# মনসূত্র

- Author: [গোধূলি](https://sonelablog.com/author/krintonika/)
- Published: 2013-07-11T13:55:33+00:00
- Updated: 2013-07-11T16:13:35+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a7%82%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0/

---

[!\[\](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2013/07/530742_540680309289048_20946974_n.jpg)](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2013/07/530742_540680309289048_20946974_n.jpg)

‘  মীরার বিয়ের অনুষ্ঠানেই কীর্তনের সাথে দেখা হয়ে গেল। মীরার বরের দুঃসম্পর্কের ভাই কীর্তন। দুজনই দুজনকে দেখে চমকে উঠেছিল। মীরার মেকআপ বেশি হয়ে যাওয়ায় হাসতে পারছিল না, কীর্তনের সাথে আকস্মিক সাক্ষাতে অসুবিধাটি দূর হল। মীরার বরটি বোকাসোকা গোছের, কীর্তনের আচরণ দেখে তাই কিছু বুঝতেও পারে নি। মীরার অন্যতম কাছের বন্ধু হওয়ায় সবই বুঝতে পারছিলাম। মীরার চোখ বারবার কীর্তনকেই খুঁজছিল, আর কীর্তন পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।

আজকাল ভালবাসার পথে মা-বাবা যতটা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, তার থেকে বড় বাঁধা প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজেরা। ‘সুখে থাকতে ভূতে কিলায়’ টাইপের ঝামেলা। ফোন ধরতে না পারলেই সন্দেহের শিকার হতে হয়, বাথরুমে গেলেও জানিয়ে যেতে হয়। যদিও মীরা ও কীর্তনের ব্যাপারটা অন্যরকম। কথা প্রসঙ্গে এসে গেল আর কি।

মীরার বরের নাম ‘উদাস’। ছেলেটা শুধু নামেই না,কাজেও উদাস। অনেকদিন ধরেই মীরাকে পছন্দ করত, ঔদাসীন্যের জন্য সরাসরি বিয়ের পিঁড়িতেই বসতে হল। মীরার বোকাসোকা বরটিকে আমরা কেউ ওতটা পছন্দ করতে পারি নি। মীরা বলত, “বোকাসোকাই ভাল। যখন আমার চোখের দিকে তাকাবে আমাকেই দেখবে, অন্য কাউকে খুঁজবে না।”

উদাসের চোখজোড়া ভীষণরকমের সুন্দর ছিল। বিয়ে ঠিক হবার পর daily পাঁচ-ছ’বার সেই চোখজোড়া নিয়ে কথা বলত মীরা, বলত, “নেশা আছে আমার হবু বরের চোখে।”

বছরখানেক আগে কীর্তনের সাথে বিচ্ছেদ বা সোজাকথায় ব্রেকআপ হবার পরও মীরা কথায় কথায় কীর্তনকে টেনে আনত। কোন অনুষ্ঠানে হয়ত বলবে, “কীর্তন হলে কবিতাটা অনেক সুন্দর করে আবৃত্তি করতে পারত।” নয়ত বলবে,” কীর্তনের কণ্ঠে কবিতাটা শুনতে অস্থির লাগত।” তবে আমি মনে করি, কীর্তনের থেকে আমার ভয়েস হাজারগুন বেটার।

একদিন বললাম, “এখনো যখন পছন্দ করিস বললেই পারিস।”

“সবকিছু যদি বলেই বোঝাতে হবে, তবে ওর মাথাটা আছে কিসের জন্য?”

“তুইই তো বলিস -বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলে ও। তুই সারাজীবন শুনেও ক্লান্ত হবি না। কথা বলার বুদ্ধি আছে ছেলেটার মাথায়।”

“শুধু বুদ্ধি দিয়ে কী হবে যদি বোধই না থাকে? যে এখনই আমাকে বোঝে না, পুরোটা জীবন কিভাবে বুঝবে? আবেগ-অনুভূতিজ্ঞানশূন্য মানুষকে ভালবাসার ভুল করতে চাই না। ‘Haal-e-dil’ মুভিটা দেখেছিস? প্রচণ্ড ফ্লপ, কিন্তু একটা সুন্দর ছোট গল্প আছে ঐ সিনেমায়। এক রাজ্যে এক রাজকন্যা ছিল। এক সৈনিক তাকে ভালবেসে ফেলে। জীবনের ভয়কে পরোয়া না করে সে রাজকন্যাকে তার ভালবাসার কথা জানায়।

রাজকন্যা সৈনিককে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার মধ্যে কি আছে, যার জন্য আমি তোমাকে গ্রহণ করবো? তুমি কি রাজপুত্র? তুমি কি রাজকবি? নাকি তুমি শিল্পী বা সৈন্যবাহিনীর শ্রেষ্ঠ বীরসৈনিক?’

