পাথর জীবন

মামুন ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫, শুক্রবার, ১২:৪৬:৪৮পূর্বাহ্ন গল্প ৮ মন্তব্য

আজানের শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে মিলির।
বারান্দা থেকে মাথা নীচু করে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায় সে। আসরের আজান দিয়ে দিলো?! এতটা সময় ধরে এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ভেবে অবাক হয়!
মেয়েরা কি করছে কে জানে।
গত সন্ধ্যা আর আজকের দুপুরটার মধ্যে ডুবে গিয়েছিল। এতো সুখী একটা সময় শুধু দুই একটা অসতর্ক শব্দের জন্য এমন করে নষ্ট হয়ে গেল।

সামান্যই ঘটনা। নাকি দুর্ঘটনা?

রায়হান বেড়ানো পাগল মানুষ। প্ল্যান করছিল ছুটির শেষ দিনটা কোথায় কোথায় যাওয়া যায়। মিলি ঈদের কাপড়গুলোর মধ্যে থেকে বাছাই করছিল। শাড়ি যেটা পরতে চাচ্ছিল তার সাথে মিলিয়ে কোন গয়না নেই। এক জোড়া মাঝারি হিলের স্যান্ডেলও দরকার ছিলো। তাড়াহুড়ায় শাড়ির ব্লাউজও সিলাই করা হয়নি।

প্রত্যেকবার এমনই হয়। কিছু একটা গোঁজামিল দিয়ে ম্যানেজ করতে হয়। যত বড় অনুষ্ঠানই হোক। সব ঠিক থাকে, শুধু মিলির বেলায়ই এই অবস্থা। সবার খেয়াল সে রাখে, তার দিকে খেয়াল করার কেউ নেই। কিন্তু দোষ হলে ঠিকই খুঁজে পেতে ধরবে কেউ না কেউ।

মন খারাপ করে ঈদের দিন যা পরেছিল সেই সেলোয়ার কামিজই হাতে তুলে নিল। আয়রন করতে হবে। রায়হানের পাশ দিয়ে যাবার সময় মনের দুঃখ কি চেহারায় প্রকাশ পেল? মিলির চেহারার পরিবর্তনটা রায়হান খেয়াল করল।
: এইটা ছাড়া কি আর পরবার মতো কিছু নেই?
রায়হানের কথার ভিতরে কি উষ্মা প্রকাশ পেয়েছিল? বলার টোনটিতে এমন কিছু ছিল, যা শুনে মিলির ভিতরে মুহুর্তে এতদিনের ছোটখাট পাওয়া না পাওয়ার দুঃখ জাগানিয়া ব্যথা মনে খোঁচা দিলো। তাৎক্ষনিক ‘রিয়্যাকশন’ হিসাবে ফস করে মিলির মুখ দিয়ে বের হয়-
: কত দিয়েছ মনে হয়?

মেয়েদের সামনে কথাগুলো শুনে রায়হানের নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয়। পরক্ষণেই লজ্জা, ক্ষোভ আর বিজাতীয় এক অনুভূতিতে জ্বলে উঠে। তবে একেবারে বেসামাল হয় না। বড় মেয়ের দিকে তাকাতেই সে নীরবে ওর রুমে চলে যায়। ছোট মেয়েও বড় বোনকে অনুসরণ করে।

কথার গোড়ায় গিয়ে সে কথা শুরু করে, ” কি পাওনি? ”

মিলির মুখ তখন ঘোর অন্ধকার। হয়তো কাঁদত। কি ভেবে রায়হানের চেয়ে কঠিন গলায় বলল,” তোমার তো জানার কথা! ”
ব্যস। দপ করে জ্বলে উঠল দাবানল। দুই এক কথায় বাড়াবাড়ি। কে কখন কি পায়নি… কি ছেড়েছে… কার কোন আত্মীয় স্বজন কাকে কখন কী কষ্ট দিয়েছে… শ্বাশুড়ি বউ সম্পর্কের গুরুতর বিষয় ও… এভাবে হতে হতে এক পর্যায়ে গলার স্বর চড়তে চড়তে চিৎকার চেঁচামেচি… অনেক বেশীই হয়ে যায়। রাগে হাতের কাছে থাকা কাঁচের গ্লাসটি দেয়ালে ছুড়ে মারে রায়হান।
তারপর…

শোক উথলে চোখ ছাপিয়ে গাল মুখ ভাসিয়ে পানি নেমে এল অযত্নে গায়ের উপর পড়ে থাকা ওড়নায়। ভিজতে থাকল। না খাওয়া দুর্বল শরীরটা দু:খে কাঁপতে লাগল।

কে আছে মিলির? সংসারে একমাত্র যে মানুষটাকে তার কষ্টের কথা বলতে পারত সেও এইই!

