# মুসাফির

- Author: [নাজমুল আহসান](https://sonelablog.com/author/mukto90/)
- Published: 2019-08-29T05:10:00+00:00
- Updated: 2019-08-29T07:59:04+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- Tags: অমীমাংসিত, গল্প, ডেজা ভ্যু, দেজা ভ্যু, প্যারালাল ইউনিভার্স, বিজ্ঞান, মাল্টিভার্স, রহস্য গল্প, রহস্যময়
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%ab%e0%a6%bf%e0%a6%b0/

---

আমি পেশাদার গল্পকার নই। মন ভালো থাকলে মাঝে মাঝে গল্প লিখি। নিয়মিত লিখি না বলেই হয়তো অনেকে আমার গল্পগুলোকে বাস্তব মনে করেন। কিছুদিন আগে একটা ছোটোখাটো রহস্য গল্প লিখলাম, [মোটরসাইকেল এ্যাক্সিডেন্ট করেছি](https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a6%b8%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a6/) -এরকম একটা অংশ ছিল। এরপর কয়েকদিন ধরে পরিচিতদের ফোন আসতে লাগল- এখন কেমন আছি, সুস্থ হয়েছি কিনা!

বাসায় ফিরতে পৌনে দশটা বেজে গেল। অফিসে কাজের প্রচণ্ড চাপ যাচ্ছে। প্রায়ই ফিরতে দেরি হয়ে যায়। গত এক মাসে ন’টার আগে কখনো বাসায় ফিরেছি, এরকম মনে পড়ছে না।

সাধারণত বাসায় এসে চারটা মুখে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়ি। অনেক সকালে উঠতে হয়। ঠিকঠাক ঘুম না হলে সারাদিন অস্বস্তি লাগে। শরীর ম্যাজম্যাজ করে।  
রান্নাঘরে ঢুকে বুঝতে পারলাম, বুয়া আসেনি। হঠাৎ করে মাথা গরম হয়ে গেল। আগে জানলে বাইরে থেকে কিছু খেয়ে আসতাম। এখন এতো রাতে রান্নার ঝামেলায় যাওয়া সম্ভব না। বৃষ্টি শুরু হয়েছে, বের হওয়াও মুশকিল। ফ্রিজে কয়েকদিনের বাসি ভাত পাওয়া গেল। এটা কোনোভাবে কাজে লাগানো যায় কিনা ভাবছি, এমন সময় কলিং বেল বাজল।

আমি বলতে গেলে চমকেই উঠলাম। এই প্রায়-মাঝরাতে আমার কাছে কারও আসার কথা নয়। মাসের শুরু হলে ভাবতাম বাড়িঅলা এসেছেন। ঢাকা শহরের বাড়ির মালিকেরা মাসের শুরুর দিকে খুব সজ্জন হয়ে ওঠেন। ভাড়াটিয়া কেমন আছে, কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা জানার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কে হতে পারে ভাবতে ভাবতে দরজা খুললাম। এবং আরেকবার চমকে উঠলাম।

লম্বা একজন মানুষ দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে গেছেন। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল। মুখভর্তি দাড়িগোঁফ। চুল-দাড়ি বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। ভদ্রলোক আমার হাতে একটা ব্যাগ দিতে দিতে বললেন, এখানে আপনার রাতের খাবার আছে।  
আমি বললাম, আমার খাবার মানে? আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।

ভদ্রলোক আমাকে এক প্রকার সরিয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। বললেন, একটা গামছা বা তোয়ালে দিতে পারেন? আপনাকে কি বিরক্ত করলাম?  
– তা তো একটু করলেনই। আপনার পরিচয় জানতে পারি?  
– আমার নাম মারুফ। মারুফ হোসেন। দেশের বাইরে থাকি। মিডল-ইস্টের একটা দেশে কাজ করি। আপনাকে এতো রাতে বিরক্ত করার জন্যে আমি সত্যি দুঃখিত। কিন্তু আমার আসলে উপায় ছিল না।  
আমি বললাম, কীরকম?  
মারুফ বললেন, আমি দেশে এসেছি প্রায় এক মাস। পারিবারিক একটা কাজ ছিল। সেটা শেষ করার পর আপনার নাম জানলাম। আপনাকে খুঁজে বের করতে এই কয়টা দিন চলে গেল। আমি কালই চলে যাব। সেজন্যে রাতেই আপনার কাছে আসতে হল। আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করেছেন?  
বললাম, আমি বিশ্বাস করাটা কি গুরুত্বপূর্ণ?  
– জ্বি, গুরুত্বপূর্ণ। আমি আসলে আপনার কাছে একটা সাহায্যের জন্যে এসেছি।  
– আপনি কি নিশ্চিত আপনি আমার কাছেই এসেছেন?

