# ‘মোহিনী মালদ্বীপ’ মোরশেদ হাসানের ভ্রমণ বিষয়ক উপন্যাস।

Author: মারজানা ফেরদৌস রুবা
Published: 2020-02-15
Category: বুক রিভিউ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%80-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%aa-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%b0%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%b9/

‘মোহিনী মালদ্বীপ’  
সাহিত্যানুরাগী চিকিৎসক মোরশেদ হাসানের লেখা একটি ভ্রমণকাহিনি বিষয়ক গ্রন্থ। দ্বীপদেশ মালদ্বীপকে নিয়ে লেখা এ গ্রন্থটি লেখালেখির জগতে লেখকের প্রথম প্রকাশ। তবে আমার পড়া এটি তাঁর দ্বিতীয় বই। মূলত আমি মোরশেদ হাসানের দ্বিতীয় বইটিই প্রথম পড়েছি। #ব্যাকরণ\_ও\_বিবিধ’ নামের বইটি গতবছর মেলা চলাকালীনই নজরে আসে। দারুণ উপকারী একটি বই। পরবর্তীতে একসময় ‘মোহিনী মালদ্বীপ’ বইটিও হস্তগত হয়।

‘মোহিনী মালদ্বীপ’ বইটি হাতে নিয়ে শুধু বই-ই পড়িনি, পুরো মালদ্বীপের ঘরেঘরে ঘুরে বেড়িয়েছি। এমন সহজ আর সাবলীলভাবে মালদ্বীপবাসীদের জীবন যাত্রার বর্ণনা এসেছে যে, প্রায়শই মনে হয়েছে আমি ওখানেই আছি, মালদ্বীপবাসীদের সাথে গল্প করছি, আড্ডা দিচ্ছি। আড্ডা দিতে দিতে একসময় দেখেছি ওরা ওদের সামাজিক সংস্কৃতিরই অংশ হিসাবে আতিথেয়তা দেখাতে আমার হাতেও রোদে শুকানো খটখটে একখানা মাছ ধরিয়ে দিয়েছে চিবানোর জন্য। ধরনটা এমন, আমরা যেমন চা খেতেখেতে আড্ডা দিই, তারাও অমন। কেবল উপকরণটা ভিন্ন। কী অদ্ভুত সংস্কৃতি!

বইটির প্রতি পরতে পরতে মালদ্বীপবাসীদের অবাক করা অনেক বিবরণই উঠে এসেছে লেখকের সূতীক্ষ্ম দৃষ্টির কারণে। পাশাপাশি ঝোপঝাড়পূর্ণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে গঠিত দ্বীপদেশ মালদ্বীপ কোনো ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াই শুধুমাত্র সাগরের মাছ আর সাগরের সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন ব্যবসার মাধ্যমে মাত্র তিন দশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী একটি দেশে পরিণত হয়েছে, এ নিয়ে প্রায়শই লেখকের দুঃখভরা খেদোক্তি বইটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নাগরিকদের জাতিয়তাবোধের কারণেই তা সম্ভবপর হয়েছে। তাদের সততা, সচেতনতা, রাষ্ট্রীয় নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলার ধরণে লেখককে প্রায়শই অবাক হতে দেখা গেছে। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, “এখানে জিনিস হারাতে চাইলেও অনেকসময় হারানো যায় না।” শিষ্টাচারের বর্ননা দিতে গিয়ে লিখেছেন, “এরা উচ্চস্বরে কথা বলা কেমন তা জানেই না।” এসব বলতে গিয়ে নিজদেশের মানুষগুলোর মলিন চেহারা ভীষণ প্রকটভাবে তাঁর মানসপটে ধরা দিয়েছে। কপটতা, অসততা, উৎশৃঙ্খলতা, শিষ্টাচারের অভাব, যেন সব কুআচরণের সমাহারে একটা জাতি আমরা। ভীনদেশে গেলে নিজেদের দীনতা এভাবেই প্রকট হয়ে চোখে পড়ে।

যাহোক, বইটির ৭৫ পৃষ্ঠায় শব্দের লড়াই নিয়ে যে ব্যাখ্যাটি এসেছে, উপস্থাপনাটি দারুণ। আর ঠিক এ জায়গাটিতে এসেই আমি একজন বৈয়াকরণিক মোরশেদ হাসানকে খুঁজে পেয়েছি। আহ! গল্পচ্ছলে বর্ণনাটি কী দারুণ, “মূল্য গিয়েছে বইয়ের প্রচ্ছদের পরের পাতায়।” অর্থাৎ এ বাক্যটির মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে, মূল্য সংস্কৃত শব্দ। কিন্তু তাকে টেক্কা দিয়েছে গ্রীক শব্দ ‘দাম’ ( গ্রিক মুদ্রা দ্রখমা থেকে দাম, যা গ্রিকদের ভারত বিজয়ের সময়ে আগত। রসকষহীন ব্যাকরণ বৈয়াকরণবিদ মোরশেদ হাসানের পাঠদানে যে কত রসাত্মক হয়ে ওঠে সে আমি তাঁর ‘ব্যাকরণ ও বিবিধ’ বইটি পড়েই বুঝেছি। ঠিক এ বেলায়ও ব্যাকরণের শব্দ লড়াইয়ের দিকটা পড়ে শেষ করেই লেখকের আরেকটি লফজ শুনে অজান্তেই হাসিতে গড়াগড়ি খেয়েছি। তিনি এখানে মালদ্বীপের অধিবাসী এক বাচ্চা ছেলের একটি লফজ (শব্দ বা কথা) বলে পাঠকের পেট মোচড়ানো হাসির খোরাক এনে দিয়েছেন। ইয়েস, গুডো গুডো (মালদ্বীপীয়রা গুডকে এভাবেই গুডো বলে)। আর তাই বইটির ৭৫ পৃষ্ঠা থেকেই আমার পড়া শুরু হয়েছে ধীর গতিতে আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে। এর আগে পর্যন্ত পুরো মালদ্বীপ চষে বেড়িয়েছি। বেড়াতে বেড়াতে নিজেও কখনো কখনো মালদ্বীপীয় অধিবাসীদের সাথে মিশে গিয়েছি।

সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলব, যাঁরা বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি সম্বন্ধে ধারণা লাভ করতে আগ্রহী, তাঁরা Morshed Hasan -এর ‘মোহিনী মালদ্বীপ’ বইটি পড়তে পারেন। নিশ্চিত করেই বলতে পারি, মালদ্বীপীয় সংস্কৃতির পরিপূর্ণ ধারণাই পেয়ে যাবেন।

বইটি পাওয়া যাবে-  
বলাকা প্রকাশন  
স্টল: ৭২৫  
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
