# ভূমিকম্প: করণীয়: বাংলাদেশের ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা

Author: আনন্দধারা বহিছে ভুবনে
Published: 2015-04-26
Category: সমসাময়িক
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ad%e0%a7%82%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a7%80%e0%a7%9f-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6/

প্রকৃতির নিয়মে ভূ-অভ্যন্তরে সৃষ্ট ভূআলোড়নের কারণে ভূ-পৃষ্ঠের কোনো কোনো অংশ হঠাৎ কেঁপে উঠলে তাকে আমরা বলি ভূমিকম্প৷ এধরনের কম্পন প্রচন্ড,মাঝারি বা মৃদু হতে পারে৷ পৃথিবীতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬ হাজার ভূমিকম্প হয়৷ কিন্তু এর বেশিরভাগই মৃদু ভূমিকম্প বলে সাধারণত আমরা অনুভব করি না৷ পৃথিবীর ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বাংলাদেশ অবস্থিত বলে এদেশে মাঝে মাঝে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়৷আবার অনেক সময়ই সমুদ্রের তলদেশে ভূকম্পন সংঘটিত হয় যাকে সুনামি বলা হয়৷ যদিও বেশিরভাগ সময় স্থলভাগে এর প্রভাব অনুভূত হয় না৷ কিন্তু অনেকসময় সুনামির কারণে প্রচন্ড জলোচ্ছ্বাস হয়।

**ভূমিকম্প পরিমাপঃ**  
যে স্থান বা জায়গায় ভূমিকম্পের উত্পত্তি হয় তাকে এর কেন্দ্র বলে এবং কেন্দ্র থেকে তা ঢেউ বা তরঙ্গের মতো চারদিকে প্রসারিত হয়৷ এধরনের তরঙ্গ সিসমোগ্রাফ (Seismograph) বা ভূকম্পন লিখনযন্ত্রের সাহায্যে মাপা হয়৷ সাধারণত অনেক ভূমিকম্প আমরা অনুভব করি না৷ ভূকম্পন যখন মাত্রাধিক হয় এবং ঘরবাড়ি, দালানকোঠা,গাছপালা ইত্যাদি যখন নড়তে থাকে তখন আমরা অনুভব করি৷  
ভূমিকম্পের মাত্রা দু’ভাবে পরিমাপ করা হয়-  
১। তীব্রতা (Magnitude)  
২।প্রচন্ডতা বা ব্যাপকতা (Intensity)  
ভূমিকম্পের তীব্রতা সাধারণত রিখটার স্কেলে মাপা হয়৷ আর রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ৫ এর উপরে উঠলে যথেষ্ট বিপদের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করা হয়৷

রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা/ তীব্রতা  
৫ এর বেশি বিপদের সম্ভবনা  
৬ – ৬.ঌ ব্যাপক  
৭ – ৭.ঌ ভয়াবহ  
৮ বা এর বেশি অত্যন্ত ভয়াবহ।  
রিখটার স্কেলের মাত্রা ১ বৃদ্ধি পেলেই ভূকম্পনের মাত্রা ১০ থেকে ৩০ গুণ বেড়ে যায়৷

**প্রচন্ডতা বা ব্যাপকতাঃ**  
ভূমিকম্প হওয়ার পর এর ক্ষয়ক্ষতির মধ্যদিয়ে ব্যপকতাকে মাপা হয়৷ প্রচণ্ডতার দিক দিয়ে একে ভয়াবহ (violent), প্রচন্ড (severe), মাঝারি (moderate), মৃদু (mild) ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা হয়৷

**বাংলাদেশের ভূমিকম্পপ্রবন এলাকাঃ**   
[![earthqua1s](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2015/04/earthqua1s.jpg)](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2015/04/earthqua1s.jpg)