আমার কেন যেন মনে হল, এই ভদ্রলোক টাকাপয়সা চাইতে এসেছেন। হয়তো আমার কোনো শিক্ষকের পরিচিত, সেই শিক্ষক জোড় গলায় আমার প্রশংসা করে পাঠিয়েছেন, আমার কাছে এলেই সাহায্য পাওয়া যাবে!

মারুফ হাসলেন। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, জ্বি, আপনার কাছেই এসেছি। এই চিঠিটা শফিক সাহেব দিয়েছেন।  
আমি চিঠিটা হাতে নিলাম। ভিজে জবুথবু হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে পাঠোদ্ধার করা গেল। দেড় লাইনের চিঠি-

> “এই ছেলের নাম মারুফ। আমার পরিচিত। ভালো ছেলে। সে বিপদে পড়েছে। যথাসাধ্য সাহায্য করবে।
>  ইতি,
>  তোমার শিক্ষক,
>  শফিকুল ইসলাম”

আমি চিঠিটা মারুফের হাতে ফেরত দিয়ে বললাম, আপনার কোথাও ভুল হয়েছে। আপনি বোধহয় অন্য কাউকে খুঁজছেন। চিঠি যিনি দিয়েছেন, তাঁকে আমি চিনি বলে মনে হচ্ছে না।

ভদ্রলোককে এবার বিব্রত মনে হল। মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, ওহ, তাহলে তো ভুলই হয়ে গেল! দেখেন দেখি কী অবস্থা! কিন্তু শফিক সাহেব তো বললেন উনি আপনাদের ভার্সিটির শিক্ষক ছিলেন।

আমার মনে পড়ল। শফিক স্যার আমাদের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক পড়াতেন। অল্পবয়সী লেকচারার।  
বয়স্ক প্রফেসরদের সাথে ছাত্রদের দূরত্ব কখনোই কমে না, কিন্তু লেকচারারদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটে উল্টো। শফিক স্যারের সাথে অল্পদিনেই আমাদের সুসম্পর্ক হয়ে গেল। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্যারকে পছন্দ করতাম। খুব চমৎকার পড়াতেন। ক্লাসে একটা উৎসবের আমেজ থাকত। মাঝে মাঝে রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে যেতেন।  
কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ঠিক আমার আগ্রহের বিষয় ছিল না, তবুও কীভাবে কীভাবে যেন ভালো রেজাল্টও করে ফেলেছিলাম। পড়ানোর ধরণের একটা প্রভাব নিশ্চয়ই ছিল। স্যার আমাদের ক্লাস নিয়েছিলেন বছর খানেক। এরপর নরওয়ে চলে গেলেন। ইন্টারনেটের কল্যাণে শুরুর দিকে মাঝে মাঝে যোগাযোগ হলেও খুব দ্রুতই সেটা বন্ধ হয়ে গেল।

আমি আগন্তুককে সমাদর করা শুরু করলাম। শিক্ষকের পরিচিত বলে কথা! ড্রয়িং রুমে নিয়ে গিয়ে বসালাম। ভদ্রলোক ততক্ষণে স্বাভাবিক হয়েছেন। আমি বললাম, মারুফ সাহেব, আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন?  
মারুফ বললেন, আমি একটা সমস্যায় পড়েছি। সমস্যা না বলে আসলে বিপদ বলা উচিৎ।  
বললাম, কেমন বিপদ?  
মারুফ সাবধানে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন। বললেন, আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাই!

