# রণাঙ্গন থেকে পাঠানো চিঠি / একাত্তরের চিঠি-৭

Author: হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ
Published: 2013-01-06
Category: মুক্তিযুদ্ধ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%a8-%e0%a6%a5%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a0%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8b-%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%a0%e0%a6%bf-7/

**![](http://www.jeshan4u.com/wp-content/uploads/2012/12/war71.webp)**

লাল সবুজের এই পতাকার জন্য ১৯৭১ সনে এক সাগর রক্ত দিতে হয়েছিল আমাদের। শুধু মাত্র দেশ মাতাকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিল এই দেশের দামাল ছেলেরা। বাবা মা ভাই বোন স্ত্রীর ভালোবাসার টানকে উপেক্ষা করে ঝাঁপিয়ে পরেছিল যুদ্ধে।রণাঙ্গন থেকে মুক্তিযোদ্ধারা চিঠি দিয়েছেন তাঁদের প্রিয় জনকে। চিঠিতে যুদ্ধের অবস্থা , মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের প্রতি ভালবাসা স্পর্শ করে যায় আমাদের ।  
মুক্তিযোদ্ধাদের এমন চিঠি প্রকাশ করেছে প্রথম আলোর প্রকাশনী প্রথমা । সুন্দর এই ঐতিহাসিক বইটির মুল্য ৩০০ টাকা।

২৭/০৯/৭১**  
প্রিয় কমরেড মঞ্জুর,**

আশা করি এত দিনে আপনারা ট্রেনিং শেষ করিয়া ফিরিয়া আসিয়াছেন। এখনো আপনাদের ট্রেনিং সম্বন্ধে সমস্ত খবর জানিতে পারি নাই, কিন্তুু তাহা স্বত্বেও আপনাদের এই সাফল্যজনক প্রত্যাবর্তনে আপনিসহ আপনাদের সকলকে অভিনন্দন জানাইতেছি। আপনাদের সহিত দেখা করিবার জন্য অত্যন্ত আগ্রহের সহিত অপেক্ষা করিতেছি। আরও কয়েক দিন পরও হয়তো দেখা করা সম্ভব হইবে না। যাহা হউক, দেখা হইলে সমস্ত কিছু জানা যাইবে এবং তাহার ফলে আমাদেরও কিছুটা অভিজ্ঞতা হইবে। প্রথম ইধঃপয –  এর ব্যাপারেও কতকগুলি অভিজ্ঞতা হইয়াছে কিন্তুু সেগুলি খুব বেশি ভালো নয়।

আশা করি আপনারা সকলেই সুস্থ আছেন। আপনাদের খবর জানিবার জন্য খুবই উদগ্রীব আছি। সম্ভব হইলে একখানা চিঠি দিবেন।

আমি এক প্রকার ভালো আছি। আমার জন্য কোন চিন্তা করিবেন না। আপনি যে ঐড়ৎষরপশং (……)  দিয়াছিলেন তাহা বেশ কিছুদিন খাইয়াছি। আপনারা আমার ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা গ্রহন করিবেন।

**জ্ঞান চক্রবর্তী**

*  
চিঠি লেখক: জ্ঞান চক্রবর্তী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা।  
চিঠি প্রাপক : মুক্তিযোদ্ধ মনজুরুল আহসান খান। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি।  
চিঠি পাঠিয়েছেন : মনজুরুল আহসান খান।*

সোনাটোলা, ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১**  
প্রিয়তম স্বামী,**

