# সাহিত্যের মহাসমূদ্রের একবিন্দু জল হবার স্বপ্ন

- Author: [জাকিয়া জেসমিন যূথী](https://sonelablog.com/author/zakia-juthi/)
- Published: 2020-04-21T06:23:27+00:00
- Updated: 2020-04-21T07:06:02+00:00
- Category: [একান্ত অনুভূতি](https://sonelablog.com/category/misc/personal/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%82%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%8f-2/

---

২  
প্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ এর বই তখন চুটিয়ে পড়তাম। পাড়ায় একটা বইয়ের পাঠাগার ছিলো। দু-টাকা করে ভাড়ায় পেতাম এক সপ্তাহ রাখা যেতো। তখনই প্রথম তিন গোয়েন্দা সিরিজ বইয়ে হাতেখড়ি! ঐ পাঠাগার থেকে তিন গোয়েন্দা ভলিউমই বেশি বেশি নেয়া হতো। দু’টাকায় একসাথে তিনটা গল্প পড়ার সৌভাগ্যটা মোটেই ছোট করে দেখার বিষয় ছিলো না তখন।  
.  
অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রেমের একটা গল্প পত্রিকায় চলে আসায় আগ্রহও যেমন বেড়ে গেলো লেখা প্রকাশের ভূতও বোধহয় তখনই চেপেছিলো। কিন্তু হাতে লিখে লিখে ভুল হলে বার বার কাটাকুটি করে করে গল্প লেখার ধৈর্য কুলাতো না। ফলে তা একসময় স্তিমিত হতে হতে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পাঠ থেমে যায়নি। নিয়মিত শরৎচন্দ্র, সুনীল, সমরেশ, জাফর ইকবাল, হুমায়ূন এবং তিন গোয়েন্দার সমস্ত পুরানা বইগুলো তিন ভাই-বোন টাকা জমিয়ে বিশাল প্যাকেটে কিনে নিয়ে এসে নাক ডুবিয়ে প্রতিযোগিতামূলকভাবে পড়ে শেষ করে আবার ছুটতাম নীলক্ষেতে। এভাবে নিজের ঘরের ভেতরেই একটা ছোটখাটো পাঠাগার গড়ে উঠতে থাকে। সারা ঘরময় বই আর বই। মাঝেমাঝে আম্মু বিরক্ত হয়ে যেত পুরানা বইয়ের অত্যাচারে। কাগজওয়ালার কাছে বিক্রি করে দিতে চাইতো। তখন সেখান থেকে কিছু কিছু বই ছোট ছোট খালাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিলাতে শুরু করি। ওদের মধ্যেও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগে ডুবিয়ে দেই আমিই। এখন ব্লগবন্ধুদের বইগুলো কিনি আমি। আর ওরা কিনে জাফর ইকবাল, হুমায়ুন এবং তিনগোয়েন্দা সিরিজগুলো। সবগুলো এখন হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রী বলে বই আদানপ্রদানেরও একটা সেতু বন্ধন তৈরী হয়ে গেছে।  
.  