বাংলাদেশে ১ঌঌ৩ সালে ভূমিকম্প বলয় মানচিত্র তৈরি হয়েছে৷ সিসমিক রিস্ক জোন হিসাবে বাংলাদেশকে প্রধান তিনটি বলয়ে ভাগ করা হয়েছে৷ বলয়গুলো হলো :  
\* প্রথম বলয় (প্রলয়ন্কারী ভূমিকম্প) : বান্দরবান, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রংপুর এই বলয়ে অবস্থিত এবং এই বলয়ে ভূমিকম্পের সম্ভাব্য মাত্রা রিখটার স্কেলে ৭ ধরা হয়েছে৷  
\* দ্বিতীয় বলয় (বিপদজনক ভূমিকম্প) : ঢাকা, টাঙ্গাইল, বগুড়া, দিনাজপুর, কুমিল্লা ও রাঙ্গামাটি এতে অবস্থিত এবং এখানে ভূমিকম্পের সম্ভাব্য মাত্রা রিখটার স্কেলে ৬ ধরা হয়েছে৷  
\* তৃতীয় বলয় (লঘু অঞ্চল) : উপরোক্ত এলাকাগুলো ছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকাগুলো যা মোটামুটি নিরাপদ সেগুলো এবলয়ে অবস্থিত৷ এসব অঞ্চলে ভূমিকম্পের সম্ভাব্য মাত্রা রিখটার স্কেলে ৬ এর নিচে ধরা হয়েছে৷

**ভূমিকম্প হলে আমাদের যেসব ক্ষতি হতে পারেঃ**  
আমাদের মনে রাখা দরকার যে, অন্যান্য প্রাকৃতিক দুযোগ যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ইত্যাদির মতো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়ার কোনো পদ্ধতি এখনও আবিষ্কৃত হয়নি৷ এটা অত্যন্ত আকস্মিকভাবে ঘটে এবং এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তুলনামূলকভাবে বেশি৷ ভূমিকম্পের কারণে যেধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে তা হলো :

\* বিভিন্ন পাকা ভবন ও ঘরবাড়ির নিচে চাপা পড়ে বহুসংখ্যক মানুষ মৃত্যু বরণ করে,  
অনেকে আহত হয় ও পঙ্গু হয়ে যায়৷ ঘরবাড়ির নিচে বহু লোক আটকা পড়ে৷  
\* ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ ও যাতায়াত ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়৷  
\* চুলার আগুনে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হওয়ায়, পেট্রোল-কেরোসিন ইত্যাদি বা রাসায়নিক পদার্থসমূহের মিশ্রণে আগুন লেগে অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হয় এবং তাতে বহুসংখ্যক মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়, এমনকি মারাও যায়৷  
\* গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগী ব্যাপকভাবে মৃত্যুবরণ করে এবং গাছপালা ও ক্ষেতের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়৷  
\* রাস্তা-ঘাটের ক্ষতি; ব্রিজ-কালভার্ট-সেতু ইত্যাদি ধ্বংস হয় এবং রাস্তা-ঘাটে গাছপালা, লাইটপোস্ট ইত্যাদি পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়৷  
\* বৈদ্যুতিক তার বিচ্ছিন্ন হয়ে, বৈদ্যুতিক খুঁটি পড়ে বা ভেঙ্গে গিয়ে, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে আলোর স্বল্পতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি হয়৷  
\* হাসপাতাল, ক্লিনিক ইত্যাদি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে চিকিৎসা ও সেবা কাজ বিঘ্নিত হয় এবং পরিবহণ গাড়ি ও যন্ত্রাদি ধ্বংস হয়ে পরিবহণ ব্যবস্থার মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে৷  
\* অনেক সময় সমুদ্র উপকূল ও বড় নদী-তীরে জলোচ্ছ্বাস হয়৷  
\* অনেক সময় নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং পুকুর, নদী-নালা শুকিয়ে যায়৷  
\* অনেক সময় উঁচুভূমি ডেবে গিয়ে জলাশয়ে পরিণত হয় এবং মাঠে ফাটল সৃষ্টি হয়৷

**ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে কি করা যায়**?  
বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা ভূমিকম্প জোনে অবস্থিত তাই সর্বদা এদেশে ভূমিকম্পের আশন্কা রয়েছে৷ এজন্য আমাদের ভূমিকম্পের ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার৷ আমরা ভূমিকম্পকে ঠেকাতে না পারলেও এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারি৷ দুইভাবে এই প্রস্তুতি নেয়া যায়-  
১) ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায় এবং  
২) সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় ৷

