# স্বপ্ন।। ২২ (ব্লগারদের সম্মিলিত গল্প)

Author: হালিম নজরুল
Published: 2020-10-20
Category: গল্প
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%b2/

দৌড়াতে দৌড়াতে কোনমতে দরজার হাতল ধরে ট্রেনে উঠে পড়ল শফিক নহর। পেছনে হাপাতে হাপাতে আমিও কোনমতে উঠে পড়লাম। বামহাতে শক্ত করে ধরা ছিল শামীম চৌধুরীর লেখা “বাংলার পাখি বাঙালির পাখি” বইটি। তৌহিদ ভাই বললেন আগে এই ছিটটাতে বসে একটু জিড়িয়ে নিন ভাই। আমি বসতে না বসতেই উর্বশী ফোড়ন কেটে বলল “আগেই বলেছিলাম একটু আগেভাগে রওনা হউন, না হলে সময়মতো পৌঁছতে পারবেন না, কে শোনে কার কথা!” তার সাথে সুর মেলাল সুরাইয়া পারভীন। বন্যা আপাও কম যান না। তিনিও বলে উঠলেন “সুপায়ন দা সবসময়ই অলস টাইপের লোক, একবার ঘুমালে আর তাকে কে ঘুম থেকে ওঠায়!”

এতক্ষণ সব কথা শুনছিলেন আর মিটমিট করে হাসছিলেন জিসান ভাই। পাশ থেকে ছাইরাস হেলাল ভাই বলে উঠলেন “খুব তো মজা নিচ্ছেন ভাই, এবার আপনি কিছু বলেন।” জিসান ভাই মুহুর্তেই গুরুগম্ভীর হয়ে উঠে বললেন, “রাতে শোবার সময়ই বলেছিলাম সবাই আযানের আগে উঠে যাবেন, তা না হলে শামীম ভাইয়ের মামা দেখার গল্পের মতো হবে। ট্রেন ফেল করলে সুন্দরবন দেখা আর কপালে জুটবে না।” এবার  দাঁত কেলিয়ে হেসে ফয়জুল মহী বলে উঠল “তাই বলে কি একটু ঘুমুতেও দেবেন না! আমরা কি সারারাত জেগে থাকাটাই ভাল ছিল?”

বিজ্ঞ বিচারকের মত অনেকক্ষণ চুপ থেকে তৌহিদ ভাই বললেন এখন ওসব কথা থাক, বরং আমাদের পরবর্তী প্রোগ্রাম ঠিক করে ফেলি। দালান জাহান সায় দিয়ে বলল সেটাই বরং ভাল হবে। মমি ভাই ব্যাগ থেকে খাতা কলম বের করে বললেন, “কার কি প্রস্তাব আছে বলে ফেলেন। তা না হলে ট্রেন থেকে নেমে আর সময় পাওয়া যাবে না। তখন আবার দৌড় দিয়ে মংলার বাস ধরতে হবে।” সাবিনা ইয়াসমিন বলল “ঠিকই বলেছেন, এখনই মোক্ষম সময়, কার কি প্রস্তাব আছে আমরা বলে ফেলি।”

সুপর্ণা ফাল্গুনী বলল, “আমরা স্টেশনে নেমেই নাস্তা সেরে নিতে চাই।” কিন্তু ভেটো দিয়ে বসলেন বন্যা ইসলাম। তিনি বললেন সেটা ঠিক হবে না, বরং ট্রেনের ভেতর নাস্তা সেরে নিলেই ভাল হবে। আরজু মুক্তা ও সঞ্জয় মালাকারও তার পক্ষে ভোট দিলেন। বন্যা লিপি আপু বললেন ” ঠিকই বলেছেন। তাতে নাস্তাটাও আগেভাগে সেরে ফেলা যাবে, আবার সময়ও সাশ্রয় হবে।” এবার নাজমুল হুদা বলল, “আপনি তো সারাদিনই খাই খাই করেন, একদিন না খেলে কি হয় বলুন তো!”

ইসিয়াক ভাই রাসভারী টাইপের মানুষ। কিন্তু তিনি যে এত মজা করে কথা বলতে পারেন, তা এতক্ষণ কেউ টেরই পায়নি। তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, “চলুন আমরা বরং আগামী দু’দিন না খেয়ে কাটিয়ে দিই।” প্রদীপ চক্রবর্তী ও শামীনুল হক হীরা ভাই তার কথায় হো হো করে হেসে উঠলেন। তাদের হাসি শুনে প্রদীপ দা বললেন, “ট্রেনে কিন্তু আরও অনেক লোক রয়েছে, এত জোরে হাসলে তো অন্যরা বিরক্তও হতে পারেন।” আলমগীর সরকার লিটন ভাই সুযোগ পেয়ে বললেন, “এই জন্যই আমি আপনাকে জ্ঞানবাবু বলে ডাকি।” এইকথা শুনে সুরাইয়া নার্গিস আপু আরও জোরে হেসে উঠলেন। এতক্ষণ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন রেহানা বীথি আপু। এবার তিনি একটু এগিয়ে এলেন। একজন আদর্শ শিক্ষিকার মতো বলে উঠলেন, “ওসব কথা রেখে এবার কাজের কথায় আসুন, প্রোগ্রামটা ফাইনাল করুন।” রোকসানা খন্দকার রুকু আর খাদিজাতুল কুবরা আপু মাথা নেড়ে উনার কথায় সম্মতি জানালেন।