অথচ..
দুই একটা সুখী মুহুর্তের ছবি কান্নাটাকে আরো উস্কে দিল। পাহাড়ি ঝর্ণার মত দু:খ আর কান্না দুর্বার বইতে লাগল অনুভুতির উঁচু নিচু ভেংগে।

এক সময় শান্ত হল। নি:শব্দ ভাবনা হয়ে বইতে লাগল।

বইতে লাগল সময় ও।

: আম্মু খাবে না?
বড় মেয়ের ডাকে ধ্যান ভাঙ্গে মিলির।
সেই কখন থেকে সে নিজেও না খেয়ে আছে। সাথে মেয়েরাও।
: রাইসাকে নিয়ে খাবার টেবিলে যাও। আমি আসছি।

একজন স্ত্রী মুহুর্তেই মায়ের রূপে ফিরে আসে। কিন্তু তাতে কি তার হৃদয়ের জ্বালা একটুও কমে? এই রূপান্তরে নিজের ভিতরের ভোঁতা অনুভূতিগুলো কি আগের সতেজ অবস্থায় ফিরে আসে?

দীর্ঘশ্বাসগুলো নামেই মাত্র দীর্ঘ। সেগুলোও কি আরো হ্রাস পায়?
নাকি মস্তিষ্কের ঝিল্লিগুলো হৃদয় নামের এক বিচিত্র মাংসপিণ্ডের ক্রমাগত সংকোচন-প্রসারণের বাইরে আরো কিছু বর্ণনাতীত কর্মকান্ডের দ্বারা রিফ্রেশ হতে চায়?

চিন্তা ভাবনাকে শিকেয় তুলে দিয়ে মিলি জোর করে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে।

কিন্তু এতো অস্বাভাবিকতার ভিতরে বিক্ষিপ্ত মনকে সাথে নিয়ে তাও কি হওয়া যায়?

গত পাঁচটা দিন প্রচন্ড মানসিক কষ্টে কেটেছে রায়হানের।
সেই শনিবার বাসা থেকে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার। রাতে সবার সাথে দেখা হবে। কিন্তু সেদিনের ঝগড়ার পরে, কয়েকবার মিলির সাথে কথা বলেছে। কেমন যেন আলগা আলগা মনে হল মিলিকে রায়হানের কাছে। মেয়েদের কথাই মূলতঃ জিজ্ঞেস করেছে। গতকাল বিকেলে একবার ফোন করেছিল। তখন রায়হান জানতে চেয়েছিল, ‘ কেমন আছ তুমি?’ উত্তরে মিলি যা জানাল তাতে মনটা আরো খারাপ হল রায়হানের, ‘ আমি কেমন আছি জেনে কি করবে তুমি?’ এভাবে কেন বলল মিলি?

অফিসের কাজগুলো কেমন এলোমেলো হতে থাকলো। মনের শান্তি না থাকলে কি আর অন্য কাজগুলোও ভালোভাবে করা যায়। আর একজন মানুষের পরিবার হল সেই মনের নিয়ন্ত্রক। ভালো-মন্দ- এই দুই অবস্থার জন্য নিজের পারিবারিক জীবনে নিজের কর্মকান্ড কতটা সেই পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখতে পারে, তার উপর নির্ভরশীল। রায়হান নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারাতেই এই সপ্তাহব্যাপী মানসিক যাতনাকে সে নিজেই টেনে আনল। তবে মিলির কি একটুও দোষ ছিল না?

নিজের কেবিনে বসে আছে রায়হান। এই ভাবনাটা আসাতেই নিজেকে চোখ রাঙ্গালো নিজেই। মনে মনে বলল, ‘ব্যাটা এখনো তোর শিক্ষা হয় নাই, কিভাবে আজ বাসায় গিয়ে সব ঠিক করবি সেটাই ভাব। উল্টা মিলির কি দোষ সেগুলো না ভেবে নিজে কেন করলি সেটাই ভাবতে থাক।’ এবার একটু কেন জানি মনটা ভালো লাগছে। তারমানে মিলিকে নির্দোষ ভাবাতেই ওর অবচেতন মন শান্তি পেয়েছে? যদিও মিলির কাটা কাটা কথা এবং মেয়েলি ‘নাই নাই কিংবা তু তু ম্যায় ম্যায়’ দ্বারাই সে সেদিন তর্কযুদ্ধে নেমে পড়তে বাধ্য হয়েছিল। তবে ঠিক এই মুহুর্তে সে সম্পুর্ণ দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিলো। এবং মিলিকে সকল দোষ থেকে মুক্তি দিলো।
আর সাথে সাথেই হৃদয়ে এক অনাবিল প্রশান্তি অনুভব করল।

