# মুক্তিযুদ্ধ, ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ ও একজন অ্যালেন গিন্সবার্গ

Author: সাতকাহন
Published: 2015-07-19
Category: মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%b0/

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যে বিদেশি নাগরিকদের ভূমিকা বাংলাদেশের জনগণ কখনও ভুলবে না, তাঁদের মাঝে অ্যালেন গিন্সবার্গ একজন। মার্কিন কবি ও গীতিকার অ্যালেন গিন্সবার্গের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের বেথ ইসবায়েল হাসপাতালে এক রাশিয়ান ইহুদি পরিবারে। জন্মের পর দাদার বাবার নামে তাঁর নাম রাখা হয় আভরুম গিন্সবার্গ। পরে এই নাম বদলে তিনি হয়ে ওঠেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। তাঁর বাবা লুই গিন্সবার্গ ছিলেন স্কুল শিক্ষক এবং কবি। লুই গিন্সবার্গের কবিতা নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হতো। গিন্সবার্গের মা নওমি ছিলেন মার্কসবাদী ও নগ্নবাদে বিশ্বাসী।

ছোটবেলা থেকেই গিন্সবার্গ রাজনৈতিক পরিবেশের মাঝে বড় হতে থাকেন। তাঁর মা ছিলেন বামপন্থী রাজনীতিবিদ এবং বামপন্থীদের অনেক গোপন সভা তাঁদের বাসায় অনুষ্ঠিত হতো। তাই তিনি তরুণ বয়সেই রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠেন। নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু, শ্রমিক অধিকার ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে চিঠি লেখা শুরু করেন একদম তরুণ বয়স থেকেই। তবে ছোট বেলায় তাঁর ইচ্ছা ছিলো আইন ব্যাবসায়ী হবার, কিন্তু স্কুলজীবনে ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতা পড়ে তিনি কবিতার প্রেমে পড়ে যান এবং সে সময় এডগার অ্যালেন পো হয়ে উঠেন তাঁর প্রিয় কবি।  
১৯৪৩ সালে তিনি ইস্টসাইড হাই স্কুল থেকে স্কুল পাস করে হিব্রু এসোসিয়েশন-এর স্কলারশিপ নিয়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখানে তাঁর বন্ধুত্ব হয় নিল ক্যাসিডি এবং জ্যাক কেরুয়ার সাথে। যাঁদের সাথে মিলে পরবর্তীকালে গিন্সবার্গ বিট প্রজন্মের নেতৃত্ব দেন। তাঁদের সাথে পরিচিত হবার পর থেকেই গিন্সবার্গ লেখালেখিটা শুরু করেন গুরুত্বের সাথে। মাঝে পড়াশুনার খরচ যোগাতে মার্কিন নৌবাহিনীর সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের কাজেও যোগদান করেন এবং এই কাজে পোর্টোরিকোসহ আরও অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ান। বিট সাহিত্য হচ্ছে আমেরিকান সাহিত্য থেকে আলাদা এক সাহিত্য তবে আমেরিকান সাহিত্য থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নও নয়। বিট সাহিত্যিকরা বিটকে সংজ্ঞায়িত করে “প্রাইভেট ইজ পাবলিক” বলে। বিট সাহিত্যের সিংহ ভাগজুড়ে আছে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি। বিটদের সাহিত্য তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির আলোকে লেখা হলেও এটা স্মৃতিকাতরতা নয়, এখানে পাঠক খুঁজে পাবে নিজেদেরকে, খুঁজে পাবে নিজের কণ্ঠস্বর। তাঁদের লেখায় আছে তারুণ্য ও দ্রোহ। তাঁদের লেখায় ছিলো ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা। সমাজের সকল অস্থিরতা অনৈতিকতার বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদ ছিলো। গিন্সবার্গ বলেছিলেন, “বাস্তবতা বিবর্জিত এবং শুধু ঈশ্বরের প্রতি অগাধ প্রেম নিবেদন করে মহৎ সাহিত্য হতে পারে না। সাহিত্যকে অবশ্যই বাস্তবসম্মত হতে হবে।”

