# হাতের মুঠোয় পৃথিবী

Author: নীলাঞ্জনা নীলা
Published: 2019-04-09
Category: একান্ত অনুভূতি
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a0%e0%a7%8b%e0%a7%9f-%e0%a6%aa%e0%a7%83%e0%a6%a5%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a7%80/

বই পড়তে ভালোবাসি। যদিও এখন খুব মন দিয়ে কিছুই পড়া হয়ে ওঠেনা। তারপরেও পড়ি। আর তাই এখনও বই উপহার হিসেবে পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। ইচ্ছে করে তখনই বসে যেতে। কিন্তু হয়ে ওঠেনা।

শৈশব থেকেই যে ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগতো, তা হলো বই পড়তে। আর এজন্য যথেষ্ট সাপোর্টও পেয়েছি মামনি-বাপির থেকে। মানুষ যখন বিকেলের অবসরে খেলাধূলা নিয়ে মত্ত, তখন আমি বইয়ে মগ্ন। মনে পড়ে বাপি আমায় একটা ছোট্ট বই হাতে দিয়ে বলেছিলো, “এটা পড়িস। সম্পূর্ণ পৃথিবী হাতের মুঠোয় এসে পড়বে।” আমি পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় আনার জন্য গোগ্রাসে পড়া শুরু করে দিলাম। সেই বইটা আসলে ছিলো একটা ইংরেজি থেকে বাংলা অভিধান। আমার পড়ার টেবিলে মিনি একটা গ্লোব ছিলো, আমি ওটাকে বারবার দেখতাম, আর অভিধানটা পড়তাম, এই বুঝি পৃথিবী হাতের মুঠোয় চলে এলো। পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম বাপিকে, পৃথিবী তো হাতে আসেনি। সেই উত্তর বাপি তখন দেয়নি, হঠাৎ একদিন বাপি একটা বাংলা(ইত্তেফাক) এবং একটি ইংরেজি(The Observer) সংবাদপত্র নিয়ে এসে আমার সামনে রেখে বললো, “নীলমন এখন দেখিস পৃথিবী হাতের মুঠোয় কেমন করে চলে আসে!” যখন স্কুল জীবন শুরু হয়নি আমার, সেই তখন থেকেই আমি সংবাদপত্র পড়া শুরু করেছিলাম। আস্তে আস্তে বুঝলাম পৃথিবী আমার হাতের মুঠোয় এসে গেছে। এ প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তের সকল কিছুই দেখে নিচ্ছি দু’ চোখ ভরে। বাপি রোজ এসে জিজ্ঞাসা করতো, “নীলমন আজকের হেডলাইন কি?” উত্তর দিতাম বাংলা এবং ইংরেজি দুই পত্রিকার-ই।

তারপর স্কুলজীবন শুরু হলো। রূপকথার বই পড়ার চেয়ে ভালো লাগতো শুনতে। মামনির বিশাল বইয়ের লাইব্রেরি আলমারিতে তালাবদ্ধ হলো। চাবি জানতাম কোথায়, কিন্তু চুরিবিদ্যা তখনও শিখে উঠিনি। হাইস্কুল পাশ করার দু’ বছর আগে এসে এই বিদ্যা নখদর্পনে এলো। কিন্তু সমস্যা হলো ধরা পড়ে যেতাম। তাই সময় বেঁধে দেয়া হলো। কিন্তু “বসতে দিলে শুতে চায়” এই প্রবাদের সত্যতার সাথে ভিন্নমত প্রকাশ করা কী সম্ভব! তাই তো চুরি করে পড়ার বইয়ের ভেতর গল্পের বই রেখে পড়া শুরু করলাম। বয়সের সাথে যেতোনা, তাও কি বাদ রেখেছি পড়তে? “ক্ষুধিত পাষাণ” পড়ার পর কী ভয়! আর “গৃহদাহে”র দুই নায়ক, এক নায়িকা সে নিয়েও ভাবতাম, এ কেমন করে সম্ভব! শরৎ সমগ্র পড়তে গিয়ে এমন ধরা খেলাম, পরেরদিন পরীক্ষা শাস্তিস্বরূপ বাপির দেয়া হোমটাস্ক। তারপর নিজেই নিজেকে বললাম, নাহ আর চুরি নয়। কিন্তু এ যে এমন এক নেশা, গাল-বকা, মার খেয়েও থামানো যায় না। “শেষের কবিতা” পড়ে কিছুই বুঝিনি। উপন্যাসের নাম কেন এমন, সেটা বুঝতে সময় লেগেছে ঢের। বঙ্কিম পড়তে গিয়ে বাংলা অভিধান কাজে লেগেছে। মামনির আলমারিতে বিভিন্ন লেখকদের “সমগ্র” ছিলো। আর তাই যখন বাংলা নিয়ে অনার্স পড়তে গেলাম, নতুন বই কিনতে হয়নি। যদিও আমার “গ্রন্থিকা লাইব্রেরি”র জন্য কিনেছিলাম নতুন করে।

আর আমার এই ” গ্রন্থিকা”র কথা কী বলবো! বাপিকে বলতাম আমি যেখানেই যাই না কেন ওকে ছাড়া কোথাও যাবোনা। কিন্তু ভাগ্য এমনই মা-বাবার মতো গ্রন্থিকাকে ছেড়েই আছি। হিসেব করে বই পড়া হয়নি। আমার গ্রন্থিকায় প্রায় একহাজার বই আছে। তাছাড়া ঢাবি’র(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), মাসতুতো ভাইয়ের বাসার বইয়ের মেলা, কলকাতা কলেজ স্ট্রিট, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি এরা জানে কিছুটা কেমন পড়ুয়া ছিলাম!

সবশেষে না বললেই নয়। এবারে দেশে যাবার পরে আমার বই পড়া নিয়ে গল্প উঠলো। মামীই শুরু করলো বলা, “মামনি তোমার কথা যখনই ওঠে, কিংবা মনে পড়লেই যে দৃশ্য ভেসে আসে, সেটা হলো জানালার পাশে রকিং চেয়ারে বসে তোমার বই পড়া। আর আমরা সবাই গল্প করছি, তোমার ওসবে মন নেই। ছিলোওনা।” হুম সেই আমি’টা আর কোথাও নেই, কোনোখানেই খুঁজে পাওয়া যাবেনা আর।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2019/04/56811292_2629120117160020_209276155558100992_n-158x300.jpg)

সিলেটের সবচেয়ে পুরোনো লাইব্রেরী, নিউনেশন লাইব্রেরীতে…

হ্যামিল্টন, কানাডা  
৮ এপ্রিল, ২০১৯ ইং।

★আমার জীবনের প্রথম অভিধান। এবারে গিয়ে ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলাম।★
