# বোরকা/ হিজাব/পর্দা, শর্টকাট ও মানসিকতা

Author: রোকসানা খন্দকার রুকু
Published: 2022-09-08
Category: সমসাময়িক
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a6%be-%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ac-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%be-%e0%a6%b6%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%95%e0%a6%be/

সমাজের এক শ্রেনী সবসময় চুপ করেই থাকেন আর একশ্রেণী যে কোন কিছু নিয়ে নেমে পড়লে অন্যদল সেটিতে ট্রলিং, বুলিং নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পোশাক আন্দোলনে নেমেছে। তাতে যারা মনে মনে সাপোর্টকারী তারা চুপ থেকে ঘটনা দেখছে। একশ্রেণীর পুরুষরা নির্দ্বিধায় নোংরা গালিগালাজ, ট্রলিং এ ব্যস্ত।

একদল বলছে শিক্ষার্থীরা ‘দেশীয় মূল্যবোধবিরোধী সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য নয়’, ‘পোশাকের স্বাধীনতার নামে পাবলিক নুইসেন্স বন্ধ হোক’, ‘ছোট পোশাক নারীকে বিজ্ঞানী বানায় না, পণ্য বানায়’ ইত্যাদি লেখাসংবলিত প্লাকার্ড প্রদর্শন করেন।

অন্যদল বলছে, ‘সংস্কৃতি কারও বাপের না’, ‘শান্তিপূর্ণ দাসত্বের উপরে প্রশ্নবিদ্ধ স্বাধীনতা বেছে নিলাম’, ‘কয়দিন পর যদি নাম শুনেই সিডিউসড হয়ে যান’, ‘সিডিউসড হোন বা না হোন হামলে পড়বেন না’, ‘আমি বলি না নিপাত যাক, বলি সব থাক থাক’ ইত্যাদি লেখা ছিল।

মজার ব্যাপার হলো, তাদের সাথে যোগ হয়েছেন আমাদের তথাকথিত পর্দানশীন নারীরা। তারা বলছেন, তারা বোরকা পরেই স্বাধীন, জানিনা কে তাদের পরাধীন বলেছে। এখানে আসলে স্বাধীনতা না হয়ে স্বাভাবিকতা বা কমফোর্ট ফিল করা ব্যাপারটি আসতে পারে। যে যেমনভাবে নিজেকে কমফোর্ট করাতে পারে। তার কাছে সেটিই তার পরিধেয় তবে কিছুটা স্থান, কাল, পাত্রভেদে।

আপনি মার্কেটে গেছেন, আপনি টি শার্ট কিংবা অন্যকিছু পরেছেন। ছেলেদের আগে পাশে থাকা বোরকা পরা মেয়েটি আগে ছি! বলবে। শার্ট পরা মেয়েটি কিন্তু কোনদিনই বোরকা পরা মেয়েকে নিয়ে মন্তব্য করে না।

আমি বলি, আজকাল বোরকা একধরনের ফ্যাশান। বেশ টাইট ফিট, স্টাইলিষ্ট ঠিক শার্ট কিংবা সালোয়ার/ কামিজের মতোই। একটা দামী শাড়ি বা লেহেঙ্গায় যে পরিমান কাজ থাকে, স্টাইল থাকে, আটোসাটো থাকে বোরকা তার চেয়ে দামে বেশি ও স্টাইলের হয়। অথচ আমাদের বোরকা পরা মেয়েরা দাবী করছে সে নিশ্চিত একজন পবিত্র নারী আর টপ জিনস পরা মেয়েটি বেয়াদব, অশালীন, অপবিত্র।

সবচেয়ে বেশি নোংরামী হয়েছে একজনকে নিয়ে। আপনারা তার সেক্সুয়্যালিটিতে কনফিউজড, সে ছেলে না মেয়ে না হিজড়া। কেন ভাইয়া/ আপুরা সেক্সুয়ালিটি তার যোগ্যতার সাথে কেন প্রশ্নবিদ্ধ? এ সমাজে হেট্রোসেক্সুয়াল মানুষদের মতো হোমোসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার, ক্রসজেন্ডার সব মানুষই প্রকৃতির সৃষ্টি। যাকে আপনারা অপূর্ণ বলছেন তার ভাষা, কথার ধরন, ভদ্রতা শালীনতা আপনাদের চেয়েও মার্জিত ও রুচিশীল ছিল।

