# উদভ্রান্ত আগন্তুক

- Author: [অলিভার](https://sonelablog.com/author/oliver/)
- Published: 2016-11-25T18:00:50+00:00
- Updated: 2016-11-25T15:58:32+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- Tags: গল্প, ডায়েরি, রহস্য, রহস্য গল্প
- URL: https://sonelablog.com/golpo-udvranto-aguntok/

---

![উদভ্রান্ত আগন্তুক](https://c4.staticflickr.com/6/5623/30411451963_5cef83b132_o.jpg)

 

মন খারাপ হলে কিংবা খুব বেশি পরিমাণে একাকীত্ব বোধ জেগে উঠলে আমি প্রায় এখানে আসি। এখানে বলতে এই পার্কটাতে। শহরের এই দালান কোঠার মাঝে অল্প কিছু জায়গা ঘের দিয়ে তৈরি হয়েছে এই শহুরে পার্ক। শহুরে জীবন থেকে কিছুটা সময় ধার নিয়ে আমার মত কিছু মানুষ চলে আসে এখানে তাদের দুরন্ত আর ছটফটে মনটাকে শান্ত করতে। তবে এমন করে ঠিক কতটুকু পরিমাণে মন শান্ত হয় তার হিসেব কখনোই কেউ করতে যায় না।

অবশ্য শুধু দুরন্তপনাকে শান্ত করতেই যে সকলে আসে তাও নয়। অনেকে সকাল বিকেল ওয়াকে আসে, কেউ কেউ সমবয়সীদের সাথে আড্ডা জমাতে একত্রিত হয় এখানে, ছেলেরা আসে নিজেদের মত দৌড়াদৌড়ি করে সময় কাটাতে। কালেভদ্রে ছেলেগুলি একসাথে ফুটবল, ক্রিকেটও খেলে ঘটা করে। আর আসে ভাসমান চা-বিস্কিট-বাদাম আর সিগারেট বিক্রেতারা। এদের কোলাহলেই বুঝি মাঝে মাঝে এই পার্ক নামের মাঠটা তার প্রাণ ফিরে পায়।

একবার এক প্রবীণ ব্যক্তির সাথে দিন কয়েক আলাপ হয়েছিল। অল্প কিছুদিনেই শহুরে এই জীবনে হাঁপিয়ে যাওয়াদের একজন ছিলেন তিনি। চিকিৎসা করানোর নাম করে তার ছেলেমেয়েরা গ্রাম থেকে জোড় করে ধরে নিয়ে এসেছিল এখানে। নিয়ম করে ক’দিন পর পর গাদা গাদা টেস্ট করিয়ে আর ডাক্তার দেখিয়ে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা চালাচ্ছিল। আর এসবের সাথে অত্যাচার হিসেবে যোগ হয়েছিল বাহারি ধরনের ঔষধ; যা তাকে ততোধিক নিয়ম মেনে গিলতে হতো তিন বেলা। একবার তিনি বেশ আক্ষেপ করে বলেছিলেন- “এই যে এত-শত ঝামেলা করছি দু’টো দিন বেশি বেঁচে থাকবার জন্যে, তাতেও কি জীবনের কোন তৃপ্তি আছে?” বড় কঠিন প্রশ্ন ছিল ওটা। তার উত্তর আজও আমি খুঁজে পাই নি। তবে ভদ্রলোক খুব দ্রুতই তার এই ‘ঝামেলা’ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। আর তার মুক্তিটা ছিল চিরকালের জন্যে। ঐ মুক্তি ছাপিয়ে কখনোই এ দুনিয়ার কোন ঝামেলা আর তাকে বন্দী করতে পারবে না। কষ্ট পাওয়ার বিপরীতে তার জন্যে আমি কিছুটা খুশিই হয়েছিলাম।

এরপর আবারও আমি একেলা হয়ে পড়লাম। ঠিক কি কারণে জানা নেই, শহুরে এই লোকগুলি আমাকে এড়িয়েই চলতো সবসময়। আর তা নিয়ে কোনদিনই আমার কোন অভিযোগ ছিল না। বরং তাতেই আমি বেশ স্বস্তি পেতাম। অন্তত ঘেঁটে-ঘেঁটে অতীত মনে করতে হতো না ওসব আলাপের তালবাহানায়। আর আমি নির্বিকারেই আমার মনকে শান্ত রাখার সুযোগ পেতাম তাদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত দয়ায়।

