# শিক্ষাগুরুর মর্যাদা

- Author: [রোকসানা খন্দকার রুকু](https://sonelablog.com/author/ruku007/)
- Published: 2021-10-01T13:27:40+00:00
- Updated: 2021-10-01T16:56:02+00:00
- Category: [সমসাময়িক](https://sonelablog.com/category/current_affairs/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%be/

---

বাদশাহ আলমগীর-  
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।  
একদা প্রভাতে গিয়া  
দেখেন বাদশাহ- শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া  
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে  
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,  
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি  
ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি।

শিক্ষক মৌলভী  
ভাবিলেন আজি নিস্তার নাহি, যায় বুঝি তার সবি।  
দিল্লীপতির পুত্রের করে  
লইয়াছে পানি চরণের পরে,  
স্পর্ধার কাজ হেন অপরাধ কে করেছে কোন্ কালে!  
ভাবিতে ভাবিতে চিন্তার রেখা দেখা দিল তার ভালে।

হঠাৎ কি ভাবি উঠি  
কহিলেন, আমি ভয় করি না’ক, যায় যাবে শির টুটি,  
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার  
দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার,  
ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল,  
বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল!!!!-

কবিতাটি আমাদের পাঠ্য ছিলো। আমরা মনোযোগ দিয়ে পড়েছি এবং জেনেছি শিক্ষক সম্মানের, শ্রদ্ধার। তবে আজকাল আর শিক্ষকের এতো স্পর্ধা নেই। পায়ে পানি কেন সামান্য পান থেকে চুন খসলেই শিক্ষকের পাওনা অনশন, অবরোধ, মিছিল, পদত্যাগ, লাণ্চনা এমনকি খুনও হতে দেখা যায়।

কদিন আগে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষিকা ফারহানা ইয়াসমিন ক্লাসে চুল বড় রাখার জন্য শিক্ষার্থীদের বকাঝকা করেন। তারা হয়তো তার কথা শোনেনি তাই পরীক্ষার আগে তিনি শাস্তিস্বরুপ মুঠি দিয়ে ধরা যায় এমন বড় চুল কেটে দিয়েছেন।

সি সি ফুটেজে তাঁকে কাঁচি হাতে হাঁটতে দেখা গেছে কিন্তু চুল কাটতে দেখা যায়নি। তবে শিক্ষার্থীদের দাবী করে তিনি এতো এবরো- থেবরো করে চুল কেটেছেন যে লজ্জায় তারা পরীক্ষা দিতে আস্তে পারছিলো না।এবং সে লজ্জা ঢাকতে মাথা ন্যাডা করে ফেসবুকে পোষ্ট করে তবেই শান্তি পেয়েছে।

তার সহকর্মী রবীন্দ্র অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান লায়লা ফেরদৌস হিমেল প্রমাণ পেয়েছেন যে তিনি এ কাজ করেছেন। ১৪ ছাত্রের চুল কেটে দেওয়া তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে এবং এ কমিটির প্রধান লায়লা ফেরদৌস হিমেল।

এরপর শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে আন্দোলন শুরু করলে মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় অভিযুক্ত শিক্ষিকা ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন তার দায়িত্বে থাকা তিনটি পদ (সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান, সহকারী প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য) থেকে স্থায়ীভাবে পদত্যাগ করেন। তবুও শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশনেই বহাল আছে এবং তাদের দাবী তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদ থেকেই স্থায়ীভাবে বহিস্কার করা হোক।

তিনি বহিস্কারও হবেন হয়তো কারন কথায় আছে- “ আমরা যে সরিষা দিয়ে ভূত তাড়াই সেই সরিষাতেই থাকে ভূত।” আর এমন ভূত আশেপাশে থাকলে তো পদত্যাগ করতেই হবে।