সালাম নিয়ো এবং ভালোবাসা। জাহান ভাই এর হাতে একটা চিঠি পাঠিয়েছ। চিঠিটা পড়ে বেশ কিছু দিন পর ছিঁড়ে ফেলেছি রাজাকারদের ভয়ে। কারন রাজাকাররা ২৪ ঘন্টা আমাদের বাড়ি পাহারা দিচ্ছে- তোমাকে ধরার জন্য। তোমার দ্বিতীয় সন্তানের বয়স যখন ৬ দিন, তখন তোমার চিঠিটা পাই। তুমি লিখেছিলে আমি বেঁচে থাকি তোমার গর্ব তোমার স্বামী। বাংলাদেশকে ছিনিয়ে আনব। আমি ছুটোছুটি করতে থাকি। প্রচন্ড কষ্ট বোঝাতে পারব না। আমি যেদিন তোমাদের বাড়ি থেকে আমার বাবার বাড়ি আসি, সেদিন ছিল ১৪ই জুলাই। সেদিন তুমি বাড়িতে ছিলে না। বুঝেছিলাম তুমি অস্থির আছ এবং বেশ কয়েক মাস ধরে লুকিয়ে থাকছ এবং অস্থিরতার মধ্যে থাকছ। কিন্তুু আমাকে কিছু বলো না। বুঝতে পারতাম তুমি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছ। আমার বাবার বাড়িতে আসার কয়দিন পর বাবুর জন্ম হলো, ২১শে জুলাই। আশা করেছিলাম তুমি আসবে। তার বদলে এল চিঠি। আগামীকাল আমি শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ তোমাদের বাড়ি যাব। রাজাকারদের অত্যাচারে। জাহান ভাই এর মাধ্যমে খবর পেতাম। তুমি বেঁচে আছ। ওখানে খবর পাব কীভাবে? তাই লিখছি।

তোমার আড়াই বছরের বড় ছেলে সব সময় পতাকা হাতে নিয়ে জয় বাংলা বলতে থাকে আর রাজাকাররা ধমক দেয়। আব্বা ছেলের মুখ চেপে ধরে, ছেলে ছটফট করতে থাকে আর বলে, নানু, আমাকে ছেড়ে দাও এবং বলে বাংলাদেশের জয় হোক। রাজাকাররা আব্বাকে বলে, তোমার জামাই তোমার বাড়িতে আসে, তোমাকে ধরিয়ে দিব। তোমার বাড়ি পুড়িয়ে দিব। এই সমস্ত কারনে আব্বাকে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, দেশ স্বাধীন করে ফিরে এসো সুস্থ দেহে।

**ইতি**

**তোমার কদবানু আলেয়া**  
*চিঠি লেখক : কদবানু আলেয়া। মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী  
চিঠি প্রাপক : মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রাজ্জাক।  
চিঠিটি পাঠিয়েছেন : এবিএম কাইসার রেজা, সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ,  
কুমারখালী ডিগ্রী কলেজ, কুমারখালী, কুষ্টিয়া। তিনি আবদুর রাজ্জাকের ছেলে।*

তারিখ : ০৪.১০.১৯৭১**  
মাগো,**

সবেমাত্র রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসে শিবিরে বিশ্রাম নিচ্ছি। একটা বিস্তীর্ণ এলাকা শত্র“মুক্ত করতে পেরে স্বস্থির নি:শ্বাস ফেলছি। মনটা তাই বেশ উৎফুল্ল। হঠাৎ মনে পড়ল তোমাকে। বাড়ি থেকে আসার পর এই প্রথম তোমাকে লিখছি। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তোমায় লিখতে পারিনি। বাঙ্কারে বসে আছি। বাইরে ভীষণ বৃষ্টি আর বাতাসের শব্দ কমিলে একটা চাপা আর্তনাদ ভেসে আসছে।

মাগো, আজ মনে পড়েছে বিদায় নেবার বেলায় তোমার করুণ হাসিমুখ।সাদা ধবধবে শাড়িটা বেশ মানিয়েছিল তোমাকে। সেদিনের পূর্ব দিগন্তের সূর্যটা বেশ লাল মনে হয়েছিল। আমার কী মনে হয়েছিল জানো মা? অসংখ্য বাঙালির রক্তে রঞ্জিত ওই লাল সূর্যটা । ওর প্রতিটি কিরণচ্ছটা প্রথিবীতে জন্ম দিয়েছে অগ্নি – শপথে বলীয়ান, স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত এক একটা বাঙালি সন্তান । মগো- তোমার কোলে জন্মে আমি ধন্য । শহীদের রক্তরাঙা পথে তোমার আদুরে ছেলেকে এগিয়ে দিয়েছে। ক্ষণিকের জন্যও তোমার বুক কাঁপেনি, স্নেহের বন্ধন – দেশমাতৃকার ডাক উপেক্ষা করতে পারোনি। মা, তুমি শুনে খুশি হবে যে তোমারই মতো অসংখ্য জননী তাঁদের স্নেহ ও ভালোবাসার ধন-পুত্র-স্বামী, আতœীয়-সর্বস্ব হারিয়েও শোকে মুহ্যমান হয়নি; বরং ইস্পাতকঠিন মনোবল নিয়ে আজ অগ্নি-শপথে বলীয়ান।

