# জসীম স্যার – যাঁদের কাছে ঋণী এ জীবন : প্রথম ভাগ

- Author: [নীলাঞ্জনা নীলা](https://sonelablog.com/author/nilanjana/)
- Published: 2016-07-09T03:39:09+00:00
- Updated: 2016-07-16T05:30:14+00:00
- Category: [একান্ত অনুভূতি](https://sonelablog.com/category/misc/personal/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9b%e0%a7%87-%e0%a6%8b%e0%a6%a3%e0%a7%80-%e0%a6%8f-%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0/

---

[!\[জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক...\](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2016/07/Teacher-Quotes-The-best-teachers-teach-from-the-heart-not-from-the-book..jpg)](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2016/07/Teacher-Quotes-The-best-teachers-teach-from-the-heart-not-from-the-book..jpg)

****জ্ঞানের কান্ডারী শিক্ষক…****

একটি জাতির মেরুদন্ড গড়ে ওঠে শিক্ষার মাধ্যমে। আর সে শিক্ষা আমরা পেয়ে থাকি শিক্ষকের কাছ থেকে। একটি কম্পাস যেমন নাবিকের দিকনির্দেশনায় সাহায্য করে, একজন সঠিক শিক্ষক তেমন করেই দিকনির্দেশক হিসেবে একটি উন্নত জাতি তৈরী করার শক্তি রাখেন। শিক্ষকতাকে তাই মহান পেশা বলা হয়ে থাকে। শিক্ষকসম্প্রদায় নিয়ে কোনো প্রবন্ধ লিখতে বসিনি আমি। আমার জীবনে যেসব শিক্ষকদের অবদান তাঁদের কথাই বলার জন্য এই লেখাটি।

আমার প্রথম স্কুল ময়মনসিংহ মিশনারি স্কুল। ওখানে বেশীদিন ছিলাম না। কিন্তু মনে পড়ে একজন শিক্ষিকা আমায় কোলে নিয়ে আদর করছেন। পরে শুনেছি উনি খুবই রাগী এবং কড়া শিক্ষিকা। থাকা হয়নি কারণ বাপিকে খুব মিস করতাম। মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। তারপর চলে আসি কানিহাটি চা’ বাগানের বাসায় বাপির চাকরীস্থলে। স্কুলে তখনও ভর্তি হইনি, বাসায় একজন শিক্ষক আসতেন। সবাই উনাকে বুড়া মাষ্টার বলে ডাকতো। আমি মাষ্টার স্যার বলে ডাকতাম। স্যারের স্বভাব ছিলো লেখা একটু বাঁকা হলেই আঙুলের মধ্যে পেন্সিল ঢুকিয়ে শাস্তি দিতেন, নয়তো হাতের উপরে চিমটি কাটতেন। ব্যথা হলেও চুপ করে থাকতাম। কারণ দোষ তো আমারই কেন জানালার বাইরে ওই মাঠের দিকে দৃষ্টি রাখি? মনটা দূরের ওই গরু-ছাগলের স্বাধীনভাবে চলাফেরা দেখতে ছুটে যেতো। যদিও স্যার যা শেখাতেন সবই আমার শেখা হয়ে গিয়েছিলো। সত্যিকার অর্থে আমার জীবনে প্রথম শিক্ষক এই বুড়া মাষ্টার স্যার। যখন উনার কোনো ছাত্রই সেভাবে ছিলোনা, প্রচন্ড দারিদ্রতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন, মামনি-বাপি টাকা দিতেন। এইতো সেদিনের কথা আমি যখন ইন্টারে পড়ি তখনও তিনি এসেছিলেন। মাথায় হাতটা দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন। অনার্সে ভর্তি হবার পর একদিন দেখেছিলাম, তারপর শুনেছি আর নেই। আমাদের শমশেরনগর চা’ বাগানের সব আপু-দিদি-ভাইয়াদের প্রথম শিক্ষাগুরু এই বুড়া মাষ্টার স্যার।

শমশেরনগর বাজারে রামচিজরাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। চোখে ভাসছে বাপির সাইকেলে চড়ে স্কুলে গেছি হেডস্যারের রুমে। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক জসীম স্যার। স্যারের আদর-ভালোবাসা-স্নেহ এর তুলনা নেই। স্যারকে সবাই-ই ভয় পেতো। কিন্তু স্যার আসলে বাইরেই কঠিন। তা নইলে আমায় একটা বেত মেরে ভোররাতে সেই চার মাইল দূরে আমাদের বাসায় কেন যাবেন? অন্যায় তো করেছিলাম, সহপাঠীদের টানাটানিতে স্কুলের বাইরে গিয়েছিলাম। সত্যি বলছি একটুকুও ইচ্ছে করেনি লুকিয়ে যেতে। আমাদের ক্লাশ ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার কোচিং চলছে। স্কুল বন্ধ। জসীম স্যার আমাদেরকে ইংরেজী ক্লাশ ওয়ার্ক দিয়ে নামাজ পড়তে গেছেন। আমাদের অঙ্কের শিক্ষক আশিক স্যার নামাজ শেষ করে এসে দেখেন ক্লাশে কেউ নেই। আশিক স্যার গিয়ে জসীম স্যারকে বললেন। স্যার নামাজ শেষ করে কারোও সাথে কথা বলছিলেন। তিনি এসে দেখেন কেউ নেই আমরা। যাক ক্লাশে ফিরে এসে দেখি জসীম স্যার বেত নিয়ে চেয়ারে বসা। উনি জিজ্ঞাসা করলেন বিথীকে বাইরে কেন গিয়েছি আমরা? বিথী বললো আমি নাকি সবাইকে টেনে নিয়ে গেছি। স্যারের থেকে প্রথম বেত এ হাতে। বাসায় গিয়ে হাত ফুলে ঢোল, সঙ্গে প্রচন্ড জ্বর। যেদিন ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলাম, স্যারের খুশী দেখে কে! বাসায় ছুটে এলেন সন্ধ্যায়, আমায় কোলে উঠিয়ে নিলেন। আরেকদিন এলেন আবার স্যারের আনন্দ আমি সম্পূর্ণ সিলেট জেলার(মৌলভীবাজার তখন সিলেট জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিলো) মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করি। আমায় নিয়ে স্যারের কি গর্ব, কতো যে আশা! সেই স্যার এখনও বাপিকে দেখতে রোজ আসেন। প্রায়ই ফোনে কথা হয়। মজাও করেন। স্যার বড়ো একলা আজ, চাচী গতবছর রোজা মাসে ঠিক ইফতারীর সময় ঈশ্বরের কাছে চলে গেছেন। বাপি-মামনির পরে আমি যে দম্পত্তিকে দেখেছি পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ, জসীম স্যার এবং চাচী তেমনই এক আদর্শ দম্পত্তি।