আমি নিজে যখন শিক্ষার্থী ছিলাম কোনমতেই আরবি সুরা মুখস্থ থাকতো না। সেই ক্লাস ফোরে পড়ার সময় স্যার আমাকে প্রচুর পেটালেন। তখনকার শিক্ষকরা কিন্তু বেত দিয়ে পেটাতেন। আমার পায়ে হাঁটুর কাছে অনেকখানি কেটে রক্ত বেরুলো। ভাইয়ার দামী ফাউন্ডেন পেনটা নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটি হাতে ছিলো আমি হাত দিয়ে হয়তো নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম তাই সেটিও বেতের নিচে পরে ফেটে- ভেঙ্গে গেলো। বাড়িতে এসে বলার সাধ্য নেই, তবুও কলমের বিচারে ধরা পড়ে গেলাম। পড়া না পারার জন্য এমন পিটুনি কম হয়েছে এ কথা বলে মা আরও বেদম পিটুনি শুরু করে দিলো।

দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় কিছুতেই ‘টেনস’ বুঝি না। ইংরেজি স্যার আমাকে প্রায়ই ডেস্কের উপর হাটু মুডে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। পরবর্তীতে ইংরেজিতেই আমার সবচেয়ে বেশি নম্বর ছিলো।

অনার্সে পড়ার সময় পাশের কুডিয়ে পাওয়া সাদা চিরকুটটি হাতে নেয়া মাত্রই স্যার কি ওটা, কোথায় পেলে, নকল করছো কেন? একগাদা প্রশ্ন করে খাতা নিয়ে চলে গেলেন। আমি বলারও সুযোগ পেলাম না স্যার ওটা আমার নয় এবং সাদা। দুবারের বেশি কথা বললে এক্সফেল্ড করে দিতেন সেই ভয়ে বেডিয়ে এসেছিলাম।

সে সময় আমরা কখনোই বাবা- মাকে এসে শিক্ষকদের নামে নালিশ করিনি কিংবা অনশন ধর্মঘট, পদত্যাগ দাবী করার মনমানসিকতা রাখিনি। আর বাবা- মা বোধহয় শোনার সাথেই পিঠের ছাল তুলে ফেলতো। জীবনে কি হয়েছি জানিনা তবে মনে হয় নিজেকে একজন পরিপূর্ন মানুষ বলা যায়।

আমি যখন শিক্ষক, নার্সারীর এক শিক্ষার্থীর মা এসে অফিসে কমপ্লেইন করেছে এবং আমাকেও এসে বললো- মিস আপনি এ কাজটা ঠিক করেননি। আমার ছেলের ভীষন প্রেসটিজ, সে এসব পছন্দ করে না।

আমি কি করেছি; পড়া না পারায় তার বাচ্চার কান টেনে মজা করেছিলাম। নার্সারীর বাচ্চার ভীষন প্রেসটিজ এ মা চলে এসেছেন।

আমাদের বাবা- মা হয়তো বলতেন সে জানে আর তার শিক্ষক জানে। আমি কি এতোসব বুঝি? কোনদিন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যাবার প্রয়োজন হয়নি তাদের।

কিছুদিন আগে ডিগ্রি পরীক্ষায় এক শিক্ষার্থী অন্যজনের দেখে দেখে কপি করছিলো। আমি তাকে বেশ কয়েকবার সাবধান করার পরও সে বিরত হলো না, আমার সামনেই একই কাজ করতে লাগলো। আমি বাধ্য হয়ে অপরজনকে সরিয়ে অন্য সিটে বসালাম। তার বন্ধুবরকে সরানোর অপরাধে আমাকে সবার সামনেই বললো- ম্যাম আপনি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছেন। জানেন না করোনায় আমাদের পড়াশুনা হয়নি। এরকম করলে পাশ করতে পারবো?

বলতে মন চাইলো করোনায় খাওয়া, হাগা-মোতা, বন্ধু- বান্ধবী, বারোটা পর্যন্ত রাস্তার মোডে আড্ডা, রাতভর চ্যাটিং সবই যদি তোর ঠিক ছিলো তাহলে শুধু পড়াশুনা কেন বন্ধ ছিলো বা হয়নি?

