# লোকগল্পে বাংলাদেশ।

- Author: [রিতু জাহান](https://sonelablog.com/author/mounata/)
- Published: 2018-02-01T19:56:40+00:00
- Updated: 2018-02-01T20:00:18+00:00
- Category: [বিবিধ](https://sonelablog.com/category/misc/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b2%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a5%a4/

---

আমার লোককাহিনীর উপর দুর্বলতা সব সময়ই। কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানকার মানুষের কাছ থেকে সে যায়গার লোকগল্প শুনতে ভাল লাগে। ভাবছি এই ভাষার মাসে লোকগল্প নিয়েই শুরু করি। এবার শেরপুরে গিয়েছিলাম বেড়াতে। তাই আজ প্রথম শেরপুর নিয়েই শুরু করি।  
‘শেরপুর’  
গাড়ো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত শেরপুর জেলা। প্রাচীনকালে শেরপুর কামরূপ রাজ্যের অংশ ছিল। এটাকে রাজ্যও বলা হয়। তখন এর রাজধানি ছিল গরজরিপা। বাংলায় নবাবী আমলে শেরপুর দশকাহানিয়া বাজু নামে পরিচিত ছিলো। আইন-ই-আকবরি গন্থে আবুল ফজল এলাকাটির নাম দশকাহানিয় উল্লেখ করেছেন।কথিত হয়, জামলপুর ও শেরপুরের মধ্যস্থানে একটি জলমগ্ন বিল ছিল। এটি পারাপারের ভাড়া ছিল দশ কাহন কড়ি। দশকাহন কড়ি হতে এলাকাটি দশকাহানিয়া পরিচিতি লাভ করে। সপ্তদশ শতকের প্রথমভাগে ভাওয়ালের গাজীগণ ঈসা খাঁর বংশধরগণের নিকট হতে ভাওয়ালের গাজী শের আলী গাজী দশকাহানিয়া বাজু দখল করে এখানে স্বাধীন রাজত্ব শুরু করেন। তিনি ছিলেন তিনি ছিলেন প্রজাবৎসল। শেরপুরের একটি বৃহদাংশের প্রাচীন নাম ছিল গড়জরিপা। এটি ছিল একসময় শেরপুর অঞ্চলের শাসনকেন্দ্র। হুমায়ুন শাহ আমীর হোসেন সৈন্য সামন্ত নিয়ে গড়জরিপার জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য আসেন। জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে একজন দরবেশকে দেখতে পান। যার অর্ধাঙ্গ মাটিতে পুঁতে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন। আমীর হোসেন দরবেশকে স্থান ত্যাগ করার অনুরোধ করলে, দরবেশ স্থান ত্যাগ করার শর্তস্বরুপ তার নামানুসারে একটি গড় নির্মাণ করতে বলেন। শাহ আমীর হোসেন রাজী হন। তিনি একটি গড় নির্মাণ করেন। যার নাম রাখা হয় গড়জরিপা। তার নামা তার নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম দেন শেরপুর। এরপর তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। শেরপুর রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শের আলী গাজী বর্তমানে গাজীর খামার ইউনিয়নের গিদ্দা পাড়ায় চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। প্রতিবছর পহেলা ফাল্গুন এখানে ওরশ হয়। কংস নদীর তীরবর্তী লেটিরকান্দা গ্রামে গিয়ে পাগল বাড়ি বললেই যে কেউ দেখিয়ে দিবে। এই পাগলবাড়িতে গেলে আপনারা একধরনের আধ্যাত্নিক গান শুনকে পাবেন যা টিপু পাগলের গান নামে পরিচিত। ইংরেজ শাসনরে বিরুদ্ধে ফকির আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে শেরপুরকে ইংরেজমুক্ত করা এই টিপুকে আমরা ভুলতে বসেছি। ভুলতে বসেছি তার রচিত হাজার