এটা মিলির জন্য ওর ভালোবাসা নয়ত কি?
এই ভালোবাসা রয়ে গেছে বলেই সে এই ক’দিন কষ্ট পেয়েছে!
যাকে যতটুকু ভালোবাসা যায়, তার প্রতি রাগও কিন্তু সমপরিমাণেই করে মানুষ। রাগগুলো কিভাবে যেন এসে যায়।
কিন্তু বোকা মেয়েগুলো সেটা কেন বোঝে না?
অহেতুক গাল ফুলিয়ে থাকে। কথার বাণ নিক্ষেপ করে মজা পায়।

এই যেমন ওদের এবারের গন্ডগোলের তৃতীয় দিনে [ দুজনের ঝগড়া শুরু হয়েছিল বৃহস্পতিবার রাতে। সেটাকে ‘গন্ডগোল নামেই ধরে নেয়া হল। এবারের দ্বারা বোঝা যায়, এরকম গন্ডগোল আরো হয়েছে।] রায়হান বেশ কয়েকবার মিলিকে ফোন করে। কিন্তু মিলি ফোন ধরে না। ঘন্টাখানেক পরে আবারো ফোন করলে এবার রিসিভ করে। রায়হান জানতে চায়,’ কি ব্যাপার? ফোন ধরলে না যে?’ উত্তরে মিলি বলে, ‘ আমার সময় নেই।’

এটা একটা কথা হল?
ওর সাথে কথা বলার সময় যদি ওর না থাকে, তবে কার সাথে কথা বলার সময় রয়েছে? অন্য সময় হলে হয়তো এটা নিয়েই আবার তুমুল হয়ে যেতো।

এটাই কি জীবন? ইটপাথরের নগরজীবন! মুহুর্তেই ভালোবাসা হৃদয়কে তাড়িত করে বেড়ায়, পরক্ষণেই জন্ম নেয় সন্দেহ, অবিশ্বাস আর ঘৃণা! এগুওলো কি একই হৃদয়ে সব হাত ধরাধরি করে চলে? না হলে পরিস্থিতির চাপে পড়ে এর যে কোনো একটি জন্ম নেবার সাথে সাথেই কেন মানুষ প্রতিক্রিয়া দেখায়? যদি এমন হতো, রাগ থাকবে মানুষের হৃদয় থেকে ৫০০ মাইল দূরে, ঘৃণা থাকবে ১৪০০ মাইল দূরে, শুধু ভালোবাসা থাকবে হৃদয়ের অন্তঃস্থলে। তাহলে মানুষের যখন রাগ উঠবে, সে ৫০০ মাইল দূর থেকে আসতে আসতে ইতোমধ্যে ভালোবাসা পুরো হৃদয়কে দখল করে নিবে। আর রাগ এসে অধোমুখে ফিরে যাবে। ইস! কতই না ভালো হতো!

নিজের মনে এগুলো ভেবে ভেবে হাসতে থাকে রায়হান। কি সব উল্টাপাল্টা বাচ্চাদের মত ভেবে চলছে সে। মিলির রাগ ভাঙ্গানোর জন্য তার এক বিশেষ প্ল্যান করা আছে। কাজটা শনিবারেই সে করে এসেছে। আজ বাসায় ফিরবার সময়ে শুধু এক জাায়গায় কিছুক্ষণের যাত্রা বিরতি করলেই চলবে। অবশ্য এই রাগ ভাঙ্গানোর জন্য রায়হানের দীর্ঘদিনের একটি লালিত স্বপ্নের সাময়িক মৃত্যু হবে।

তা হোক না। ওর একটি স্বপ্নের মারা যাওয়াতে মিলির স্বপ্নগুলো যদি দীর্ঘজীবী হয়, সেটাই কি ভালো নয়? মিলি কি শুধুই একজন নারী? সে একজন মা ও বটে। যে রায়হানের অনুপস্থিতিতে পুরো সংসারটি দেখেশুনে পরম মমতায় আগলে রাখছে।
এই পৃথিবীর সকল মায়েরাই এমন!
মমতায় আশেপাশের সবাইকে ঘিরে রাখেন!

