# ‘হয় যদি বদনাম হউক আরও’

- Author: [শামীম চৌধুরী](https://sonelablog.com/author/shameem/)
- Published: 2020-08-04T12:42:59+00:00
- Updated: 2020-08-04T12:42:59+00:00
- Category: [একান্ত অনুভূতি](https://sonelablog.com/category/misc/personal/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b9%e0%a7%9f-%e0%a6%af%e0%a6%a6%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%a6%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%b9%e0%a6%89%e0%a6%95-%e0%a6%86%e0%a6%b0%e0%a6%93/

---

বাংলা ছায়াছবি এখন কেবলই সোনালী অতীত। ৬০ দশক থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত বাংলা ছায়াছবি বিনোদনের একটি অনন্য মাধ্যম ছিল। সে সময় নির্মাতারা সামাজিক ও প্রেমের ছবি বেশী চিত্রায়িত করতেন। মারদাঙ্গা বাংলা ছবি এদেশে আসে স্বাধীনতার পর। মারদাঙ্গা ছবি দর্শক মনে যতটুকু দাগ কাটতো, তার চেয়ে কয়েক গুন বেশী দর্শক হৃদয় ছুঁয়ে যেত সামাজিক ছবি। বিশেষ করে ঘরের গৃহিনী, মা-খালা ও চাচী-ফুফুদের কাছে সামাজিক ছবি ছিল দুঃখের, বেদনার ও প্রেম ভিত্তিক আনন্দের। প্রেমের ছবিতে নববধূরা সুড়সুড়ি পেতেন। ছবির মতন করে অনেকেই তার স্বামী বা প্রিয়জনকে ভালবাসতে শিখতেন। কিছু কিছু ছবিতে মা-খালা বা চাচী-ফুফুরা এমন কেউ নেই যে, কান্না না করে ভেঁজা চোখে হল থেকে বেরিয়েছেন।

সে সময় নির্মাতাদের কাছে কোন নায়ক-নায়িকা ও খলনায়কের অভিনয় দর্শক মন জয় করবে তা নির্ভর করতো চিত্র কহিনী ও সংলাপের উপর। প্রেমের ছবিতে বেশীর ভাগ নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করতেন কবরী,ববিতা, শবনম সহ অনেকে। আর সামাজিক ছবিগুলির অধিকাংশ ছবির বাজার দখলে ছিল শাবানা,সুচন্দা,সুজাতা সহ অনেকে। নায়কদের মধ্যে রাজ্জাক,ফারুক,উজ্জ্বল,ওয়াসিম,জাফর ইকবাল সহ অনেকে।

একটি সঙ্গীত পরিবারে জন্ম নেয়া চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল মূলতঃ গায়ক থেকে নায়ক হোন। দেশের প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজ ছিলেন জাফর ইকবালের বড় ভাই। কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ ছিলেন ছোট বোন। আবিদা সুলতানাদের মতন জাফর ইকবালের পরিবারের সবাই সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। যা এই দেশে বিরল।

বাংলা ছায়াছবিতে জাফর ইকবাল একজন ড্যাশিং হিরো হিসেবে খ্যাতি পান। তাঁর পোষাক, চুলের স্টাইল, কথা বলার ঢং, চোখের চাহুনী, কোমড়ের ব্যাল্ট সহ পায়ের জুতা পর্যন্ত সব খানেই ছিল স্টাইলিশ ছাপ। নামকরা গীটার বাদকও ছিলেন। সর্বময় গুনী এই মানুষটির জীবনে দুঃখ ও কষ্ট ছিলো মাত্রাতিরিক্ত। একটি মাত্র প্রেম বা ভালবাসা জাফর ইকবালের সব কিছু কেড়ে নেয়। নিজেকে হারিয়ে ফেলেন না পাওয়া স্বর্গীয় প্রেমে। জীবনের শেষ মহুর্ত পর্যন্ত আশায় ছিলেন তার প্রেমিকা আসবেই। কিন্তু আশাবাদী এই শিল্পীর স্বপ্ন তাঁর জীবদ্দশায় পূরন হয়নি। তার প্রেমিকার (নামটা অপ্রকাশিত থাকুক।) বিয়ের দিন নিজ কন্ঠের সর্বত্র দিয়ে এই গানটি গেয়েছিলেন-  
“সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী  
হয়ে কারো ঘরনী”।