একদিন এক উদভ্রান্তকে দেখলাম পার্কের এক কোনায় হাতে এক লাঠি নিয়ে দাড়িয়ে হাসছে। মানসিক ভারসাম্য যে সে হারিয়েছে তা আর আলাদা করে কেউ কাউকে বলল না। কিছু লোক তার এমন কর্মকাণ্ডে কিছু বিনোদিত হল; আর মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল এমন করে মুখোশ ছেড়ে প্রাণ খুলে হাসতে না পারার অপারগতায়। সমাজের এই মুখোশটাও বেশ অদ্ভুত; সামাজিক তো তাকে করে তোলে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নেয় তার প্রকৃতি প্রদত্ত স্বভাব। চাইলেই এই উন্মাদের মত হাতে লাঠি নিয়ে কোন মাঠের কোনায় একাকী বসেও নির্লজ্জ হাসিতে মেতে উঠতে পারে না। সামাজিক মুখোশ তাকে অমন উন্মাদনার স্বাদ আহরণ করার অনুমতি দেয় না।

পরপর কয়েকদিন ঐ উদভ্রান্ত পার্কের ঐ কোনাতেই বসে থাকল। ক্ষণে ক্ষণে আপন ইচ্ছেতে হেসে উঠে কারও কারও বিরক্তির কারণ হল। আবার ঠিক ঐভাবেই হঠাৎ শান্ত হয়ে তাদের বিরক্ত হওয়া থেকে মুক্তি দিল। আমিও আর সবার মতই দূর থেকে তাকে দেখলাম কেবল।

এক বিকেলে পার্কে গিয়ে দেখলাম যে স্থানটাতে বসে আমি সময় কাটাই ঠিক সেখানেই ঐ উদভ্রান্তটা বসে আছে। নিশ্চিত নই, তবে মনে হল সে আমাকে দেখে মিটিমিটি হাসছে। যেন বলছে, দেখো বাপু আমি তোমার জায়গাতে এসেছি এখন তুমি আবার ঝামেলা করতে এসো না, লক্ষ্মী ছেলেটার মত আমার যায়গাতে গিয়ে বস। আমি অবশ্য তার মিটিমিটি হাসির বিপরীতে কোন প্রতিক্রিয়া দেখালাম না; কিংবা তার এমন কাজে বিরক্তও হলাম না। আমি আমার মত হেটে গিয়ে ওখানেই একটু দূরত্ব রেখে একপাশে বসে পড়লাম।

একটু বাদে পাগলটা আমার দিকে মুখ করে বসে জিজ্ঞাস করল, “তোর মনে রাগ ধরেনি?”

নিতান্ত পরিচিত ছাড়া এ শহরের ভদ্র সমাজ কেউ কাউকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে না, আর অনভ্যাসে আমিও কিছুটা বিরক্ত হলাম অপরিচিত এক উদভ্রান্তের মুখে ‘তুই’ সম্বোধন শুনে। তাই আর ও প্রশ্নের জবাব দিতে গেলাম না। তাছাড়া কেন জানি মনে হচ্ছে ঝামেলা করার জন্যেই ব্যাটা এখানে এসে বসেছে। আমি নির্বিকার বসে রইলাম।

জবাব না পেয়ে একটু অপেক্ষা করে বলল, “এবারে তোর মনে রাগ ধরেছে। আর ভদ্রতা করে তুই তোর রাগ লুকাতে চাইছিস। কি চাচ্ছিস না?”

আমি নির্বিকার। কথায় কথা বাড়ে। আমি মোটেও তা করতে চাইছি না। আর এমন উদভ্রান্তের সাথে তো ভুল করেও না।

তবে তাতে ঐ উদভ্রান্তের উৎসাহে কোন ভাটা পড়ল না। নিজে নিজেই কথা চালিয়ে যেতে লাগল। বলল-  
“তোর মুক্ত হওয়া নেশা তোরা ছাড়ে না। খাঁচায় আটকা পাখির মত তুই খালি ছটফটাস। ছটফটাশ মনে মনে, আর শান্তি খোজস এই শহরের বনে।”

এইটুকু বলেই সে তার মত চিৎকার করে হাসতে লাগল। যেন চরম কোন রসিকতা করেছে সে এ মুহূর্তে। দূর থেকে ক’জন খুব বিরক্ত নিয়ে একবার তাকাল, তারপর আবার নিজেদের মত আবার আলাপ জুড়ে দিল।