-‘নই আমি রাজপুত্র, নই কবি বা শিল্পী। না প্রমাণ করতে পারব যে সৈন্যবাহিনীর শ্রেষ্ঠবীর আমি। অতি সাধারণ এক সৈনিক আমি । কিন্তু প্রমাণ করতে পারবো, আমি আপনাকে যতোটা ভালবাসি, আর কেউ আপনাকে অতোটা ভালবাসবে না।’

-‘প্রমাণ করো।’

-‘আজ থেকে শুরু করে আমি টানা ১০০দিন আপনার রাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকব। সময় পেরোবে, কিন্তু আমি নড়বো না, অপেক্ষা করবো। আমার বিশাস,এই ১০০দিনে আপনার মন গলবে। আর ১০০দিন পরেও যদি আপনি না আসেন, আমি নীরবে চলে যাবো ।’ সেদিনই সৈনিক দাঁড়িয়ে পড়লো রাজমহলের সামনে। ঝড় হল, বৃষ্টি হল, কিন্তু সৈনিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। এভাবে দিন কাটতে লাগলো। ১০ দিন। ২০ দিন। সৈনিক ঠায় দাঁড়িয়ে। ৯৯দিনও পার হল। ১০০তম দিনের সূর্য ওঠার আগেই সৈনিক চলে গেল।”

“Looser. আরেকটু সময় থাকলে কি হতো ?”

“coz ১০০দিন পূর্ণ হবার পরও যদি রাজকন্যা না আসতো, তাহলে সৈনিক সারাজীবনেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারতো না এই ভেবে যে, সে অনুভূতিশূন্য পাথরকে ভালবেসেছে, রক্তমাংসের মানবীকে নয়। তাই ১০০দিন পূর্ণ হবার আগেই চলে গেল। At least এতোটুকু সান্ত্বনা যে, সে ১০০দিন পূর্ণ করতে পারলে হয়ত রাজকন্যাকে পেত। মানুষ আশাকে পুঁজি করে বাঁচতে চায়। বুঝেছিস,নাহিদ?”

“হুম, জটিল সারতত্ত্ব।”

 

উদাসের সাথে যখন মীরার বিয়ের কথা চলছিল, তখন ওকে বলেছিলাম, “মীরা, ভুল করছিস না তো?”

“না”, বলেছিল মৃদু হেসে।

“তুই কীর্তনকে ভালবাসিস না?”

“জানি না। তবে soft corner নেই- তা বলবো না।”

“Generally ব্রেকআপের পর প্রেমিক-প্রেমিকারা পরস্পরকে ঘৃণা করে।”

“প্রেমিকদের কথা জানি না। তবে প্রেমিকাদের ঘৃণা নিজেদের সাথে একটা নাটক ছাড়া কিছু নয়। কীর্তনকে ঘৃণা করার প্রশ্নই আসে না। কখনোই সব আবেগ ওকে সমর্পণ করিনি। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চিত ছিলাম আমি। কিছু আবেগ-অনুভূতি জমিয়ে না রাখলে আজ উদাস বঞ্চিত হতো। আর আমার অনুভূতির গভীরতাকে পরিমাপ করতে চাচ্ছিল কীর্তন, অনুভূতিকে পরিমাপ করা যায় না-এটা ও বোঝেনি। আমার প্রতি ওর natural কোন ফিলিংস ছিল না। ওর প্রতি আমার অনুরাগ থেকে ও Sympathy ফিল করত। ওর করুণার ভালবাসা আমি চাই নি। তাই silly issue নিয়ে ঝগড়া শুরু করেছিলাম ও বলেছিলাম, ‘You do not respect my opinion. Better we should be apart. ‘আসলে মিথ্যে মায়ার বাঁধন থেকে মুক্তি দিয়েছিলাম ওকে, কিন্তু বাঁধন থেকে নিজেই বের হতে পারি নি আজো। কি করবো, বল?” অসহায় ভঙ্গিতে হেসেছিল মীরা। ‘

 

বিয়ের দু’দিন আগে মীরা বলছিল, ” ওমা, লাজুক ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি ,FM Radio.” বলেই হো হো করে হেসে দিল।

বললাম,”তোকে হ্যাপি দেখে অনেক ভাল লাগছে ।”

“তাই?”

“হুম, তোকে একটা কথা বলার ছিল ।”

“বলতেই হবে?”

“হুম।”

“আমি জানি”

“কি?”

“আমাকে অনেক ভালবাসিস তুই।”

“জানিস তাহলে?”