১৯৫০ সালের ১৯ এপ্রিল তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জে জন্ম গ্রহন করেন এই গুনী শিল্পী। ‍১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। যুদ্ধাচলাকালীন সময়ে আরেক মুক্তিযোদ্ধা খসরুর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় কোলকাতায়। সেখান থেকেই দুজনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে। স্বাধীনতার পর খসরু ওরা ১১ জন ছায়াছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। পাকিস্তান আমল থেকেই জাফর ইকবাল চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। এফডিসিতে জাফর ইকবালের সঙ্গে খসরুর একটি আত্মিক সম্পর্ক হয়। নয়ক খসরু ও তিনি দুজনই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার সিনেমায় প্রথম প্লে-ব্যাক করা গান ছিল তার ভাই আনোয়ার পারভেজের সুরে নায়করাজ রাজ্জাক অভিনীত ‘বদনাম’ ছবিতে প্রথম গান করেন ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও/আমি তো এখন আর নই কারও’। জাফর ইকবাল এর কণ্ঠে “হয় যদি বদনাম হোক আরো ” গানটি একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় প্রথম প্লেব্যাকেই ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান এই অভিনেতা।

এরপর সুরকার আলাউদ্দিন আলী তাঁকে দিয়ে অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করিয়েছিলেন। তাঁর জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে  
‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারও ঘরনি’,  
‘তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন’,  
‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’ অন্যতম।  
নিজের কণ্ঠে ‘কেন তুমি কাঁদালে’ শিরোনামে একটি অডিও অ্যালবাম প্রকাশ করেন আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের যুগে ‘সুখে থাকো নন্দিনী’ গানটি গেয়ে দারুণ সাড়া ফেলেছিলেন। এরপর বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২৫ বছর উদযাপন বিশেষ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন ‘এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে’ গানটি। গান ছাড়াও বহু ছায়াছবির নায়ক হয়ে অভিনয় করেছেন এই গুনী শিল্পী। তারমধ্যে  
“ফকির মজনু শাহ”  
“এক মুঠো ভাত”  
“বাঁদী থেকে বেগম”  
“বেদ্বীন”  
“নয়নের আলো”  
“বদনাম”  
“শঙ্খনীল কারাগার”  
“মিস লংকা”  
“সূর্য সংগ্রাম”  
“ফেরারি”  
“মাস্তান”  
সবগুলি ছায়াছবি ছিলো বক্স অফিস হিট। তখন এই ছবি গুলির কাহিনী ও গান সবার মুখে মুখে ভেসে বেড়াতো।

জাফর ইকবালকে আমি মামা বলে ডাকতাম। খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তার মূল কারন নায়ক খসরু জন্য। খসরু মামার ভাইগ্না স্বপন ছিল আমার প্রিয় বন্ধুদের একজন। নতুন পল্টন ইরাকী কবরস্থান সংলগ্ন বাসা ছিল খসরু মামার। এখনও অসুস্থ্যাবস্থায় সেই বাড়িতেই আছেন। আমার বাসা আজিমপুর হওয়ায় প্রতিদিন বিকালে ইরাকী মাঠে খেলতে যেতাম। কোন নায়ক নায়িকা খসরু মামার বাসায় আসলে স্বপনই আমাদের নিয়ে যেত। এমন অনেকেরই সান্নিধ্যে ছিলাম। ১৯৮৭-১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্বপন আমাদের সঙ্গে খেলধূলা ও আড্ডা দিতো। পরে স্বপন বিদেশে চলে যায়।

জনপ্রিয় প্রয়াত নায়ক জাফর ইকবালের কণ্ঠে ‘সুখে থাকো নন্দিনী’ গাওয়া এই গানটিতে যেন তার আত্ম অভিমান প্রকট হয়ে উঠেছিল। বেঁচে থাকতে এই প্রতিভাবান অভিনেতাকে কতটা মূল্যায়ন করা হয়েছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অভিনয়ের স্বীকৃতির কথা বাদ দিলেও ‘হয় যদি বদনাম’ গানটির জন্য নিশ্চিতভাবে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। এখনো শ্রোতারা গানটি শুনে অশ্রু ঝড়ান। কিন্তু তাকে সেই সম্মান দেওয়া হয়নি।

প্রেমে ব্যার্থ এই গুনী শিল্পী শেষের দিকে অতিরিক্ত এ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়েন। লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪১ বছর বয়সে ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারী তাঁর সকল ভক্তদের কাঁদিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। মৃত্যুর পর দীর্ঘ ২৮ বছর পার হয়ে গেলেও তার জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকীতে চলচ্চিত্র জগৎ, তার পরিবার বা অন্য কেউ তাকে স্মরণ করে না। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো মৃত্যুর পরও অবহেলায় রয়ে গেলেন এই ফ্যাশনেবল ড্যাশিং হিরো। প্রেমে ব্যর্থ ও স্ত্রী সোনিয়া তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট ভুলতে জাফর ইকবাল একসময় অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়েন। অতিমাত্রায় আসক্তির কারণে ১৯৯২ সালে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের জটিলতায় মৃত্যুবরণকারী জাফর ইকবালের শেষ ঠিকানা হয়েছিল ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে।

