একটু ছুঁয়ে দাও , মা ।

সানিয়া নাগমা ,

ক্লাশে এসে আমার ডিরেক্টর ঢুকলেন । বললেন , তোমার দেশ থেকে একটি মেয়ে এনরোল করেছে তোমার ক্লাসে । আমি তো অবাক । বললাম , তাই নাকি ? এরপর পরিচয় করিয়ে দিল মেয়েটির সাথে । আমি তো মহাখুশী । বাংলায় কথা বলব মেয়েটির সাথে , কি মজা। মেয়েটির নাম সানিয়া নাগমা । ৪ বছর বয়স । সাথে মা আছে । হটাত মা বলে উঠলেন , আপকা নাম হেনা ? আমি দুনিয়ার বিস্ময় নিয়ে তাকালাম তার দিকে । আপ উর্দু জানতি হ্যায় ? ডিসেম্বর মাস , মা শহীদ হয়েছেন । কি জবাব দেব , ডিরেক্টর সামনে । বললাম , জানি না তবে বুঝতে পারি । মেয়ের মা বললেন , আমি গত সপ্তাহ এসেছিলাম । আপনার কথা শুনেছি । বাংলাদেশ থেকে এসেছেন , মুসলমান । ভীষণ মমতায় জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। বাচ্চাটির জন্য আপন নির্ভরতা চায় । এই বাচ্চাটির বয়সে আমার সবচেয়ে বড় নির্ভরতা হারিয়ে গেছে । এই মেয়েটির দেশের কোন এক জানোয়ার আমার মাকে মেরে ফেলেছে। মেয়েটি এসে আমার হাত ধরল , আমি ক্ষণিকের জন্য কেঁপে উঠলাম । নিজেকে সংযত করে সানিয়াকে আদর করলাম । মাকে আসস্থ করলাম মেয়েটির ভাল থাকা নিয়ে। সানিয়া কি দেখতে পাচ্ছিল আমার ভেতরটা ? আমি আমার মাকে হারিয়ে আগাছার মত বেড়ে উঠেছি , যত্ন ছাড়া । আমি কখনো মা ডাকিনি , মায়ের ছবি দেখিনি , মায়ের স্পর্শ পাইনি । পৃথিবীর সবচেয়ে আপন জিনিসটি নিয়ে গেছে সানিয়া তোমার দেশের মানুষ আমার কাছ থেকে ।

১৯৭১ এর ১১ ই জুন , আমিই সেই হতভাগ্য সন্তান যে মাকে মৃত্যুর সময় মুখে পানি দিয়েছে । বুকের ভেতর হাত ডুকিয়ে রক্ত পরিষ্কার করেছে । চিৎকার করে বলেছে মা আর নেই । পাকিস্তান , পাকিস্তান । তুমি নিয়ে গেছ ৩০ লক্ষ প্রাণ । তোমাকে বা তোমার দেশের মানুষকে আমি কি ক্ষমা করতে পারব ?

সানিয়া , হাসিনা , খালেদা , নিজামী , এরশাদ , কার কাছে আমি আমার মায়ের বিচার চাইব ? তোমরা কত সহজে স্বাধীনতার কবিতা পড় , গল্প লিখ , আমাদের গল্প তো পাথর হয়ে আছে । জানো বন্ধুরা এই কষ্টের পাথর কোন ভাবেই সরাতে পারি না। চাপা , চাপা, পাথর চাপা। আমরা কেন শুধু কষ্ট পাচ্ছি ?

আমার ঘুমের বালিশ চোখের পানিতে ভিজে ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায় । জানালার গ্রীল সাক্ষি হয়ে থাকে আমাদের কষ্টের । তবুও আমি সানিয়াকে আদর করি , কাছে টানি , নির্ভরতা দেই । মানুষ আমি এই তো পরিচয় আমার ।

হাত ছুয়ে দেখি সানিয়ার , কি নরম , আমার হাত কি কখনো কেউ এইভাবে ছুঁয়ে দেখেছে ?

জানি না ।

মা , আমাকে একবার আদর কর। আমাকে কেউ কখনো আদর করেনি ।

মোট পড়েছেনঃ ৮১০জন আজ পড়েছেনঃ ০জন

১৭টি মন্তব্য

  1. মায়ের অভাব অপূরণীয় , মায়ের স্নেহের বিকল্প নেই ।

    সহমর্মিতা জানানোর ভাষা জানা নেই ।
    আল্লাহ আপনার মাকে হেফাজতে রাখুন শুধু এই কামনাই করি ।
    অসাধারন লেখনি আপনার ।

  2. অন্তর ছুয়ে যাওয়া লেখা । যে মানবিক আচরন আমরা এদের সাথে করি , এরা তা আমাদের সাথে করেনি তখন । এখনো এদের প্রায় সবাই ঘৃনা করে আমাদের ।

  3. মায়ের অভাব অপূরণীয়, মায়ের আদর পুরন হবার না।
    এর জন্য শুধুই সমবেদনা কিভাবে দিব?
    তবুও দিতে হয় দিলাম।
    তবে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা,
    তাঁকে জান্নাতে রাখুন।

  4. আপনি যা হারিয়েছেন ফিরিয়ে দেয়া তো সম্ভব না কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না …………………

    সানিয়া , হাসিনা , খালেদা , নিজামী , এরশাদ , কার কাছে আমি আমার মায়ের বিচার চাইব ? তোমরা কত সহজে স্বাধীনতার কবিতা পড় , গল্প লিখ , আমাদের গল্প তো পাথর হয়ে আছে ………।।
    অসাধারণ বলেছেন …………
    পাকিস্তানী না তো তাদের শাস্তি পেয়েছে কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমারা স্বাধীনতার ৪২ বছরের ওই সব জুদ্ধুপরাদি দের বিচার করতে পারি নাই …………
    আজ হইত আপনার মায়ের আত্তা একটু হলেও সান্তি পাবে যে জুদ্ধপরাধিদের বিচার হইতেছে

    আপনার মায়ের গল্প শুনতে চাই ………… অপেক্ষায় রইলাম সম্পুন্ন গল্প সুনার জন্য

  5. ভীষণ কস্ট পেলাম আপু. ভীষণ
    কত সন্তানের কান্না জড়িয়ে আছে এই দেশে.
    এই দেশটাকে রক্ষা করো প্রভু.
    আপু টার কস্ট কমিয়ে দাও.

  6. মধুর আমার মায়ের হাসি চাদের মুখে ঝরে
    তুমি মা হয়ে থাক তুমি মা হও যে হাহাকার বুকের গভীরে তা মেটাবার দরকার নেই তাকে জ্বলতে দাও।

    আমি হলে সরাসরি বলতাম আমি বাংলাদেশী পাকিস্তানি না, তোমাদের আমি কখনই শ্রদ্ধার চোখে দেখি না। তবে তোমার মেয়ে ভাল থাকবে কারন আমরা মানুষ হিসাবে তোমাদের চেয়ে অনেক উন্নত।

  7. ‘ হাত ছুয়ে দেখি সানিয়ার , কি নরম , আমার হাত কি কখনো কেউ এইভাবে ছুঁয়ে দেখেছে ?
    জানি না ।
    মা , আমাকে একবার আদর কর। আমাকে কেউ কখনো আদর করেনি । ‘
    অসাধারণ লেখা । অত্যন্ত আবেগ দিয়ে লিখতে পারেন আপনি।

মন্তব্য করুন