# লাশের খাটিয়ার মতো একা (পর্ব – ২)

- Author: [মুহম্মদ মাসুদ](https://sonelablog.com/author/masud95/)
- Published: 2020-06-30T10:41:32+00:00
- Updated: 2020-06-30T10:41:32+00:00
- Category: [উপন্যাস](https://sonelablog.com/category/literacy/%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b8/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a7%8b-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d/

---

লাশের খাটিয়ার মতো একা

- উপন্যাস
- নৃ মাসুদ রানা 

 

২.

নিমাই হাঁটছে। 

ধীরে হাঁটছে। রাস্তা পিচ্ছিল। শেষে আছাড় খেয়ে পড়লে বিপদ। 

তারপরও একটু হাঁটতে হবে। তবে একটু জোরে। জায়গাটা ভালো না। দিনের বেলায়ও কেমন যেন ভয়ভয় করছে। চারদিক নিশ্চুপ, নিস্তব্ধতা। নিঃশব্দে সবকিছু আরও ঘোলাটে লাগছে। কোথাও কোন সাড়াশব্দ নেই। 

 

একটা লাশ ঝুলে আছে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে। লাশটা দুলছে। হাতপাও নড়ছে। নড়বড় করছে। 

আরও বেশি দুলছে। 

আগের চাইতে দ্রুত বেগে। যখনতখন দড়ি ছিড়ে দৌড়ে আসতে পারে। দেহের ভিতরটা শশান ঘাট। শুকিয়ে যাচ্ছে। শুকিয়ে চৌচির। 

হাড্ডি-গুড্ডিতে ভয় এসে পরিপূর্ণ। বুক শুকিয়ে কাঠ গেছে। মাথা ঘুরছে। কখন যেন মাথা ঘুরে পড়ে যায়। 

 

কি ভয় পেয়েছেন নিশ্চয়ই? 

কণ্ঠটি মোলায়েম। বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে। কোথাও যেন শুনেছে। কোথায়, কোথায়? না ঠিক মনে পরছে না। 

কি? আমার কন্ঠ পরিচিত মনে হচ্ছে? 

বুকের ভিতর সাহস যেটুকু ছিলো। সেটাও হৃৎপিণ্ডের সাথে ধস্তাধস্তি জাবরদস্তি করে হাউমাউ করে পালিয়ে গেলো। এখন কি উপায়? 

আপনি কে? 

আমি যদু পাগলা। 

যদু পাগলা! আপনি আমার পিছনে পিছনে ঘুরছেন কেন? 

ঘুরছি না। আপনার সাহায্য করতে এসেছি। 

কি সাহায্য? 

সামনে আপনার মহা বিপদ। তাই বলছি – 

কি বলছেন? আপনার কোন সাহায্য আমার লাগবে না। আর আমার কোন বিপদও হবে না। 

আমার কথা বিশ্বাস করলেন না। 

না, বিশ্বাস করিনি। একটা পাগলের কথা আবার সত্য হয় না-কি। 

যদি আমি প্রমাণ করে দিতে পারি। 

কিসের প্রমাণ? 

মজনু মিয়া যে ভবিষ্যতের কথা আপনাকে বললো, সেটা। 

প্রমাণ করুন। তারপর না হয়… 

এই একটু আগে – আপনি বটগাছের ডালে একটি লাশ ঝুলে থাকতে দেখেছেন। ভয়ে তো আপনার কলিজা অবধি শুকিয়ে গেছে। হাতপা এখনো কাঁপছে। এই প্রথম হয়তো ভূতপ্রেত দেখলেন। তাই নয় কি! 

(নিমাই মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগলো-  আরে! যদু পাগলা তো ঠিক কথাই বলছে। আসলেই দেখি সে ভবিষ্যতের কথা বলতে পারে। ভয় পেয়েছি জানলে ব্যাটা আমার উপর হামলা করতে পারে। একথা মোটেই বলা যাবে না।) 

কে বলেছে আপনাকে? আমি ভয় পেয়েছি। 

শুনুন, আমি প্রমাণ দিয়েছি। আপনাকে বিশ্বাস করতে বলিনি। তবে একটা কথা বলছি – সামনে আপনার মহা বিপদ। যেখান থেকে এসেছেন সেখানে ফেরত চলে যান। নইলে আপনার বড্ড বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে। 

 

নিমাই ‘থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কি করবে বুঝতে পারছে না? চারদিকে আঁধারের নিশ্বব্দে শরীরের মাংসপেশিও নিবুনিবু করছে। হার্টবিট বেড়েই চলেছে। হঠাৎই নিমাইয়ের কাঁধে হাত। 

নিমাই চমকে উঠলো। জিজ্ঞেস করলো – কে? 

