জানুয়ারি মাসের সকাল।
কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দু’চোখ ভরা জন্ম-কাজল লেগে থাকা এক তরুণীর সঙ্গে বসে আছি। এর আগে সবুজ শাড়ি আর লাল চুড়িতে অনেক ইন্দ্রাণীকে দেখলেও, মার্চ আর ডিসেম্বর ছাড়া দেশপ্রেম দেখি নি।সকালবেলা নিজস্ব সময়।এ সময় নিজের মত থাকতে ভালো লাগে। সাড়ে ছয়টার দিকে দিয়ে যাওয়া দৈনিক পত্রিকাটি ভাঁজ খুলে উদ্বোধন করতে হয়। অবশ্য, নেতা-নেত্রী না হওয়ায় উদ্বোধন কার্যক্রম ওখানেই থেমে যায়। পত্রিকা সবার আগে পড়তে পারলে কিছু লাভ আছে। কাগজের সুন্দর গন্ধটা পাওয়া যায়। কয়েকজনের চোখে ব্যবহৃত হয়ে গেলে সেটা আর থাকে না।কিছু কিছু গন্ধ মন ভালো করে দেয়।দৈনিকের ভাঁজ খোলার মধ্যে একটা গোপন আনন্দ আছে। যদিও, সবাই তা বুঝতে পারে না। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে দেশ-বিদেশের ওপর চোখ বুলিয়ে নিই। তারপর, বিশেষজ্ঞদের উষ্ণ-কলাম পড়তে পড়তে চায়ের কাপে চুমুক দিই। সাধারণত, এই সময় মনোযোগ বেশী হয়ে গেলে কাপ থেকে দু-একটি ফোঁটা পড়ে গিয়ে কাগজ খানিকটা ভিজে যায়। তখন, পত্রিকাটি পরবর্তী’তে যার হাতে যাবে, তার কথা ভেবেও ভালো লাগে।আজ এসবের কিছুই করা হয় নি। লাবণ্যের সঙ্গে দেখা করার জন্যে তাড়াতাড়ি বের হতে হলো। এ পৃথিবীতে ছেলে-মেয়েরা চুপচাপ থাকার জন্যে দেখা করে না।আমরাও হয়তো করি নি।তাছাড়া আমাদের এখানে নীরবতার দৈর্ঘ্য থাকে দু-এক মিনিট। যার সঙ্গে একটি ইস্যুকেও জড়িয়ে থাকতে হয়। আমি প্রথম দিকে ভাবলাম, লাবণ্য হয়তো নতুন কোনও ইস্যুর প্রতি সহমত পোষণ করছে। কিন্তু, দশ-বারো মিনিট পেরিয়ে যাবার পর মনে হল এতক্ষণ চুপ থাকার মত কোনও ইস্যু তো পৃথিবীতে ঘটে নি।এই পৃথিবীটা টিকে আছে কথার ওপর।আমি তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে একটা কাশি দিয়ে বুকের কফ পরীক্ষা করলাম। শুকনো কাশির শব্দে নীরবতার রেকর্ড ভেঙ্গে গেলো। কিন্তু, কফ পরীক্ষাটা সফল হলো না।তখনই লাবণ্য আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী অবস্থা?’আমি বললাম, ‘ফাটা বস্তা-সহ চার বস্তা।’‘মজা করছো, তাই না?’‘না। আমার বালকবেলার একমাত্র ফ্যান্টাসি ছিল বস্তা আইসক্রিম। এটা খাওয়ার জন্য আমি নিয়মিত টাকা চুরি করতাম। একদিন চার’টা বস্তা আইসক্রিম নিয়ে স্কুল থেকে ফিরছি পথের মধ্যে পাড়ার এক বড়-ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। যি-নি সে সময় মোটা থেকে মুটিয়ে যাওয়া এক বান্ধবীকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।হঠাৎ তিনি আমাকে বললেন, কী অবস্থা?আমি তখনই একটু আগে তোমাকে দেয়া উত্তরটি দিলাম।