আমার সারাদিনের ক্লান্তি হঠাৎ করে ফিরে এলো। বিরক্তি চেপে রেখে বললাম, দেখুন, ভবিষ্যৎ কেউ দেখতে পায় না। আর আপনি যদি দেখতে পান, সেটা তো ভালো। এটাকে বিপদ বলছেন কেন?  
মনে হল ভদ্রলোক আশাহত হয়েছেন। বললেন, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি, না?  
আমি বললাম, না।  
মারুফ বললেন, কাউকে আসলে বিশ্বাস করানো কঠিন। আমি কি একটু খুলে বলব?  
ভদ্রতার খাতিরে বললাম, বলুন।

মারুফ সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে এলেন। পকেট থেকে ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন। মুখ মোছা শেষ করে রুমালটা হাতের মধ্যে নিয়ে কচলাতে শুরু করলেন। আমি বুঝতে পারলাম, ঠিক কীভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না। বললাম, শুরু করুন। আর তার আগে বলুন, আপনি আমার কাছে এসেছেন কেন?  
মারুফ বললেন, আমি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যায় এরকম কাউকে খুঁজছিলাম। সাইকিয়াট্রিস্ট দেখিয়েছি, কেউ কোনো সমাধান করতে পারেননি। শফিক সাহেব আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। কথা প্রসঙ্গে উনি আপনার কথা বললেন। অ্যাবনরমাল বিষয়ে আপনার আগ্রহ আছে জানালেন। আর তাছাড়া আপনার কিছু লেখাও পড়লাম। কিছুদিন আগে একটা ঘটনা লিখেছিলেন, [একটা ছেলের মা মারা গেছেন অনেক আগে, কিন্তু সে তার মাকে দেখতে পায়](https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%9a%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%ad%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%a8/)– এরকম।  
আমি বললাম, মারুফ, ওটা ঘটনা ছিল না, ওটা ছিল একটা গল্প।  
– কেন, সত্যি ঘটনা না?  
– বললাম তো, ওটা গল্প ছিল।  
মারুফের উৎসাহের প্রদীপ দপ করে নিভে গেল। শুধু বললেন, আপনি এসব নিয়ে স্টাডি করেন তো?  
– ঠিক স্টাডি করা বলা যাবে না, তবে আগ্রহ আছে। আচ্ছা, আপনি আপনার বিষয়টা খুলে বলুন। ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার ব্যাপারটা কেমন? একটা এক্সাম্পল দিন তো।  
– আপনার বাসায় রান্না হয়নি এটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আপনার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে ভাবলাম কিছু খাবার নিয়ে আসি।  
বললাম, মারুফ সাহেব, আমার ধারণা আপনি আমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। আমার বাসায় রান্না হয়নি -এটা বুঝতে পারা খুব সহজ। আপনি আমার সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন, আমি একা থাকি। বৃষ্টিবাদলের দিন। কাজের লোক না আসাই স্বাভাবিক। আর আপনি যেহেতু বললেন, অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন, আমার বুয়া এসেছে কিনা আপনি এমনিতেই বুঝতে পারবেন।

মারুফ মাথা নিচু করে থাকলেন। আমি বললাম, আপনার ভবিষ্যৎ দেখার ব্যাপারটা যদি এরকম হয়, তাহলে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। আপনার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে, আপনার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি। আপনি কি আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?  
– জ্বি। কিন্তু আমি আপনাকে অন্য একটা ঘটনা বলতে চাই।  
– তার কি আসলেই দরকার আছে?  
– জ্বি, আছে।  
– আচ্ছা, বলুন।  
মারুফ বললেন, আমি তখন কলেজ পাশ করেছি। ফ্যামিলির আর্থিক অবস্থা ভালো না। বড়ভাই চাচ্ছিলেন পড়াশুনা চালিয়ে যাই, কিন্তু বাবার ইচ্ছা আমাকে মিডল-ইস্টে পাঠাবেন। আমাদের পাশের এলাকায় কামাল নামের এক লোক ছিলেন। বিদেশে লোকজন পাঠানোর কাজ করতেন। গলাকাটা পাসপোর্ট বলে একটা ব্যাপার ছিল, ওইসব করতেন আরকি। একজনের পাসপোর্টের ছবিতে অন্যজনের মাথা লাগিয়ে কোনোভাবে কিছু করতেন। আমি বাবার কাছে ঠিকানা নিয়ে কামাল ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলাম। আমাদের বাড়ি থেকে আট-নয় কিলো পথ। গাড়িঘোড়া চলে না, সাইকেলে যেতে হয়।