মাগো বাংলার প্রতিটি জননী কি তাঁদের ছেলেকে দেশের তরে দান করতে পারে না- পারে না মা- বোনের ভাইয়েদের পাশে এসে দাঁড়াতে? তুমিই তো একদিন বলেছিলে, সেদিন বেশি দূরে নয়- যেদিন এ দেশের শিশুরা মা- বাবার কাছে বিস্কুট- চকলেট না চেয়ে চাইবে পিস্তল -রিভলবার। সেদিনের  আশায় পথ চেয়ে আছে বাংলার প্রতিটি সন্তান, যেদিন বাংলার স্বাধীনতার সূর্য প্রতিফলিত হবে, অধিকারবঞ্চিত,শোষিত, নিপীড়িত, বুভুক্ষু, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির আশা- আকাঙ্খা। যে মনোবল নিয়ে প্রথম তোমা থেকে বিদায় নিয়েছিলাম, তা আজ শত গুণ বেড়ে গেছে। শুধু আমার নয়,প্রতিটি বাঙালি খুনের হানছে মাতোয়ারা। তাই তো বাংলার আনাচকানাচে এক মহাশক্তিতে বলীয়ান তোমার অবুঝ শিশুগুলোই আজ হানাদার বাহিনীকে চরম আঘাত হেনেছে- পান করছে হানাদার পশুদের তাজা রক্ত। ওরা ওরা মানুষ হত্যা করছে- আর আমরা পশু হত্যা করছি। মা, মাগো। দুটি পায়ে পড়ি মা। তোমার ছেলে ও মেয়েকে দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে ঘরে আটকে রেখো না। ছেড়ে দাও স্বাধীনতার উত্তপ্ত রক্তপথে। শহীদ হয়ে অমর হব; গাজী হয়ে তোমারই কোলে ফিরে আসব মা। মাগো – জয়ী আমরা হবই। দোয়া রেখো। জয় বাংলা।

**তোমারই**

**দুলাল**

*চিঠি লেখক: মু্িক্তযোদ্ধা দুলাল। তাঁর বিস্তারিত পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।  
ফুলবাড়িয়ার সম্মুখেসমরে তিনি আহত হন এবং পরে মারা যান। আহত হওয়ার সময় চিঠিটি তাঁর পকেটে ছিল। এটি পরে, মুক্তিযুদ্ধকালে পত্রিকাটি ময়মসিংহের ভালুকা থেকে প্রকাশিত হতো।  
চিঠি প্রাপক: মা। তাঁর পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।  
চিঠিটি পাঠিয়েছেন: এস এ কালাম, সম্পাদক, সাপ্তাহিক চরকা ও ’৭১ মুক্তিযুদ্ধে জাগ্রত বাংলা । তাঁর বর্তমান ঠিকানা : ৫/৪৬ আউটার স্টিডিয়াম, ময়মনসিংহ।*

০৫/১০/৭১**  
শ্রদ্ধাবরেষু,**

ভাই, সালাম জেনো, তোমার চিঠি পেয়েছি ১৪ তারিখ লেখা। কুচবিহারে যে চিঠিটা দিয়েছ, তা পাইনি। এর ভিতরে হয়তো আমার আর একটা চিঠি পেয়ে গেছ। ওখানে রংপুরে আর গাইবান্ধায় দুটো চিঠি দিতে পাঠিয়েছিলাম । ও দুটো পাঠিয়ে দিয়ো। রংপুরের কোনো খোঁজখবর পাইনি। কাজেই মানসিকভাবে কী রকম চলছি বোঝ।

যাক, করার কিছু নেই। ভাই বা চিনুর চিঠি পাইনি অনেক দিন। আমি খোঁজ নিবার চেষ্টা করছি। তুমি এখনো কিছু ঠিক করো না কী করবে। তবে দেশে ফিরবার চেষ্টা একেবারেই করবে না। কদিন আগেই বিদেশ থেকে কজন শিক্ষক আর রেলওয়ের এক ডাইরেক্টর দেশে ফেরার সাথে সাথে প্রাণ হারিয়েছেন করাচিতেই। সমাধানের কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না। তোমার ওপর একটা অনুরোধ, বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই প্রাণ নিয়ে এ দেশে পালিয়ে এসেছে-দেশে তাদের কেউ কোনো খোঁজ জানেন না। তুমি ওদের বিরাট উপকার করতে পার। চিঠিগুলো ওদের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়ো। কৃতজ্ঞ থাকবে ওরা।

