# রবীন্দ্রনাথ বর্ষার পরিপূর্ণ কবি

- Author: [তৌহিদুল ইসলাম](https://sonelablog.com/author/touhidislam/)
- Published: 2020-06-16T14:59:14+00:00
- Updated: 2020-06-16T15:01:47+00:00
- Category: [সাহিত্য](https://sonelablog.com/category/literacy/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a5-%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%aa%e0%a7%82/

---

পৌরাণিক ও প্রাচীন যুগ হতে একাল পর্যন্ত মানুষের অন্তরঙ্গ জীবনের বিশেষ কোনো রূপান্তর হয়নি। দেশকালের পরিবর্তনে নর-নারীর অন্তরতম সত্ত্বার কোন পরিবর্তন হয় না। মানুষের সুখ-দুঃখ, কাম-প্রেম, দ্বেষ-হিংসা প্রভৃতি সহজাত বৃত্তিগুলি চিরন্তন মানব-প্রকৃতির অঙ্গ। পূর্বের যুগে সেগুলি মূলত যেমন যেমন ছিল, বর্তমানেও তেমনি আছে এবং ভবিষ্যতেও লুপ্ত হবে না। একালের প্রেমিকারাও সেকালের প্রেমিকাদের মতো বর্ষাসমাগমে বিরহ বেদনা অনুভব করে এবং প্রিয় মিলনের জন্য ব্যাকুল হয়।

ভারতীয় কাব্যে আদি কবি বাল্মীকির রামায়ণে আমরা সর্বপ্রথম বর্ষায় নরনারীর বিরহবেদনার এই চিত্র দেখতে পাই। তাঁর মধ্যে বর্ষা প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য, বর্ষার ফুলফল, পশুপাখির বর্ণনা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাল্মীকি বর্ষার আকাশ বর্ণনা করছেন – আকাশ কখনো পরিষ্কার, কখনো মেঘলিপ্ত, কখনো শান্ত সমুদ্রের মতো। বর্ষার সঙ্গে বিরহের সম্বন্ধের কথা ভারতীয় সাহিত্যে বাল্মীকির রামায়নেই প্রথম পাওয়া যায়।

অন্যদিকে কালিদাস যে বিশেষভাবে বর্ষাকে বিরহদুঃখের উৎসারক বলে বর্ণনা করেছেন তার পিছনে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কার ও প্রথা বর্তমান। বর্ষায় যে বিরহ উদ্দীপিত হয় তার স্বরূপটি কালিদাসই প্রথম আমাদের নিকট সুস্পষ্টরূপে উদঘাটিত করেন। প্রাচীন ভারতে বর্ষা ছিল কর্মবিরতির ঋতু। তখন সম্ভবত প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য ভ্রমণ, যুদ্ধ, বাণিজ্য প্রভৃতি সমস্তকিছু বন্ধ থাকতো। বর্ষারম্ভে প্রবাসী স্বামীরা ঘরে ফিরতো, তাদের পত্নীরাও প্রিয় মিলনের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে থাকতো। যদি প্রত্যাগমন বিলম্বিত হতো তবে বিরহবেদনা উভয়পক্ষেই দূর্বহ হতো।

রবীন্দ্রনাথের বর্ষা-কাব্যের উপর কালিদাস ও বৈষ্ণব পদাবলীর এই প্রভাব যথেষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। প্রকৃতির বিচিত্র রূপ, ষড়ঋতুর লীলাবৈচিত্র্য চিরকাল কবি হৃদয়কে নিবিড় রস মাধুর্যে আপ্লুত করেছে। বর্ষা ঋতুর ঐশ্বর্য ও মাধুর্য, তার অন্তর্নিহিত নিবিড় ভাব-সম্পদ, তার মর্মের চিরন্তন বিরহবাণী কবির কাব্যে বিস্ময়কর রুপ পেয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ বর্ষা কাব্যকে অপরূপ সৌন্দর্য ও লোকোত্তর ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত করেছেন। রবীন্দ্রকাব্যের একটি উৎকৃষ্ট অংশই তাঁর  বর্ষা সম্বন্ধে গান ও কবিতা। বর্ষা-প্রকৃতির বাহিরের বিচিত্র রুপে রবীন্দ্রনাথ আত্মহারা হয়ে গিয়েছেন-

*“হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো*  
*নাচেরে হৃদয় নাচেরে।”*

এই রুপ দর্শনের তাঁর হৃদয় অপূর্ব পুলকে নৃত্য করে উঠছে। কখনো তিনি বর্ষাকে উদাত্ত আহ্বান করেছেন-

*“ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে*  
*জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভরভসে*  
*ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা*  
*শ্যামগম্ভীর সরসা!”*

কখনো আমাদের দেশের প্রাচীন কবিদের সঙ্গে মিশে তাঁদের মুখপাত্র হিসেবে রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে অভিনন্দন করছেন এভাবে –

*“শতেক যুগের কবিদলে মিলি আকাশে*  
*ধ্বনিয়া তুলিছে মত্তমদির বাতাসে*  
*শতেক যুগের গীতিকা*  
*শত শত গীত-মুখরিত বনবীথিকা।”*

বর্ষার অবিরল জলধারাচ্ছন্ন নির্জন নিভৃত অবসর প্রেমের গূঢ় অনুভূতি প্রকাশের, প্রেম নিবেদনের চরম ক্ষণ মনে করে কবি অনুভব করেছেন-

*“এমন দিনে তারে বলা যায়,*  
*এমন ঘনঘোর বরিষায়।”*

রবীন্দ্রনাথ তাঁর বর্ষাকাব্যে প্রেমের লৌকিক স্তরের ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছেন। সেখানে পার্থিব ও অপার্থিব একসাথে মিলন হয়েছে। কালিদাসের সময় হতে বর্ষাঋতুতে যে বিরহ বেদনা জেগেছে লৌকিক প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে অনেকক্ষেত্রে সেই বিরহ বেদনা জেগেছে অন্তরের অন্তরতম প্রিয়ার জন্য। বর্ষায় কবির চিত্ত তাঁর হৃদয়বিহারীর জন্য অশান্ত হয়ে উঠেছে-

*“গগনতল গিয়েছে মেঘে ভরি,*  
*বাদল জল পড়িছে ঝরি ঝরি।*  
*এ ঘোর রাতে কিসের লাগি*  
*পরাণ মম সহসা জাগি*  
*এমন কেন করিছে মরি মরি।*  
*বাদল জল পড়িছে ঝরি ঝরি।”*

রবীন্দ্রনাথকে নিঃসন্দেহে বর্ষার পরিপূর্ণ একজন কবি বলা যায়। কেবল বাংলা সাহিত্যে নয়, মনে হয় বিশ্ব সাহিত্যেও বর্ষার বাহির ও অন্তরের সমস্ত সৌন্দর্য-মাধুর্য রুপ রহস্য এমনভাবে গানে ও কবিতায় প্রকাশ করে আর কেউই সাহিত্য সৃষ্টিরুপে পরিবেশন করেননি।

*(সাহায্যকারী কাব্যগ্রন্থ – মানসী)*

---

Comments: 21 — https://sonelablog.com/%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a5-%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%aa%e0%a7%82/#comments