কার্যত এ কারনেরই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তাঁর দৃষ্টিতে বড় মানের কবি মনে হয় নি। তাঁর দৃষ্টিতে বাংলার সব থেকে প্রতিভাবান কবি হচ্ছেন জীবনানন্দ দাশ। যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সব লেখা তিনি পড়েন নি। গুটি কয়েক লেখা পড়ে হয়তো তাঁর এমন মনে হতে পারে এবং যদি বেশির ভাগ লেখাই পড়তেন তবে তাঁর মতামত ভিন্ন হলেও হতে পারতো বলে আমার মনে হয়।  
১৯৫৫ সালে গিন্সবার্গ তাঁর সমস্ত কাজ ছেড়ে দিয়ে কবিতা লেখার কাজে মনোনিবেশ করেন। এবং এর কিছুদিন পরেই তিনি লেখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘Howl’ এই কবিতা তাঁকে এনে দেয় আকাশচুম্বী খ্যাতি এবং কবিতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে অনুপ্রেরণা যোগায়।  
গিন্সবার্গ ছিলেন যুদ্ধবিরোধী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষের দিকে তখন তিনি ২২ বছরের যুবক। তাঁর জীবনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছাড়াও তিনি অবলোকন করেছেন কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার আগ্রাসন; দেখেছেন বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা। যুদ্ধ একটি দেশকে কিভাবে মেধা শূন্য করে সে বিষয়ে গিন্সবার্গ বলেন, “যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে একটি দেশ ভয়ংকর ভাবে ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার পর যে নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠতে থাকে তারা অসুস্থ এবং উন্মাদ হয়ে যায় কারণ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা যুদ্ধ পরবর্তী মেধাবী প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়।”

পৃথিবীতে যখন যেখানেই যুদ্ধ সংগঠিত হোক না কেনো গিন্সবার্গ সব সময় তার প্রতিবাদ করেছেন। কখনো হয়তো রাজপথে নেমে, কখনো হয়তো কবিতায়, কখনো আবার যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য তহবিল সংগ্রহে নেমেছেন। ১৯৬০ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে আক্রমণ করে তখন তিনি রাস্তায় রাস্তায় আন্দোলন করেছেন। এ সময় সরকার আন্দোলন থামাতে আন্দোলন কারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে, তাঁদের সরকারি চাকুরী থেকে বহিষ্কার করে। তবুও তাঁদের এ আন্দোলন থেমে থাকে নি এবং জনগণের চাপের কারনেই যুক্তরাষ্ট্র এক সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতি টানে। ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কঠোর সমালোচক ছিলেন গিন্সবার্গ। তিনি বলেন, “দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন কেনো পাশাপাশি থাকতে পারবে না? একজন আরেক জনকে স্বীকার না করে বরং ধ্বংস করতে ইচ্ছুক? এটা হচ্ছে শুধুমাত্র আমেরিকার ইচ্ছায়।”  
একবার ইসরায়েলে গিয়ে তিনি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলেন, তখন তাঁকে ইসরায়েল থেকে বের করে দেয় তৎকালীন সরকার। জাতিসংঘ নিয়ে গিন্সবার্গের কথাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ তিনি বলেন, “জাতিসংঘ একটা অকার্যকর প্রতিষ্ঠান, অনেকটা ক্লাবের মতো। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এখানে আসেন, আড্ডা দেন, চা কফি পান করেন, বাথরুমের কাজ সারেন; এই পর্যন্তই। কোনো সমস্যার সমাধান তাদের দিয়ে হয় না।”