আপনিই কি নিমাই? 

জ্বি, আমি নিমাই। কেন বলুন তো? 

আপনাকে খুঁজছিলাম। রেলস্টেশনে বসে ছিলাম কিন্তু আপনাকে পেলাম না। এজন্য পেরত এসেছি। কিন্তু… 

কিন্তু কি? 

আপনি! এই বটগাছ তলায় দাঁড়িয়ে কেন? 

না মানে! এমনিতেই। 

শুনুন, জায়গাটা বেশি ভালো না। 

ভালোনা মানে? 

ভরদুপুরেও মানুষ এখানে ভয় পায়।

সত্যি! সত্যি? 

হুমম সত্যি। 

কেন বলুন তো?

আমি বেশি কিচু কইবার পারুম না। তবে… 

তবে? 

তবে কিছু না। 

চলুন। দ্রুত চলুন। 

 

মতি দ্রুত পা চালালো। তার সাথে পাল্লা দিতে গেলে প্রায় দৌড়াতে হয়। তারমধ্যে আবার পিচ্ছিল পথ। নিমাই পা টিপেটিপে হাঁটছে।

আপনার নাম কি? 

আমার নাম মতি। বাপমায়ে নাম রাখছিলে মতিয়ার। কিন্তু মাইনসের বাড়িতে কামকাজ করতে করতে মতি অইয়া গেছি।

তা মতি তুমি যদু পাগলা সমন্ধে কিছু জানো কি? 

কেন জানমু না। গ্রামের বেক্কেই জানে। আমিও জানি। 

কি জানো? আমাকে বলোতো। 

মতি বললো – যদু পাগলের কথা শুনবার ম্যালা সময় পাবেন। এখন একটু পা চালাইয়া হাঁটেন। সাবধানে হাঁটেন। তয় একটু জোরে। 

জোরে কেন? 

গ্রামের সবাই বলাবলি করে এই বটগাছটা ভালো না। বটগাছের নাকি ম্যালা দোষ আচে।

দোষ আছে মানে? 

হ, ম্যালা দোষ আছে। দেওয়ান বাড়ির বড় মাইয়াই তো এইহানে ফাঁসি লইয়া মইরা আঁচিল। 

বলো কি! 

জ্বি, সত্যি কথা বলছি। গ্রামের বেক্কেই দেখচে। 

আর কোন ঘটনা? 

আরও ম্যালা ঘটনা আছে। বারিত চলুন। তারপর ঠান্ডা মাথায় কইমুনি। 

 

মতির গলা শুনে নিমাই বুঝতে পারলো, সে নিজেও যথেষ্ট ভয় পায় এই জায়গাটি। এজন্য কষ্ট হলেও একটু দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু হঠাৎ করেই নিমাইয়ের মনে হলো – যদু পাগলা কোথায় হারিয়ে গেলো? সে-তো যদু পাগলার সাথেই কথা বলছিল। তাহলে এতো তাড়াতাড়ি সটকে পড়লো কোথায়? সটকে পড়লে তো মতি নিশ্চয়ই দেখতো। 

মতি, তোমাকে একটা প্রশ্ন করি। 

আমাকে জিজ্ঞেস করতে অইবো না। সরাসরি কইরা ফেলান। 

আচ্ছা, তুমি কি আমার পিছনে যদু পাগলারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছ? 

ক্যান? অয় কি আপনের পিছুন লইছিল? 

না, পিছনে আসে নাই। রাস্তায় দেখা হয়েছিল। তাই বললাম আরকি? 

