# হিল্লে বিয়ে নাকি আত্মহননের পথ?

Author: রোকসানা খন্দকার রুকু
Published: 2020-12-20
Category: গল্প
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%bf-%e0%a6%86%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%a8%e0%a6%a8/

তিনি এলাকার মাতব্বর, মান্যগণ্য। সম্প্রতি হজ্জব্রত পালন করে এখন হাজী সাহেবও। সবাই তাকে মানে।আবার  তিনি মসজিদ কমিটির একজন সদস্য। গ্রামের অধিকাংশ বিচার সালিশ তাকে ছাড়া হয়না। এরকম ফেরেশতার মত একজন মানুষ, সাতসকালে তার বাড়িতে কেন লোকসমাগম? কি হয়েছে? জানা গেল কেউ গলায় দড়ি দিয়ে আত্যহত্যা করেছে। সবাই বলাবলি করছে কেন এ কাজ করল বা কি হয়েছিল এসব!  
হাজী সাহেবের দুই স্ত্রী। কালই তিনি অতি গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। একদম বিপদে পড়েই বলা চলে। একজনের বিপদে এগিয়ে যাওয়ার সাজা তাকে ভোগ করতে হচ্ছে।

করিম মিয়া সাদাসিধে গ্রামের নিম্ন গৃহস্থ। দুই বাচ্চা আর অতি সুন্দরী বউ নিয়ে অভাবের সংসার। রাস্তার পাশেই দোচালা টিনের বাড়ি। স্বামী স্ত্রীর অভাবের সংসারে ভালোবাসার কমতি যেমন নেই; তেমনি অভাব আর চাহিদার কমা বাড়ায় সারাক্ষন দুজনের খুটখাট ঝগড়া লেগেই থাকে। কোন কোনদিন সেটা অনেক বেশি বলে মনে হয়। এর কারন হল করিম মিয়া একটু বেশি চিল্লায়। অন্যেরা শুনলে ভাবতে পারে এই বুঝি শেষ। করিম মিয়া গজর গজর করতে করতে বেরিয়ে যায়” ফিরে এসে যেন তোর মুখ না দেখি, সোজা বাপের বাড়ি যাবি”।

দোকানে গিয়ে চায়ের অর্ডার দেয় কিন্তু ক‘চুমক খেয়ে মনে হয় পাছে বউ বাপের বাড়ি চলে যায়। বউ ছাড়া সে একমুহুর্ত থাকতে পারেনা। একমুঠো চকলেট নিয়ে ফেরত আসে বউ,বউ ডাকতে ডাকতে। অতঃপর দুজনে কুটুর মুটুর করে চকলেট খায় আর হাসে। পাশের বুড়ো খালা,মামীরাও হাঁসে করিমটা বউ পাগলা। শুধু একজনের হাসির বদলে লালা ঝরে, ওত পেতে থাকে সুযোগের। কবে সেই দিন আসবে?

আজকেও ঝগড়া চলছে, খুব তুঙ্গে একেবারে। গন্যমান্য হাজী সাহেব রাস্তা দিয়ে যাবার সময় অন্যদিনের মত আজও তাদের ঝগড়া শুনেছেন। হঠাৎ তিনি আঁতকে উঠলেন। নাউযুবিল্লাহ এ কি হল?

যেনতেন ঝগড়া হলে কথা ছিলনা। করিম মিয়া ঝগড়ার এক পর্যায়ে চরম রেগে গিয়ে স্ত্রীকে একতালাক, দুইতালাক, তিনতালাক বলে ফেলেছে। শেষ বারে যদিও তার বউ মুখ চেপে ধরেছিল তারপরও তো হয়েছে।

এটা নিয়ে যোহরের নামাজের পর মসজিদে মাতব্বর সাহেব কথা তুললেন। করিম মিয়াকে সন্ধ্যায় ডেকে পাঠানো হল। অন্যান্য মান্যগন্য মানুষজনও উপস্থিত। দুচারজন মওলানাও আছেন। সবার উপস্থিতিতে মাতব্বর সাহেব আবার বললেন সকালে করিম রাগের মাথায় তার বউকে তিনতালাক দিয়েছে। এটার সঠিক সুরাহা প্রয়োজন। কারণ শান্তিপূর্ণ এলাকায় কোন অনাচার হতে দেয়া যাবেনা।

উপস্থিত গন্যমান্য সিদ্ধান্ত ও ফতোয়া দিলেন করিম মিয়ার স্ত্রী তালাক হয়েছে। করিম মিয়া যেহেতু তার স্ত্রী তালাক বলেছে তিনবার তাই সে তালাক হয়ে গেছে।

করিম মিয়া সবার হাতে পায়ে ধরল। ক্ষমা চাইল আর কখনো এমন করবেনা। এবং বললো সেও জানে রাগের মাথায় সে বলেছে। আর রাগের মাথায় তালাক বললে তালাক হয়না। স্ত্রীর দোষ ত্রুটি হলে তিন স্টেপে তালাক দিতে হয় এবং ঠান্ডা মাথায় দিতে হয়। প্রথমে হালকা শাসন, তারপর বিছানা আলাদা, শেষ পর্যন্ত অসহনীয় হলে কিছু উপস্থিতির সামনে দেনাপাওনা মিটিয়ে দিলেই তবে তালাক হয়।