লোকগান। তার এই গানগুলো পাদপ্রদীপের আলোয় আনতে পারলে লালনের গান, শাহ্ আব্দুল করিমের গানের মতো জনপ্রিয় হতো। নেতাজী শুভাষ চন্দ্র বসু থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান শেরপুর ভ্রমণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন শেরপুর ভ্রমণ করেন তখন দূর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডার এর কর্ণধার শ্রী কানাই লাল ঘোষ তাকে ছানার পায়েস খেতে দেন। তিনি এই পায়েস খেয়ে এর অনেক প্রশংসা করেন। ছানার পায়েস শেরপুরকে আলাদাভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।  
শেরপুরে অবাক হওয়ার মতো অনেক কথার মধ্যে বড় কথা হলো এখানকার ২০০ বছর ধরে চলে আসা চরনতলা মেলা। ২২শে এপ্রিল বৈশাখ মাসের কৃষ্ণপক্ষের প্রথম মঙ্গলবার এই মেলা হয়। এ মেলার বর্তমান সভাপতি পিযূস কুমার মোদক। এটি ঝিনাইগাতি উপজেলাতে হয়ে থাকে। মেঘালয় রাজ্য থেকে শুরু করে দূর দূরান্ত থেকে অনেক জেলার মানুষ এখানে সমবেত হয়।  
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত তার ‘Sultana Dream’ গ্রন্থে যে সমাজের কথা স্বপ্নে দেখেছিলেন সেই মাতৃতান্ত্রিক সমাজ গারোদের মাঝে দেখা যায়। গারোদের বৈচিত্রময় সংস্কৃতি অবাক করার মতো।  
শেরপুরে কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন আছে তার মধ্যে ‘বারোদুয়ারি’ মসজিদটি অন্যতম। আমরা বারোদুয়ারি’ মসজিদটি দেখে ফেরার পথে জরিপ শাহের মাজার দেখতে গেলাম। আমার মাজার নিয়ে কখনোই কোনো আগ্রহ নেই। অর্থাৎ মানত বা এই টাইপের কিছু। কারণ, ইসলামের শরিয়ত মতে মাজারে মানত, শেজদা করা হারাম। আমি যাই ইতিহাস খুঁজতে। পেয়েও গেলাম জনমুখি ইতিহাস। জনমুখি এজন্য বললাম কারণ, এর কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। বা বাস্তব সত্য আছে কিনা তাও জানি না। তবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যে কথা বা গল্প চলে আসছে তাই তো লোকগল্প তাই না! যাইহোক, এ মাজারে একটি শীলপাটা দেখলাম যা কিনা কেউ উঠাতে পারে না। আমি উঠানোর চেষ্টা করিনি। এখানে অনেক পুরাতন একটি বড় পাথরখন্ড দেখলাম। কথিত আছে এটি জমজম কূপের পাথর। তাই এখানকার মানুষ তাদের বিশ্বাসমতে পাথরটিতে পানিঢেলে সে পানি পান করে। মাজারে যার কবর আছে তার এক অন্যরকম কাহিনী। এখানে যিনি শুয়ে আছেন তিনি এক পীর ছিলেন। তার বাড়ি ছিলো ভারতে। তিনি ইসলাম প্রচার করতে করতে এখানে আসেন। তিনি অনেকদিনযাবত বাড়ি না ফেরার কারনে তার মা তাকে এক বার্তাবাহকের কাছে খবর পাঠায় যে সে যেনো তার মায়ের সাথে একবার হলেও দেখা করে। পীর সাহেব বার্তাবাহককে একটি পুঁটলি ধরিয়ে দেন। তাতে কি আছে তা যেনো শুধু তার মায়ই খুলে দেখে অন্যথায় বিপদ হয়ে যাবে। বার্তাবাহক কৌতুহলবশত পুঁটলিটি খুলে ফেলে। সে পুঁটলিরর ভিতর একটি বাটি দেখতে পায়। আর তাতে সে পীর সাহেবের শরীরটি দেখতে পায়। ওমনি পীর সাহেবের মাথা ছাড়া শরীরটি তার সামনে হাজির হয়। আর শুধু মাথাটি তার মায়ের কাছে চলে যায়। আসলে মূল কথাটা ছিল, তার মা যখন পুঁটলিটি খুলতো তখন পীরসাহেব তার মায়ের সামনে হাজির হতো। কিন্তু বার্তাবাহক তার আগেই পুঁটুলিটি খুলে ফেলে আর পুরা শরীর দেখার আগেই সে তা বন্ধ করে দেয়। তাই তার মাথাছাড়া শরীরটির কবর এখানে আর মাথাটা ওখানে।  