মাহবুবুর রহমান ভাই প্রস্তাব দিলেন ট্রেনে নাস্তা সেরে আমরা স্টেশনে নেমে যত তাড়াতাড়ি পারি মংলার বাস ধরব। বাস থেকে নামার আগেই কামরুল ইসলাম ও মজিবর রহমান ভাইকে ট্রলার রেডি রাখার জন্য ফোন দেব। উনারা হয়তো এতক্ষণে ট্রলার ঠিক করে রেখেছেন। ফোন করে আমরা এখনই বলে দেব যেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো কিনে রাখে। ট্রলার নিয়ে সোজা ডাইংমারি ফরেস্ট অফিসে যেতে হবে। ওখান থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও দু’তিন জন গার্ড নিয়ে আমরা হিরণপয়েন্টের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাব। খুরশীদ আলম বললেন, “অনুমতির জন্য ভাবতে হবে না, আমার মামা ওখানকার ফরেস্ট অফিসার, তাকে বলে রেখেছি অনুমতিপত্র রেডি রাখতে।”

রেজওয়ানা কবির আপা বললেন বনের মধ্যে গিয়ে কেউ যেন এলোমেলোভাবে ঘোরাফেরা না করেন। বনের মধ্যে বাঘ-ভল্লুক ছাড়াও জলদস্যু বা বনদস্যু ঘোরাফেরা করে। ওরা সুযোগ পেলেই কাউকে অপহরণ করে জিম্মি করতে পারে। এ কথা শুনে মুহাম্মদ মাসুদ ছু মন্তর ছু বলে ম্যাজিসিয়ানের ভঙ্গিমায় ব্যাগ থেকে একখানা বই বের করলেন। “এই দ্যাখেন বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনী লেখক কামাল উদ্দিন ভাইয়ের লেখা সাতরঙা ছবিযুক্ত বিখ্যাত বই ” বাংলার পথে প্রান্তরে”। এই বইখানা নিয়ে আমি গাইডের মত সামনে সামনে যাব, আর আপনারা আমার পেছনে পেছনে।” বিন্দুমাত্র দেরী না করে মুক্তা মৃণালিনী বললেন, তাহলে তো ভালোই হবে, বাঘমামা প্রথমে আপনাকেই নাগালে পেতে যাচ্ছে।

সমস্ত পরিকল্পনা করতে করতে ট্রেন প্রায় খুলনার কাছাকাছি চলে এসেছে। সুতরাং তড়িঘড়ি নাস্তা খেয়ে নিতে হবে। কিন্তু ইঞ্জা ভাই যে পরিমান খায়, তা কি দশ বিশ মিনিটে হয়। কিন্তু উপায় কি! হাতে সময় না থাকায় কোনমতে কটা নাকে মুখে দিয়ে নেমে যেতে হল। ট্রেন থেকে নেমেই হুড়মুড় করে বাসের জন্য দৌড়। উঠতে না উঠতেই বাস ছেড়ে দিল। কিন্তু কেউ খেয়াল করেনি মনি কাশফিতা তখনও বাসে ওঠেনি। সে দৌঁড়ে উঠার চেষ্টা করছে আর চিৎকার করছে। হঠাৎ তৌহিদ ভাই খেয়াল করলেন বিষয়টি। সিট থেকে উঠে দৌঁড়ে গেটে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। কোনমতে টেনেহিঁচড়ে তাকে ভিতরে উঠালেন। কিন্তু কাশফিতা আর হাত ছাড়ছে না। ত্রিস্তান শামসুল মওলা হৃদয় এই দৃশ্য দেখে গেয়ে উঠলেন “ছেড়ো না ছেড়ো না হাত, দেব না দেব না গো যেতে থাকো আমার পাশে……”। সবাই হো হো করে হেসে উঠল। কিন্তু একজন রাগে খিটিমিটি করছে। তৌহিদ ভাইয়ের পাশে বসা সুন্দরী রমণী শবনম মুস্তারী রাগে জ্বলতেছে। ততক্ষণে তৌহিদ ভাই বিষয়টি বুঝতে পেরে হাতটি ছেড়ে দিয়ে নিজ আসনে গিয়ে বসলেন।

