# মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

Author: তৌহিদুল ইসলাম
Published: 2020-06-25
Category: স্বাস্থ্য বার্তা
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b0/

উন্নয়নশীল হলেও বর্তমান বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এখানে বেশিরভাগ লোক দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। উপরন্তু মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিরক্ষর। বাকি এক-তৃতীয়াংশ স্বাক্ষর জনসাধারণের মধ্যে খুব কমই উচ্চশিক্ষিত। তাছাড়া উচ্চশিক্ষিত ও মেধাবী অংশ উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনযাপনের নামে পাড়ি জমাচ্ছে উন্নত দেশগুলোতে। ফলে শিক্ষিত যে অংশটি দেশে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছে তাদের মধ্যে মেধাবীদের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজনের চেয়ে কম। উপরন্তু আমাদের শিক্ষার মান বর্তমানে অনেক অবমূল্যায়িত হয়েছে, একথা বলা হয়তো ভুল হবে না।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে এক কথায় আধা-সামন্তবাদী ও আধা-পুঁজিবাদী বলা যায়। তাই সামন্ত সমাজের নানা ধরনের কুসংস্কার ও গোঁড়ামি, ধর্মীয় আচরণে ও সসমাজমূলে আবদ্ধ হয়ে আছে। এছাড়া চরম অশিক্ষা-কুশিক্ষা, অপশিক্ষা ও দারিদ্রতা একসাথে সমাজকে এমন একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে ধরে রেখেছে যেখানে জ্ঞান চর্চা ও বিকাশ অত্যন্ত মন্থরগতিতে চলছে। এরূপ একটি সামাজিক অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের মানসিক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি অত্যন্ত অবহেলায় এবং একান্ত অগোচরেই থেকে গেছে। সাধারণ শিক্ষা এবং সামাজিক পগ্রতির আন্দোলনে বর্তমানে শারীরিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা হচ্ছে। সরকারের কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এনজিওদের কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথাপি এক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন পর্যন্ত তেমন গুরুত্ব লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য আন্দোলন কেবলমাত্র সেমিনার সিম্পোজিয়ামের মধ্যে আবদ্ধ আছে একথা বললে হয়তো অত্যুক্তি করা হবে না। মানসিক স্বাস্থ্য আন্দোলনের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাঈ চলছে বিশেষ করে শারীরিক রোগের ডাক্তার ও মনোচিকিৎসকদের মাধ্যমে। এখানে প্রকৃত মনোবিজ্ঞানী বা চিকিৎসামূলক মনোবিজ্ঞানীদের তেমন কোন অংশগ্রহণ কার্যত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এসব প্রচেষ্টার সাথে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কোন সম্পর্কও গড়ে ওঠেনি অদ্যাবধি।

বাংলাদেশের মানসিক রোগ সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে নানা রকমের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। মানসিক রোগকে তারা জ্বীন-পরী ভূত ও নানা রকমের অশরীরী আত্মার দ্বারা ব্যাখ্যা করে থাকে। এসব রোগীদের চিকিৎসা হয় সাধারণত গ্রাম্য ওঝা-দরবেশ, পীর ফকিরদের মাধ্যমে। ফলে দেখা যায় রোগীরা মানবেতর জীবন-যাপন করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করে থাকে। এই সকল পদ্ধতিগুলো ক্ষেত্র বিশেষ মধ্যযুগীয় বর্বর ইউরোপের অনুরুপ। সামাজিক প্রচলিত ধারণা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির সাথে এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে আছে। তাই খুব সহজে এর মূলোৎপাটন করা সম্ভব নয়।

১৮ কোটি মানুষের এই দেশে কেবলমাত্র পাবনাতে অবস্থিত একটি মানসিক হাসপাতাল নিতান্তই অপ্রতুল। তাছাড়া মেডিকেল কলেজগুলোতে যে একটি করে মানসিক ওয়ার্ড রয়েছে তার ধারণ ক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা চরম হাস্যকর। তাছাড়া এসব চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়গুলোতে কেবলমাত্র মনোচিকিৎসগণ চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। যেখানে পাশাপাশি চিকিৎসামূলক মনোবিজ্ঞানীদের এবং থেরাপি প্রদানকারীদের কর্মকাণ্ড একান্তই প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে তা অনুপস্থিত। এছাড়া উক্ত হাসপাতালগুলোতে এখনো চিকিৎসার আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রেরও ঘাটতি রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে।

বাংলাদেশের মানসিক রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা করতে হলে এবং মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে ব্যাপক ভিত্তিক সরকারি ও বেসরকারি কর্মসূচি পালন করতে হবে। কেননা ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এর মতে জনস্বাস্থ্য বলতে জনসাধারণের কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যকেই বুঝায় না, বরং শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্ব বহন করে। মানসিক রোগের চিকিৎসা করার পাশাপাশি মানসিক রোগ যাতে সৃষ্টি না হয় সেজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর এজন্য বর্তমানে শক্তিশালী প্রচারমাধ্যমগুলোর দ্বারা ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজ এমনকি উচ্চ শিক্ষিত লোকদের মধ্যেও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টির কাজ করতে হবে।

শারীরিক স্বাস্থ্যকে নিশ্চিত করতে হলেও চাই মানসিক সুস্থতার নিশ্চয়তা। আত্মহত্যার প্রবনতা, মাদক গ্রহণসহ নানাধরনের সামাজিক সমস্যা, দ্বন্দ, সন্ত্রাস, বিবাহ বিচ্ছেদ ইত্যাদি নিরসনের জন্য চাই মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে ব্যবহারিক ও কার্যকরী জ্ঞান।

মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসার ও প্রচারই পারে সমাজ থেকে নোংড়া ও কুসংস্কারগুলোকে দূর করতে এবং পাশাপাশি মানসিক রোগীদের মানসিক মুক্তি ঘটাতে। আজ বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়ে আমরা তাই মানসিক রোগীদের মুক্তি কামনা করি। উন্নতি হোক মানসিক স্বাস্থ্যের, জয় হোক মানবতার। সমাজ হোক উদ্ভাসিত জ্ঞান ও সত্যের আলোকে আমাদের সমস্ত ধ্যানে চিন্তা-চেতনায় এবং কর্মে।

————

*\* লেখার তথ্য- কাজী সাইফুদ্দীন রচিত* *অস্বভাবী মনোবিজ্ঞান।*  
*\* The  Inner World Of Mental Illness by Kalplan, Bert.*