এইসব খোলামেলা ও সরাসরি মন্তব্যের জন্য এবং সরকারের কুকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য আমেরিকান সরকার তাঁকে বারবারই ফাঁসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে তারা। এর মাঝে ১৯৭০ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন বিরোধী আন্দোলনে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতারও করে, কিন্তু গ্রেফতারের ভয় তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারে নি। ১৯৮০ সালে তিনি আবার সরকার বিরোধী আন্দোলনে নামেন এবারের বিষয় প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের নিকারাগুয়া নীতি। কোনোভাবেই তাঁকে দমিয়ে রাখতে না পেরে সরকার এক সময় এফবিআই’কে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিলো মাদক পাচারের অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেয়ার জন্য। এটা তাদের জন্য কিছুটা সহজই ছিলো কেনোনা গিন্সবার্গ ছিলেন মাদকের পক্ষে। কিন্তু সরকারের এই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়।  
গিন্সবার্গ মাদককে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিলেন কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষাপাতি ছিলেন না। মাদক সম্পর্কে তাঁর যুক্তি ছিলো, “আমরা ধ্বংস হওয়ার জন্য নেশা করছি না। নতুন কিছু খুঁজে বের করার জন্য মাদকের আশ্রয় নিয়েছি।” আজীবন মাদকের পক্ষে থাকলেও শেষ বেলায় এসে অতিরিক্ত নেশার কারনে অনেক মেধাবী তরুণের অকালে ঝরে যাওয়া দেখে মাদকবিরোধী হয়ে উঠেন।

**আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অ্যালেন গিন্সবার্গ**  

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষের দিকে তিনি কলকাতায় আসেন। কলকাতার কিছু সাহিত্যিকের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিলো, এদের মাঝে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর বেশ ভালো সম্পর্ক ছিলো। একাত্তরে তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতেই উঠেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছেই তিনি পূর্ব বাঙলার মানুষের উপর পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতার কথা শুনেন। সে সময় তিনি অবলোকন করেন পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের দুর্ভোগ। তিনি বাঙলার অবস্থা সরেজমিনে দেখার জন্য যুদ্ধের সময় বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন; এই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি রচনা করেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” নামের বিখ্যাত কবিতাটি। এই সুদীর্ঘ কবিতাটিতে ভেসে উঠে বাঙলার বিধ্বস্ত রূপ, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং এই কবিতার মাধ্যমেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি তাঁর একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং আমেরিকায় ফিরে গিয়ে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অর্থ সংগ্রহ করে হযোগিতার জন্য পণ্ডিত রবি শংকর ও জর্জ হ্যারিসন আয়োজিত “কনসার্ট ফর বাংলাদেশ”-এ অন্যতম একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।

এই কনসার্টে জর্জ হ্যরিসন, বব ডিলান, জোয়ান বায়েজসহ আমেরিকার আরও অনেক জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। পণ্ডিত রবি শংকর ও অপর ভারতীয় কিংবদন্তী গায়ক আলি আকবর খানও গান পরিবেশন করেন এই কনসার্টে এবং এখান থেকে প্রায় আড়াই লাখ ডলার সংগৃহ করা হয়। এই টাকার থেকেও বড় ব্যাপার ছিলো এই কনসার্ট সারা বিশ্বকে একটা নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিলো। সবার কাছে পৌঁছে গিয়েছিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কথা এবং আমাদের গৌরবান্বিত স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা। এরপর থেকে জনমত গড়তে থাকে এবং বিশ্ব অপেক্ষা করে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের জন্য।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অর্থ সংগ্রহের জন্য “কনসার্ট ফর বাংলাদেশ” ছাড়াও গিন্সবার্গ ও রাশিয়ার ইয়েভগেনি ইয়েভ তুসোস্কোর মিলে কবিতা পাঠের আসরও আয়োজন করেছিলেন। গিন্সবার্গের “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” কবিতাটি পরে ১৯৯৯ সাথে প্রয়াত কিংবদন্তির চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ তাঁর “মুক্তির কথা” চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন মৌসুমী ভৌমিকের কণ্ঠে। তারেত মাসুদ প্রথমে খান মোহাম্মদ ফারাবীর অনুবাদ করা কবিতাটি গান হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কবিতা থেকে সুর করা কঠিন ছিলো তাই এটাকে গান করার দায়িত্ব পড়ে তারেক মাসুদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওপার বাঙলার প্রখ্যাত শিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের উপর। তিনি এই কবিতার ভাবানুবাদ করেন এবং সুরারোপও করেন। এই গানটি তারেক মাসুদ তাঁর অপর চলচ্চিত্র “মুক্তির গান”-এ ব্যবহার করার জন্য গিন্সবার্গের কাছ থেকে অনুমতি এনেছিলেন কিন্তু “মুক্তির গান” চলচ্চিত্রের ফাইনাল এডিটিং-এর সময় এই কবিতা বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কালজীয় ভাষণ যুক্ত করা হয়।