পোশাক স্বাধীনতা আন্দোলনে যেসব কমেন্ট এসেছে তা অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও নোংরা। লোকালয়ে একটা বিকিনি পরা মেয়ে যতোটা নোংরা তার চেয়েও বেশি নোংরা। কুকুরের সেক্স কর ছবি দেয়া হয়েছে। এসব মেয়েরা পশুর জন্মা কিংবা পশুর চেয়েও খারাপ।

জেনে রাখুন, পশু/পাখিরা সেক্স করার আগে মানিয়ে নেয়, বাগিয়ে নেয়, তৈরি করে নেয়। আপনাদের মতো রেপিষ্ট বা জুলুমকারী না, সিডিউসড হয় না। অবশ্যই তারা অনেকাংশেই আমাদের চেয়ে ভালো।

আমার নিজের কথাই বলি। যখন কেয়ার বাংলাদেশে জবে ছিলাম একেবারেই তরুন বয়স। প্রচুর কাজের চাপ, ফিল্ডে সারাদিন থাকতে হতো। তো সে সময় প্যান্ট/লং টি শার্ট পরে খুব দ্রুত বের হতে হতো। ফিল্ডের কাজ শাড়িতে বা থ্রি পিচে কষ্টকর বা ঝামেলাপূর্ন ছিল। তাই সময় ও ঝালেলা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করতে হতো। কিন্তু অবশ্যই খেয়াল রাখার বিষয় ছিল আমাকে কোনভাবেই অশালীন লাগছে কিনা। কারন গ্রামের মানুষদের নিয়ে কাজ। তারা অবশ্যই আমার ব্যস্ততা দেখবে না। তারা দেখবে একজন শালীন মানুষকে যার কথা রাখা  যায়।

পেশা চেঞ্জ হলো, বয়স বাড়লো। পোশাকও বদলে গেল। শিক্ষক হিসেবে শাড়ি কিংবা থ্রি পিচ পরি। হিজাবের ব্যাপারটা একটু আলাদা। এটা আমার চুল কন্ট্রোল ও সময় বাঁচানো যাকে বলে আরকি! এক ঠিলে অনেক পাখি মারার মতো।

বাজার কিংবা নদীর পাড়ে নিশ্চিতে পায়ে সান্ডেল কিংবা ট্রাউজার/ ঢোলা পাজামা, লং টি শার্ট  আমার ভালো লাগে। আমি তখন পেশায় নেই তবুও কিছু মানুষের জন্য আমার রাস্তার খাবারের মজা বা বেড়াতে যাবার মজাটা আর মজা থাকে না। রাস্তার পাশে ফুচকা খেতে দেখে অনেকেই হা! কারন সেখানে ক্যাজুয়ালী হিজাব ছাড়া গিয়েছি। কিংবা আমার মতো শিক্ষকের এটা বেমানান। যদিও আমি অশালীন নেই।

বলেও বসে- তুমি কি হিজাব ছেড়ে দিয়েছ? বাধ্য হয়ে নিজেকে হিজাবে ঢেকে আজকাল ফুচকাও খেতে হয়। রাস্তার পাশে চাও খেতে পারিনা। কেন ভাই?