কামাল ভাইদের গ্রামে পৌঁছলাম বিকেলে। আগে কখনো এই এলাকায় আসিনি। গ্রামের শুরুতে একটা বিরাট বটগাছ। বটগাছের নিচে গিয়ে সাইকেল থেকে নামলাম। সাথে সাথে আমার মনে হল, আমি এই রাস্তাঘাট চিনি। মনে হল, আগেও একদিন এখানে সাইকেলে করে এসেছিলাম।  
মারুফ থামলেন। আমি বললাম, এটার নাম দেজা-ভ্যু।  
– মানে?  
– মানে এটা খুবই কমন একটা ব্যাপার। অনেকের সাথেই এরকম ঘটেছে। আমার মনে হচ্ছে, আপনি অকারণে ব্যাপারটাকে জটিল করে ফেলেছেন।  
– হতে পারে।  
মারুফকে স্বাভাবিক করার জন্যে বললাম, এরকম আর কোনো গল্প কি আছে?  
– আছে।  
– চলুন, খাওয়াদাওয়া সেরে নেই। তারপর আপনার গল্প শোনা যাবে।

মারুফ দ্বিতীয় যে গল্পটি বললেন, সেটাও কাছাকাছি ধরণের। কলেজে ক্লাসে বসে তাঁর মনে হয়েছে, এই ক্লাস তিনি আগেও করেছেন।  
– বুঝলেন, আমার হঠাৎ মনে হল, স্যার আমাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবেন। আমি ভালো ছাত্র ছিলাম না। আর স্যাররা সাধারণত এরকম ছাত্রদেরকেই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন বেশি। আমি বই খুললাম। স্যার যে চ্যাপ্টার পড়াচ্ছেন, সেটা বের করলাম। একটা লাইন জোর করে মুখস্থ করলাম। প্রায় সাথে সাথেই স্যার বললেন, মারুফ দাঁড়া। আমি দাঁড়ালাম। স্যার এবার আমি যে অংশটা পড়ছিলাম, সেটাই জিজ্ঞেস করলেন।  
আমি বললাম, আপনার এই গল্প কি এখানেই শেষ?  
মারুফ মাথা ঝাঁকালেন।  
আমি এবার শব্দ করে হাসলাম। বললাম, এই ঘটনারও তো একই ব্যাখ্যা। আপনি পুরো ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরেছেন। হতে পারে, আপনি বই খুলেছেন, এটা স্যারের নজরে পড়েছে। এজন্যে স্যার আপনাকেই জিজ্ঞেস করেছেন। আর প্রশ্ন মিলে যাওয়ার ব্যাপারটা কাকতালীয়! বুঝতে পারছেন?  
– জ্বি।  
– আর আপনার এই দুই ঘটনার কোনোটাই প্রমাণ করে না আপনি ভবিষ্যৎ দেখতে পান। এরকম অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটে। ইনফ্যাক্ট আমার সাথেও এরকম কয়েকবার ঘটেছে। এটাকে বলে দেজা-ভ্যু। যদিও পুরো বিষয়টার বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।  
– একটু বিস্তারিত বলতে পারবেন?