গিন্সবার্গের কাছ থেকে অনুমতি আনতে যাবার স্মৃতিকথা তারেক মাসুদ লিখেছিলেন তাঁর রোজনামচায়, “মুক্তির গান ছবিটি করার সময়ই অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম। অনুমতির জন্য তখন নিউইয়র্ক যাই। গিন্সবার্গের পিএসকে সব খুলে বলার পর উনি জানালেন, ‘আপনাদের খুব একটা কষ্ট করতে হবে না। কারণ ইতি মধ্যেই গিন্সবার্গ কবিতাটিতে সুরারোপ করে গেয়েছেন। আর বাংলাদেশের প্রতি তাঁর দুর্বলতা থাকায় চাইলেই গানটি পেয়ে যাবেন। আগামী বুধবার তরুণদের কবিতা পাঠের একটি আসর আছে। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা করা যাবে।’ আমি এবং ক্যাথরিন সময় মতো সেখানে উপস্থিত হই। কবিতা পাঠ শেষ হওয়ার পরই গিন্সবার্গকে ঘিরে ধরলেন ফটো সাংবাদিকরা। কড়া প্রটোকল এবং সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে গিন্সবার্গের সামনে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই সাংবাদিকদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরমধ্যেই আমাদের লক্ষ্য করে গিন্সবার্গ বললেন, ‘তোমরা কি বাংলাদেশ থেকে এসেছো?’ হ্যাঁ, বলতেই কাছে টেনে নিয়ে কোটের বুক পকেট থেকে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ গানের একটি সিডি ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘তোমাদের জন্য বাসা থেকেই সিডিটা নিয়ে এসেছি।”

[গান হয়েছিলো এই কবিতাটি নিয়ে, গেয়েছিলেন মৌসুমি ভৌমিক, পুরো গানটিই তাই তুলে দিলাম।](https://www.youtube.com/watch?v=GmGMC-g9rWk "গান হয়েছিলো এই কবিতাটি নিয়ে, গেয়েছিলেন মৌসুমি ভৌমিক, পুরো গানটিই তাই তুলে দিলাম।")

> [**সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড (গান)**](https://www.youtube.com/watch?v=GmGMC-g9rWk "সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড (গান)")
> 
> শত শত চোখ আকাশটা দেখে  
> শত শত শত মানুষের দল  
> যশোর রোডের দু-ধারে বসত  
> বাঁশের ছাউনি, কাদামাটি জল
> 
> কাদামাটি মাখা মানুষের দল  
> গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে  
> আকাশে বসত মরা ঈশ্বর  
> নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে
> 
> ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে  
> যুদ্ধে ছিন্ন ঘরবাড়ি দেশ  
> মাথার ভিতরে বোমারু বিমান  
> এই কালো রাত কবে হবে শেষ
> 
> শত শত মুখ হায় একাত্তর  
> যশোর রোড যে কত কথা বলে  
> এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে  
> পূর্ব বাংলা কলকাতা চলে
> 
> সময় চলেছে রাজপথ ধরে  
> যশোর রোডেতে মানুষের মিছিল  
> সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর  
> গরুগাড়ি কাদা রাস্তা পিছিল
> 
> লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে  
> লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়  
> ঘরহীন ভাসে শত শত লোক  
> লক্ষ জননী পাগলের প্রায়
> 
> রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু  
> পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে  
> এইটুকু শিশু এতবড় চোখ  
> দিশেহারা মা কার কাছে ছোটে
> 
> সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর  
> এতো এতো শুধু মানুষের মুখ  
> যুদ্ধ মৃত্যু তবুও স্বপ্ন  
> ফসলের মাঠ ফেলে আসা সুখ
> 
> কার কাছে বলি ভাত রুটি কথা  
> কাকে বলি কর কর কর ত্রাণ  
> কাকে বলি ওগো মৃত্যু থামাও  
> মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রাণ
> 
> কাঁদো কাঁদো তুমি মানুষের দল  
> তোমার শরীর ক্ষত দিয়ে ঢাকা  
> জননীর কোলে আধপেটা শিশু  
> এ কেমন বাঁচা, বেঁচে মরে থাকা
> 
> ছোট ছোট তুমি মানুষের দল  
> তোমার ঘরেও মৃত্যুর ছায়া  
> গুলিতে ছিন্ন দেহ-মন-মাটি  
> ঘর ছেড়েছো তো মাটি মিছে মায়া
> 
> সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর  
> ঘর ভেঙ্গে গেছে যুদ্ধের ঝড়ে  
> যশোর রোডের দু’ধারে মানুষ  
> এত এত লোক শুধু কেন মরে
> 
> শত শত চোখ আকাশটা দেখে  
> শত শত শত শিশু মরে গেল  
> যশোর রোডের যুদ্ধক্ষেত্রে  
> ছেঁড়া সংসার সব এলোমেলো
> 
> কাদামাটি মাখা মানুষের দল  
> গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে  
> আকাশে বসত মরা ঈশ্বর  
> নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে
> 
> ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে  
> যুদ্ধে ছিন্ন ঘর-বাড়ী-দেশ  
> মাথার ভিতরে বোমারু বিমান  
> এই কালো রাত কবে হবে শেষ
> 
> শত শত মুখ হায় একাত্তর  
> যশোর রোড যে কত কথা বলে  
> এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে  
> পূর্ব বাংলা কলকাতা চলে
> 
> এত মরা মুখ আধ মরা পায়ে  
> পূর্ব বাংলা কলকাতা চলে।

“সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড”-এর ইংরেজি মূল কবিতা

> **September on Jessore Road**
> 
> Millions of babies watching the skies  
> Bellies swollen, with big round eyes  
> On Jessore Road–long bamboo huts  
> Noplace to shit but sand channel ruts
> 
> Millions of fathers in rain  
> Millions of mothers in pain  
> Millions of brothers in woe  
> Millions of sisters nowhere to go
> 
> One Million aunts are dying for bread  
> One Million uncles lamenting the dead  
> Grandfather millions homeless and sad  
> Grandmother millions silently mad
> 
> Millions of daughters walk in the mud  
> Millions of children wash in the flood  
> A Million girls vomit & groan  
> Millions of families hopeless alone
> 
> Millions of souls nineteenseventyone  
> homeless on Jessore road under grey sun  
> A million are dead, the million who can  
> Walk toward Calcutta from East Pakistan
> 
> Taxi September along Jessore Road  
> Oxcart skeletons drag charcoal load  
> past watery fields thru rain flood ruts  
> Dung cakes on treetrunks, plastic-roof huts
> 
> Wet processions Families walk  
> Stunted boys big heads don’t talk  
> Look bony skulls & silent round eyes  
> Starving black angels in human disguise
> 
> Mother squats weeping & points to her sons  
> Standing thin legged like elderly nuns  
> small bodied hands to their mouths in prayer  
> Five months small food since they settled there
> 
> on one floor mat with small empty pot  
> Father lifts up his hands at their lot  
> Tears come to their mother’s eye  
> Pain makes mother Maya cry
> 
> Two children together in palmroof shade  
> Stare at me no word is said  
> Rice ration, lentils one time a week  
> Milk powder for warweary infants meek
> 
> No vegetable money or work for the man  
> Rice lasts four days eat while they can  
> Then children starve three days in a row  
> and vomit their next food unless they eat slow.
> 
> On Jessore road Mother wept at my knees  
> Bengali tongue cried mister Please  
> Identity card torn up on the floor  
> Husband still waits at the camp office door
> 
> Baby at play I was washing the flood  
> Now they won’t give us any more food  
> The pieces are here in my celluloid purse  
> Innocent baby play our death curse
> 
> Two policemen surrounded by thousands of boys  
> Crowded waiting their daily bread joys  
> Carry big whistles & long bamboo sticks  
> to whack them in line They play hungry tricks
> 
> Breaking the line and jumping in front  
> Into the circle sneaks one skinny runt  
> Two brothers dance forward on the mud stage  
> Tehgaurds blow their whistles & chase them in rage
> 
> Why are these infants massed in this place  
> Laughing in play & pushing for space  
> Why do they wait here so cheerful & dread  
> Why this is the House where they give children bread
> 
> The man in the bread door Cries & comes out  
> Thousands of boys and girls Take up his shout  
> Is it joy? is it prayer? “No more bread today”  
> Thousands of Children at once scream “Hooray!”
> 
> Run home to tents where elders await  
> Messenger children with bread from the state  
> No bread more today! & and no place to squat  
> Painful baby, sick shit he has got.
> 
> Malnutrition skulls thousands for months  
> Dysentery drains bowels all at once  
> Nurse shows disease card Enterostrep  
> Suspension is wanting or else chlorostrep
> 