এমন কথার পরেও আমি খুব একটা বিচলিত হলাম না। শহরের হাজার হাজার মানুষের ভীরে এমন কিছু মানুষও আছে যারা মন দুর্বল করা কিছু আবেগী কথার দ্বারা মানুষকে সম্মোহিত করেতে জাল ফেলে। মানুষ তাদের কথার জালে আকটে যায়। যারা আটকে যায় তারাও জানে এটা তাদের ভ্রম। কিন্তু আজব এইসব মানুষের মন সেই ভ্রম কেটে বাইরে বের হয়ে আসতে চায় না। মাঝে মাঝে সর্বোস্ব খুইয়ে তারপর নিজের করে যাওয়া এই বোকামিকে গালমন্দ করতে থাকে। আমি তার সম্মোহনের এমন জালতে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিজের মত বসে রইলাম।

এরপর লোকটা উঠে দাড়িয়ে একদম আমার সামনে এসে দাঁড়াল। ঝুঁকে একদম মুখের সামনের দিকে এসে বলল, “যাবি? তোর মুক্তি যেইখানে, ঐখানে যাবি?”

এরকম মুখের সামনে এসে দাড়িয়ে এমন করে বললে সেটাকে আর আমলে না নিয়ে পারা যায় না। লোকটাকে কিছু না বলে চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়ালাম। দেখাদেখি লোকটাও সোজা হয়ে একদম সামনে দাঁড়াল। এরপর বলল- “পলাইবি? কই পলাইবি? এইখানে পলানির জায়গা কই? আয় আমি তোরে মুক্তি দেখাই, তোরে তোর মুক্তির কাছে লইয়া যাই।”

এরপর আচমকা তার হাতের লাঠিটা বিপদজনক ভাবে খুব দ্রুত মাথার উপর উঠিয়ে মুখে মুখে কিছু একটা বিড়বিড় করতে লাগল। আমি ওসব গ্রাহ্য না করে পাশ কাটিয়ে চলে আসতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু হঠাতই লোকটার লাঠি একদম আমার সামনে দিয়ে মাথার উপর হতে নিচের দিকে দ্রুত নামিয়ে নিলো। কাজটা আরও একটু অসাবধানে করলে নির্ঘাত লাঠিটি আমার মাথায় আঘাত করত। এবারে বেশ খানিকটা বিরক্ত হয়ে লোকটিকে একচোট ধমকে দেবার উদ্দেশ্যে ওদিকে ঘুরতেই বুঝলাম কিছু একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে এর মধ্যে।

হঠাৎ করেই আমি অনেক পরিচিত একটা স্থানে যেন চলে এসেছি, যে স্থানটাকে শেষ এরকম দেখেছিলাম প্রায় ২৪/২৫ বছর আগে। যে জায়গাটাতে ফিরে যাবার জন্যে আমার মনটা প্রায় ব্যকুল হয়ে থাকে, এটা ঠিক ঐ জায়গাটা। অবাক হওয়ার চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণে স্মৃতি-কাতর হয়ে উঠলাম নিমিষেই। বুক ভরে শ্বাস টানলাম, এই নির্মল বাতাস পাবার জন্যে ফুসফুসটাও আকুতি জানাচ্ছিল সেই কত বছর আগ থেকে। চোখ বুজতেও কেন জানি ভয় করছিল। মনে হচ্ছিল চোখ বুজলেই হঠাৎ চোখের সামনে এই স্থানটা যেমন করে উপস্থিত হয়েছে, ঠিক তেমনি হারিয়ে যাবে।

কতটুকু সময় ওভাবে বিমুঢ় হয়েছিলাম তার হিসেব দিতে পারব না, তবে বেশ অনেকটা সময় বিমুঢ় হয়ে ছিলাম তা নিশ্চিত। চোখের কোন দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল তা নিয়ে মোটেই বিচলিত হলাম না। অনা-প্রাপ্তির মরুতে যেন হঠাৎই বৃষ্টির পরশে সবুজ উদ্যান গড়ে উঠেছে মনে। পাশে দাড়িয়ে ঐ উদভ্রান্তটা দাঁত কেলিয়ে হাসছে, কিন্তু এবারে তার হাসিতে উল্লাসের চিৎকার অনুপস্থিত। সে হাসছিল যেমন করে হাসে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানকে চমকে দিয়ে। আমি কোনরকম শুধু বলতে পারলাম, ‘কিভাবে?’