যদু পাগলারে তো আমি দেকলাম বইয়া বইয়া গান গাইতেছে। ও আয়বো কোত্থেকে। 

তাহলে আমি কার সাথে কথা বললাম? তাহলে কি আমিও ভুতপ্রেত দেখেছি? ভাবতেই শরীরটা ঝিনঝিন করে উঠলো নিমাইয়ের। আচমকা সবকিছু অন্ধকার মনে হলো তার। না, এখন থেকে সাবধানে থাকতে হবে। মীলন যা বলে ছিল তার সবকিছুই আস্তে আস্তে মিলে যাচ্ছে। 

 

চারদিকে রহস্যের ডালপালা। 

 

মতির তাড়াতে নিমাই দ্রুত পা চালালো। ক্ষুধায় পেট চো-চো করছে। ক্ষুধার সহ্য করতে পারে না সে। তারপর আবার সকালে হালকা নাস্তা করেছে সে। 

বাড়িতে ঢুকতেই তারা দেখলো ঠান্ডু মোল্লা চিন্তিত মুখে বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন। 

ঠান্ডু মোল্লা চিন্তিত গলায় বললেন, তোমার মোবাইল বন্ধ কেন? 

নিমাই বললো, মোবাইল বৃষ্টিতে ভিজে বন্ধ হয়ে গেছে। 

মোবাইলটার প্রতি একটু খেয়াল রাখবা না?

নিমাই কোন উত্তর দিলো না। চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। 

তা আসতে এতো দেরি হলো কেন? মতি তো সাথেই ছিলো। কি রে মতি? সাথে ছিলি না? 

হ, সাথেই তো ছিলাম। তাইনা ভাইজান। 

মতি চোখ টিপ দিলো। 

জ্বি কাকু। মতি ঠিক কথাই বলেছে।  আসলে হইছে কি! আমিই মতিরে নিয়া একটু জমিদার বাড়িতে গিয়েছিলাম। এজন্য…। 

তোমার জন্য চিন্তায় ছিলাম। এজন্য স্টেশনে মতিকে পাঠিয়েছি। এখানকার রাস্তাঘাট তো কিছুই চেনো না। 

নিমাই এবারও চুপ করে রইলো। 

দেখ বাপু! এরপর থেকে কোথাও দেরি করবা না। আর যেখানেই যাও মতিরে সাথে নিয়ে যেও। 

ঠিক আছে। 

মতি, যা ওকে খাবার-দাবার কিছু দে আগে।  তারপর রাতে গল্প করবো। 

 

নিমাই ঘুমিয়ে। 

অদ্ভুত একটা স্বপ্ন তাকে তাড়া করছে। 

এক তরুণীর লাশ তার পিছনে পিছনে দৌড়াচ্ছে। 

তরুণীটি রূপবতী। অতি রূপবতী। গোলগাল মুখউজ্জ্বল বর্ণের। ভয়ার্ত চেহারা, চাহনি। আহ! দেখলেই বুকটা ধুকপুক করে কেঁপে ওঠে। 

কিন্তু মেয়েটি বিবস্ত্র। 

গায়ে একটা সূতা পর্যন্ত নেই। তারপর আবার রক্তাক্ত শরীর। মগজ থেকে রক্তবিন্দু চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। সত্যি! ভয়ংকর সে দৃশ্য। 

মেয়েটি এগিয়ে আসছে। এইতো ধরে ফেলবে। আর একটু দৌড়াতে হবে। 

নিমাই কাঁপছে। শরীরেও শক্তি নেই। দম ফুরিয়ে গেছে। প্রচন্ড তৃষ্ণা পেয়েছে তার। গলা শুকিয়ে ঠোঁটেঠোঁটে নেতিয়ে পরেছে। দৌড়াতে দৌড়াতে যেটুকু জান অবশিষ্ট আছে সেটুকুও বুঝি চলে যায়। 

স্বপ্নের সিঁড়িগুলা সুউচ্চ থাকে। তবে বাঁধা বিপত্তি থাকে না। অথচ নিমাই প্রতিটি সিঁড়িতে বিপদ দেখতে পেল। সাথে ফাঁসির মঞ্চ। 

নিমাই আরো দেখলো বিয়ের আসর। 

হঠাৎ তরুণীটি বিয়ের আসরেই পৌঁছাল। নিমাই ভয় পাচ্ছে। না জানি কি হয়। সকলে কি না ভাবে? 

না, তরুণীটি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। যাবার সময় মুচকি মুচকি হাসলো। 

সবাই জামাই এসেছে, জামাই এসেছে বলে বলে চিৎকার করতে লাগলো। 

জামাই, জামাই ডাকার সাথে সাথেই নিমাইয়ের ঘুম ভেঙে গেলো। ধড়মড় করে উঠে বসতেই দেখলো সে ঘরেই শুয়ে আছে। বিয়ের স্বপ্ন দেখলে মৃত্যু সংবাদ আসে। তবে কি? 