একজন পুরুষ মানুষের পেশাগত পোশাক আর বাড়ির পোশাক এক হয় না। আবার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, বাজারের পোশাকটাও আলাদা। বিয়ে বাড়ি, ঈদ, পুজো কিংবা পহেলা বৈশাখে সে নিশ্চিন্তে আলাদা আলাদা পোশাকে থাকে। মেয়েদের বেলায়ও ঠিক তেমনই হওয়া উচিত। একজন ডাঃ হয়তো সময় বাঁচানোর তাগিদে চুলের স্টাইল না করে হিজাবী কিন্তু সে কোন ফেস্টিভ্যালে সেভাবে নাও থাকতে পারে। কিংবা পরিবার নিয়ে সাগর পাড়ে বেড়াতে গিয়ে তিনি তা নাও করতে পারেন। এটাকে নিয়ে ট্রল করা যাবে না। আর পোশাক পরিধানকারীকেও সচেতন হতে হবে। তবে সমাজের কিছু লেজকাটা শেয়াল আছে যারা কারও ভালো দেখতে পারে না। আপনি ভালো চাকরী করেন, ব্যবসা করেন, ভালো চলছেন? কিন্তু সে সেটা পারছে না। তো আপনারটা তার অবশ্যই অসহনীয়। তো তিনি বোরকায় নিজেকে ঢেকেছেন, আপনাকেও ঢাকতে হবে।

আসলে তা মোটেও নয়। যেহেতু আমাদের মার্কেটগুলোতে সবধরনের পোশাক পাওয়া যায়। তার মানে আমরা এগুলো পরবো। তো আমাদের পোশাক হবে স্থান, কাল, পরিবেশ, পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর শিক্ষার্থীরা সালোয়ার কামিজ কিংবা কাট ব্লাউজেও শালীন ও সুন্দর। সমাজটাতে এতো সমস্যা থাকতে আমরা যেন দিনে দিনে আজাইরা বাকওয়াস টপিক নিয়ে সময় নষ্ট করছি।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2022/09/images-74-1.jpeg)

যে পুরুষদের পতিতালয়গুলোতে নিয়মিত আনাগোনা তাদের কে সিডিউসড করে? মাদ্রাসা শিক্ষক তার ছাত্রীকে ধর্ষন করে সে কার দাড়া সিডিউসড হয়? ৬ বছর, ৮০ বছরের বাচ্চা বা নারী কেন ধর্ষণের শিকার হয়? নারী মানে শুধু শরীর, সেক্স করার বস্তু পুরুষের এই মানসিকতাই জন্মগত সিডিউসড। আমরা একজন হাফপ্যান্ট পুরুষ দেখলে চোখ নামিয়ে নেই অথচ রিকসার হুডের ফাঁক দিয়েও পুরুষ নারী খোঁজে। ওড়না না থাকলে বা পাতলা ওড়না পরলে শিষ দেয়। এসব আসলে মানষিকতা।

আজকে যে ওয়েস্টার্ন কালচারের কথা বলা হচ্ছে। ভাই একজন ওয়েস্টার্ন পুরুষ হয়ে দেখান তারা বিকিনি পরে থাকলেও ফিরে তাকায় না। জোর করে ধর্ষন তো দুরের কথা!

প্রত্যেক নারী/ পুরষ, তরুন/ তরুণীর সাজপোশাকে স্বাধীনতা থাকা উচিত। স্থান-কাল-সময় বুঝে পোশাক পরাই পোশাকের স্বাধীনতা। পোশাকের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের রুচিশীলতা, ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। সাজপোশাকের মধ্য দিয়ে নগ্নতা বা উগ্রতা ফুটে তোলা আধুনিকতা নয়। আটোসাটো, অর্ধলগ্ন শরীরের তথাকথিত আধুনিক পোশাক নয়। আবার শালীন পোশাক বলতে শার্ট- প্যান্ট মেয়েদের জন্য নয় এটাও বলা যাবে না। শুধু শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, শার্ট, বোরকা নয়, সকল পোশাকই স্মার্টলি ক্যারি করতে পারলেও মানুষকে সুন্দর দেখায়। আর শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, শার্ট, বোরকা পরে কেউ এগিয়ে বা পিছিয়ে যায় না। আমাদের এগিয়ে বা পিছিয়ে নেবার জন্য মানষিকতার পরিবর্তন জরুরী। এ মানষিকতা অবশ্যই দ্বীপাক্ষিক। আমরা কারও পোশাক দেখেও সিডিউসও হবো না আর কাউকে সিডিউস করার মতো কিছু পরবোও না।

ছবি- নেট থেকে।
