# মামাকে দেখতে যাওয়া (পর্ব-২৪)

Author: শামীম চৌধুরী
Published: 2020-09-10
Category: ভ্রমণ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%93%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac-%e0%a7%a8-5/

**আগের পর্বের লিঙ্ক–** [মামাকে দেখতে যাওয়া (পর্ব-২৩)](/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%93%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac-%e0%a7%a8-4/)

**পর্ব-২৪**

সূর্য্য অস্ত যাবার ৩০মিনিট বাকি। এরই মধ্যে আমরা ৬ নাম্বার জোনের ভিতর প্রবেশ করলাম। প্রথমদিনই আমরা শুরু করেছিলাম এই জোন দিয়ে। ফ্লেমিংঙ্গো পাওয়ার আসায় আমরা উল্টো দিক থেকে যাত্রা শুরু করি। যেটা ছিলো আমাদের ভুল সিদ্ধান্ত। কারন, এই জোনটা মূলতঃ সবুজ মাঠে ঘেরা। মাঝে মাঝে কিছু খন্ড খন্ড জলাশয়। আর এ রকম জলাশয়ে জলজ পাখিদের খাবার কম। যে সমস্ত পাখি তৃণভোজী বা ঘাসের বিঁচি ও মাটির ভিতর থেকে পোঁকা-মাকড় খুঁজে খুঁজে খাবারের সন্ধান করে মূলতঃ সেই প্রজাতি পাখির আড্ডা স্থল এই জোন।

প্রথম দিন আমরা শুরুটা উপযুক্ত সময়েই করেছিলাম। বনের যাবতীয় কাজ শেষ করে যখন ভিতরে প্রবেশ করছিলাম তখন সময় ভোর ৬:৩০মিনিট। ১ নাম্বার দিয়ে শুরুটা হলে ভাল হতো। কারন বেশ কয়েক প্রজাতির হাঁস জাতীয় পাখি পেতাম। পাখিদের খাবারের মোক্ষম সময় হলো সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত। সূর্যের তাপ বেড়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে পাখিরা খাবার থেকে বিরত থাকে। বেলা ৩টা পর্যন্ত কোন গাছের ডালে বা ছায়ায় বিশ্রাম করে। দেহে ক্যালরী বা শক্তি তৈরী করে। আর এটাই হচ্ছে পাখিকূলের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। মানুষের মতন সারাদিন খাবারের উপর থাকে না। নিয়ম বেঁধে খাবার ও বিশ্রাম এদের অপরিহার্য্য। কারন, হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এরা এসব জায়গায় পরিযায়ী হয়ে আসে। পর্যাপ্ত খাবার খেয়ে বিশ্রামের মাধ্যমে যদি চর্বি সংগ্রহ করতে না পারে তবে ফিরে যাবার সময় পথেই তাদের মৃত্যু অনিবার্য। প্রতিটি প্রানীই তার নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তায় চলে। অথচ সৃষ্টির সেরা জীব ও মেধা সম্পন্ন হয়েও মানুষ অন্যের জ্ঞানে চলতে অভ্যস্ত।

জোনে ঢুকার সময় সতীর্থদের সঙ্গে কথার ছলে বলা হয়েছিলো যে, এই সময়ে তেমন কিছু পাওয়া যাবে না। যেহেতু বিস্তীর্ন মাঠ তাই নীল গাই ছাড়া তেমন কিছু নজরে আসবে না। সবাই জানতে চাইলো আমরা এখন কি করবো? আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বললাম যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় তবে কিছু হ্যারিয়ার জাতীয় ঈগল পাওয়ার সম্ভবনা আছে। কারন খন্ড খন্ড জলাশয়ে অল্প পানিতে মাছ শিকারে ঈগলের তেমন বেগ পেতে হয় না। সহসাই মাছ শিকার করতে পারে। প্রতিটি প্রানী তার আহারের জন্য শিকারের স্থান বেঁঁছে নেয়। শিকারের জন্য এদের জ্ঞান এমনই প্রখর যে তারা জানে কোন সময়টা তাদের জন্য সহায়ক। ব্যাতিক্রম শুধু সভ্য মানুষ। মানুষ তার আহার জোগানের দায়িত্ব একজনের উপর ছেড়ে দিয়ে খাদ্য গ্রহনে অভ্যস্ত।