এ তো গেলো বই পাঠের কথা। এবার আসি লেখার কথায়। দু’হাজার আট সাল। ইতিমধ্যে আমার মাস্টার্স এবং ফাইন আর্টস ডিপ্লোমা নেয়াও শেষ। চাকরির চেষ্টা করছি। ভাইয়াটাও তখন আমাদের কাছে নেই, থাকে দূর প্রবাসে। তার সাথে সারাদিনের কথাবার্তা জমতো অনেক। অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখা, ভাইয়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাই টেনে নিলো অনলাইনের দিকে। ফেসবুক একাউন্টও খোলা হলো। একেবারে শুরুতে শুধু কাছের পরিচিত আত্মীয় বন্ধুতে সীমাবদ্ধ থাকলেও বন্ধু সংখ্যা বৃদ্ধির ভুত চাপলো। তখন অপরিচিত অনেক বন্ধুকেই যোগ করে নিলাম ফেসবুক বন্ধুর তালিকায়। সেখান থেকেই পেয়ে গিয়েছিলাম মামুন ম আজিজ নাম এর একটা আইডিকে। তাকে চিনি না। চিনতাম না। কিন্তু মাঝেমাঝেই এক দু’টি বাংলা গল্প-কাহিনী বা কবিতা তার ফেসবুক ওয়ালে শোভা পেতে দেখে তাকে চ্যাটবক্সে নক করতাম-‘কিভাবে কোথায় আপনি বাংলা লিখছেন?’ তারই হাত ধরে অনলাইন বাংলা ব্লগ সামহোয়ারইনে একটা ছদ্মনিক খুলে বাংলা লেখার শুরু। প্রথম প্রথম খুব অসুবিধায় পড়ে যেতাম। কিভাবে লিখতে হয়, কিভাবে পোস্ট করতে হয় কিছুই বুঝছিনা। ইন্টারনেটে বসে থাকা একটা অচেনা মানুষ আমাকে কি করে অত সময় দিবে? কিভাবে কি করতে হবে এত কিছু বুঝিয়ে দেয়ার অত সময় কোথায় তার বা কোথায় কার? কারো জন্য কারো তেমন সময় নেই। তার ভেতরেই কখনো কখনো তাকে অতিষ্ট করে ছেড়েছি। ধীরে ধীরে একটা সময় সবকিছু বুঝে পাকা হয়ে গিয়েছি। কলেজ লাইফে রচিত কবিতা বা ছড়াগুলোই তখন একটি দুটি পোস্ট দিতে শুরু করি। মামুন ভাই এসে বলে যেতো ছন্দের গোলমাল হয়েছে। ছন্দ-উপমার মাধুর্য ছড়ানো শিখতে। সেজন্য আমাকে বিভিন্ন শিক্ষামূলক লিঙ্কও শেয়ার করতেন শেখার জন্য। বেশি বেশি কবিতা পাঠের আহবান করে যেত। কিন্তু আমি ছিলাম অলস আর যা বুঝাতেন বুঝতাম তার উলটো। বিরক্তও হোতাম! ‘কবি যেন উনি একলাই!’ মাঝে মাঝে তুমুল ঝগড়া করতাম। উনি বিনয়ী মানুষ কখনো বিরক্ত হতে দেখিনি। কখনো মিথ্যে চাপা ঝাড়া মন্তব্য ওনার কাছ থেকে পাইনি। পরিমিত কথা বলতেন। মাঝে মাঝে সুন্দর গঠনমূলক পরামর্শই থাকতো। কিন্তু তখনো আমি অন্ধ সাগরে হাবুডুবু খাই। যারা আমার লেখায় ভূয়সী প্রশংসা করে তাদেরই আমি মাথায় তুলে রাখি।  
.  
ফাঁকে ফাঁকে দু-একটা গল্প লেখার চেষ্টাও চালাতাম। মাঝে মাঝে আমার চিত্রকলা বিষয়ক পোস্ট দিতে দিতে ইষ্টিকুটুম বেশ জনপ্রিয় ব্লগার নিক হিসেবে পরিচিতিও পেয়ে গেলো। তখন আমার ফেসবুক বন্ধুতালিকায় অনেক ব্লগবন্ধু। কিন্তু আমার লেখার সংখ্যা বাড়লেও মান তো আর বাড়ে না। নিজের অবস্থান থেকে কিভাবে আরও উপরে উঠা যায় সেই পথে উত্তোরণের চেষ্টা মাথায় সবসময় খোঁচাতে থাকতো। আমার একটা প্লাটফরম দরকার, যেখানে দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে শিখবো। সেই প্লাটফর্ম সেই এস্কেলেটরটা আমি আর খুঁজে পাই না। বছর ঘুরে একুশে বইমেলা ও নতুন বইয়ের মহুয়া ঘ্রাণ বার্তাটা জানুয়ারীর শেষ দিক থেকে ব্লগে ফেসবুকের ওয়ালে প্রকাশিত হতে থাকতো আর আমার লেখক হয়ে উঠার সুপ্ত বাসনাটা তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো। কিন্তু আলসেমীতে লেখা হতো না তেমন। লেখক কিভাবে হয়ে উঠবো সেই পথ খুঁজে পেতাম না।  
.  
যাদের বই বেশি পড়তাম সেই সমরেশ, হুমায়ূন বা জাফর ইকবাল তো আর পাঠক আমি’র নাগালের ভেতরে বাস করতেন না; হঠাত পথেঘাটেও তাদের দেখা পাওয়া দুষ্কর বা ভাগ্যের ব্যাপার। মুঠোফোনের ব্যবহারে তখনো অত অভ্যস্ত নই। আর, ডাকপিয়নের মাধ্যমে প্রিয় লেখকের দ্বারে আমার একটি সামান্য বিষয়ে কথা বলার সুযোগ? অসম্ভবের কাছাকাছি ব্যাপার! সে রাস্তায় তাই কখনো চেষ্টাই করা হয়ে উঠেনি।  
.  
সামনে তখন আমি একজনকেই অনুসরণ করার মত পেলাম যাকে সামনে থেকে শরীরি অবয়বে দেখার সৌভাগ্য না হতে পারে কিন্তু তার রচিত সাহিত্যের কিছু কিছু অংশ তো অনলাইন সুবিধায় পড়ে নেবার সুযোগ পেয়েই গিয়েছি। বেছে নিলাম লেখক বা কবি হওয়ার স্বপ্নকথক একজন-মামুন ম আজিজ তথা পথিক নামের ব্লগ আইডিটাকে। এদিকে ২০০৯ বা ২০১০ এর একুশে বইমেলায় যাবো, ঢাকা শহরের জন্ম নেওয়া এই বান্দার তখনো টিএসসি বা বাংলা একাডেমী কোন দিকে কিভাবে যেতে হয় জানা নেই। এক পরিচিত ছোট বোন এবং ফাইন আর্টস এর ক্লাস-মেট প্রজ্ঞাকে অনুরোধ করলাম একুশে বইমেলায় নিয়ে যাওয়ার। তার সাথেই প্রথম টিএসসি বা বাংলা একাডেমী যাওয়া হয়। এরপরে নিজেরই পাখা গজিয়ে গেলো। এক সময় একাই যাতায়াত শুরু করলাম বইমেলাতে। একা একাই ঘুরে ঘুরে ব্লগারদের বই কেনা শুরু করলাম। কি লেখে আর কিভাবে ছাপার অক্ষরে আসে এইসব নতুন নতুন অপরিচিত লেখকদের বই সেটাই ছিলো গবেষণার মূল বিষয়। নিজের বইয়ের তাকের একটা অংশ ভরতে শুরু করলাম ব্লগ ও ফেসবুক বন্ধুদের নতুন প্রকাশিত বইগুলো দিয়ে। অনলাইন থেকে বইয়ের শিরোনাম আর প্রচ্ছদ নির্বাচন করে তালিকা তৈরী করে বইমেলায় ছুটতাম; সাধ ও সাধ্যের মিলনে তালিকার কিছু কিছু বই কিনে নিয়ে এসে নাক ডুবিয়ে পড়তাম আর স্বপ্ন দেখতাম একদিন এদের বইয়ের পাশে নিজেরও একটা বই বেরোবেই। দিনে দিনে বছরে বছরে ২০০৯-১০ হতে শুরু করে এই পর্যন্ত মামুন ম আজিজ ভাইয়ের প্রকাশিত সবগুলো বই সহ, আরও অনেক অনলাইনে পরিচিত লেখক-কবি বন্ধুর বইই সংগ্রহের ঝুলিতে জায়গা করে নিয়েছে।  
.  