নিজের মায়ের কথা মনে পরে দু’চোখ অশ্রুসজল হয়ে পড়ে। ওর ভাবনায় মিলি, মা, দুই কন্যা- এরা সকলে এক হয়ে যায়। এদের সমন্বিত একটি রূপ রায়হানকে যেন বলে,’ যারা তোমাকে এমন মমতায়, স্নেহে, আদর-ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখে, কেন তাদের সাথে এমন ব্যবহার কর?’
… …. ….

সকাল থেকেই মিলিকে একটু কেমন যেন দেখে ওদের বড় মেয়ে ইসরাত। গত বৃহস্পতিবার থেকে বাবা-মায়ের ভিতরে ঘটে যাওয়া সেই অনাকাংখিত ঘটনাটি মিলি এবং রায়হানের দুই মেয়ের মনোজগতেও আলোড়ন তুলেছে। ছোট মেয়ে রাইসা সেদিন রাতে খুব ভয় পেয়েছিল। সাধারণত ওদের বাবা-মায়ের ভিতর এরকম ঝগড়া দেখে বা শুনে ওরা অভ্যস্ত নয়। রাইসা ওর স্কুলে যাবার সময় পথের পাশে কাজের বুয়াদের বাসা অতিক্রম করে যায়। এই গরীব মানুষগুলো তাদের প্রতিদিনের জীবনে না পাওয়া এবং বঞ্চনার কষাঘাতে নিজেদের হৃদয়ের বেদনাগুলোকে মুখের কর্কশ ভাষায় উগড়ে দিতে চায়। আর রাইসা কখনো কখনো সেই সময়গুলোতে মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায় এবং ওদের সেই ঝগড়া শুনতে পায়। যদিও ওদের ব্যবহার করা অনেক শব্দের মানেই সে বুঝে না। কিন্তু সেদিন রাতে বাবার মুখে ওগুলোর ভিতর থেকে দু’একটি শব্দ শুনে সে কিছুটা হতবাক হয়ে গেছে। কেননা অনেক দিন আগে মিলিকে সে এই শব্দগুলোর ভিতর থেকে দু’একটি সে যা মনে রাখতে পেরেছিল, সেগুলোর অর্থ জিজ্ঞেস করেছিল। মিলি ওকে এগুলো খুব খারাপ কথা, এসব শুনবেও না, আর বলবে ও না, বলেছিল সেদিন। তাই ওর কচি মনে এই প্রশ্নটি-ই জাগে, ‘আমার পাপা কি খারাপ মানুষ ? সে কেন আম্মুকে এসব কথা বলবে?’

মিলি গতকাল বিকেলে সাভারে গিয়েছিল। সাংসারিক কিছু কেনাকাটার প্রয়োজন ছিল। সেগুলোর সাথে আরো একটি কাজ করে এসেছে। সেটা ভেবেই একদিক দিয়ে মনের গভীরে আনন্দ পাচ্ছে। আবার একজন মেয়ে হবার কিছু স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের বেড়াজালে পড়াতে একটু একটু কষ্টও পাচ্ছে। তবে সব কিছু মিলিয়ে নিজেকে বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছে। আর ওর বড় মেয়ে ইসরাত ঠিক এই জিনিসটি-ই লক্ষ্য করেছে। ওদের আম্মু কেন জানি ভিতরে ভিতরে খুব খুশী! সেটা কি আজ বৃহস্পতিবার বলে?
আজ বাবার আসার দিন বলে?

কিন্তু ওদের ভিতরে না ঝগড়া হয়েছে। সে নিজের রুমে বসে বসেও এই ক’দিন মোবাইলে ওদের বাবার সাথে মায়ের কথার কিছুটা শুনেছে। কিছুটা এই জন্য যে, শুধুমাত্র এই পাশের কথাই শুনতে পেয়েছে। আর সেখানে আম্মু কিভাবে বাবার সাথে কথা বলেছে, সেটা শুনে বাবার জন্য একটু খারাপ লেগেছিল।
আম্মু কেন এভাবে বাবার সাথে কথা বলল?
সে কি একটু নমনীয় হতে পারত না? সামনে ওর পরীক্ষা। জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। অথচ ওদের বড় মানুষ দু’জনের এই ছেলেমানুষি কাজের দরুন ইসরাতের পড়ালেখার যে ক্ষতি হচ্ছে সেটা কি ওরা দু’জন বুঝতে পারছে?