করিম মিয়ার কোন কথাই টিকলনা। সিদ্ধান্ত হল,করিম মিয়া এই বউ নিয়ে সংসার করতে চাইলে হিল্লে বিয়ে করাতে হবে। করিম মিয়া অগত্যা রাজী হয়ে গেল। এবার হিল্লে বিয়ের পাত্র খোঁজা শুরু হল। উপস্থিত সবার মাঝেই আলোচনা হল হিল্লেবিয়ে হবে কার সাথে। সবাই মাতব্বর সাহেবকে দেখিয়ে দিলেন।অগত্যা মাতব্বর সাহেবকেই বিয়েতে রাজী হতে হল।

করিম মিয়ার বউ-বাচ্চা সবাই কাঁদছে। কিছুক্ষন পরে করিমের বউয়ের বিয়ে। খুব গোপনে মাতব্বরের সাথে হিল্লে বিয়ে হল। কানের পানি কান দিয়ে যাওয়াই ভালো। হিল্লে বিয়ের পরবর্তী  নিয়ম হল শারিরীক সম্পর্ক অবশ্যই হতে হবে। পরদিন তালাক হবার পর ইদ্দত শেষ হলে পুনরায় করিম মিয়া বিয়ে করবে। তা না হলে স্ত্রী জায়েজ হবে না। বাসর ঘরে মাতব্বর সাহেব ঢুকলেন। অগত্যা এসব না করলে তো হচ্ছেই না। অনেক জোর জবরদস্তির পর করিম মিয়ার বউ পরাস্ত হল। মাতব্বরের অনেকদিনের জমানো, অভুক্ত খায়েশ পুরন করল। দাতাল শুয়োরের মত শরীরের যেখানে সেখানে কামড় বসিয়ে পুরুষ হবার প্রমাণ রেখে দিল। প্রায় সারারাতই এমন চলল। বাকিরাত করিম মিয়ার বউ কেঁদে কাটাল।

করিম মিয়ারও দুচোখে ঘুম নেই, কখন সকাল হবে। পরদিন সে আবার বউ আনবে। বউ করিম মিয়ার হবে। কারন মাতব্বর তাকে কাল তালাক দেবে। কিছুদিন অপেক্ষা করার পর করিম মিয়ার সাথে আবার বিয়ে হবে। আবার তারা একসাথে খুটখাট ঝগড়া করবে। কখন আবার মিটিং বসবে স্বনামধন্য তার বউকে তালাক দেবে এ ভেবে বাচ্চাদের বুকে জডিয়ে নিল।

তাদের সুখের সংসার। চৌদ্দ বছরের মেয়েটিকে সে এনেছিল বিয়ে করে। গরীব ঘরে আল্লাহ পরী দিয়েছে। করিম মিয়াকে সবাই এজন্য একটু হিংসা করে। করিম মিয়া বউকে দেখে আর মনে মনে খুশিই হয়। বাজার থেকে স্নো,আলতা,পাউডার নিয়ে আসে বউ কাজল বানায়। চোখে পড়লে চোখজোড়া কি সুন্দর হয়। সব ছেড়ে দেখে থাকতে ইচ্ছে করে। এবার এলে আর কোনদিন রাগ করবে না। আর ওসব বাজে কথা তো মুখেই আনবে না। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে। মাতব্বর তাদের ভালোবাসা দেখে হিংসায় এমন করল। সে তিনতালাক বলেনি ঠিক মনে আছে।

মাতব্বরের বাড়িতে এত লোক কেন? কি হয়েছে? ভীড় ঠেলে করিম মিয়া ভেতরে ঢুকল। তার বউ চৌকির উপর শোয়া। কেন কি হয়েছে? সে আর নাই মারা গেছে। একবার মুখটা দেখল কি মায়াবী অভিমান সে মুখে। যেন বলছে-“করিম তুমি আমার প্রথম ও শেষ প্রেম। আজ তুমি আমায় একটা জানোয়ারের হাতে তুলে দিতে সাহায্য করলে। কতবার বলেছি সড়ক দিয়ে লোকজন যায়। আস্তে কথা বল। নাই কথাতেই চিল্লাও। সারারাত শুয়োরটা আমাকে খুবলে খুবলে খেয়েছে। তাই এ শরীর আর আমি কাউকে দেখাতে চাইনা। তুমি ভালো থেকো।”

প্যান্ট-শার্ট-গেঞ্জি পরিহিত লোকজন ভালো; কিংবা ভালো না। দাঁড়ি- টুপি পান্জাবী পরিহিত মানুষ ভালো না আবার পুত পবিত্র এমনটা নয়। সমস্যা পোশাক বা ধর্মে নয়। আবার কাবা, মসজিদ, মন্দির, গীর্জাও সমস্যা নয়। সমস্যা মানসিকতায়। যারা পোশাকী নয় কিন্তু মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ। বরং আমরা সেই সব মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষকে মানুষ মনে করি। তার পোষাক কিংবা স্ট্যাটাস যেটাই হোক না কেন?  সারাজীবন অপকর্ম করে তা ঢাকতে পোশাক ব্যবহার করব। আবার ধর্ম, ধর্মীয় বিধান মান্যকারী হব কিন্তু সেটা ব্যবহার করে লেবাস ধারন করে নিজের স্বার্থ হাসিল করব। এটা যেন কখনোই হাসিল না করি সেটা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই। সবাইকে শুভ রাত্রি🌹🌹