এবারে আর তার মুখে আর কোন শব্দ নেই, নেই কোন উত্তর। শুধু ঠোটে লেগে আছে এক টুকরো হাসি। সত্যিই সে আমাকে আমার মুক্ত আরণ্যে নিয়ে এসেছে, দিয়েছে মুক্তির স্বাদ। জায়গাটা ঠিক ২৪/২৫ বছর পূর্বে যেমন ছিল, এখনো ঠিক তেমন দেখাচ্ছে। কিন্তু এটা যে সত্যি নয় তা আমি খুব ভালো করেই জানি। এও জানি যে আমি মোহে আটকে গেছি। সত্যিটাকে আমার মন অস্বীকার করে যাচ্ছে, চোখের সামনে যে মায়াজাল দেখছে তাকেই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে প্রাণপণ।

একসময় লোকটি তার মাথাটা একটু নাড়িয়ে ইশারা দিল। এ ইশারা না বোঝার কিছু নেই। সময় ফুরিয়ে এসেছে, মোহ ভঙ্গ হবে এখুনি। ব্যকুল হয়ে বলতে চাইলাম, ‘আর একটু….”। কিন্তু তার আগেই দৃশ্যপট পাল্টে গেল। দেখলাম অনেকগুলি মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আতঙ্ক আর উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। চোখ মেলতেই পাশ থেকে কেউ একজন একটু চিৎকারের মত করেই বলল, “মরে নি! বেঁচে আছে এখনো”। আমি হুড়মুড় করে উঠে বসলাম, আশে পাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলাম ঐ উদভ্রান্ত লোকটিকে। কিন্তু তাকে দেখলাম না কোথাও।

যে লোকটি বলেছিল আমি এখনো মরি নি সম্ভবত সে এগিয়ে আসল। বলল, ‘কি? কিছু দিয়েছিল নাকি আপনাকে খাওয়ার জন্যে?”। আমি তার উত্তর দেবার আগে জিজ্ঞাস করলাম, “ঐ লোকটা কই?”। সে খুব কৃতিত্বের কণ্ঠে বলতে লাগল, “প্রথম দিন থেকেই দেখছিলাম ঐ ব্যাটার নজর আপনার উপর। তারপর আজ যখন আপনাকে দেখলাম হঠাৎ টলে পড়তে তখনই দৌড়ে এসে ধরলাম ব্যাটাকে। দুটো ঘা দিতেই ব্যাটা দিল আমার হাতে একটা কামড় বসিয়ে”। নিজের হাতটা সামনে নিয়ে এসে উৎসুক জনতাকে দেখাতে লাগল। “তারপর দিল এক ভো-দৌড়! এরপর আমার চিৎকার শুনে এরা সবাই এগিয়ে আসল। তা আপনার কিছু খোয়া গেছে নাকি দেখেন তো।”

কি করে এদের বোঝাই আমার কিছুই খোয়া যায় নি। বরং যা খুইয়েছিল অনেক অনেক বছর আগে তাকেই ফিরে পেয়েছিলাম এক মুহূর্তের জন্যে। আমি জানি আমার এই গল্প এদের বিশ্বাস করানো যাবে না। তাই সে চেষ্টাতেও গেলাম না। লোকটার ব্যাপারে কোন সাফাইও গাইলাম না, আর করলেও সেটা কোন কাজে আসত না। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। যে লোকটি খুব আগ্রহ নিয়ে ঘটনা বলছিল সবাইকে তাকে ছোট করে একটা ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়ে এলাম পার্ক থেকে।  
এরপর শুধুমাত্র আর মনকে শান্ত করার জন্যে কখনোই পার্কে যেতে পারি নি। যতবার গিয়েছি, ততবারই গিয়েছি ঐ উদভ্রান্তের খোঁজে। কিন্তু উদভ্রান্তদের কোন ঠিকানা নেই, তারা হুট করেই আসে আর হুট করেই হারিয়ে যায়। হারায়, একদম চিরতরে……

 

 

 

 

 

---

Comments: 16 — https://sonelablog.com/golpo-udvranto-aguntok/#comments
