# সূর্যাই ডোম ও রাম্বা আখ্যান-১৪ (ধারাবাহিক উপন্যাস)

Author: সাতকাহন
Published: 2014-07-05
Category: সাহিত্য
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b8%e0%a7%82%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%a1%e0%a7%8b%e0%a6%ae-%e0%a6%93-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%96%e0%a7%8d%e0%a6%af-13/

**ভাগাড়ে গরুর চামড়া ছিলা ও ভাগ-বাটোয়ারার রীতি**   
ভাগাড়ে রামু ও কৃষ্ণা গরুর চামড়া ছিলছে। পাশেই কয়েকটা গ্রিফন শকুন  চিৎকার করতে করতে মরা গরুর দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে। কৃষ্ণা শকুনের দিকে মাটির ঢেলা ছুঁরে মেরে হটিয়ে দেয় বারবার।

রামু: ঝরছে কর। কেউ দেখলিয়েছে ভাগ দিয়ে হই।

দূর থেকে ছুড়ি হাতে গরুর দিকে দৌড়ে আসতে থাকে কানু ও সিধু। হঠাৎ কৃষ্ণার চেখে কানু ও সিধুর দৌড়ে আসা চোখে পড়ে।

কৃষ্ণা: রামু দেখ দেখ কানু-সিধু চাক্কু হাতমে লেকে দোড়কে আয়োতে। ঝরছে কর।  
রামু: কা বলোতেরে। তাইতো। ঝরছে হাত চালা।

রামু ও কৃষ্ণা তাড়াতাড়ি চামড়া ছিলোছে। কানু ও সিধুও ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসছে। গরুর গায়ে চামড়া আর একটু খানি লেগে আছে। কানু ও সিধু একেবারে কাছকাছি।

কৃষ্ণা: টান দে রামু। জোরে… জয় মা কালি…।  
রামু: জয় মা কালি…।

কানু ও সিধু গরুকে লক্ষ করে ছুরি ছুড়ে মারে। ছুরি ছুটে চলছে…। আরেকটু পরেই হয়তো বিঁধে যাবে মৃত গরুর গায়ে। কিন্তু গরুর গায়ে গাঁথার আগেই কৃষ্ণা ও রামু টান মেরে গরুর গা থেকে চামড়া খুলে ধপাস করে মাটিতে পড়ে হাঁপাতে থাকে। ওরা চামড়া খুলে মাটিতে পড়ে যাবার সাথে সাথেই সাঁই সাঁই করে নগ্ন গরুটার শরীরে কানু ও সিধু’র ছুড়ে দেয়া ছুড়ি গাঁথে।

রামু: বাঁচলাম।  
কৃষ্ণা: কানু ও সিধু হাবা-গাবারে। লাভতো কুচ্ছু না ভা। ভাগতো না পায়। লে এগো বিড়ি খো। মনঠো আচ্ছা হো যায়ি।

কানু ও সিধু রাগে ফুঁসতে থাকে। গরুর গা থেকে ছুরি খুলে নিয়ে হাঁটা দেয়।

কানু: তর বিড়ি না লাগি।

একথা বলে নিজের গাঁট থেকে বের করে একটা বিড়ি ধরায় কানু, সিধুকে একটা বিড়ি দেয়। তারপর দ্রুত হাঁটা দেয়।  
কানু: চল সিধু।

**রামদাসের কোমড়ে পুলিশের দড়ি**  
রামদাসের বাড়ির উঠান। পরিচ্ছন্ন ছোট শনের ঘর। উঠানে ঢুকতেই সুদীর্ঘ একটা ছাতিম গাছ আকাশ ছোঁয় ছোঁয়। উঠানজুড়ে ঈষৎ সবুজ-শাদা ছাতিমের ফুলঝুরি। বিমলার উঠানজুড়ে ঝরে পড়া বাসি ফুল শলার ঝাড়ু দিয়ে ঝাড় দিচ্ছে। শলার আঘাতে উঠানের ধূলোর শরীরে সুনিপুণ আঁচড়ের অর্ধবৃত্তাকার চক্র আঁকা পড়ছে, এখানে-ওখানে। উঠছে খরা দিনের ধূলার ঘূর্ণি। রামদাস দাওয়ায় বসে বলিষ্ঠ হাতের মাংসল চওড়া তালুতে সিদ্ধি ডলছিলো বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে। এরই মধ্যে দারোগা বিশ্বজিৎ দু’জন কন্সটেবলসহ রামদাসের বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ায়।

বিশ্বজিৎ: রামদাস কে?