স্বাভাবিক হতে খানিকটা সময় লাগলো নিমাইয়ের। বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। চোখেমুখে পানি দেওয়া দরকার। মতিকে ডাকতে গিয়েও কি যেন মনে করে আর ডাকলো না নিমাই। 

বিদ্যুৎ চলে এসেছে। মোবাইলটা চার্জ দেওয়া দরকার। যদি অন হয় তবে বেশ ভালো হবে। লাইটটা অন করলো। 

এই ঘরটায় মাঝারি একটা খাট। খাটের পাশেই ছোট্ট একটি টেবিল। টেবিলের উপর একটি ছোট্ট ডায়েরি। তার পাশে একটি আয়না। আয়নার কাঁচে একটি নাম লেখা। 

জানালার কাছাকাছি আরও একটি ছোট্ট টেবিল। টেবিলে পানি ভর্তি জগ। 

জগ ভর্তি পানি শেষ করেও নিমাইয়ের পিপাসা একটুও কমেনি। আরো পানি দরকার। নিমাই মতিকে ডাকলো। 

নিমাই জানালা খুলল। জানালার করিডরে সিগারেটের ছাইপাঁশ। তাহলে নিশ্চয়ই কেউ এখানে সিগারেট টানে। তবে, কে সে? না কোনকিছুর সমাধান মিলছে না। তবে সময় যাচ্ছে ততই সবকিছু বিদঘুটে লাগছে। 

জানালার কাছে দাঁড়িয়ে একটি বাড়ি দেখা যাচ্ছে। তবে বেশ খানিকটা দূরে। হঠাৎই সে বাড়ির ঘরে আলো জ্বলে উঠলো। ঘরের একটি জানালা খোলা। দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না লোকটি কে? তবে শরীরের গঠন দেখে পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছে নিমাইয়ের। 

দরজায় ঠকঠক শব্দ। নিমাই জিজ্ঞেস করলো, কে? 

ভাইজান আমি, আমি মতি। 

দাঁড়াও। খুলছি। 

মতি আসরের আজান হয়েছে? 

কি যে বলেন না ভাইজান। আসর শ্যাষ অইয়া মাগরিবের নামাজের সময়ও শ্যাষ। এহন এশার নামাজের আজান হবে। 

বল কি? 

জ্বি, ভাইজান। আপনে ঘুমাই ছিলেন। এজন্য ডাহিনি। 

চা হবে? 

জ্বি হবে। তয় আপনে আর ঘর থেইক্কা বের অইবেন না। 

কেন? 

পুকুর পাড়ে একটা লাশ ভাইসা উঠছে। 

কার লাশ? 

জানিনা। পুলিশে লইয়া গেছে। তবে লাশের মুখে ফুপড়ি দেইখা আমার হাসি পাচ্ছিল। 

হাসি! লাশ দেখে কেউ হাসে? 

তাহলে আপনেকে একটা ঘটনা কই শুনুন…

 

আমি ম্যালা ছোট। আব্বায় আমাকে বুকের মধ্যে লইয়া নানান রকমের গল্প কইতো। কহনো ভুতের গল্প, কহনো সাপের গল্প, আবার কহনো রাজা-মন্ত্রীর গল্প। আমি আব্বার কাছে গল্প শুনে শুনে কহন ঘুমিয়ে পরতাম নিজেই জানতাম না। ঘুম ভাঙলে দেকতাম সক্কাল অইয়া গ্যাছে। আব্বা আমারে থুইয়া কাজে গ্যাছে। মায়েও সংসারের অন্য কাজ লইয়া ব্যস্ত। আমার দিকে কারোর খেয়াল থাকতো না। খেয়াল থাকতোই বা কেম্নে। অভাবের সংসার। কিন্তু হঠাৎ একদিন আব্বা আর মায়ের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হলো। মায়ে না খেয়ে শুয়ে পড়লো। আব্বায় আমারে কোলে লইয়া নিজেও না খেয়ে শুয়ে পড়লো। 