আমি কিছু না বলে আমার কলিগ সহোদরকে বললাম সেই ছাত্রের খাতাটা কিছুক্ষনের জন্য সিগনেচার না করতে, সে ভয়ে থাকুক। তাতে আর ডিসটার্ব করবে না, পরে সিগনেচার করে দেয়া হবে। তিনি আমার অনুরোধ রাখেননি। শিক্ষার্থী বের হয়ে যাওয়ার সময় এমন একটা ভাব করলো- আপনার খাওয়া নাই ম্যাম!!!

এখনকার ছাত্রদের মাথায় টিকনি, কেউ কেউ মেয়েদের ব্যান্ড লাগিয়ে আসে, চুলে কালার, পেছনে ঝুটি, চুল কাটতে বললে বলে তিনি ব্যান্ড সংগীত করেন, মুখে দাড়ি তাও বিভিন্ন স্ট্যাইলের, কারও দাঁড়িতেও ব্যান্ড লাগানো, প্যান্ট যেখানে সেখানে ফাটা এবং তা কোনমতে বেল্ট দিয়ে নিতম্বে আটকে থাকে যে কোন সময় খুলে পড়তে পারে। চুইঙ্গাম চাবাতে চাবাতে পরীক্ষা দেয়, না হলে এঙ্জাইটিতে ভোগে। বিভিন্ন কালারের বাইক, গাড়িতে আসে এবং শিক্ষকদের হর্ন দিয়ে সরিয়ে চলে যায়। এসবই এখন স্বাভাবিক, যা শিক্ষকদের মানতে হয়। তবে এসব সবাই নিতে পারেন না।

কিছু প্রবীন শিক্ষককে দেখে মনে হয় তারা যৌবনে আগুন ছিলেন কিন্তু এখন তাঁদের সামনেই হাজারো অন্যায় হলেও তাঁরা চুপ মেরে দ্যাখেন। একদিন হয়তো তাঁরাও প্রতিবাদ করে, প্রতিরোধের মুখে চুপসে গিয়েছিলেন। পাশে কেউ দাঁড়ায়নি।

 

তবে কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের এসব আতলামী নিতে পারেন। আর পারেন বলেই আজকাল আর সেই শিক্ষক নেই। একজনের জন্য ভালোজনও ভালো থাকতে পারেন না। শিক্ষার্থীদের কাছে টাকা বিনিময়,দলীয় প্রশ্রয়, প্রশ্ন ফাঁস সহ নানারকম কাজ করে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় দলাদলি। শিক্ষকরা সবাই রাজনীতি করি, যা করা উচিত নয়। ফলে আমরা স্বার্থপর হয়ে উঠি ও একে অপরের ক্ষতি করতে চাই। সেই আশি- নব্বই দশকের শিক্ষকদের মতো একসাথে একই টেবিলে চায়ের পরিবেশ আর নেই। শিক্ষক পরিষদে অবশ্যই দুটি দল থাকে। সেখানে একদল বসলে অন্যদল বসে না। এবং অন্যদের সমালোচনা, কুৎসা রটাতে মহা ব্যস্ত সময় পার করি। তাই শিক্ষার্থীদের লেলিয়ে দিয়ে কিভাবে অন্যদনকে হায় করা যায়, ছোট করা যায় কিংবা চাকুরীচ্যুত করা যায় তা বেশ ভালোই পারি।

শিক্ষাঙ্গন থেকে এসব দুর হয়ে যেদিন শিক্ষকরা এক হবে, একেঅপরের পাশে দাঁড়াবে, শিক্ষার পরিবেশ কঠোরতর হবে ।সেদিন আর শিক্ষার্থীর এসব আতলামী ঠাঁই পাবেনা।

---

Comments: 22 — https://sonelablog.com/%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%be/#comments