বললাম, আমি নিজেও ভালো জানি না। আর এই বিষয়টার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে পারেনি। দেজা-ভ্যু শব্দটা ফ্রেঞ্চ। এটার মানে- যেটা আগেও দেখা হয়েছে। অলরেডি সীন। মোটামুটি পনের থেকে পঁচিশ বছর বয়সীদের মধ্যে এটা বেশি হয়ে থাকে। ষাট বছরের বেশি বয়সে কারও এরকম হয়েছে বলে জানা যায়নি।  
– কিন্তু দেজা-ভ্যু জিনিসটা আসলে কী?  
– অনেকগুলো ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। সবগুলোই অনুমান। মোটামুটি যুতসই একটা ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমরা যখন কিছু করি, কিছু খাই বা দেখি, তখন অনেকগুলো অভিজ্ঞতা একসাথে আমাদের ব্রেনে পৌঁছায়। খাবারের গন্ধ, রং, স্বাদ আর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ – সব একসাথে মিলে ব্রেনে পৌঁছার পর আমরা পুরো অভিজ্ঞতাটা পাই। কিন্তু কোনো কারণে যদি একটা তথ্য দেরিতে পৌঁছায়, তখন মনে হয় এই ঘটনাটা আগেও ঘটেছে। কারণ অভিজ্ঞতার কিছু অংশ আগেই মস্তিষ্কে পৌঁছেছে।  
– ইন্টারেস্টিং তো!  
– হ্যা, ইন্টারেস্টিং। যেমন ধরুন, আপনি একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে চায়ের অর্ডার দিলেন। একটু পর দেখলেন ওয়েটার চা নিয়ে আসছে। আপনার একদম কাছে চলে এসেছে। আপনি বিপুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন, একটু পরই চা খেতে পারবেন। এমন সময় আপনার ফোন বেজে উঠল। আপনি ফোন ধরলেন। আপনার মনোযোগ অন্যদিকে সরে গেল। কথা শেষ করে যখন ফোন রাখলেন, তখনই ওয়েটার আপনার টেবিলে চায়ের কাপ রাখল। এরকম পরিস্থিতিতে আপনার মনে হতে পারে, আপনি এই রেস্টুরেন্টে এর আগেও এসেছিলেন। ঠিক একই ওয়েটার একইভাবে আপনাকে চা দিয়ে গিয়েছিল।  
– এরকম কেন মনে হবে?  
– কারণ, যখন আপনার ফোন বাজল, তখন চা প্রায় চলে এসেছিল। আপনার ব্রেন ধরে নিয়েছে এই ঘটনাটা কমপ্লিট হয়েছে। ফোন রাখার পর ওয়েটার যখন চা টেবিলে রাখল, তখন ব্রেন ভাবল এটা অন্য একটা ঘটনা। যদি এটা আগের ঘটনারই অংশ।  
মারুফ মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, মজার বিষয়, কিন্তু হুট করে মাথায় ঢুকবে না।  
আমি বললাম, হ্যা। দেজা-ভ্যুর আরও একটা মজার ব্যাখ্যা আছে।  
– কী রকম?  
– অনেকে মনে করেন এটা প্যারালাল ইউনিভার্স কনসেপ্ট-এর সাথে সম্পৃক্ত।

মারুফ খপ করে আমার হাত ধরলেন। বললেন, আপনাকে একটা সত্যি কথা বলি?  
– বলুন।  
– আমি এই ব্যাপারটা নিয়েই আসলে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আমি আপনার ওই লেখাটা পড়েছি, যেখানে [একটা ছেলের মা অন্য জগত থেকে মাঝে মাঝে চলে আসে](https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%9a%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%ad%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%a8/)।  
আমি বললাম, মারুফ সাহেব, আমি আপনাকে একবার বলেছি, ওটা একটা গল্প ছিল।  
– আমার ধারণা ওটা গল্প ছিল না। ওটা সত্যি ঘটনা ছিল, আপনি স্বীকার করছেন না।  
– স্বীকার করব না কেন?  
– জানি না কেন। তবে আমার কেন এরকম মনে হচ্ছে জানেন?  
– কেন মনে হচ্ছে?  
একটা লম্বা নিশ্বাস নিয়ে মারুফ বললেন, কারণ আমার মনে হয় আমি মাঝে মাঝে অন্য জগতে চলে যাই।

আমি চমকে উঠলাম। বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। এই আগন্তুকের কথাবার্তা শুরুর দিকে অগোছালো মনে হলেও, এখন যথেষ্ট সিরিয়াস মনে হচ্ছে। আমি প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে খোঁজ খবর করেছি। বিজ্ঞানীদের একটা দল বিশ্বাস করেন, আমাদের এই পৃথিবীর বাইরেও আরও জগত আছে। সেগুলোতেও আমরা বাস করি। প্রতিটা জগতে আমাদের জীবন প্রবাহ প্রায় একই। হয়তো সময়ের কিছু তারতম্য থাকে। এখানে আমি চাকুরী করি, অন্য জগতে হয়তো বেকার!