নিজের ভেতরে লেখক হয়ে উঠার স্বপ্নটাও তখন হাঁটি হাঁটি পা পা করে আগের চেয়ে দ্রুত গতিতে এগুতে শুরু করেছে। একুশে বইমেলায় প্রকাশ পাওয়া কোন একটা বইতে নিজের নামটি দেখার প্রয়াস যদি মিলতো! সেই স্বপ্নটিই বাস্তব রুপ পেলো আমারব্লগডটকম এর উদ্দ্যোগে ‘আমার প্রকাশনী’ থেকে বাংলা ব্লগ দিবস ২০১১ স্মারক হিসেবে ‘আমার চিঠি’ সংকলনে। চিঠি লেখার নেশাটাও এক সময় খুউব ছিলো। আমি, আমার স্কুল-কলেজ জীবনের কয়েক বন্ধু লুসি, নার্গিস, শাপলা, বাবলী, সূচনা, কল্লোল, আফজাল, ঝুমুর এবং চাচাতো বোন জ্যোতি-সেতু বছরের বারো মাসের নানা উপলক্ষ্যে বিশাল বড় উপহার বাক্সের সাথে করে নতুন নতুন স্বাদে-গন্ধে-ধরনে নানান আকারের চিঠি আদান-প্রদান করতাম। ওই আদান-প্রদান একসময় বন্ধ হয়ে যায় মুঠোফোনের অগ্রযাত্রায়। সেই চিঠি সাহিত্য বই ‘আমার চিঠি’ বইটির নাম ধরেই পারিবারিক অঙ্গনে লেখালেখির মানুষ হিসেবে পরিচিতি হলো শুরু। জীবনের এই অংশে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি আপন ছোট দু’ভাইয়ের কাছে। আর সমবয়সী চাচাতো বোন প্লাস বন্ধু জ্যোতির কাছে। আমার যেকোন লেখাই সে উদার আগ্রহে সংগ্রহে রেখেছে। এর মধ্যে ই-বুকে লেখা প্রকাশের সাথেও জড়িত হতে শুরু করি। ই-বুক প্রকাশনা সংগঠন সৃজনের সম্পাদক সকাল রয়ও আমার লেখার গুরু। পেয়েছি অনেক উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা তার থেকেও। এখনো পাই। পেয়ে চলেছি। লেখা আমার যেমনই হোক ওনার ভূয়সী প্রশংসায় এগিয়ে যেতে পেরেছি। নতুনদের জন্য আসলে এটাও প্রয়োজনীয়-এগিয়ে যাওয়ার জন্য সামান্য একটু প্রশংসা প্রদান; সেটা সকাল রয় জানতেন বোধহয়। উনিও আমার একজন অনলাইন বন্ধুই। তার সাথে প্রথম চর্মচাক্ষুস সাক্ষাৎ মিলেছিলো গত বছর একুশে বইমেলায় ওনার রচিত ‘নীড় গল্প গুচ্ছ’ গল্প সংকলনটিতে লেখক অটোগ্রাফ সহ। সেই প্রথম জানলাম যে নাহ-মানুষটা মানুষই; শুধু একটা ভার্চুয়াল আইডি নয়!

[আগের পর্ব](https://sonelablog.com/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%82%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%8f%e0%a6%95/)

পরের পর্বে সমাপ্ত  
.  
জাকিয়া জেসমিন যূথী

[নোটঃ নক্ষত্র আয়োজিত সৃজনশীল ব্লগিং প্রতিযোগিতা ২০১৪ এর ৪র্থ পর্বে ১ম স্থান অধিকারী প্রবন্ধ। বইগুলোতে আরও অনেকের সাথে আমারও লেখা গল্প, কবিতা, চিঠি, বই আলোচনা, প্রবন্ধ প্রকাশিত]

---

Comments: 15 — https://sonelablog.com/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%82%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%8f-2/#comments