এর মধ্যে ‘ফাটা’ বলার কারণ ইতিমধ্যেই আমি একটা আইসক্রিমের প্যাকেট খুলে ফেলেছিলাম। আর তিনি ভাবলেন, আমি তার বান্ধবীকে বস্তা’র সঙ্গে তুলনা করেছি। তাও এক বস্তা নয়, পুরো চার বস্তা। আমাদের এখানে চালের বস্তাগুলো পঞ্চাশ কেজি। এবার চার বস্তার ওজন চিন্তা করে নাও। ’‘সবসময় উদ্ভট কথা বলবে না। মেজাজ খারাপ হয়।’এত মজার একটা গল্প বলার পর, লাবণ্য এমন ব্যবহার করবে চিন্তাই করতে পারি নি। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সে নিজেই বলে ওঠে, ‘চুপ করে আছো কেনো?’আমি বললাম, ‘জোকস শুনবে?’‘বলো।’‘এক বুদ্ধিমান ডাক্তার তার বিশাল স্বাস্থ্যের অধিকারী রোগীকে বলছেন, আপনি যা ইচ্ছে তা-ই খেতে পারবেন। তবে, যা যা ইচ্ছে হবে তার একটা লিস্ট আপনাকে দিচ্ছি।’‘তেমন ভালো লাগে নি।’‘আচ্ছা। আরেকটা বলি।অফিসের বস খুবই রেগে আছেন। কারণ, ক’দিন আগে তার এক কর্মচারী মিথ্যে কথা বলে ছুটি নিয়েছেন। তিনি তাকে ডেকে বললেন, ‘জানো? যারা মিথ্যা বলে আমি তাদের কি করি?’কর্মচারীটি বলল, ‘জানি স্যার। আপনি তাদের সেলসম্যান করে দেন।’’‘এটা প্রথমটা থেকেও খারাপ হয়েছে।’মেয়েদের জোকস বলা ভয়াবহ ঝুঁকির ব্যাপার। কারণ, পৃথিবীর চমৎকার রসিকতাগুলো আদিরসে পূর্ণ। এসব সহজে বলা যায় না। অবশ্য, কেউ কেউ বলে ফেলে। তারপর কিছু কিছু সাইড-এফেক্ট দেখা যায়। যেমন, কেউ হাসতে ভুলে যায়, কেউ গম্ভীর হয়ে থাকে। সবচেয়ে বড় মিল হল বেশীরভাগ সময়ে বক্তাকে ‘অসভ্য’ ডাকা হয়। এ কারণে ভালো রসিকতাগুলো আমার গলা পর্যন্ত এসে আটকে যায়। তবুও তৃতীয় দান দিলাম।‘এক বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে থানায় টেলিফোন করে বলল, ‘স্যার আমাদের ওপরের তলায় প্রচণ্ড মারামারি লেগেছে তাড়াতাড়ি ফোর্স নিয়ে চলে আসুন।’ওসি সাহেব তার দলবল নিয়ে নির্দিস্ট ফ্ল্যাটের সামনে হাজির হলেন। তখনও মারামারি থামে নি। ভেতর থেকে ভাঙচুরের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। কলিং বেল দেয়ার পর, এক বিবাহিত মহিলা দরজা খুলে দিলেন। তার হাতে ঝাড়ু, এবং তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, কুস্তি লড়ে এসেছেন।ওসি সাহেব বললেন, ‘এটা কার ফ্ল্যাট?’ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আ-রে, সেই কথাটারই তো ফয়সালা হচ্ছিল এতক্ষণ। একটু পরেই সঠিক জানতে পারবেন।’’এই পর্যায়ে লাবণ্য ফিকফিক করে হেসে ফেলল।আমি বেশ কিছুদিন রাইটার্স ব্লকে ছিলাম। ফিকফিক শব্দ শোনার পর মনে হল, সে-ই ব্লক কাটতে শুরু করেছে। কত আনন্দের ব্যাপার! ক্যান্সারের মত রাইটার্স ব্লকেরও শ্রেণী-বৈষম্য নেই। এই সমাজতান্ত্রিক রোগ ছোট লেখক, মাঝারী লেখক, বড় লেখক সবারই হয়ে থাকে।হঠাৎ জীবনানন্দ দাশের কথা মনে পড়ল।