রামদাস দারোগাকে লক্ষ করে হাতের সিদ্ধি ফেলে দিয়ে দাওয়া থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ে। বিমলা ঝাড়ু হাতে নিয়ে তব্ধা মেরে তাকিয়ে থাকে।

রামদাস: আমি বাবু।  
বিশ্ব: কন্সটেবল কোমড়ে দড়ি লাগাও!  
কন্সটেবল: স্যার!  
বিমলা: কেনো বাবু আমার স্বামী কি করছে?

এরই মধ্যে কন্সটেবল রামদাসের কোমড়ে দড়ি লাগায়।

বিশ্ব: কি করছে থানায় গেলেই টের পাবা। কন্সটেবল, মুভ!  
কন্সটেবলস: স্যার!  
বিমলা: বাবু আমার স্বামী খুব সরল মানুষ ও কোনো অন্যায় করতে পারে না। আমার স্বামীরে ছাইড়া দেন বাবু!  
বিশ্ব: কন্সটেবল মুভ!

কন্সটেবল দড়ি ধরে টানতে থাকে। বিমলা উচ্চস্বরে মিনতি করে কাঁদে। সে কান্না ডোমপাড়ার মানুষ শোনে কিন্তু কেউই এগিয়ে আসে না। দুই-এক ঘরের মেয়েরা জানালা কিঞ্চিৎ ফাঁক করে ঘটনাটা এক নজর দেখে। তারপর খুব সুকৌশলে জানালা বন্ধ করে শব্দহীন।

কন্সটেবল: স্যার!  
বিমলা: বাবুগো আমি আপনার পায়ে পড়ি। আমার স্বামীরে মাফ কইরা দেন বাবু। আমার পোলা দুইডারে এতিম কইরেন না দারোগা বাবু।

বিমলা কাঁদতে কাঁদতে বিশ্বজিৎ-এর পায়ে লুটিয়ে পড়ে। বিশ্বজিৎ এক ঝটকায় পা ছাড়িয়ে নেয়। রামদাস ক্ষিপ্ত হয়ে মুখ খোলে।

রামদাস: বিমলা! ভগবান ছাড়া আর কারো পায়ে পড়তে নাই। ওঠ কইতাছি!

বিশ্ব:বাহ্ বাহ্, খুব চোট না! থানায় নিয়ে যাবার পর তোর চোট দেখবো। কন্সটেবল মুভ!

কন্সটেবল দুইজন: স্যার!  
রামদাস: বউ! পার্থ-গণেশরে দেইখ্যা রাখিস।

কন্সটেবল রামদাসের কোমড়ে বাঁধা দড়ি ধরে হিচড়ে টানতে থাকে। সামনে কুতুবপুর থানার বড় দারোগা বিশ্বজিৎ ঘোষ। রামদাসকে ধরে নিয়ে গেলে নিঃসঙ্গ উঠানে শূন্য বুঁকে একলা কাঁদে অসহায় বিমলা। সাত দিন পর একদিন ভর দুপুরে রামদাসের বাড়ির উঠানের মাটিতে পড়ে হামলে কাঁদে বিমলা।

বিমলা: হায় ভগবান!

বিমলার কান্না শুনে ডোমপাড়ার অনেক লোকজন জড়ো হয়। পাড়ার বউরা তাকে সান্ত্বনার স্পর্শে সামাল দেবার চেষ্টা করে। বিমলা একটু দম নিয়ে আবার কাঁদতে থাকে।

বিমলা: হায় ভগবান, আমার এতোবড় সর্বনাশ করলা ভগবান! আমি কি অপরাধ করছি ভগবান?  
রাজালালের বউ নলিনী তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

নলিনী: থাম থাম। ঠাণ্ডা হ।  
বিমলা: দিদি মনকে কেইসে বুঝ দেব্। হামার সোজা সরল আদমিঠোকে বিনা দোষমে দশ বছরকে জেল হোগা দিদি। হামরিকে অভি কে দেখি। হামার পার্থ, গণেশকে কে খায়ে দিহি। হামার সংসার, ভরা ঘর খালি হোগা দিদি।

কাঁদতে কাঁদতে বিমলা অজ্ঞান হয়ে দাঁত লেগে যায়। মাসুম বাচ্চা গণেশ আর পার্থ বিমলাকে জড়িয়ে ধরে অবুঝের মতো কাঁদে, ‘মা, মা তোর কা ভায়? আঁখ খোল মা।’

হঠাৎ বিপিন, কানু চিৎকার করে ওঠে, ‘জবা জল লেকে আও ঝটছে।’ পাশের বাড়ির জবা দৌড়ে ঘটিতে করে জল নিয়ে আসে। নলিনী বিমলার মুখে জলের ছিটা দেয়। তারপর আঁচলের চাবির গোছা থেকে একটা শক্ত চাবি বেছে নিয়ে বিমলার দাঁত খোলে। বিমলার দাঁত লাগা খুলতে নলিনীর চাবির গোছার সবচেয়ে শক্ত চাবিটিও বেঁকে যায়। একটা হেচকির মতো আওয়াজ করে বিমলা হুশ ফিরে পায়।