ইসরাত নামের একটি মেয়ে যে তার বয়ঃসন্ধিকালীন অনুভূতিতে নিজের ভিতরে ভিতরে অস্থির এবং বিচলিত ছিল, বাবা-মায়ের ভিতরকার সম্পর্কের ভিতরের সম্পর্কহীনতা দেখে সে নিজের ছোট্ট জগতে আরো বেশী ম্রিয়মান হয়ে পড়ে।

বিকেলবেলা মিলি খুব সুন্দরভাবে সাজে। বড় মেয়ের অবাক বিস্মিত দৃষ্টির সামনে সে নিজের কাজ করেই যেতে থাকে। মেয়ের ভ্রু একটু উঁচুতে উঠে গেলেও মিলি নির্বিকার থাকে।
এরপর কিচেনে ব্যস্ত সময় কাটে মিলির। নিজের হাতে সব কাজ করে অভ্যস্ত সে। বেশ কয়েকটি খাবার আইটেম বানাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুই মেয়ে এসে কয়েকবার ঘুরে গেছে। প্রতিটি আইটেম ওদের বাবার প্রিয়। ছোটজন তো একবার জিজ্ঞেস ই করে ফেললো, ‘ পাপার প্রিয় খাবারগুলো কেন বানাচ্ছ আম্মু?’ বড়জন ফোড়ন কাটে মাঝখান থেকে, ‘ পাপার জন্য বানাচ্ছে না। অন্য কেউ আসবে মনে হয়। কে আসবে আম্মু?’ অন্য সময় হলে মেয়েকে ইচ্ছেমত কথা শোনাতো কিংবা এটুকু তো বলতই, ‘বেশী পাকামো হচ্ছে, না? কিন্তু আজ মিলি ওদেরকে কিছুই বলল না। নীরবে নিজের কাজ করে চলল।
দুই মেয়ে ওদের মায়ের এমন নির্লীপ্ত ব্যবহারে বেশ অবাক হয়।

রায়হান এসে যখন বাসার কলিং বেল বাজায়, তখন রাত আটটা বেজে গেছে। ছোট মেয়ে রাইসা এসে দরোজা খুলে ওর পাপাকে দেখে প্রতিবারের মত আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে মায়ের কাছে চলে যায়, ‘আম্মু পাপা, পাপা…’। বরাবরের মত মিলি বলে না, ‘ তো কি করব? নাচব?’ আজ ছোট্ট করে শুধু বলে ,’ ঠিক আছে।’ স্বাভাবিক উত্তর না পেয়ে কেন জানি রাইসার মনটা ব্যথিত হয়। সে নিজের কাজে ফিরে যায়। কাজ বলতে এতোক্ষণ কার্টুন চ্যানেলে কার্টুন দেখছিল, সেখানেই ফিরে গেল।

রায়হান দরোজা থেকে মা-মেয়ের কথা শুনতে পায়। দরোজা বন্ধ করে জুতোর স্ট্যান্ডে জুতো রেখে কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে বড় মেয়ের রুমে গেল। সে তখন পড়ছে। পাশের সোফায় ব্যাগটা রাখে মেয়ের হালচাল জিজ্ঞেস করে। অন্য সময়গুলোতে রায়হান বাসায় এসেই নিজেদের রুমে চলে যায়। আজ কি এক অজানা জড়তা ওকে মেয়ের রুমে টেনে নিয়ে এলো। মেয়েকে জিজ্ঞেস করল, ‘ তোমার আম্মুর কি অবস্থা? এখনো রাগ?’

মেয়ে নিজের বাবার দিকে তাকায়। একটু হাসে। বলে, ‘ রাগ তো হবেই। তুমি ওরকম করেছিলে কেন? যাও এখন মানাও গিয়ে।’
রায়হানও হাসে। হাসির সাথে নিজের ভিতরের সকল দ্বিধা -দ্বন্দ্ব গুলোকে উড়িয়ে দিয়ে চায়।
কিন্তু এতো সহজেই কি সব কিছু হেসে উড়িয়ে দেয়া যায়?

