# সাম্প্রতিক আন্দোলন, হতাশাগ্রস্থ প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ

Author: অপার্থিব
Published: 2019-03-23
Category: এদেশ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%86%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8b%e0%a6%b2%e0%a6%a8-%e0%a6%b9%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b6/

একটা ভবিষ্যৎ বাণী দিয়েই  শুরু করি।  আওয়ামী লীগ সরকারকে এই টার্মে অনেক বেশি অরাজনৈতিক আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হবে। এদেশের  রাষ্ট্র ক্ষমতায় কোন দল একবার থাকলেই যেখানে  জনগণ তার প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে সেখানে এই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে টানা তিনবার।  গত টার্মের শেষ বছরে তাকে দুটো অরাজনৈতিক আন্দোলনের  ( কোটা বিরোধী  ও নিরাপদ সড়ক চাই)  মুখোমুখি হতে  হয়েছে ।  এ বছর  প্রথম তিন মাসেই কিনা দুইটা! ( হাঁসের জুতা নির্বাচন পরবর্তী আন্দোলন (নামের জন্য কৃতজ্ঞতা- তৌহিদ) ও নিরাপদ সড়ক ভার্শন টু)।

প্রতিটা সফল আন্দোলন বা  রিভুলিউশনের একটা লাইফ সাইকেল থাকে যেটার সুচনা পর্বকে বলা হয় রিভল্ট অর্থাৎ  সমাজে বিদ্যমান কোন একটি সিষ্টেমের অন্যায় অবিচার কিংবা শোষনের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভুত ক্ষোভের তাৎক্ষনিক বিস্ফোরণ।  যেমন  ঢাকা শহরে কোথাও এক্সিডেন্ট ঘটলে  অনেক সময় বাস ভাংচুর করা হয় , এছাড়া বাস চালককে দেওয়া গণ পিটুনি, তাৎক্ষণিক মিছিল, মানব বন্ধন এগুলোকে আপনি রিভল্টের অংশ হিসেবে ধরে নিতে পারেন।  রিভুলিউশনের  পরের ষ্টেজে  থাকে থাকে এই  সব অন্যায়, অবিচার , শোষণ দূর করার লক্ষ্যে মানুষের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র যন্ত্রের প্রতি এক গুচ্ছ দাবী  দাওয়া এবং সেগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা জনসংযোগ- মিছিল মিটিং ইত্যাদি।  আর  রিভুলিউশনের শেষ ধাপটি হচ্ছে এক গুচ্ছ অভাব-অভিযোগ-দাবীর বদলে একটা জনদাবী তৈরী  হওয়া এবং তা থেকে গড়ে ওঠা দুর্বার আন্দোলন।  হ্যাঁ অথবা না, এক দফা এক দাবী, অমুক তুই কবে যাবি। স্মরণ করুন, ৬৬ তে বাঙ্গালীর ছয় দফা আন্দোলন একাত্তরে পরিণত হয়েছিল এক দফার স্বাধীনতার সংগ্রামে। কিন্ত  সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে সংঘটিত হওয়া এই সব অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর প্রধান দুর্বলতাটাই হচ্ছে , এই সব আন্দোলনে দাবী  ছিল অনেক, কিন্ত  সেগুলো একটি সুনির্দিষ্ট জনদাবী হিসেবে তৈরি হতে ব্যর্থ হয়েছে।  যেমন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে কেউ চাচ্ছে নিরাপদ সড়ক, কেউ চাচ্ছে এক সপ্তাহের মধ্যে ড্রাইভারের ফাঁসি আবার কেউ চাচ্ছে ফুট ওভার ব্রিজ ইত্যাদি।   আছে সুনির্দিষ্ট নেতৃত্বের দুর্বলতাও।   এই সব আন্দোলনগুলোতে বিএনপি জামায়াত নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বড়  একটা  অংশগ্রহন থাকলেও আন্দোলনকারীরা তাদের এই আন্দোলনকে সরকার বিরোধী আন্দোলন নয় বলে ব্রান্ডিং করার চেষ্টা  করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। যদিও সরকার বিরোধী নানা ক্ষোভ,   ছাত্রলীগ- যুব লীগের তান্ডবসহ  নানা বিষয় এই সব আন্দোলন গড়ে তুলতে প্রভাবকের ভুমিকা পালন করছে, তারপরও আন্দোলন কারীদের একটা বড় অংশই বিশ্বাস করে তাদের হাতে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের চেয়ে ভাল কোন  বিকল্প নেই। মুলত এটাই  এই সব অরাজনৈতিক আন্দোলন  দমাতে ভবিষ্যতে  আওয়ামী লীগকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে।