বিমলা: জানলে দিদি, যে হরিকে হামার আদমি নিজেকে ভাইয়েছে দেখোতরাহা উ হরি কোর্টমে যাকে হামার আদমিকে বিপক্ষে স্বাক্ষী দিয়েবাই দিদি!  
বিপিন: শালা বেঈমান! নিজেকে জাতকে সঙ্গে গাদ্দারী। ভগমান উকরেকে নরকমেও জাগা না দিহি।  
বিমলা: বিপিন হরি কাহে হামার একনা বড়কা সর্বনাশঠো করেছ্। হাম হরিকে কা ক্ষতি করেবানি। উকা হামার হাতকে পাকাউয়া খায়া নেইখে। হামার ঘরকে ভাত খায়া নেইখে। হরিকে মনমে তেনিও মায়া না লাগেছ  
বিপিন: ঠাণ্ডা হ বিমলা।  
বিমলা: ভাইয়া হাম অভি দুগো ছোট্ ছোট্ লেইকা ফেইকা লেকে কেকের কেনে যাইব্। হাম এই ছোটকা দুগো লেইকাকে কেইসে বাঁচব্। কেইসে নিজে বাঁচব্, কেইসে লেইকা দুগোকে মুমে খানা উঠাকে দেব ভাইয়া?  
কানু: রোয়া থামাও ভৌজি। হামনিককে চারগো খায়াসে তুলোগো চারগো খায়ে সখবো। হামনিককেই তোহারকে দেখব্।  
বিপিন: পার্থ আর গণেশ আজছে তিন বেলা হামনিককে ঘরমে খাই। তু ঘরমে যা ভৌজি। হরিকে হাম দেখলেব্। নলিনী তু ভৌজিকে ঘরে লেকে যা।

নলিনী বিমলাকে ধরে ঘরের দিকে নিয়ে যায়। বিপিন গণেশকে কাঁধে নেয় আর পার্থকে হাতে ধরে নিয়ে চলে। রাস্তায় যেতে যেতে ওরা কথা বলে টুকটাক।

বিপিন: চল কাকু। তুন্নিকে ছানাকে সন্দেশ খিয়ায়েব।  
পার্থ: বিপিন কাকু বাবু আর কুনদিন ছোড়া না পাই, তাইনা?  
বিপিন: আরে না নু পাগল। ভগমান কেনে প্রার্থনা করবে। একদিন সকালে নিনছে উঠকে দেখবে তর বাপ ঘরে চালা আনবায়।  
গণেশ: সাচ্চা!

বিপিন গণেশের কথার উত্তরে সত্য বলতে পারে না। চুপ মেরে যায়। অবুঝ শিশুদের মিথ্যা বলার যন্ত্রণায় বিপিনের চোখ ঘোলা হয়ে আসে জলে। লুকিয়ে কাঁদে বিপিন। কারণ সে জানে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে কিছু হয় না। যা হবার তা হয়ে গেছে। ভগবানের কাছে সহস্র প্রার্থনায় যাদের জাতের কলঙ্কই ঘোঁচেনি সেখানে বড়লোকদের ফাঁদ থেকে রামদাসকে মুক্ত করে ভগবান ছোট জাতের পক্ষ নেবে-এ অসম্ভব, এ হয় না। গাঁয়ের সদর রাস্তা ধরে বিপিন গণেশকে কাঁধে নিয়ে আর পার্থ’র হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশঃই দূরবর্তী হতে থাকে।

***(……………………………………….চলবে)***

**আগের পর্বগুলোর লিংক:**

১. [http://sonelablog.com/archives/12440](/archives/12440)

২. [http://sonelablog.com/archives/12475](/archives/12475)

৩. [http://sonelablog.com/archives/12531](/archives/12531)

৪. [http://sonelablog.com/archives/12788](/archives/12788)

৫. [http://sonelablog.com/archives/12859](/archives/12859)

৬. [http://sonelablog.com/archives/12944](/archives/12944)

৭. [http://sonelablog.com/archives/13003](/archives/13003)

৮. [http://sonelablog.com/archives/13126](/archives/13126)

৯. [http://sonelablog.com/archives/13269](/archives/13269)

১০. [http://sonelablog.com/archives/13617](/archives/13617)

১১. [http://sonelablog.com/archives/14926](/archives/14926)

১২. [http://sonelablog.com/archives/17125](/archives/17125)

১৩. [http://sonelablog.com/archives/17164](/archives/17164)