তার কবি-সত্ত্বার আড়ালে ঢেকে গেছে উপন্যাসগুলো। কত সময় খরচ করেই না লিখেছিলেন ওগুলো! না-কি উপন্যাসগুলোই কবিতার খসড়া? কে জানে!ওর কথা মনে হতেই লাবণ্যকে বললাম, ‘হায় চিল’ কবিতাটা পড়েছ?’‘হ্যাঁ।’ বলার পর সে মিষ্টি একটা হাসি দিলো। এই হাসির অর্থ আমি জানি। মানে, কবিতাটা ওর মনে নেই।‘পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মত সে যে চলে গেছে রুপ নিয়ে দূরেআবার তাহারে কেন ডেকে আনো?কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’আমি এটুকু-ই জানি।খানিকক্ষণ পর বললাম, ‘এই লেখাটা ঠিক করে লেখা উচিত ছিল।’লাবণ্য অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, ‘কেনো?’‘আমি নিশ্চিত, তিনি যে-ই পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যার কথা লিখেছেন, তার দেখা পান নি। হয়তো রাজকন্যা দেখেছেন, কিন্তু রাঙা রাজকন্যা দেখেন নি। সে অ-নে-কঅ-নে-ক বেশী আলাদা। অদ্ভুত ব্যাপার হলো সে মাঝে মধ্যে আমার পাশে বসে থাকে। আজকেও আছে।’এই বাক্য শোনার পর লাবণ্য তার মুখটা অন্যদিকে সরিয়ে নেয়। বোধ হয় তার চোখে খানিকটা জলও নেমে আসে। কিন্তু, যাদের চোখে জন্মকাজল থাকে, তারা চোখের জল আড়াল করতে পারে না। ঠিকই বোঝা যায়।মেয়েরা দুঃখ ছাড়াও কাঁদতে পারে। সে-ও কাঁদুক।লাবণ্যের যখন প্রচণ্ড মন খারাপ থাকে, সে বড় বড় ভুল করে। আজ সে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে দু’পায়ে দু’রকম স্যান্ডেল প’রে। আমার ধারণা, এর ভেতর এক পাটি বাথরুমের। তাড়াহুড়ায় খেয়াল করে নি।ওর বাবা প্রচণ্ড রবীন্দ্রভক্ত।কন্যার নাম রেখেছিলেন শেষের কবিতা থেকে। গল্পগুচ্ছ কিংবা গীতাঞ্জলী নিয়ে পড়ে থাকা মেয়েটিকে আমি প্রায়ই বলতে চাই, আমিও একজন কবি। আমার দিকেও একটু তাকাও।শেষ পর্যন্ত বলা হয়ে ওঠে না।
শোনা যায়, জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী লাবণ্য দাশও স্বামীর দিকে সেভাবে ফিরে তাকান নি। হায়, কত কাকতালীয় ঘটনা এ পৃথিবীতে ঘটে!
নাজমুস সাকিব রহমান।২২ নভেম্বর, ২০১৬
মোট পড়েছেনঃ ১,০৭৭জন
আজ পড়েছেনঃ ০জন
অহ! বেশ ভালো গল্প।
ধন্যবাদ।
সত্যিই নতুন খবরের কাগজের গন্ধটা বেশ লাগে।
বস্তার কৌতুকটি খুব ভাল লেগেছে।
জীবনানন্দের চোখ দিয়েই কি তবে আপনার প্রিয়াকে দেখা? হয়ত তাই হবে।
প্রেমের গল্প লেখার নিয়মকানুন জানি না, জানলে অন্যভাবে লিখতাম। ধন্যবাদ।
লেখাটি বেশ লেগেছে।
আর জীবনানন্দ এর কবিতায় আমি প্রান ফিরে পাই যেন …
ধন্যবাদ। আমারও ভাল লাগে তাঁর কবিতা।
লেখাটি প্রচন্ড ভালো লেগে গেলো। ধন্যবাদ সুন্দর লেখাদিয়ে মনটাকে সতেজ করার জন্য
পাণ্ডুলিপি তৈরি করছি; আশাকরি ভাল কিছু গল্পের সংগ্রহ রাখতে পারব। ধন্যবাদ।
গল্পের ভেতর এমনভাবেই মনটা গেঁথে গেছে, বহুদিন মনে থাকবে। বহু বহুদিন হয়তো!