আজ ভোরে হাঁটার সময় বহু বছর পর স্বপনের সঙ্গে দেখা হলো। কথার ফাঁকে খসরু মামার প্রসঙ্গ চলে আসে। আসে প্রয়াত নায়ক জাফর ইকবালের কথা। হঠাৎ আমার মনে হলো জাফর ইকবালকে দাফন খসরু মামা নিজ হাতে করেছিলেন। খলনায়ক মঞ্জুর রাহীর মৃত্যুর দুই মাস পর জাফর ইকবাল মারা যান। দুজনকেই দাফন করেন খসরু মামা। দুজনের কবর ছিলো মুখোমুখি। রাস্তার ধারে নিম গাছের নীচে। কবরস্থান নতুন আঙ্গিকে সাঁজাতে যেয়ে নিম গাছটি কেঁটে ফেলেছে।

সেখানে গিয়ে তার কবর(?) খুঁজে পাওয়া গেল। কবরস্থানের একজন গোর খোদক ওলী মিয়া, যিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে সেখানে কাজ করছেন তিনি বললেন, জাফর ইকবালের পরিবারের কাউকে কখনো এখানে আসতে বা তার কবরের খোঁজ নিতে দেখিনি। কবরটিকে একটি পরিত্যক্ত জঙ্গলই বলা যায়। নেই কোনো নাম ফলক। তিনি বলেন, এই কবরটির ওপর ইতিমধ্যে ২০/৩০টির মতো কবর পড়েছে। কবরটিতে এখন জাফর ইকবালের বিন্দুমাত্র স্মৃতি চিহ্ন নেই। কষ্ট হলো এই ভেবে যে, এমন একজন জনপ্রিয় নায়ক, গায়ক ও মুক্তিযোদ্ধার প্রতি কি কারও কোনো দায়িত্ব ছিল না। মৃত্যুর পর তার স্মৃতিটুকু ধরে রাখার প্রয়োজনও কি কেউ অনুভব করলেন না। বড় ভাই ও বোন প্রয়াত সংগীতকার আনোয়ার পারভেজ ও শাহনাজ রহমতুল্লাহ বেঁচে থাকতে কি ভাইয়ের প্রতি এতটুকু মমতা অনুভব করেননি। জাফরের দুই পুত্রও কি বাবাকে ভুলে গেছেন।

একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও জাফরের প্রতি সরকারেরও কি কোনো দায়িত্ব নেই? চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি বেঁচে থাকতে কোনো শিল্পীর খবর রাখে না, মৃত্যুর পর তো খবর নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, অথচ এই আজিমপুরে কত কত নাম না জানা মুক্তিযোদ্ধা শায়িত আছেন। তাদের কবরে নামফলক আছে। আছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। একজন কিংবদন্তী শিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা জীবদ্দশায় মান অভিমানে জীবন কাটিয়ে গেলেন। যৌবনে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে দেশের জন্য পতাকা বয়ে আনলেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আজ ক্ষমতায় থেকেও মুক্তিযোদ্ধা জাফর ইকবাল জীবনের শেষ সম্মান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জাফর ইকবাল হয়তো বুঝেছিলেন তার মতো একজন নিঃসঙ্গ মানুষ যিনি প্রেমে ব্যর্থ এবং বিবাহিত জীবনেও ছিলেন অসুখী, কাজের কোনো মূল্যায়নও পাননি তাকে হয়তো মৃত্যুর পরও অবহেলায় ঘুমিয়ে থাকতে হবে। তাইতো তিনি তার সব আবেগ ঢেলে দিয়ে গেয়েছিলেন

‘হয় যদি বদনাম হউক আরও  
আমিতো এখন আর নই কারও…।

আমি জাফর ইকবালের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/08/117160984_334786407551115_8234593777460786231_n.jpg)

প্রয়াত জাফর ইকবালের অবহেলিত কবর।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/08/117164604_980801239036891_125242182652705258_n.jpg)

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/08/117181991_293065868446390_261562626609790505_n.jpg)

এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের রিজার্ভ কবর।

 

 

---

Comments: 28 — https://sonelablog.com/%e0%a6%b9%e0%a7%9f-%e0%a6%af%e0%a6%a6%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%a6%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%b9%e0%a6%89%e0%a6%95-%e0%a6%86%e0%a6%b0%e0%a6%93/#comments