“হুম, আমিও তোকে অনেক ভালবাসি।”

“হুম” বলে ওর কপালে ঠোঁটস্পর্শ করলাম। বললাম,”হৃদয় থেকে আশীর্বাদ করছি তোকে। ভাল থাকিস।”

মীরা বলল, “তোকে Telepathy Test এর কথা বলেছিলাম। মনে আছে? মনে মনে কাউকে ডাকলে টের পায় কিনা?

মায়ের সাথে সন্তানের টেলিপ্যাথি সবাই জানে, বলে-‘নাড়ীর টান’। সন্তান হোঁচট খেলে, মায়ের হাত থেকে দুধের বাটি পড়ে যায়, নয়ত সেলাইয়ের সূচ ফুটে যায় অথবা ফল কাটতে গিয়ে হাত কেটে যায়। জানতে ইচ্ছা করে যে, প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যেও টেলিপ্যাথি আছে নাকি লায়লা-মজনু, চণ্ডীদাস-রজকিনী টাইপের। অনেকটা ‘একজনের সুতোয় টান পড়লে অন্যজন বুঝবে’-ধরনের। মনে মনে কীর্তনকে ডেকেছি, হয় নি। উদাসের সাথে হুট করেই বিয়ে ঠিক হয়ে গেল, ডাকার সুযোগ হয়ে ওঠে নি।”

“এখন ডাকলেই পারিস।”

“ধুর, বোকা। বিয়ে দু’দিন পর। এখনতো এমনিই আমাকে নিয়ে ভাববে।”

“ও আচ্ছা।”

“তবে টেলিপ্যাথি শুধু মা-সন্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ কিনা জানার জন্য নিজে অনেকভাবে apply করেছি। বুঝলাম, টেলিপ্যাথি যে কারো সাথেই সম্ভব।”

“মানে?”

“মা-সন্তানের টেলিপ্যাথি universal, সবচেয়ে strong। তবে টেলিপ্যাথি অন্য সম্পর্কের মধ্যেও সম্ভব।”

“মানে lovers?”

“আরে না, যে কোন সম্পর্ক। বাবা-ছেলে, ভাই-ভাই, ভাইবোন, বোন-বোন, এমন কি দুটি সম্পূর্ণ অপরিচিত অনাত্মীয়ের মধ্যে সম্ভব। যদি তুই কাউকে selflessly ভালবাসিস এবং সেও যদি তোকে selflessly ভালবাসে, টেলিপ্যাথি possible.”

“তুই আবার Platonic love এর গেজানি শুরু করলি নাকি?”

“আমি একদিন তোকেও ডেকেছিলাম। মিনিটখানেক বাদেই তুই ফোন দিয়েছিলি। আমি বললাম,’ কিরে, কি দরকারে ফোন দিলি?’ তুই বলেছিলি, ‘কেন? এমনি এমনি ফোন দিতে পারি না? তোর খোঁজ নিতে ফোন দিলাম।’ তাই জানি,তুই আমাকে ভালবাসিস।” মৃদু হাসলাম।

এই ছিল মীরা, আমার মীরা। তোমাকে অনেক আগেই বলেছিলাম,’আমাকে বিয়ে করলেও পুরোপুরি কখনো পাবে না আমায়। তুমি শোনো নি। জেদ করলে- ‘

‘আপনিও তো মীরাকে পান নি।’

‘মীরাকে যতটুকু পেয়েছি যথেষ্ট, ওটুকুই আমার প্রাপ্য। আমার অন্তঃস্থলে মীরার আসন Irreplaceable। বুঝবে না হয়ত। মীরাকে নিয়ে কখনো পুরুষসুলভ চিন্তা মাথায় এলেও মুহূর্তেই উবে গেছে। আমার মনের মানসী মীরা। নীলা, আমি তোমাকেও ভালবাসি।’

‘সেটাও আবার করুণার ভালবাসা নয়তো ?’

‘মীরা বলত, “মানুষের ভালবাসা-অনুভূতিকে অবহেলিত হতে দেখেছি। নিজের আবেগের অমর্যাদা না হলেও সঠিক মর্যাদা হয় নি। তাই যে আমাকে ভালবাসে আমিও তাকে ভালবাসি।”  নীলা, তোমার চোখে আমি দেখেছিলাম আমার জন্য অপরিসীম আবেগ। তোমার আবেগকে অগ্রাহ্য করার মত অপরাধ আমার পক্ষে সম্ভব হয় নি। বেসেই ফেললাম ভালো তোমাকে।’

[বিঃ দ্রঃ “মনময় = মন্ময়” গল্পের একটি প্রিকুয়াল বলা যেতে পারে “মনসূত্র” গল্পটিকে]

---

Comments: 18 — https://sonelablog.com/%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a7%82%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0/#comments
