ভালোবাসা এমনই

মামুন ২০ ডিসেম্বর ২০১৫, রবিবার, ১২:০০:২৬পূর্বাহ্ন গল্প মন্তব্য নাই

একদিন কথা হচ্ছিলো মেকুরাণীর সাথে। পাশে মেকুর কন্যারাও রয়েছে। টুকটাক কথাবার্তা। নির্দোষ গীবত ও হচ্ছিলো কিছু। গীবত ও কি কখনো নির্দোষ হয়? মনে হয় না। তবে আমাদের নাগরিক জীবনে এই জিনিসটা খুবই স্বাভাবিক লাগে আমাদের কাছে।
সপ্তাহের একটি দিন কাছের মানুষদের সাথে একজন আদর্শ মানুষ হিসাবে থাকবার চেষ্টা করি। এজন্য বেশীরভাগ সময়ই কথা শুনে কাটে আমার।

কলিং বেলের আওয়াজ। সুন্দরী বাবু দরোজা খুলে বলে-
‘আম্মু, দুধওয়ালা।’
আমি যেখানে থাকি সেটা বলতে গেলে গ্রামই। পাশে একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। তো এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষেরই নিজেদের পালা গরু রয়েছে। আমরা যারা বহিরাগত, ভাড়াটিয়া- আমাদের প্রয়োজনীয় দুধের জোগান দেয় সেই গাভীগুলি।

দুধওয়ালা চলে গেলে সুন্দরী বাবু বলে-
‘জানো পাপা! এই লোকটাকে দেখলে আমার খুব ভয় করে।’ বললাম,
– কেন পাপা?
‘এই লোক ভালো না। ওনার বউকে খুব মারধোর করে। সেদিন স্কুলে যাবার পথে দেখলাম ওনার বউকে মারধোর করছে। অনেক গালিগালাজ ও করেছে।’

আমি এ কথার পিঠে আর কিছুই না বলে চুপ থাকলাম। কিন্তু এবার মেকুরাণীর গলা বোধহয় চুলচুল করছিলো। সে মঞ্চ দখল করে নেয়। দর্শক সেই এক এবং অদ্বিতীয় আমি।
লোকটির সম্পর্কে আরো অনেক অজানা তথ্য জানলাম। আমার জানার পরিধি তাতে সমৃদ্ধ হলো কিনা জানি না। তবে মেকুরানী যে খুব খুশী হয়েছে, বেশ বুঝতে পারলাম।
এভাবেই সপ্তাহের দিনগুলি কাটাই আমি। বেশ তো- কি বলেন?

এরপরের সপ্তাহে আসছিলাম প্রান্তিক গেট দিয়ে হেঁটে হেঁটে। আমাদের মহল্লার প্রান্তসীমায় সেই দুধওয়ালার বাড়ি। কয়েকটা বাঁশ ঝাড়ের পাশ দিয়ে পথ চলে গেছে। আলোআঁধারি পরিবেশ। মাটির ঘর। উপরে টিনের ছাউনি। সাধারণত পথ চলতি আমি মানুষের ঘরবাড়ির দিকে তাকাই না। কিন্তু সেদিন, দুধওয়ালা সম্পর্কে আগেই আমার জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ হওয়াতে, আজ কেন জানি লোকটার বাড়ি অতিক্রম করার সময় একবার তাকালাম। তাঁর ঘরের জানালা খোলা। ভিতরে বাতি জ্বলছে। সেই আলোয় আমি দেখলাম তাদের শোবার ঘরের বিছানায় দুজনে বসে আছে। দুধওয়ালার হাতে কি যেন। আমার একটু কৌতুহল হল। আমি গতি স্লথ করে দাঁড়িয়ে গেলাম। ভিতর থেকে আমাকে হঠাৎ করে দেখা যাবে না। জানি কাজটা ভালো হয় নাই। তবুও অনেক সময় জেনেও কি আমরা কিছু কিছু কাজ খারাপ করি না?