বাসটি তখন দুরন্ত গতিতে ছুটছে। তবুও সাফায়েতুল ইসলাম ভাই উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ঘোষণা দিলেন এখন শুরু হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই মহারাজ ছাইরাস হেলালের একটি কবিতা গাইছেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী তোফায়েল হোসেন। তিনি তার পরিবেশনায় সবাইকে মুগ্ধ করে দিলেন। এরপর অপূর্ব কণ্ঠে গান নিয়ে হাজির হলেন আরজু মুক্তা আপু। ” পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম বন্ধুর ভাগ্য হইল না…..” গানে সবাই মাতোয়ারা হয়ে গেলেন। এভাবে একে একে সকলের পরিবেশনার মধ্যে দিয়েই আমরা পৌঁছে গেলাম মংলায়।

বাসে ওঠার মতই ট্রলারে উঠতে গিয়েও ঘটল আরেক বিপত্তি। ব্লগ সঞ্চালক ব্লগ চালানোর চমৎকার কৌশল জানলেও ভালমতো সাঁতার জানেন না। তাই ট্রলারে উঠতে গিয়ে তার গা কাঁপতে লাগল। ভাবীসাহেবা তার হাত ধরে উঠানোর চেষ্টা করলেও তিনি পা পিছলে পানির ভিতর পড়ে গেলেন। জিসান ভাই আর ছাইরাস হেলাল ভাই তাকে দৌঁড়ে গিয়ে উঠিয়ে আনলেন। ততক্ষণে তিনি কয়েক ঢোক নদীর জল গিলে ফেলেছেন। কাঁদো কাঁদো গলায় ভাবী তাকে বললেন, ” এই তোমার পেট এত উঁচু মনে হচ্ছে কেন, তুমি কি অনেক পানি খেয়ে ফেলেছ?” কিন্তু তিনি স্বাভাবিক থাকার ছল করে বললেন, “আরে না না, কই! আসলে আমার খুব তেষ্টা পেয়েছিল তো, তাই গলাটা একটু ভিজিয়ে নিতে গিয়েছিলাম।”

আর কিছুক্ষণ পরই আমরা পৌঁছে যাব ডাইংমারি ফরেস্ট অফিস। সুন্দরবন এলাকায় অলরেডি আমরা ঢুকে পড়েছি। কি অপরূপ দৃশ্য। নদী আর সবুজের অপার সোন্দর্যে সবাই মুগ্ধ। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া, গোলপাতার চমৎকার সাজানো বেহেস্তী বাগান যেন। শত শত পাখি, বানর আর হরিণদের দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এখানেই একটু নৌকা ভিড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছেন। তাই অনেকের অনুরোধে নৌকা ভিড়ানো হল। আমরা দুই একজন নেমে পড়লাম। সবাই মনের আনন্দে ছবি ওঠাতে লাগল। কতগুলো কৌতুহলী বানর আমাদের কাছাকাছি এসে আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগল। তৌহিদ ভাইয়ের খুব শখ হল তিনি বানরের সাথে ছবি উঠাবেন। তাই তিনি বানর সাহেবের হাত ধরে কাছে আনার চেষ্টা করলেন। আর অমনি বানরটি সপাৎ করে কানের উপর এক চড় বসিয়ে দিল। অপ্রস্তুতভাবে বেকায়দায় লেগে যাওয়ায় তৌহিদ ভাই অজ্ঞান হবার মত পড়ে গেলেন। বানরটি এবার হাত ও মুখ দিয়ে কানের কাছে দুই একটা ঘষা দিল। কামাল ভাই এগিয়ে গেলে বানরটি দূরে সরে গেল। ছাইরাস হেলাল ভাই হাত দিয়ে চোখে একটু পানি ছিঁটিয়ে দিতেই তৌহিদ ভাইয়ের সম্বিত ফিরে এল। শবনম মুস্তারী তোহিদ ভাইকে জিজ্ঞেস করল “বানরটি তোমার কানের কাছে কি বলিল?” তৌহিদ ভাই স্বাভাবিক ভাব দেখিয়ে বলল, “বানরটি বলিল আই লাভ ইউ”।

অতপর সবাইকে আবার নৌকায় ওঠার আহবান জানানো হল। আমরা সবাই নৌকায় উঠতে যাচ্ছি। এমন সময় আমার ফোনটি বেজে উঠল। এত রাতে হঠাৎ কে ফোন দিল! থতোমতো খেয়ে ফোনটি ধরতেই অপর পাশ থেকে বলে উঠলেন, “আমি ইঞ্জা বলছি হালিম ভাই, এখনো গল্পটি পোস্ট দিলেন না………!!!”

#### [**স্বপ্ন।। ২১ (ব্লগারদের সম্মিলিত গল্প)**](/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a8%e0%a5%a4%e0%a5%a4-%e0%a7%a8%e0%a7%a7-%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%ae/)