আমাকে চিঠি দিয়ো। কীভাবে আমি আছি- তুমি চিন্তা করতে পার না। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার যা বাকি। এবং  তোমার কাছ থেকে ছাড়া অন্য কোথা থেকেও চিঠি পাবার উপায় নাই। সাথের চিঠি কটার সানু মিয়া হেডমাস্টারের চিঠিটা আগে পাঠিয়ে দিয়ো। পরে চেয়ারম্যানের চিঠিটা পাঠিয়ো। প্রেরককে তোমার ঠিকানা না দেওয়াই ভালো। এমনি একটা কিছু লিখে দিয়ো।

**ইতি**

**জীমু**

*চিঠি লেখক: জীমু, মুক্তিযোদ্ধা কে মুশতাক ইলাহী। জীমু ছদ্ম নাম। তাঁর পিতার নাম: খোন্দকার দাদ ইলাহী। ঠিকানা: ধাপ, মেডিকেল মোড়, রংপুর।  
চিঠি প্রাপক: ভাই; কে মউদুদ ইলাহী।  
চিঠিটি পাঠিয়েছেন: ড. কে. মউদুদ ইলাহী; প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, স্ট্রামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ঢাকা। তিনি মুক্তিযোদ্ধা কে মুশতাক ইলাহীর ভাই।*

তারিখ: ১১/১০/৭১ইং**  
স্নেহের শামীম,**

কারও কোনো বিপদে এখন আর এক পয়সার সাহায্যও আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ অবস্থা আমার কাছে অসহ্য।

সারা জীবন পরিশ্রম করে আজ বলতে গেলে একেবারে নতুন করে সংসারযাত্রা শুরু করতে হচ্ছে। কোনো অপঘাতে যদি মৃত্যু হয়, জানি না কোনো অকূল পাথারে সকলকে ভাসিয়ে রেখে যাব। কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবিনি যে, সংসারজীবনে এমনি করে পেছনে ফিরে যেতে হবে। এ বয়সে নতুন করে দু:খ কষ্টের মধ্যে যাওয়ার যাওয়ার মতো মনের বল আর অবশেষ নেই। যা হোক, তোমাকে আশীর্বাদ করি, জীবনে সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে সামনে এগিয়ে যাও। আমার বন্ধুবান্ধবের সম্পর্কে যে কথা লিখছে, ওতে আমি বিস্মিত হইনি, কারণ আমি অনেকের বন্ধু হলেও কেউ আমার বন্ধু ছিল না। কারণ, এ সংসারে সকলেই স্বার্থের দাস, জীবনের মহত্ত্বের গুণাবলি কজনের আছে? আমার জীবনে অপরিচিত জন ছিল যারা, বিপদে-আপদে তারাই আমার পশে এসে দাঁড়িয়েছে, পরিচিত কোনো বন্ধুজন নয়।

শুনে খুশি হলম, তুমি\* মানিকের স্নেহাস্পর্শে আছ। ওদের ক’ জনকে আমি বরাবর স্নেহের নয়, শ্রদ্ধার চোখেই দেখেছি। ওকে আমার শুভেচ্ছা জানাবে।

**ইতি**

**আব্বা**

এগারোই অক্টোবর  
উনিশ শ’ একাত্তর

*চিঠি লেখক: শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দীন হোসেন। দৈনিক ইত্তেফাক এর প্রবীণ সাংবাদিক। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর আলবদর বাহিনী তাঁকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়, তারপর তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।  
চিঠি প্রাপক: মুক্তিযোদ্ধা শামীম, পুরো নাম শামীম রেজা নূর। শহীদ সিরাজুদ্দীনের বড় ছেলে।  
সংগ্রহ: স্মৃতিপটে সিরাজুদ্দীন হোসেন *গ্রন্থ থেকে।*  
*