এখান থেকে কিছুদূর গিয়েই দেখতে পেলাম ‘ কালিদাস সাগর’। এই কালিদাস সাগরকে দেখলে এখন একটা লম্বা শান্ত জলাশয়ই মনে হবে। দেখে বিশ্বাস করার উপায় নেই যে এখানে একসময় প্রচন্ড ঢেউ ছিল আর ছিল স্রোত। শুনলাম এখানে আছে চাঁদসওদাগারের নৌকা। আর চাঁদ সওদাগারের নামের সাথেই জুড়ে আছে বেহুলা লক্ষীন্দরের কাহিনী। চাঁদসওদাগর মনসামঙ্গল কাব্যধারার একটি কিংবদন্তি চরিত্র। তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতের চম্পক নগরের একজন ধনী ও ক্ষমতাশালী বণিক। চাঁদসওদাগারের বানিজ্যতরী সপ্তগ্রাম ও গঙ্গা-যমুনা-স্বরস্বতী নদীর মিলনাস্থলে অবস্থিত ত্রিবেনী হয়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করত। চাঁদসওদাগর ছিলেন দূর্গার ভক্ত তিনি শিব ও দূর্গার পূজা করতেন। কিন্তু মনসা চাইতেন চাঁদ তার পূজা করুক। কিন্তু চাঁদ তা করতে অস্বিকৃতী জানায়। তখন মনসা স্বর্পঘাতে চাঁদের ছয় পুত্রের প্রাণনাশ করে। চাঁদ তারপরও মনসার পূজা করতে অস্বীকার করে। তিনি শতো দুঃখ কষ্টকে পিছনে ফেলে আবারো বজরা নিয়ে বানিজ্যে বের হন। তিনি যখন বজরা ভরে বানিজ্য করে ফিরছিলেন। মনসা রেগে গিয়ে চাঁদসওদাগরের বানিজ্যতরী শেরপুর শহরের অদূরে গরজরিপার অন্তর্গত কালিদাস সাগরে প্রচন্ড ঝড় তুলে ডুবিয়ে দেন। চাঁদের সঙ্গিরা মারা গেলেও চাঁদ প্রাণে বেঁচে যান। দূর্গা চাঁদকে রক্ষা করতে গেলে মনসার অনুরোধক্রমে শিব তাকে বারন করে। এরপর মনসা চাঁদকে ভাসিয়ে সমুদ্রের তীরে চন্দ্রকেতুর কাছে পৌছে দেন। আর তাই এখানে এসে তার নৌকা দেখব না! হতেই পারে না। প্রথমে তো আমি শুনে অবাক! বলে কি? চাঁদ সওদাগারের নৌকা। আমার অনেক পথ হাঁটার সব ক্লান্তি গেলো উড়ে। হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দেখি উঁচু ঢিবির মতো। এখানকার এক বৃদ্ধ বললেন, এটাই চাঁদসওদাগারের নৌকা। আমি তো নৌকা দেখছি না, দেখছি শুধু পানির ভিতর কিছু উঁচু মাটি। এখানকার মানুষের ভাষ্যমতে এই উঁচু ঢিবিটি যতো বন্যায়ই হোক না কেনো মাথাটা এমনি ভেসে থাকে। শুকনা মৌসুমে কখনোই তেমন মাটি কটকটে শুকনা হয় না। আর একটা লেককথা হলো এর উপর যে উদ্ভিদই জন্মাক না কেনো কেউ তা নিয়ে যেতে পারে না। ঘুরেফিরে তাকে এখানে ফিরে আসতেই হবে। আমি বিশ্বাস করছি না বুঝতে পেরে বৃদ্ধ লোকটি একটি শন গাছ ছিঁড়ে আনতে বলল আমায়। আমি বললাম,” আমি তাড়াতাগি ঘরে ফিরতে চাই।” আমি কয়েকটা ছবি তুলে চলে এলাম।  
“””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””তবে এ কথাও সত্য যে, প্রকৃতির রহস্য বোঝা মুুুুশকিল।

“আমাার কথাটি ফুরালো নটে গাছটি মুড়লো। আজকে এ পর্যন্ত। মাসী পিসির গল্পের ঝুঁড়ি পরে আর এক পর্বে।  
“”””””””””রিতু”””””‘”  
১/২/১৮.

---

Comments: 11 — https://sonelablog.com/%e0%a6%b2%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a5%a4/#comments