**Blue Buff বা নীল গাই।** সঙ্গে আমি পূর্বেই আমার পাঠক বন্ধুদের পরিচয় করিয়েছি। সারিস্কা টাইগার জোনে আমি প্রথম নীল গাই দেখি ও ছবি তুলি। যা আমার ভ্রমন কাহিনীর ২য় পর্বে ছবি দিয়ে এই বিলুপ্ত প্রানীটির পরিচয় দিয়েছিলাম। তারপরও আমি আবার নীল গাইয়ে ছবি দিলাম।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/09/AMIM2316-.jpg)

**Blue Buff বা নীল গাই।**

দিনের শেষে এই জোনে একটা অদ্ভুত দৃশ্য নজরে আসলো। যা পাঠক বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার না করলে নিজের মন স্বস্তি পাবে না। আর বন্ধুদেরও অজানা থেকে যাবে। এখানে আমরা অসংখ্য ষাঁড় গরুর দেখা পেলাম। যা বণ্য গরু নামে পরিচিত।

আমি আশ্চর্য হলাম এত ষাঁড়ের মালিক কে?

পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে, দিল্লী ও কোলকাতা ছাড়া ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ। তাই মালিকদের কাছে ষাঁড় গরুর তেমন কোন চাহিদা নেই। তাদের খামারে ষাঁড় গরু জন্মালে এই বনে ছেড়ে দেয়। এরা বণ্য গরু হয়ে বেড়ে উঠে। কারন গাঁই গরুর পিছনে শ্রম ও অর্থ খরচ করলে দুধ বিক্রি করে ও নিজেরা পান করে সেই অর্থ উঠে আসে। কিন্তু ষাঁড় গরু পালনে তাদের আর্থিক ক্ষতি ছাড়া কোন লাভ নাই। গরুগুলি বেশ মোটা তাজা। একেকটি গরুর ওজন হবে কম করেও ৪৫০-৫০০ কেজির মতন। ঠাট্টা করে সতীর্থদের বললাম,আমাদের দেশে কোরবানীর সময় একেকটা গরু ৫-৬ লাখ টাকায় বিক্রি হবে। সবাই ক্ষনিকের জন্য হাসির খোরাক পেলো।

হা হা হা…।

কথা বলতে বলতে হঠাৎ **Eastern Marsh Harrier বা পূবের কাপাসি ঈগল ও Western Marsh Harrier বা পশ্চিমের কাপাসি ঈগল** নজরে পড়লো। ডুমুর গাছের ঝোপের ভিতর থেকে Eastern Marsh Harrier বা পূবের কাপাসি ঈগল উড়াল দিলো। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেমে বন্দী করলাম। তার ডান পাশে খোলা মাঠে নৃত্য করে খাবার খাচ্ছিল **Western Marsh Harrier বা পশ্চিমের কাপাসি ঈগল।** এর ছবিও ফ্রেমে বন্দী করলাম। দুই প্রজাতি পাখির ভালো মানের ছবি পেয়ে মনটা আনন্দে ভরে গেল। তবে একটি কথা না বললেই নয়। **Western Marsh Harrier বা পশ্চিমের কাপাসি ঈগল** যখন তুলি তখন এন্টি লাইট ছিলো। এই জোনটা বনের পশ্চিম প্রান্তে। তাই দুপুর ২টার পর ভাল মানের ছবি এন্টি লাইটে হয় না। আমি দুই প্রজাতি পাখি দুটি আমার পাঠক বন্ধুদের দেখার জন্য শেয়ার করলাম।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/09/82720445_102107511333829_1466368905063694336_o-800x600-1.jpg)

**Eastern Marsh Harrier বা পূবের কাপাসি ঈগল।**

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/09/AMIM2099-.jpg)

