অবসর

মামুন ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫, শনিবার, ১১:১৩:৫৪অপরাহ্ন বিবিধ ৬ মন্তব্য

জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন।
কালো মেঘে ঢেকে আছে পুরোটা আকাশ। মেঘ জমেছে মনের কোণেও। আকাশের মেঘ কিছু পরেই সরে যাবে, মনের বিষন্নতার কালো মেঘ এতো সহজেই কি তাঁকে নিষ্কৃতি দিবে?
সবাই চলে গেছে। ছুটি হয়ে গেছে। সেকশনের সবাই যাবার পরেও কিছু কাজ পেন্ডিং থেকে যায়। সেগুলো আগামীকাল করলেও চলে। কিন্তু মোবারক সাহেব কোনো কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রাখেন না। গত পনের বছর ধরে তো এভাবেই কাজ করে আসছেন।

একটু আগে এইচ,আর ডিপার্টমেন্ট থেকে ঘুরে এলেন। এইচ.আর ম্যানেজার তাকে ডেকেছিলেন। হাতে আর চার মাস সময় আছে। বয়স ৬০ হতে যাচ্ছে এই চার মাস পর। বাধ্যতামূলকভাবে এবার অবসরে যেতেই হচ্ছে।

জানালার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের সেকশনের দিকে ফিরলেন। এই ষ্টোরটির প্রতিটি জায়গায় রয়েছে তার হাতের ছোঁয়া-হৃদয়ের পরশ। গত পনের বছরে নিজের মেধা দিয়ে এটিকে গড়ে তুলেছেন। ‘ইমপ্লিমেন্ট’ করেছেন যুগের সাথে তাল রেখে। এগুলোকে ছেড়ে চলে যেতেই হচ্ছে তাহলে! একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে কিছু জমাট বেদনাও যেন বের হয়ে সেকশনের ভিতরের আবহাওয়াকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।

এখনো তো কর্মক্ষম রয়েছেন। নিজের দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ওদের একজন অস্ট্রেলিয়ায়, অন্যজন কানাডায় পরিবারসহ ভালোই রয়েছে। বৃদ্ধ বাবা-মাকে কত বলেছে ওদের সাথে চলে যেতে। কিন্তু মোবারক সাহেব স্মিত হেসেছেন শুধু। এতেই মেয়েরা বুঝে গেছে তার নেতিবাচক মনোভাব।

ইচ্ছে করলে অনেক টাকা তিনি অবৈধ ভাবে রোজগার করতে পারতেন। পার্চেজ এর দায়িত্বও তার কাছে। একই সাথে দুটো দিকই সামলে এসেছেন সাফল্যের সাথে। কিন্তু দু’নাম্বারি নিজেও করেন নাই, অন্যদেরও করতে দেন নাই। তাই আজ যাবার বেলায় একেবারে ‘শুন্য’ হাতে চলে যেতে হচ্ছে। গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে হাসিনা বেগম রয়েছেন ওনার সুখ-দুঃখের সাথী হিসেবে। এই চাকরি থেকে ‘অবসর’ নেবার পরে কি করবেন? ভাড়া বাসায় থাকেন। দুজনের থাকা-খাওয়ার খরচ আর ঘরভাড়ার টাকাটা তো মাস গেলে দিতেই হবে। বড় মেয়ে প্রথমদিকে টাকা পাঠাতো। বার দু’এক ফিরিয়ে দেবার পরে আর ফোনে একটু কড়া ভাবে নিষেধ করাতে সেগুলো আসাও বন্ধ হয়েছে।

সেকশনের মেইন ডোর বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যেতে যেতে ভাবলেন, তিনি কি ভুল করলেন? অন্যদের মত ‘উপরি আয়ের’ দিকে না গিয়ে সৎ থাকাটা কি সঠিক ছিল? সিকিউরিটিদের সালামের জবাব দিতে গিয়ে তাঁর ভাবনার রেশ একটু ছিন্ন হলো। সালামের উত্তর দিতে গিয়ে নিজের উত্তরও পেয়ে গেছেন। আল্লাহপাক তো রয়েছেনই! আর তিনিও এখনো কর্মক্ষম এবং সুস্থ রয়েছেন। আল্লাহর দুনিয়ায় একটা না একটা ব্যবস্থা হবেই ইনশা আল্লাহ।

বিশাল কারখানার মেইন গেইট দিয়ে একজন মোবারক সাহেব বের হয়ে এলেন। মুখে হাসি আর অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস। হাতে আর চার মাস সময় আছে, এরপর অবসরে যাবেন- এমন একজন ষাট বছর ছুঁই ছুঁই মানুষ আর পিছন ফিরলেন না। সোজা রাস্তাটি একদম সামনের দিকেই চলে গেছে। জীবন ওদিকেই। তিনিও সেদিকে পা বাড়ালেন।

৪৭৬জন ৪৭৬জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