# মানুষ হবার পথ খুলে দিই

Author: হালিম নজরুল
Published: 2022-04-08
Category: একান্ত অনুভূতি
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b7-%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%a5-%e0%a6%96%e0%a7%81%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%87/

সেদিন দাঁড়িয়ে আছি চৌরাস্তার মোড়ে। তের চৌদ্দ বছর বয়সের একটি ছেলে হেঁটে আসছে। লিকলিকে চেহারা, মলিন মুখ, চোখ ছলছল। ডেকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে তোমার? এই সময় এমন মন খারাপ করে কোত্থেকে এলে? আর যাচ্ছোই বা কোথায়? কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার বুঝতে বাকি রইল না যে তার উপর চাপিয়ে দেওয়া বইয়ের বোঝা বহন করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তার। কাঁধে চাপানো বইয়ের ব্যাগের চেয়ে অনেক বড় বোঝা তার মাথার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা না হলে এই পড়ন্ত বিকেলে যে ছেলেটির খেলার মাঠে থাকবার কথা, সে কিনা মন খারাপ করে রাস্তায় হাঁটেছে হন্তদন্ত হয়ে।

তাকে নিয়ে বাবা মায়ের অনেক বড় স্বপ্ন। ছেলে বিদ্বান হবে। অনেক বড় অফিসার হবে। তা না হলে বাবা-মা সমাজে মুখ দেখাবেন কি করে! কলিগের মেয়ে গত পরীক্ষায় গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছে। পাশের বাসার মেয়েটাও চান্স পেয়েছে মেডিকেলে। বড় ছেলে রাজনৈতিক দলের বড় ক্যাডার। তার ভয়ে বাঘে মোষে এক ঘাটে জল খায়। আর বড় মেয়ে? সেও অফিসের অনেক বড় অফিসার। তার দাপটেও অফিসের সবাই তটস্থ। লাখ টাকা মাইনে। বেতন ছাড়া উপরি ইনকাম আরও অনেক বেশি। তাই সে ইচ্ছা করলে অফিসের সবাইকে নিজের ইচ্ছামতো নাচাতে পারে, সমাজের আর দশজনকে পায়ের নীচে রাখতে পারে। বাবা মা বুক ফুলিয়ে সবার কাছে বলতে পারে আমি অমুকের বাবা, আমি অমুকের মা। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এটি খুবই দুঃখজনক। একজন সন্তানকে চিনতে গেলে তো আগে বাবা মাকেই চেনার কথা। হ্যাঁ হ্যাঁ ওই ছেলেটা? সে তো অমুক সাহেবের ছেলে। কিন্তু পৃথিবী উল্টে গেল নাকি!

সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিচয়ের রীতিটাও পাল্টে গেছে বুঝি? সারাক্ষণ অসুস্থ এক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা। পড়াশুনা করে ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, অনেক বড় অফিসার হতে হবে, মন্ত্রী- এমপি- আমলা হতে হবে। ক্লাসে প্রথম হতে হবে, জিপিএ ফাইভ পেতে হবে, সবসময় বড় হতে হবে! কিন্তু আমাদের সন্তানেরা সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠছে কি না, তা কেউ ভেবে দেখছি না। তাই যে সোনালী বিকালে ছেলেটি খেলার মাঠে বা সাংস্কৃতিক চর্চায় থাকবার কথা, সে বইয়ের বোঝা কাঁধে হতাশায় ডুবে যাচ্ছে। হয়তোবা কেউ কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বড় অফিসার হচ্ছে, এলাকার চাঁদাবাজ, বখাটে রাজনৈতিক ক্যাডার হচ্ছে। কিন্তু সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠছে না। সুতরাং তাদেরকে নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। চলুন তাদেরকে সত্যিকারের মানুষ হবার উৎসাহ জোগায়। তাদের জন্য ভালোবাসার প্রাণ খুলে দিই। দরজা খুলে দিই, জানালা খুলে দিই, খেলার মাঠ – সাংস্কৃতিক চর্চার পথ খুলে দিই। ওরা প্রাণখুলে শ্বাস নিক, সত্যিকারের মানুষ হবার দৃঢ় শপথ নিক।