ভূমিকম্প মোকাবেলায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে করণীয় পূর্বপ্রস্তুতিসমূহ :  
\* ভূমিকম্প সম্পর্কে ধারণা করুন;  
\* আপনার ঘরবাড়ি শক্ত করে তৈরি করুন;  
\* পুরানো ঘরের খুঁটি ও ভিত মেরামত করুন;  
\* শক্ত মাটিতে ঘর বা ভবন নির্মাণ করুন৷  
\* কখনই গর্ত বা নরম মাটির উপর বাড়ি বা ভবন নির্মাণ করবেন না;  
\* পাকা ভবনের শক্ত ভিত দিন এবং প্রয়োজনে দালান বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর পরামর্শ প্রহণ করুন৷  
\* ভবনের উচ্চতা ও লোডের হিসাব অনুযায়ী ভবনের ভিত্তি দিন৷ এমএস রড ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করুন ;  
\* অবকাঠামোতে রিইনফোর্সড কংক্রিট ব্যবহার করুন;  
\* আপনার বাড়ি বা ভবনটি পার্শ্ববর্তী বাড়ি বা ভবন থেকে নিরাপদ দূরত্বে নির্মাণ করুন;  
\* বাড়িতে বৈদ্যুতিক লাইন ও গ্যাস লাইন অত্যন্ত নিরাপদ ও সতর্কভাবে লাগান;  
\* গ্যাসের চুলা ব্যবহারের পর নিভিয়ে ফেলুন এবং ভূমিকম্পের সময় গ্যাসের চুলা বন্ধ রাখুন কেননা ভূমিকম্পের সময় চুলা উল্টে আগুন ধরে যেতে পারে।  
\* বাড়িতে সদস্যের সংখ্যানুযায়ী মাথার হেলমেট কিনে রাখুন যাতে ভূমিকম্পের সময় ব্যবহার করা যায়;  
\* খাট, টেবিল ইত্যাদি শক্ত করে তৈরি করুন যাতে বিপদের সময় তার নিচে আশ্রয় নেওয়া যায়;  
\* ঘর বা পাকা ভবনের একাধিক দরজা রাখুন যাতে বিপদের সময় দ্রুত বের হওয়া যায়;  
\* ব্যাটারিচালিত রেডিও, টর্চলাইট ও প্রাথমিক চিকিত্‌সার সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখুন;  
\* পরিবারের সবাইকে বিদ্যুতের মেইন সুইচ,গ্যাসের চুলা,বাল্ব ইত্যাদি বন্ধ করা শেখান;  
\* টিনের ঘর হলে চারের টুঁই – এর সাথে কয়েকটি লম্বা ও শক্ত দড়ি বেঁধে রাখুন যাতে প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন;  
\* ভারী কোনো জিনিস উপরে তুলে না রেখে মেঝের কাছাকাছি রাখুন;  
\* পরিবারের সকল সদস্যকে ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও করণীয় সম্পর্কে অবহিত রাখুন।  
\* সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে ভূমিকম্প সম্পর্কিত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করুন এবং অপরকেও অংশগ্রহণ করতে বলুন।

**ভুমিকম্প হলে যা যা করনীয়ঃ**  
ঘর হতে যদি বের হতে পারেন-  
১. হুড়ো-হুড়ি না করে… সতর্কতার সাথে বের হোন…  
২. খোলা স্থানে অবস্থান নিন…  
৩. গ্যাস-এর লাইন… ইলেকট্রিসিটি-র লাইন… এ-সব থেকে দূরে থাকুন…  
৪. জানালা হতে দূরে থাকুন…  
৫. দেয়াল হতে দূরে অবস্থান নিন…

যদি বের না হতে পারেনঃ  
১. হুড়ো-হুড়ি করবেন না…  
২. ঘরের দরজা খুলে… ঠিক দরজা-র নীচ বরাবর অবস্থান করূন…  
৩. গ্যাস-এর চুলা এবং ইলেকট্রিসিটি বন্ধ করে দিন…  
৪. জানালা হতে দূরে থাকুন…  
৫. কাচঁ-এর জিনিস… যেমনঃ ফুল-দানি / শো-কেস / ড্রেসিং-টেবিল… এ-সব থেকে দূরে থাকুন…  
৬. ঘরের যে-কোনো ভারী দ্রব্য… যেমনঃ টেবিল-এর নীচ বরাবর অবস্থান নিতে পারেন…

*তথ্য সুত্রঃ বিভিন্ন সাইট এবং ব্লগ।  
*

এসম্পর্কে সোনেলায় প্রকাশিত ব্লগার সঞ্জয় কুমার এর পোষ্ট পড়ুনঃ [আপনার ভবনটি কি ভূমিকম্প থেকে নিরাপদ ?](/archives/31293 " আপনার ভবনটি কি ভূমিকম্প থেকে নিরাপদ ?")