আন্দোলনের দ্বিতীয় দুর্বলতা হচ্ছে বাস্তব লক্ষ্যের অভাব।  নিরাপদ সড়ক চাই নামের সুন্দর একটা থিমকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন গড়ে উঠলেও বাস্তবতা হচ্ছে ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপটে নিরাপদ সড়ক আসলে ইম্পসিবল। এই অপরিকল্পিত শহরে প্রায় দুই কোটি লোক বাস করে, আবারো পড়ুন সংখ্যাটা দুই কোটি।  একটা আদর্শ শহরের মোট  আয়তনের  যেখানে ২৫ ভাগ রাস্তার জন্য বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন সেখানে ঢাকায় বরাদ্দ আছে মাত্র ৮ ভাগ। এই ৮ ভাগের একটা অংশ আবার আছে অবৈধ দখলের মধ্যে।  এই ৮ ভাগ রাস্তার  ৮০ ভাগ  আবার দখল করে রাখে প্রাইভেট কার  বা ব্যক্তিগত গাড়ি যেগুলোতে  আবার চলাচল করে ঢাকার মোট জনসংখ্যার মাত্র ৮থেকে  ১০ভাগ মানুষ! আসলে সমস্যাটা এতটাই মাল্টি ডাইমেনশনাল যে সমাধান করার সাধ্য কার!   অনেকের মনেই  প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন ঢাকা শহরে এত ফিটনেস বিহীন গাড়ি, কেন এত অবৈধ লাইসেন্সধারী ড্রাইভার, এর উত্তরটা হচ্ছে  প্রধানত আমাদের প্রয়োজন। আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় দক্ষ ড্রাইভারের অভাব বলেই অদক্ষদের আবির্ভাব। চিন্তা করুন এই দুই কোটি মানুষের শহরে প্রতিদিন চলাচলের জন্য কত ড্রাইভার প্রয়োজন। পেশা হিসেবে ড্রাইভিংকে  আমাদের সমাজে খুব একটা সম্মানের চোখে দেখা হয় না। দেশের শিক্ষিত তরুণদের একটা বড় অংশ বেকার হলেও আমরা ড্রাইভিংকে তাদের কাছে সম্মানজনক পেশা হিসেবে তুলে ধরতে পারছি না । ইটজ অল এবাউট ডিমান্ড সাপ্লাই মেকানিজম। বাজারে চাহিদার তুলনায় পণ্যের যোগান যদি  কম হয় এবং সেই সঙ্গে ব্যবস্থাপনাও যদি দুর্নীতি গ্রস্থ হয় তাহলে ফাঁক তাল দিয়ে মানহীন পণ্য ঢুকে পড়া খুবই স্বাভাবিক। আর যারা ড্রাইভার তাদের পরিচয়টাও একটু জানা দরকার, এই ড্রাইভারদের অধিকাংশই ক্যারিয়ার শুরু করেছে শিশু শ্রমিক হিসেবে, যে বয়সে আমাদের ভদ্র সমাজের  শিশুরা স্কুলে যায় সে বয়সে এরা উত্তরা টূ সদরঘাট লোকাল বাসের হেল্পার হিসেবে জীবন পার করেছে।  মোটামুটি বেসিক মানের যে শিক্ষা কিংবা সুস্থ মানসিক বিকাশের সুযোগ এর কোনটাই তারা পায়নি। একটা  ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে ভোর থেকে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত মানে প্রায় ১৬-১৭ ঘন্টা।  গাড়ি নিয়ে ঢাকার রাস্তায় বাস ড্রাইভারদের তাড়াহুড়োর প্রধান কারনটা যে অর্থনৈতিক এটাও অধিকাংশ মানুষ বুঝতে  অক্ষম।  কয়েক বছর আগেও একটা ড্রাইভার যদি দিনে গড়ে ১০টা ট্রিপ দিতে পারতো , ঢাকার ক্রম বর্ধমান ট্রাফিক জ্যামের কারনে এখন সে দিতে পারছে গড়ে ৬ থেকে ৭ টা। এই ৬-৭টা ট্রিপ দিয়েই তাকে বাস মালিকের জমা, পেট্রোল খরচ, শ্রমিক সংগঠন, পুলিশ সহ বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিয়ে নিজের জন্য কিছু  রাখতে হয়।   কে না চায় ঘরে কালার টিভি, ফ্রিজ,  বউ/গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে পার্কে বসে ফুচকা  খাওয়ার জন্য পকেটে  বাড়তি কিছু টাকা !   আমি আপনি যদি চাইতে পারি তাহলে ওরা পারবে না কেন?   আগেই বলেছি সমস্যাটা মাল্টি ডাইমেনশনাল, সমাধান সহজ নয়।

