এক মুঠি কথা

সে কত বছর আগেকার কথা, সেইদিন সন্ধা ডোবানো আকাশে চাঁদ উঠেছিল, জানালা দিয়ে চাঁদ তার আলো ঢুকিয়ে দিচ্ছিল, ওস্তাদ দিদি আমায় গান শেখাচ্ছে ’ জাত গেল জাত গেল বলে – একি আজব কারখানা –’ আমার গলায় রবি বাবুর গান শোভা পায়, তাই লালনের গান যখন গাইছিলাম তখন মনে হচ্ছিল গলা আমার ফেটে যাচ্ছে — আমি গান গাওয়া রেখে চাঁদ দেখতে লাগলাম-বিরাট থালার মত চাঁদ নরম মন ছোঁয়ানো জোৎস্মা ছেড়ে দিচ্ছে, আর এই অসময়ে হেরে গলায় লালনের গান !!! আমি আনমনে গেয়ে উঠলাম ’আজ জোৎস্মা রাতে সবাই গেছে বনে’—। দিদি আমায় বললেন, তোমার গানের সাথে আজকের পরিবেশের দারুন মিল, কিন্তু আজ লালনের গানটা শেষ কর— মনে মনে ভাবলাম, ইস ! কি বেরশিক দিদিরে বাবা ! এত সুন্দর মত মাতানো পরিবেশ ! — আবারও শুরু করলাম গান — এক পর্যায়ে একটা লাইন খুবই গুরুত্ব দিয়ে গাইতে লাগলাম —’গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায় -তাতে ধর্ম’এর কি ক্ষতি হয় -’ কিন্তু আমার দিদি বললেন, শোন ঐ বেশ্যা শব্দটি উচ্চারণ করবে না, বরং বল,’ গোপনে যে কূলটার ভাত খায়”— আমি বললাম, কেন দিদি ! দিদি বললেন, এই শব্দটা শুনতে কোন ধর্ম’এর মানুষের ভাল লাগবে না –তাই একটু ঘুরিয়ে বল !! আমার তখন আর জোৎস্মা ভাল লাগছিল না, শুধু দিদির কথা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল — আমরা কতটা ভন্ড, কতটা অভিনয় করি যে সত্যিটা বলতে /শুনতে আমাদের বুকে কাঁপন ধরে !!! দিদিকে বললাম, দিদি ! আমি এই লাইনটা ঠিকই গাইবো, কোনই পরিবর্তন করবো না, দিদি আমার আত্মবিশ্বাস দেখে বললেন, আমরা মানুষেরা বড়ই অদ্ভূত, তাইতো আমাদেরকে সমাজে হিসেব কষে চলতে হয় — আমার সব মন তখন ঐ লাইনটায় –আমি মন দিয়ে গলা ছেড়ে লালনের গান গাইতে লাগলাম –দিদি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি পারবে —

মোট পড়েছেনঃ ৮৪৯জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

২২টি মন্তব্য

  1. সত্যটা হজম করে নেবার মত পরিস্থিতি সকলের থাকে না, আর তাই কথা বদলে কিংবা নিজেকেই বদলে নিতে হয়। তবুও যতই বদলাই না কেন, কারও না কারও কাছে সেই বদলে যাওয়া কথা কিংবা মানুষটা ঠিকই কিছুটা হলেও ‘ভিন্ন’ হয়ে যায়।

    1. হুমম ভাই, সমাজ সত্যটাকে গ্রহণ করতে চায় না বা কেউ কেউ গ্রহণ করতে চাইলেও সমাজের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা লোকেরা বাধা হয়ে দাঁড়ায় — এভাবেই যেন আমরা এক পা আগাই আর দু পা পিছিয়ে চলছি ——-
      তবে অনেকে আছে এর প্রতিবাদ করে, তাদের দেখে ভরসা পাই —-
      শুভকামনা রইল

  2. দিদির কথা শুনে অবাক হলাম। এভাবে গানের শব্দ পরিবর্তন ইচ্ছেমত করা যায়না। আপনার আত্মবিশ্বাস দেখে মুগ্ধ হয়েছি আপু। আপোষ করতে করতেই আজ আমাদের এই হাল। লালনের গানের এই লাইনটি কি চমৎকার না আপু!!

    1. হ্যা আপু, এই লাইনটা যতবার গাই ততবার মনে হয় এখানে প্রতিবাদ গর্জণ করে উঠছে —সত্যটাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে — আপু ! আমরা কি শুধুই আপোষ করে যাব ! আমাদের কি প্রতিকারের জন্য এতটুকু প্রতিবাদী হবো না !! মাঝে মাঝে মনের ভেতর খুবই অভিমান ভর করে —তারপরও প্রতিবাদ করি —
      শুভকামনা রইল

  3. এই লাইন টাই তো গানটাকে একটা অন্যরকম মাত্রা দিয়েছে , সেঈ লাইনের একটা অর্থপূর্ণ শব্দ কি হুট করে পরিবর্তন করা যায়?? আপনার সিদ্ধান্তে অটল থাকা টা খুব অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।

    1. অন্তর থেকে ধন্যবাদ আপু, লালনের এই লাইনটাতে আমি প্রাণ খুঁজে পাই, তারপরও সমাজ এই লাইনটা মানতে চায় না — তারা এই লাইনটা শুনতে পছন্দ করে না —-কিন্তু আমার মনে হয় গাইব, এই লাইনটাই গাইব- এতটুকু পরিবর্তন করবো না —-
      শুভকামনা রইল আপু

    1. আপুরে ! সমাজ আমাদের এরূপ ভাবতে শেখায়, তারা আমাদেরকে যতটা না মানুষ ভাবে তারচেয়ে ততটাই মেয়ে মানুষ ভাবে —–সমাজ নারীদেরকে বেশ্যা বানায়, প্রয়োজনমত সেই বেশ্যাদের উপভোগ করে, আর প্রয়োজন শেষ হলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় —-
      সেই কত বছর আগের কথা ! মনে হয়ে গেল গতকাল, তাই দুকলম লিখে দিলাম —-
      ভাল থাকবেন আপু

    1. ভাই ! মানতে পারছিলাম না, সেই বয়সে বার বার মনে হচ্ছিল এটা ঠিক হচ্ছে না — একেবারেই ঠিক নয় —যেটা সত্য সেটাই করা উচিত — যদিও সমাজ সেটা শুনতে পছন্দ করে না —
      শুভকামনা রইল ভাই

  4. কোন কিছুর জন্য সত্য থেকে দূরে সরে যাওয়া ভীরুতার লক্ষণ, কিন্তু আপনি সে রকম কেউ না, আপনার সাহস আত্মবিশ্বাস দেখে ভালো লাগলো…….

  5. সব সত্যিই অনেক সময় নীরব হয়ে যায় দিদি সময়োপযোগী কথা বলেছিলেন।সুন্দর অনুভূতি।কন্ঠ শিল্পীর কাছ থেকে কখনো এমন সুন্দর রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে পাবো কি না কে জানে।রেকডিং করে হলেও এক দিন সোনেলার বন্ধুরা আপনার গান শুনতে চায়।কি বলেন।

মন্তব্য করুন