সেদিন আমার চোক্ষে ঘুম ছিল না। আব্বায়ও গল্প বলতে চাইছিল না। কিন্তু আবার বাড়াবাড়িতে শ্যাষম্যাশ গল্প বলতে রাজি অইলো। কিন্তু শর্ত দিল – জীবনে কোনদিন নিজের গোপন কথা স্ত্রীকে খুইল্যা কবি না। খুইল্যা কইলেই বিপদ। আমি গল্প শোনার লোভে মাথা তুইলা কইলাম, আচ্চা কমু না। তহন আব্বায় গল্প বলতে শুরু করলো – 

চক শিমলা নামে একটি গ্রাম ছিল। সেই গ্রামে কাজ করতো নান্নু নামের এক ছেলে। দীর্ঘদিন কাজের জন্য এক গেরস্তে তার মেয়ের সাথে নান্নুকে বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই হিসেবে রেখে দেয়। হঠাৎ একদিন নান্নু আর  তার বউয়ে একসাথে পুকুরে সেঁচে মাছ ধরতে ছিলো। মাছ ধরতে ধরতে হঠাৎ এক সময় নান্নু মুচকি হেসে ওঠে। আর এই মুচকি হাসিটা নান্নুর বউয়ে দেখে ফেলে। মাছ ধরা শ্যাষে বাড়ির উঠানে যেতেই নান্নুর বউয়ে নান্নুকে জিজ্ঞেস করে, তুমি মাছ ধরার সময় হাসলে কেন? 

নান্নু চুপ করে বসে থাকে। কিছুই বলে না। 

নান্নুর বউয়ে আবার জিজ্ঞেস করে। কিন্তু না  তহনো সে কিছু বলে না। শুধু বলে এমনি এমনি হাসছি। 

নান্নুর বউয়ে বিশ্বাস করে না। সে বলে, মানুষ কারণ ছাড়া কখনো হাসে না। তুমি নিশ্চয়ই আমার কাছ থেইক্কা কিচু লুকচ্ছ। 

নান্নু বলে, আমি কিচ্ছু লুকাচ্ছি না। 

কিন্তু কিছুতেই নান্নুর বউয়ে তার কথা বিশ্বাস করে না। 

শ্যাষম্যাশ কোন উপায় না পেয়ে নান্নু বলে ওঠে, বলতে পারি এক শর্তে। 

কি শর্ত? 

বল তুমি কাউকে বলবে না। 

না, কাউকে বলবো না। 

যদি বল তাহলে কিন্তু আমার বিপদ হবে। 

বললাম তো বলবো না। 

আজ থেকে প্রায় সাড়ে এগারো বছর আগে আমি একজনকে খুন করে তোমাদের এখানে এসেছি। সেদিন আমি যাকে খুন করেচিলাম তার নাক-মুখ দিয়ে ফুপড়ি উঠছিল। আজ যখন পুকুরে পা ফেলেছি ঠিক সেরকমই কেঁদোর মধ্যে ফুপড়ি দেকলাম। এজন্য মুচকি হেসে ওঠেছি। 

এইডা কেডা কেডা জানে? 

না, কেউ জানে না। শুধু তুমি-আমি ছাড়া। 

আর মাত্র মাস তিনেক আছে। 

মাস তিনেক আছে মানে? 

শুনেছি ১২ বছরের মধ্যে আসামি ধরা না পরলে তার কোন বিচার অয় না। 

 

এভাবে বেশ কিছুদিন চলতে লাগলো। নান্নুর বউয়ে কথাটি কাউকে না বলতে পেরে শান্তি পাচ্ছিল না। মনের মধ্যে কথাটি শুধু নড়াচড়া করেছিল। না বললে হয়তো দম ফেটে মরে যাবে। হঠাৎ একদিন সে পাশের বাড়ির এক বউকে এই কথাটি বলে ফেললো। সেই বউ তার স্বামীকে। এভাবে আস্তে আস্তে পুরো গ্রাম এমনকি থানায়ও খবরটি পৌঁছে গেলো। 

তারপর, একদিন ভোররাতে পুলিশ এসে হাজির। নান্নুকে পুলিশ ধরে নিতেই নান্নুর বউয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। কান্নার শব্দ শুনে আশেপাশের লোকেরা দৌড়ে চলে আসলো। এসেই দেকলো নান্নুকে পুলিশ দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে। সেদিন নাকি নান্নু খুব আক্ষেপ করে বলেছিল, নিজের বউকেও কখনো গোপন কথা বলতে নেই।

ছবিঃ সংগৃহীত

---

Comments: 12 — https://sonelablog.com/%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a7%8b-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d/#comments