আন্দোলনের তৃতীয় দুর্বলতাটাকে আধুনিক বাঙ্গালী সমাজের  এক ধরনের মনস্তাত্বিক সংকট বলা যায়। বাঙ্গালীর ইগো শক্তিশালী। ইতিহাস বলে জোর করে আরোপিত কোন কিছুকেই তারা কোনকালই  গ্রহন করেনি। বাঙ্গালীর অনুভুতিও প্রখর, তাদের অনুভুতি খুব সামান্যতেই আঘাত প্রাপ্ত হয়। হাঁটুর বয়সী পোলাপান তার অনেক শখ আহ্লাদে কেনা গাড়ির লাইসেন্স চেক করছে এটা দীর্ঘমেয়াদে তার পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন, যার লাইসেন্স নেই তার পক্ষেও কঠিন, এমনকি যার লাইসেন্স আছে তার পক্ষেও কঠিন। এক দুই দিন হলে ঠিক আছে, এর বেশি হলে কঠিন। এর পাশাপাশি যোগ করুন  আন্দোলনের ফলে সৃষ্টি হওয়া গণপরিবহন সংকট। নিরাপদ সড়ক চাই, দেশ সংস্কার কাজ চলছে  টাইপের স্লোগান গুলো বাঙ্গালীর আবেগকে নাড়া দিলেও, এই আন্দোলনের ইনিশিয়াল ইম্প্যাক্ট তার ব্যক্তি জীবনে বিরক্তির উদ্রেক করেছে, তৈরী হয়েছে ব্যক্তি স্বার্থ বনাম সামাজিক স্বার্থের সংকট। পুজিবাদী সমাজে   বেড়ে উঠা মানূষের মনস্তাত্বিক গঠনে ব্যক্তি স্বার্থই থাকবে সবার আগে।

তাহলে ভবিষ্যতে  বাংলাদেশে সংঘটিত হতে যাওয়া অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর ভবিষ্যৎ কি?   সরকার মানুষের আবেগের  তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ তথা রিভল্ট ষ্টেজকে সহ্য করবে,   তবে আন্দোলন এর পরের  ষ্টেজে যাওয়া মাত্রই যাবতীয় দাবি দাওয়া গুলোর মধ্যে যেগুলো জনপ্রিয় এবং সহজে বাস্তবায়ন যোগ্য সেগুলো মেনে নেবে এবং একই সঙ্গে শক্তি প্রয়োগ করে দমন করারও চেষ্টা  করবে। সরকার চাইবে তরুণদের ক্ষোভ -বিক্ষোভ প্রতিবাদের কেন্দ্রস্থল  ঢাকার রাস্তা না হয়ে হোক ফেসবুকের নীল দুনিয়া।  তারা বিপ্লব করুক সেখানে যত ইচ্ছা, সেটা বেগুনের মুল্য বৃদ্ধি নিয়েও হতে পারে কিংবা হতে পারে নায়লা নাইম-সালমান মোক্তাদির, ডাজন্ট ম্যাটার!  এভাবেই অরাজনৈতিক আন্দোলন গুলোকে   কিছুটা পূরণ আর কিছুটা দমনের  মধ্য দিয়েই  কাউন্টার করাই হবে সরকারের রাজনৈতিক কৌশল।  এর প্রতিক্রিয়াও হতে পারে বহুমাত্রিক। সমাজে  বিদ্যমান নানা বৈষম্য ও অবিচারের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠা তরুণ প্রজন্ম ( যাদের একটা বড় অংশ আবার বেকারত্বের দুর্দশা গ্রস্থ) যখন দেখবে তার ন্যায্য দাবির আন্দোলনগুলো দিন শেষে আসলে ব্যর্থ হচ্ছে  তখন তাদের মধ্যে নৈরাশ্য ভর করতে পারে-  এদেশের আর  কোন কিছুই ঠিক হবে না, এদেশে থেকে আসলে কোন লাভ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।  তরুণ প্রজন্ম,  যারা কিনা এখন ও আগামীতে দেশের মোট  কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করবে,  তাদের মধ্যে যদি নৈরাশ্য ভর করে তবে সেটা হবে দেশের  অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা। মনে রাখবেন এই টার্মে  আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক স্লোগানটাই হচ্ছে উন্নয়ন, আর উন্নয়নের প্রধান শর্তই হচ্ছে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ও তাদের জব সেটিসফেকশন। অতি দুর্বল গণতন্ত্রের এই দেশে  একটা হতাশা গ্রস্থ তরুণ প্রজন্মকে মোটিভেট করে দেশের  ক্রম বর্ধমান অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করাই হবে  ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