মিলি নিজেদের বেডরুমে বসে আছে। অন্যান্য বৃহস্পতিবার গুলোতে কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে রাইসা যখন দরোজা খুলে দিয়ে ওর পাপাকে দেখে ওর কাছে ফিরে আসে, নিজের বসা অবস্থান থেকে উঠে মিলি দরোজার দিকে এগিয়ে যায়। ভ্রমণক্লান্ত রায়হানকে একনজর দেখে… আনন্দ পায়! আজও রাইসা একইভাবে ওর কাছে আসল… কিন্তু নিজের ভিতরে একটা জড়তা কেন জানি ওকে ওর বসা জায়গা থেকে উঠতে দিলো না। আর বরাবরের মত রায়হানও ওর কাছে এলোনা দেখে মনটা আরো খারাপ হল। ভাবল, কি হতো আসলে?
অথচ নিজে যে ওর কাছে যেতে পারত, সেটা বেমালুম ভুলে গেলো।

রায়হান ফ্রেস হয়… নিজের ঘরোয়া পোষাকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ওদের বেডরুমেই টেলিভিশন রাখা। সেখানে ছোট মেয়ে রাইসাকে নিয়ে কিছুক্ষণ কার্টুন চ্যানেলে টম এন্ড জেরি দেখে। বাবা-মেয়েতে কিছুক্ষণ পরপর হেসে গড়িয়ে পড়ে। খাটের এক পাশে বসে মিলি দেখে আর ভিতরে ভিতরে জ্বলতে থাকে। এতো হাসির কি হল সে ভেবে পায় না। সেও তো দেখছে, কই, তার তো হাসি আসছে না। একবার নিজের মনে নিজেকে জিজ্ঞেস করে, ‘ আসলেই কি তুমি দেখছ? তোমার মন কি এখানে রয়েছে?’

বেশ কিছুক্ষণ পর মিলি রাইসাকে ডাকে।
ওর সাহায্য নিয়ে ভাববাচ্যে কথা বলে,
: তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস কর খাবে কিনা?
রায়হান কণার দিকে না তাকিয়ে রাইসাকে উত্তর দেয়,
: আম্মুকে খাবার দিতে বল।
মেয়ে একবার বাবার দিকে তাকায়। পরক্ষণেই মাকে দেখে।
বড় মানুষগুলোর এই ছেলেমানুষি দেখে সে মনে মনে হাসে। ওর চেহারায়ও সেটা প্রকাশ পায়। এরা যে কি!

অন্য সময়গুলোতে মিলি নিজে এটা ওটা বেড়ে খাওয়াতো। রায়হান পছন্দের আইটেমটা দিয়ে আরো একটু ভাত বেশী খেতে চাইলে কপট রাগের অভিনয় করত। রায়হান মুটিয়ে যাচ্ছে, সেটা মনে করিয়ে দিতো। এরকম মৃদু খুনসুটিতে রায়হান-মিলির দুই মেয়েকে নিয়ে সপ্তাহের এই বিশেষ রাতটি কত আনন্দে কেটে যেতো! আজ সেরকম কিছুই নেই… নেই কোনো কপট অভিনয় কিংবা খাবার দেখে রায়হানের লোভী হয়ে উঠবার মিছে ছল। আজ দুজনেই কেন জানি অতিরিক্ত ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে এক একজন ‘জেন্টেলম্যান/লেডি’ হয়ে উঠে।

দুই মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। বড় মেয়ে নিজের আলাদা রুমে ঘুমায়। ছোট মেয়ে এখনো মাকে পাশে না নিয়ে ঘুমাতে পারে না। বাবা-মায়ের মাঝখানে তার স্থান নির্ধারিত। দুই পা দুজনের শরীরে না রাখলে সেও ঘুমাতে পারে না। তবে সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে সে কি করে রায়হানের বড্ড জানতে ইছে করে।
রাইসা ঘুমিয়ে গেলে রায়হান বিছানা থেকে নামে। মিলির দিকে তাকায়। নাহ, সে এখনো ঘুমায় নাই। নিজের ব্যাগের ভিতর থেকে র‍্যাপিং পেপারে মড়া একটা প্যাকেট বের করে। মিলিকে ডাকে,
: অ্যাই, ঘুমাইছ?