আমি বললাম, আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি কি বলছেন?  
– জ্বি, পারছি।  
– কেন মনে হয় এরকম?  
– মাঝে মাঝে আমি অন্য জগতে চলে যাই। সেই জগতটা এখানকার চেয়ে এগিয়ে। প্রায়ই এমন হয়, আমি ওই জগতে যা দেখে আসি, এখানে আসার পর সেগুলো ঘটতে থাকে!  
– কখন এরকম হয়?  
– ঠিক নেই। বেশিরভাগই যখন বাসায় একা থাকি অথবা ঘুমাই তখন। জেগে থাকা অবস্থায় হলে কয়েক মিনিট আগে থেকে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। তীব্র ব্যথা হয়। প্রথম যেদিন এরকম হল, আমি না-ঘুম না-তন্দ্রার একটা অবস্থায় চলে গেলাম। দেখি অফিসে বসে আছি। বসের জন্মদিন। খুব হইচই হচ্ছে। সবাই বসের জন্যে কিছু না কিছু গিফট এনেছে। ইংলা নামের একটা মেয়ে আছে আমাদের অফিসে। কোরিয়ান মেয়ে। প্রায়ই বসের সাথে ঘুরতে যায়। ইংলা এনেছে ঢাউস সাইজের একটা স্যুট। সেটা জোর করে বসকে পরিয়েছে। বস বেঁটেখাটো মানুষ, সেই বিশাল স্যুট তাঁর গা গলে পড়ে যাচ্ছে। ইংলা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে।  
মারুফ থামলেন। আমি বললাম, তারপর?  
– তারপর আমার তন্দ্রা কেটে গেল। সব স্বাভাবিক। পরদিন অফিসে গিয়ে শুনি বসের জন্মদিন। ইংলা বসের জন্যে অনেক বড় সাইজের স্যুট এনেছে। বসকে পরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। মাপে হচ্ছে না। ইংলা হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। ঠিক যেরকম আমি আগেরদিন দেখেছিলাম। আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করছেন?  
আমি বললাম, জানি না। বিশ্বাস করব কিনা বুঝতে পারছি না। আপনি কি কাল সকালে একবার আসতে পারবেন? অথবা চাইলে এখানে আজকের রাতটা থেকে যেতে পারেন।  
মারুফ উঠে দাঁড়ালেন, না, থাকব না। তবে চেষ্টা করব কাল আসার। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, আপনি আমাকে একটা সমাধান দিতে পারবেন।

আমি মারুফকে এগিয়ে দিয়ে এলাম। দরজা বন্ধ করে সোফায় বসে পড়লাম। হতে পারে সবগুলো গল্পই মিথ্যা। কিন্তু একজন মানুষ মাঝরাতে এসে এরকম গল্প কেন করবে?

ঘুমাতে যাব, ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছে। খেয়াল করলাম, মারুফ একটা খাম আর পত্রিকা ফেলে রেখে গেছেন। পত্রিকা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতেই চমকে উঠলাম। ডানদিকের কলামে একটা দুর্ঘটনার খবর। কুয়েতে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি আহত। নিচে মারুফের ছবি।

আমি চট করে পত্রিকার তারিখের দিকে তাকালাম। ৩১ আগস্ট, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলাম, সেখানে ২৯ আগস্ট! আমার মাথা ঘুরতে লাগল। নিশ্চিত হওয়ার জন্যে টেলিভিশন চালু করলাম, নিচে স্ক্রলে ২৯ তারিখ দেখাচ্ছে।

---

Comments: 30 — https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%ab%e0%a6%bf%e0%a6%b0/#comments