দুধওয়ালার হাতে একটি বানানো পান। সে তাঁর বউয়ের মুখে তুলে দিচ্ছে। মানে নিজে খাইয়ে দিচ্ছে। বউটি স্বাভাবিক নারী সুলভ আবেগী আচরণের ঢং করছে। বড্ড মায়ায় জড়ানো থাকে এই ঢঙগুলি! পুরুষদেরকে ভালোবাসার মাকড়শার জালে বন্দী করার এক অব্যর্থ অস্ত্র।
দৃষ্টি আমার তীক্ষ্ণ হলো। আমি সেই মার খাওয়া মহিলার চোখ জ্বলে উঠতে দেখলাম। একপলকে আমার মনে হলো, ‘জীবন এতো সুন্দর কেন?’ সেই চোখে ভালোবাসা দেখলাম আমি! তাঁর স্বামী- যাকে আপাতদৃষ্টিতে সবাই রুক্ষ-কর্কশ মনে করে, সেই মানুষটার জন্য তাঁর হৃদয়ের সকল ভালোলাগা ভালোবাসার আগুনে জ্বলে উঠে চোখে অবস্থান নিয়েছিল সেদিন।

সে একজন হৃদয়বতী মহিলা। তাঁর খোলসে ঢাকা হৃদয়বান পুরুষটির জন্য নিজের সকল ভালোবাসা দিয়ে সে তাকে ভালোবাসা শিখায়, নিজেও শিখে, অনুভব করে। মোটকথা সে ভালোবাসতে জানে। তাই দিনের পর দিন মার খেয়ে, গালিগালাজ শুনে ও সে সাথে থাকছে। সংসার করছে। বাচ্চাদের পালছে। নিজেকে সব ভাবে মানুষটাকে দিচ্ছে। সুখ ঢালছে। দুখ বইছে। কষ্ট সইছে। সে ভালোবাসতে জানে। তাই তাঁর রুক্ষ পুরুষটার স্বরূপ জেনে গেছে। মানূষটা কাউকে বুঝতে দিতে চায়না। নিজের ভালোবাসাকে আড়াল করতে চায়। ভালোবাসা তাঁর ভিতরেও অনেক অনেক। ছাইচাপা আগুনের মত তা কখনো কখনো ঝলক দেখিয়ে যায়।
সেদিন যেমন নিজের অজান্তে পথচলতি এক মেকুরের চোখে সেই ঝলক ধরা পড়ল।

সে এমন ই।
এভাবেই অনেকে ভালোবাসে।
এখানে দেখানোর কিছু নাই। সবই গোপনে-আড়ালে, বোধের গভীরে এক প্রবল মমত্ববোধ জেগে উঠা। যারা ভালোবাসতে জানে, এগুলি কেবল তাদের ভিতরেই দেখা যায়। তবে হৃদয়বান নারী-পুরুষদেরকে বাইরের খোলসাবৃত দেহ দেখে চেনা বড্ড দায়।

নিজের ভিতরে একাধারে আনন্দ-বেদনা নিয়ে, নিঃসঙ্গ পায়ে চলা পথটি ধরে আমি সেদিন অনেকক্ষণ হেঁটে চলেছিলাম। আর ভাবছিলাম নিজের মনে।
আমি কি ভালোবাসতে জানি? আদৌ ভালোবাসার অর্থ বুঝেছি কি?
আমার মেকুরাণী আমাকে কিভাবে দেখে? আজো জানা হলো না…
আমিও কি হৃদয়বান?

একজন দুধ বিক্রেতার কাছ থেকে আমি কিভাবে ভালোবাসতে হয় সেটা শিখলাম- এক পলকে। সে অনুভবে বিশ্বাসী। দেখানোয় নয়।
ভালোবাসা এমনই।।

৪৩০জন ৪৩০জন
0 Shares

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