এই প্রাইমারী স্কুলে আরোও দুজন শিক্ষকের কথা না বললেই নয়। আমাদের অঙ্কের শিক্ষক আশিক স্যার। খুব শুকনা একজন মানুষ। আস্তে আস্তে কথা বলতেন। হাতে বেত থাকতোই। আমাকে খুব ভালোবাসতেন স্যার। কিন্তু উনার ভালোবাসাটা অনুভব করার, দেখানো ছিলোনা। খুবই অন্তর্মূখী ছিলেন তিনি। স্যারের চলাফেরা, বসন-ভূষণ খুবই সাধারণ। কিন্তু স্যার অসম্ভব মেধাবী ছিলেন। আমি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বের হবার পর শুনেছি উনি আর স্কুলে নেই। স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলেন। শুনেছিলাম অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু জানা হয়নি স্যার কি আছেন? না কি…! আরেকজন শিক্ষিকা যাঁর কথা ভাবলেই শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। উনাকে সকলে ডাকতো মাষ্টারনী স্যার। আমাদের বাংলা এবং সমাজ বিদ্যা(ভুলে গেছি সমাজ বিজ্ঞান নাকি বিদ্যা?) পড়াতেন তিনি। উনার চেহারা, বেশ-ভূষার সাথে আমি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের মিল পাই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, মাথায় ঘোমটা থাকতো, কিন্তু উনি ধর্মান্ধ ছিলেন না। তার কারণ বলি। স্কুলে ভর্তি হলাম, আমাকে একেকজন এসে জিজ্ঞাসা করে আমার ধর্ম কি। সত্যি বলতে কি আমায় মামনি শিখিয়েছিলো ধর্ম একটাই আর সেটা মানবতা। আমি বললাম মানবতা। হিন্দু মেয়েরা বসতে দেয়না, এদিকে মুসলমান মেয়েরাও না। স্যারেরা ক্লাশে এলে বসতে পারতাম, নইলে না। আমি কখনো কারো নামে নালিশ করিনি। একদিন মাষ্টারনী স্যার এসে কিভাবে জানি দেখে ফেললেন আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে ব্রেঞ্চ থেকে। সঙ্গে সঙ্গে বেত নিয়ে হাজির। আর প্রশ্ন কেন আমাকে বসতে দেয়া হচ্ছেনা। ওরা বললো মাষ্টারনী স্যার এর যে ধর্ম এখানে কারোর নেই। তখন উনি জানলেন মানবতার কথা। আমার স্পষ্ট মনে আছে কথাগুলো, বললেন, “এইটাই হইলো আসল ধর্ম। তুই পুজা করস, আর ওই মাইয়া তুই নামাজ পড়স। আল্লাহ/ভগবানরে দেখছোসনি?” সবাই না বললো। তখন বললেন, “আল্লাহ/ভগবান এইখানে, আমরার মনে। আমরা মানুষ, মানুষেরই মন থাকে। মানুষরে সালাম করিস, মানুষের ভিতরই আল্লাহ থাকে।” তারপর থেকে আমি বসার সিট পেলাম। মাষ্টারনী স্যারের কথা মনে আসতেই মনে আছে উনাদের বাড়ী স্কুলের একেবারে পাশে। উনি দুপুরের নামাজ পড়তে বাড়ী যেতেন, ফিরে এসে আমার মাথায় হাত ছুঁয়ে দিতেন। আজ বুঝি, ওই আশীর্বাদ আমাকে কখনো কোনো বিপদে আটকে রাখতে পারেনি।

**পুনশ্চ সেই শিক্ষকদের কোনো ছবি নেই আমার কাছে। কিন্তু মনের ফ্রেমে ঠিক বাঁধানো আছে। আর একটি কথা এ জীবনে আমার আদর্শ যে কয়েকজন শিক্ষক আছেন, তাঁদের সম্পর্কেই বলবো। এ জীবন অনেক ঋণী তাঁদের কাছে। সেই ঋণশোধ করা হবে না এসব লিখে, কিন্তু তাও লিখছি আপনাদের সকলকে জানাতে। আজকের আমার যদি কিছু ভালো থাকে, সব এই শিক্ষকদের থেকেই পাওয়া।

ক্রমশ—

হ্যামিল্টন, কানাডা  
৮ জুলাই, ২০১৬ ইং।

---

Comments: 38 — https://sonelablog.com/%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9b%e0%a7%87-%e0%a6%8b%e0%a6%a3%e0%a7%80-%e0%a6%8f-%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0/#comments