প্রথমটায় মিলি না শোনার ভান করে। মেয়েরা এমনই হয়। অতিরিক্ত ঢং আর দেখানোর প্রবণতা ওদের ভিতরে থাকবেই। রায়হান এগুলো মনে মনে ভাবে। কিন্তু বিরক্ত হয় না। আসলে মিলির এই সব ঢং ওর কাছে বেশ লাগে। অন্যদের কাছে লাগে কিনা সে জানে না। তবে জানতে হবে।
আবারো ডাকে। এবার মিলি পাশ ফিরে ওর দিকে তাকায়। বলে,
: কি হইছে? বিরক্ত করছ কেন?
: আরে ওঠোই না। এদিকে আসো।

কেমন এক মন্ত্রমুগ্ধের মত মিলি বিছান থেকে নামে… রায়হানের পাশে আসে। রায়হান শেইভ করেছে… পরিচিত আফটার শেইভ লোশনের ঘ্রাণে মনটা কেমন যেন হয়ে যায় মিলির। নিজের ভিতর থেকে কে যেন ওকে বলে, ‘খবরদার, দুর্বল হলে চলবে না। শক্ত থাক। তোমাকে হারলে চলবে না।’ তবে মিলি এই প্রথমবার নিজের মনের ভিতরের ডাককে অগ্রাহ্য করতে চায়। ওর কাছে মনে হয়, এটা কুডাক। শয়তানের প্ররোচনা। সে রায়হানের আরো কাছে চলে আসে।
ওর চোখে চোখ রাখে… রায়হান প্যাকেটটি ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখে। মিলির চিবুকটিকে উচিয়ে ধরে ওর চোখে চোখ রাখে… নিজের ভিতরের সকল গ্লানিকে অনুভব করে এবং অনুতপ্ত হয়ে বলে,
: স্যরি!

একটি ইংরেজি শব্দ। কিন্ত এর ভিতরে কত কিছু যে লুকিয়ে থাকে! অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই একই শব্দ এক একভাবে অর্থবহন করে। আচ্ছা, রায়হান স্যরি না বলে ‘আমি দুঃখিত’ বললে কি এরকম লাগত? এতটা ভালোলাগার অনুরণন বেজে উঠত হৃদয়ে?

: আমিও স্যরি!
মিলির কথায় একটা পাষাণভার নেমে যায় রায়হানের হৃদয় থেকে। র‍্যাপিং পেপারে মোড়া প্যাকেটটাকে মিলির হাতে দেয়। বলে, ‘তোমার জন্য গিফট।’
: কি আছে এতে?
: খুলেই দেখ।

মিলি দ্রুত হাতে প্যাকেটের র‍্যাপিং খোলে। ভিতরে একটি নেকলেস বক্স। একটু অবাক হয়ে ডালাটি খুলতেই চমকে উঠে। একটি নেকলেস। ওর হাতের বালাগুলোর ডিজাইনের সাথে মিলিয়ে বানানো হয়েছে। প্রচন্ড একটা আনন্দ হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বয়ে যায় মুহুর্তে! কিন্তু সেটা হার পাবার আনন্দে নয়। রায়হান এই ডিজাইন এক সপ্তাহে মনে হয় না করেছে। ওর মনে আগে থেকেই এটার পরিকল্পনা ছিল। তার মানে মিলিকে নিয়ে রায়হান ভাবে… ওর জন্য অনেক কিছু করার জন্য চিন্তা-ভাবনায় সময় কাটায়। নিজেকে অনেক ছোট মনে হয় মিলির কাছে। আর সে কিনা সেদিন এই সামান্য একটি গহনার জন্য ঝগড়ার সুত্রপাত করেছিল।

অন্য একটি চিন্তা মনে আসতেই নিজেকে সামলে মিলি জিজ্ঞেস করে,
: এতো টাকা পেলে কোথায় তুমি?
রায়হান একমুহুর্ত থমকে যায়। আসল উত্তরটি এইমুহুর্তে দিতে ইচ্ছে করছে না ওর। তবে মিথ্যেও বলবে না ঠিক করেছে। স্বামী- স্ত্রীর ভিতরে কখনোই এই মিথ্যেকে আনা উচিত নয়। জীবনের যে কোনো পর্যায়েই যে কারো সাথেই এই জঘন্য কাজটিকে টেনে আনা উচিত নয়।
: আমার একাউন্ট থেকে সব তুলে ফেলেছি।
অবাক হয় মিলি। বলে,
: সব? মানে ওগুলো তো তুমি মটর বাইক কেনার জন্য জমাচ্ছিলে?
: হ্যা, তো কি হয়েছে? আবার জমবে… জমাবো ইনশা আল্লাহ।

মিলির পায়ের নীচ থেকে মনে হয় মাটি সরে গেলো। ওর মুখ শুকিয়ে প্রচন্ড একটা কষ্টের আবহ নিমিষে সাড়া দেহমনকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। চোখের দু’কোন বেয়ে পানি বয়ে যেতে থাকে।

রায়হান প্রথমটায় অবাক হয়। কিন্তু মিলির ‘এক্সপ্রেশন’ দেখে একটু ভয়ও পেয়ে যায়। ভাবে না জানি আবার কি ভুল করে ফেলেছে সে। ডুকরে কেঁদে উঠে মিলি। রায়হান ওকে ধরে ড্রেসিং টেবিলের টুলে বসায়। নিজেও মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে। বলে,
: কি হয়েছে? তুমি এমন করছ কেন?