12.10.71**  
খালা ও মমিন**

আমাদের আন্তরিক স্নেহ ও দোয়া ভালোবাসা জানিবা। আজ ৬ মাস তোমাদের কোনো সংবাদ পাই না। তিন মাস পর জেনেছি তোমরা ও বাড়িতে আছ এবং ভালো আছ। প্রথম তিন মাস আমাদের কী অবস্থা হয়েছিল অনুমান করতে পার। যাক তোমরা বেঁচে আছ জেনে কিছুটা নিশ্চিত হয়েছি। আমাদের মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। এপ্্িরল মাসের প্রথমদিকেই আমার বাড়িঘর সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দিয়েছে। সমস্ত জিনিস পুড়ে গিয়েছে কিংবা লুট হয়েছে। আমরা সত্যিকারের সর্বহারা। অনেক বাড়িই পুড়ে গিয়েছে এবং সমস্ত বাড়িই লুট হয়েছে। মাঝে মাঝে ২/১ খানা ভাল আছে। অপূরণীয় ক্ষতি। স্মৃতিচিহ্ন সবই গিয়েছে। জামাকাপড় থেকে আরম্ভ করে যাবতীয় জিনিস নষ্ট হয়েছে। এমনকি শোয়ার মতো বিছানা, খাট ইত্যাদিও নাই। বাড়ি মেরামত করা ছাড়া বাড়িতে যাওয়ার উপায় নাই। বর্তমানে সাধুপাড়া বাসাতে থাকি, ওই দিকটা বেশি নষ্ট হয় নাই। এই ছয় মাস বহু জায়গায় থেকে বর্তমান তিন সপ্তাহ হলো এখানে আছি। লাভলুর চিঠি পেয়েছি, ভালো আছে। করিম ও গিনি ঢাকা এসিছিল। করিম গত ৩০/৯ করাচি গিয়েছে। টিটোও গিয়েছে। টুটুরা অনেক জায়গায় ছিল, বর্তমানে চিটাগাং আছেু। বেবী ও পিয়া ৪ মাস ঢাকাতে। গত মাসে ঢাকায় তুহিনের বিবাহ হয়েছে। ছেলে এমবিবিএস-ময়মনসিংহ জেলায় বাড়ি। হিরার শ্বশুর ও শালা আয়নাল গুলিতে মারা গিয়েছে। বাড়িঘর সব লুট হয়েছে। আমিনউদ্দিন অ্যাডভোকেট গুলিতে মারা গিয়েছে। ঘুটুর শ্বশুর, আনিসের শ্বশুর, তুহিনের বড় মামা ইত্যাদি ইত্যাদি মারা গিয়েছে। পল্টু মামাও মেহমানদের নিকট। আমরা প্রথমেই বাড়ি ছেড়ে দিয়ে জীবনে বেঁচে আছি। এই শুধু সান্ত্বনা। খোদা তোমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে রাখুন,এই দোয়াই করি। ইমনের জন্য সব সময়ই মনে হয়, ও-ই সব সময় খেতে চাইত-এখন কত কষ্টই পাচ্ছে। মেয়ে হওয়ার সংবাদ যদিও পেয়েছি প্রথমে ঘুটু উ.অ.উ জধহমঢ়ঁৎ গৎ গড়সঃধু শাহানা ও অন্যান্য ২/১ জনের নিকট কিছু কিছু সংবাদ পেয়েছিলাম। পরে হেলেনের চিঠিতে সব জানি মাঝে মাঝে, এমনকি সপ্তাহে সপ্তাহে রফিকের নিকট লিখে আমাদের জানাব্ েশুভেচ্ছা রইল। ইমনকে আমাদের প্রীতি ভালোবাসা জানাবে। খোদা হাফেজ।

**আশীর্বাদক**

**তোমাদের আব্বা**

১২.১০.১৯৭১

*চিঠি লেখক: মেজর ডা. মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন।  
চিঠি প্রাপক: মেরিনা ইসলাম ও মুক্তিযোদ্ধা মুজহারুল ইসলাম। মেরিনা ইসলাম ডা. হোসেনের কন্যা। ডা. হোসেন তাঁর কন্যা মেরিনাকে ‘খালা’ বলে মম্বোধন করতেন।  
চিঠিটি পাঠিয়েছেন: মেরিনা ইসলাম।*