আমার আনন্দ কবির নামটা নিলে আমি নিজেই রাঙা রাজকন্যা হয়ে যাই। সত্যি বলছি বলে হাসবেন না যেনো! 🙂
না, হাসব না। ব্যক্তিগত ভাললাগার জায়গাকে আমি সম্মান করি। আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানেন, লেখার সময় একটা ঘোর তৈরি হয়, এটা ভাল লাগে। এই গল্পটা লিখতে গিয়ে দেখলাম, লাবণ্যের ঘাড়ের ওপর লালচে একটা তিল আছে। যেটা আমি ইচ্ছে করেই লিখি নি। এসব ভাল লাগে।
লেখা হয়ে গেলে গল্পরা আমাকে আর টানে না। আপনার মত কেউ যখন মূল্যবান সময় খরচ করে ভাল লাগা জানায়, তখন কী উত্তর দেব বুঝতে পারি না। ব্যাপারটা কী হাস্যকর ঠেকছে? মনে হয় না। শুভেচ্ছা নেবেন।
এতো সুন্দর একটি প্রতি-মন্তব্য আশা করিনি। আমরা সুন্দর মন্তব্য পেতে আশা করি, কিন্তু সবাইকে দিতে নয়।
আর এই প্রতি-মন্তব্যের জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। 🙂
নাজমুস ভাইয়া, ইচ্ছেতো করে আপনার সব লেখা প্রিয়তে রাখি। এতো অসাধারণ করে লেখা সব। আপনি কবি বলেই ভালোবাসা প্রকাশের তীব্রতা বেশি তবু কেন যেন মনে হয় কবিদের প্রেমিকারা সুখী হতে পারেনা। কি জানি ভুল বললাম কিনা। রাঙ্গা রাজকন্যা না তাকালেই বা। কাঁদাতে কজন পারে।
চমৎকার এবং চমৎকার একটি গল্প।
বাঙ্গালী ছেলেমেয়েরা একটু বড় হলেই কাব্যরোগে আক্রান্ত হয়; আমিও হয়েছিলাম সন্দেহ নেই। কিন্তু সচেতনভাবে আমি কখনও কবি হতে চাইনি। মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও এক লাইন গদ্য লিখতে পারলে আমি খুশী হব।
আর ওই অর্থে কেউ সুখী হতে পারে না; কোনও মুগ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়না। একসময় মোহ ভাঙ্গে, ভাঙবে।
তোমার হল শুরু, আমার হল সারা!
শুভেচ্ছা নেবেন।
লেখাটা যখন নাজমুস সাকিব এর সুতরাং জমিয়ে পড়তে হবে। দুই রাত আগে দেখেও পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে পরে সময় করে জমিয়ে পড়ব।
অ-নে-কঅ-নে-ক, অথাৎ তোতলামি।
বেশ ভালো লাগল গল্পটা। বরাবরের মতই আপনার উপস্থাপন কৌশল অসাধারণ ।
আনিছ ভাই, কী বলব বুঝতে পারছি না। তবে, এই গল্পটা লিখেছিলাম দুহাজার চৌদ্দতে। ১৮’র বইমেলায় কিছু করার ইচ্ছে আছে। এ জন্য এক বছর সময় নিয়ে সমস্ত গল্পগুলো রিরাইট করছি। সংখ্যাটা চল্লিশ ছাড়িয়ে গেছে। যে দু-তিনটি গল্প রিরাইট করতে পেরেছি, তার মধ্যে এটি একটি। আমি ওই অর্থে প্রেমের গল্প লিখতে পারি না। এ যাবত আমার লেখা প্রেমের গল্পের সংখ্যা দুই কি তিন। তাই, এক ধরণের নিরীক্ষা হিসেবেই গল্পটা প্রকাশ করা।
আর, আমার উপস্থাপন কৌশল তেমন আহামরি না। অন্তত, আমার নিজের তাই ধারণা। মাঝে মধ্যে রবীন্দ্রনাথের কাছে যাই। তার লেখা পড়ি। কৌশল দেখতে গিয়ে গল্পে ঢুকে পড়ি। কৌশল আর দেখা হয় না। আফসোস!
শুভেচ্ছা নেবেন।