আমাকে উপহার দিয়েছিলেন বইমেলা থেকে! সে নেওয়ার সময়ে বারেবারে বলেছি বইয়ের গুরুত্বের কথা। কিন্তু কিছুদিন পরেই তার ভন্ডামির জন্য সং ত্যাগ করি আর বই ফেরত চাই। কিন্তু সে কুমিরের কান্নার মতো হয়ে গেল…

    একবার সুযোগ পেলেই হবে, কুমিরের কান্নার বদলে লেজ দেখাবো নিশ্চিত :p

    কত্ত কথা বলে ফেললাম! আপনারা প্রথম এসে প্রথম লেখায় যা লিখে দেন তাতেই আমাদের মনের আর পেটের কথা বের হয়ে আসে। ভাবছি নিয়মিত যদি এখানে পোস্ট দেন তবে বাকি সবার শৈশবের ঝাঁপি বোধহয় খুলেই যাবে।

    যদি ঝাঁপি খুলে দিতে পারেন আপনার পোস্টের মাধ্যমে তবে আপনাকে ‘ঠাকুমার ঝুলি’র মতো ‘শৈশবের ঝুলি’ উপাধি দিয়েই দিবো আমি 😀

    স্বাগতম আপু। -{@
    সোনেলায় আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা। নিয়মিত আপনার ঝাঁপি খুলে আমাদের আমন্ত্রণ জানাবেন এই আশাই করছি \|/

  4. সোনেলা পরিবারের নতুন সদস্যকে স্বাগতম -{@
    লেখাটি আপনার জীবনের প্রথম লেখা, অথচ লেখায় পাঠককে লেখার ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়েছেন। একটি লেখা স্বার্থকতা তখনই পায়, যখন লেখাটি পড়ে শেষ করার পর পাঠক টের পায় সে বাস্তবে ফিরেছে। অর্থাৎ পাঠক পড়তে পড়তে লেখার ভেতরে ডুবে যায় আর আপনার লেখাটি পড়াকালীন সময়ে আমার তেমনি হয়েছে (y) ।
    আপনি লেখক নন, তবে লিখতে থাকলে একসময় লেখক হয়ে উঠবেন।
    শুভকামনা রইলো।

  5. সোনেলা পরিবারে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি | আশা করি আমাদের সাথে পথ চলতে আপনার ভাল লাগবে | এখানে আমরা নিশ্চিন্ত মনে লিখি , অনেকটা রাফ খাতার মত | এখানে আন্তরিকতার কোন অভাব নাই | আপনার প্রথম লেখা ভাল লেগেছে 🙂 -{@

  6. ধার করে বই পড়ার অভিজ্ঞতা সবারই কম বেশি আছে। আপনার লেখাটি কিছুটা পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করিয়ে দিল।
    অভিজ্ঞতা শেয়ারের জন্য ধন্যবাদ।

  7. ধার করেই বই পড়া শুরু করেছি, ধার ফেরত দিয়েছি।
    এখন ধারের প্রয়োজন পরে না, ধার কেউ চায় না, জানে তা পাওয়া যাবে না।
    দেবোই না।
    বই ই পড়ি, বই ই য়েই বাঁচি, এখন এমন অবস্থায় আপনার স্মৃতিময় লেখা পড়ে নস্টালজিক হয়ে পড়লাম।
    স্বাগত আপনি এখানে। প্রথম লেখার জন্য আপনাকে হিংসে করতে চাই, এমন কিন্তু লিখতে পারিনি।
    লিখুন লিখুন, নিয়মিতই লিখুন।

    1. আমি ধার চাই বই… আমাকে দিয়েন আপনার লাইব্রেরী কিছুদিনের জন্য আমার ঘরে আছে মনে করে। অকা?

      মিতাপুকে আমিও বলছিলাম যে এক লেখাতেই সবাইকে স্মৃতি রোমন্থনে নিয়ে গেল! উনাকে ‘শৈশবের ঝুলি’ উপহার দিতে হবে অচিরেই 😀

  8. ৯৫ হতে ২০০৮/০৯? এত বছরেও উনি ওনার বইয়ের কত ভুলে যাননি?আমি তো ছয় মাসই কোন কিছু মনে রাখতে পারিনা।আপু এটি আপনার প্রথম লেখা?বিশ্বাস করতে মন চাইছে না।এমন আবেগ দিয়ে লিখতে পারেনা সহজে কেহ।বই ধার করে পড়ার স্মৃতি আমার নেই বললেই চলে।আপনার নরম মনকে দেখে ফেললাম আপনার এই লেখার মাঝে।নিয়মিত লেখুন আমাদের এই সোনেলায়।আপনার কাছে আমি লেখা শিখতে চাই।

  9. স্বাগতম সোনেলায় -{@
    উনি এত বছর পরেও বই ধার নিয়েছেন এ কথা মনে রেখেছেন?স্মৃতি শক্তির প্রশংসাই করতে হয় ওনার।
    বই ধার নিয়ে আপনার চমৎকার লেখাটি অত্যন্ত ভালো হয়েছে
    মনেই হচ্ছেনা এটি আপনার প্রথম লেখা।

    আরো লেখুন আপনি
    শুভ কামনা।

  10. মিতা আপু, আপনাকে এখানে দেখে যে কি ভালো লাগছে। চমৎকার একটি লেখা দিলেন। বই নিয়ে লিখতে গেলে স্মৃতি কাতর হয়ে যাই আমরা। একটা বই হারানোর যন্ত্রনা খুবই কষ্টের, আর ওনার কাছে তো অবশ্যই হবে।
    আপনি যদি সোনেলায় একটু সময় দিতেন আপু, আসবেন না?

মন্তব্য করুন