মিলি একটু ধাতস্থ হবার চেষ্টা করে। এরপর নিজের পার্সটা ওয়ারড্রোবের উপর থেকে রায়হানকে দিতে বলে। সেটা হাতে পেয়ে মিলি পার্সের চেইন খুলে ভিতর থেকে একটা মোটা খাম বের করে। সেটা রায়হানের হাতে দিলে রায়হান জিজ্ঞেস করে,
: কি আছে এর ভিতরে?
: খুলেই দেখ।

রায়হান কম্পিত হাতে খামটা খোলে। ভিতর থেকে অনেকগুলো এক হাজার টাকার নোট বের হয়ে আসে। কয়েকটি মেঝেতে পড়ে গেলে রায়হান সেগুলো তুলে হাতে নেয়।
: এগুলো কি? এতো টাকা কোত্থেকে এলো? – মিলিকে জিজ্ঞেস করে।
: তোমার মটর বাইকের জন্য আমি আমার হাতের বালা দুটো বিক্রী করে দিয়েছি।

রায়হান প্রচন্ড এক কষ্ট পায়। এই কষ্টের ভিতরে কেমন এক ভালোলাগার অনুভূতিও পাক খেয়ে খেয়ে যেতে থাকে। মিলিও ওকে নিয়ে ভাবে!

রায়হানের একটা মটর বাইকের স্বপ্ন। মিলিও সেটা জানে। তিল তিল করে টাকা জমিয়ে চলেছে রায়হান। কিছু টাকা বাকী থাকাতে সেটা কিনতে পারছিল না, তাও মিলির অজানা ছিল না। সেজন্যই সে নিজের প্রিয় সোনার বালা দুটি বিক্রী করে দিয়েছে।
রায়হান যাতে তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে সেজন্য।

প্রচন্ড একটা ঝড় বয়ে যায় রায়হানের বুকের ভিতরে। কিন্তু মিলির মত সেখানে জোর বর্ষণ হয় না। বারিহীন এক প্রচন্ড ঝড়ে কাঁপতে কাঁপতে রায়হান মিলিকে কাছে টেনে নেয়। ততোক্ষণে ঝড় শুরু হয়েছে ওদিকেও। দু’জন নারী-পুরুষ নিজ নিজ প্রিয় জিনিস কে উৎসর্গ করে অন্যজনকে সুখী করতে চেয়েছে। কিন্তু জিনিসের উৎসর্গের থেকে আসল ব্যাপারটি হল নিজেদের ভিতরের বোঝাপড়া এবং পারষ্পরিক সম্মান জানানোর মানসিকতা গড়ে উঠা। যেটা এই দু’জনের ভিতরে ঠিক এই মুহুর্তে গড়ে উঠেছে।

সকালবেলা রাইসাই সবার আগে উঠল।
ওকে মাঝখানে রেখে পাপা-আম্মু ঘুমিয়েছিল। ওর বেশ মনে আছে।
তবে রাতে ওকে মাঝখানে রেখে দু’জনে ঘুমালেও সকালবেলায় কিভাবে যেন দু’জনে পাশাপাশি কুন্ডলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে। ঘুমন্ত এই দু’জনকে ওর বড্ড ভাল লাগছে। কত মায়া ওদের দু’জনের চেহারায় মিশে আছে।

এই সকালবেলায়ও বাবা-মাকে দেখতে দেখতে ওর কচি মনে সেই ভাবনাটি আবারো দোলা দিয়ে যায়- ‘ বড় মানুষগুলো আসলেই একদম বাবুদের মত। কত সহজেই এরা সব ভুলে যায়!’

** [ ‘ও হেনরীর ‘দ্য গিফট অব দ্য মেজাই’ গল্পের কিছুটা সুর এই গল্পের উপহার বিনিময় পর্বে এসে পাঠক পেতে পারেন। তাই আগেই জানিয়ে রাখছি। ]

৫৫৪জন ৫৫৪জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