**Western Marsh Harrier বা পশ্চিমের কাপাসি ঈগল।**

সূর্যের সোনালী আভায় পুরা বনটা ছেঁয়ে গেল। সূর্যও তার তীব্র তাপের ক্ষমতা হারালো। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ক্যামেরার ব্যাগ গুঁছিয়ে ফেরার জন্য। আমরা জোন থেকে বের হবার জন্য উল্টো পথে হাঁটছে। হাতের ডান দিকে আবারো দেখা পেলাম **Sarus crane বা সারস পাখির।** মনের সুখে দিনের শেষ বেলার খাবার খাচ্ছে। সবাইকে বললাম আইএসও বাড়িয়ে শাটার স্পীড কমিয়ে এই সোনালী আলোতে সারস পাখির ছবি তোলার জন্য। এমন ছবিতে সাবজেক্ট পরিস্কার না হলেও কম্পোজিসনটা দেখার মতন হয়। পুরা ছবি সোনালী রঙে ঢাকা থাকে। গোন্ডেন গ্লো যেন ছবিটিকে প্রানবন্ত করে তুলে। সবাই গোল্ডেন আলোতে সারস পাখির ছবি তুলে এই কেওলাদেও বনে ছবি তোলার কাজ শেষ করলাম। আবার কবে এই বনে ছবি তুলতে আসবো বা আদৌ আসা হবে কিনা তা অনিশ্চয়তা রয়ে গেল।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/09/AMIM3402-.jpg)

**Sarus crane বা সারস পাখি।**

জীতেনরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। আমরা যার যার মাল-পত্র গুঁছিয়ে রিক্সায় উঠে মূল ফটকের পথে রওনা হলাম। পর পর দুদিন জীতন গংরা আমাদের সঙ্গে হাড়-ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সময় দিয়েছে। পাখির খোঁজ দিয়েছে। তাই ভাবলাম ওদেরও ছবি তুলে সংরক্ষনে রাখি। জীতেনরা আমার এ্যালবামে স্মৃতি হয়ে থাকবে ।

আমি রিক্সার বাহক ও গাইড জীতেনদের ছবি পাঠক বন্ধুদের জন্য শেয়ার করলাম। এদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় না করালে নিজেকে অকৃতজ্ঞ মনে হবে।

ছবির মাঝখানে জীতেন। মোবাইল হাতে রঞ্জিত সিং ও জীতেনের ডান পাশে অরবিন্দ সিং।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/09/AMIM2436-.jpg)

**জীতেন ও তাঁর সঙ্গীরা যারা ছিলো আমাদের গাইড।**

আমার অত্যন্ত প্রিয় দুজন মানুষ ছাইরাস হেলাল ভাই ও আদরের ছোট ভাই তৌহিদের বিশেষ ইচ্ছা ও অনুরোধের জন্য আমি ডোরামাথা রাঁজহাঁসের ছবি ও পরিচিতি তুলে ধরলাম।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/09/AMIM2393-.jpg)

**Bar-headed goose বা ডোরামাথা  রাজহাঁস।**

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় ডোরামাথা রাজহাঁস হিমালয় পর্বতের চূড়া প্রায় ২৯০০০ হাজার ফুট  উপর দিয়ে পারিযায়ী হয়ে আমাদের দেশে আসে। (যদিও এটি নিয়ে মতবাদ আছে।) তবে এটা সত্য যে,প্রকৃতিবিদ আর শারীরতাত্ত্বিকদের কাছে এ এক বিরাট প্রশ্ন। কেন ডোরামাথা রাজহাঁস হিমালয় পর্বতমালার কম উচ্চতার গিরিপথ দিয়ে না এসে এত বেশি উচ্চতা দিয়ে পরিযান করে? যেখানে অন্যসব পরিযায়ী পাখিরা অহরহ সেসব গিরিপথ ব্যবহার করে। আবার অনেকে মনে করেন এত উচ্চতায় অক্সিজেনও বা কিভাবে এরা সংগ্রহ করে।এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে, এরা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার অন্যতম বাহক। কাক, দাঁড়কাক, শিয়াল, গাঙচিল ও সিন্ধু ঈগল প্রভৃতি এদের প্রধান শত্রু।