> Refugee camps in hospital shacks  
> Newborn lay naked on mother’s thin laps  
> Monkeysized week old Rheumatic babe eye  
> Gastoenteritis Blood Poison thousands must die
> 
> September Jessore Road rickshaw  
> 50,000 souls in one camp I saw  
> Rows of bamboo huts in the flood  
> Open drains, & wet families waiting for food
> 
> Border trucks flooded, food cant get past,  
> American Angel machine please come fast!  
> Where is Ambassador Bunker today?  
> Are his Helios machinegunning children at play?
> 
> Where are the helicopters of U.S. AID?  
> Smuggling dope in Bangkok’s green shade.  
> Where is America’s Air Force of Light?  
> Bombing North Laos all day and all night?
> 
> Where are the President’s Armies of Gold?  
> Billionaire Navies merciful Bold?  
> Bringing us medicine food and relief?  
> Napalming North Viet Nam and causing more grief?
> 
> Where are our tears? Who weeps for the pain?  
> Where can these families go in the rain?  
> Jessore Road’s children close their big eyes  
> Where will we sleep when Our Father dies?
> 
> Whom shall we pray to for rice and for care?  
> Who can bring bread to this shit flood foul’d lair?  
> Millions of children alone in the rain!  
> Millions of children weeping in pain!
> 
> Ring O ye tongues of the world for their woe  
> Ring out ye voices for Love we don’t know  
> Ring out ye bells of electrical pain  
> Ring in the conscious of America brain
> 
> How many children are we who are lost  
> Whose are these daughters we see turn to ghost?  
> What are our souls that we have lost care?  
> Ring out ye musics and weep if you dare–
> 
> Cries in the mud by the thatch’d house sand drain  
> Sleeps in huge pipes in the wet shit-field rain  
> waits by the pump well, Woe to the world!  
> whose children still starve in their mother’s arms curled.
> 
> Is this what I did to myself in the past?  
> What shall I do Sunil Poet I asked?  
> Move on and leave them without any coins?  
> What should I care for the love of my loins?
> 
> What should we care for our cities and cars?  
> What shall we buy with our Food Stamps on Mars?  
> How many millions sit down in New York  
> & sup this night’s table on bone & roast pork?
> 
> How many millions of beer cans are tossed  
> in Oceans of Mother? How much does She cost?  
> Cigar gasolines and asphalt car dreams  
> Stinking the world and dimming star beams —
> 
> Finish the war in your breast with a sigh  
> Come tast the tears in your own Human eye  
> Pity us millions of phantoms you see  
> Starved in Samsara on planet TV
> 
> How many millions of children die more  
> before our Good Mothers perceive the Great Lord?  
> How many good fathers pay tax to rebuild  
> Armed forces that boast the children they’ve killed?
> 
> How many souls walk through Maya in pain  
> How many babes in illusory pain?  
> How many families hollow eyed lost?  
> How many grandmothers turning to ghost?
> 
> How many loves who never get bread?  
> How many Aunts with holes in their head?  
> How many sisters skulls on the ground?  
> How many grandfathers make no more sound?
> 
> How many fathers in woe  
> How many sons nowhere to go?  
> How many daughters nothing to eat?  
> How many uncles with swollen sick feet?
> 
> Millions of babies in pain  
> Millions of mothers in rain  
> Millions of brothers in woe  
> Millions of children nowhere to go.