**Bar-headed goose বা ডোরামাথা  রাজহাঁস বা বাঁদিহাঁস বা রাজহাঁস Anatidae** পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি জলচর পাখি। যার দৈর্ঘ্য ৭২-৭৫ সেঃমিঃ(আকার ভেদে) এবং ওজন দেড় কেজি থেকে প্রায় সোয়া তিন কেজি। এরা একটাই প্রজাতি এবং এদের কোন উপপ্রজাতি নেই। এদের শরীর দেখতে অনেকটা ধূসর বর্ণের। সাদা মাথা থেকে সাদা একটি লাইন গলার নীচ পর্যন্ত নেমে গেছে। মাথায় দুটি কালো দাগ বা ডোরা দেখা যায়। যার জন্য এই পাখিটি ডোরামাথা নামে পরিচিত। মাথা সাদা বর্ণের হয় ও দেহ ফিকে সাদা রঙের। ডানার পালকের অগ্রভাবে কালো রঙ দেখা যায়। পুরুষ ও মেয়েপাখি দেখতে একই রকম। কোন প্রার্থক্য নেই। এদের চোখ বাদামী। ঠোঁট হলুদ ও নাক কালো। পা ও পায়ের পাতা গাঢ় হলুদ বর্ণের। বাচ্চা ও অপ্রাপ্ত রাজহাঁসের মাথায় কালো ডোরা দাগ নেই। কপাল সাদা এবং গাল ও গলা মলিন। পিঠ ও পেটের রঙ একই।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/09/AMIM1880-.jpg)

**Bar-headed goose বা ডোরামাথা  রাজহাঁস**

ডোরামাথা রাঁজ হাঁস লতাপাতা ঘেরা জলাশয়ে ও সমুদ্র উপকূলীয় দ্বীপে এমনকি বড় বড় নদীর চরে বিচরন করে। দলবদ্ধ হয়ে বাস করতে পছন্দ করে। এদের ঝাঁকে প্রায় ১০০টি পর্যন্ত রাজহাঁস থাকে। যদিও আমাদের দেশে নদীর চরগুলিতে ঝাঁকের সংখ্যা কম দেখা যায়। তবে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় এদের সংখ্যা অনেক। দলবদ্ধ ভাবে বিচরন করতে পছন্দ করে। একা একা খুব কমই দেখা যায়। নদীর চরাঞ্চলে জেগে উঠা চরে কৃষক যখন নতুন ধানের চারা  রোপন করে তখন এদের বিচরন চোখে পড়ার মত। এরা খুব সকালে ও সূর্য ডোবার আগে ধানক্ষেতে অবস্থান করে। দিনের বাকি সময়টা পানিতে ভাসে।এরা তীরের পাখি হিসেবেও পরিচিত।

কচি ঘাসের আগা ও ধানের চারা ও জলজ উদ্ভিদ েএদের প্রধান খাবার। যার জন্য মাঝে মাঝে এরা চরাঞ্চলে কৃষকের ধানের জমিতে হানা দেয় খাবারের জন্য। মে থেকে জুন মাসের মধ্যে তিব্বতের উচু জলাভূমিতে এরা প্রজনন করে থাকে। প্রজননের সময় নদী বা উপকূলের ধারে মাটিতে লতা-পাতা দিয়ে বাসা বানিয়ে এক সঙ্গে ৩-৪টি ডিম দেয়। মেয়েপাখিটি একাই ডিমে তা’ দেয়। ৩০ দিনে ডিম থেকে বাচ্চা ফুঁটে বের হয়। বাবা ও মা উভয়ে মিলেই বাচ্চাদের লালন-পালন করে থাকে।

ডোরামাথা রাজ হাঁস বাংলাদেশের দূর্লভ পরিযায়ী পাখি। শীতকালে আমাদের দেশে উপকূলে ও রাজশাহী,চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ভোলা, সিরাজগঞ্জ ও হাওর এলাকায় দেখা যায়। ইহা ছাড়াও পাকিস্তান,ভারত, নেপাল, ভূটান, সাইবেরিয়া আফগানিস্তান ও চীনে এদের বিচরন দেখা যায়।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2020/09/MG_8507-.jpg)

**Bar-headed goose বা ডোরামাথা  রাজহাঁস**

সবাই ভালো থাকুন।

(চলবে)
