# বিস্মৃতির অতলে চাপা পড়া এক কল্পনাতীত নিকৃষ্টতা এবং নাম না জানা কিছু মা-বোনের ইতিহাস ( ২য় পর্ব)

Author: ফাতেমা জোহরা
Published: 2015-10-26
Category: এদেশ, মুক্তিযুদ্ধ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%85%e0%a6%a4%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a7%9c%e0%a6%be-%e0%a6%8f-2/

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানীরা বাঙালির মনোবল ভেঙে দেয়া, বাঙালিদের অস্তিত্ব পুরোপুরি ভাবে ধ্বংস করে দেয়া, সেইসাথে বাঙালি জাতির নাম একেবারে মুছে দেবার একটি নিকৃষ্ট প্রয়াস চালায়। সেই আমাদের মা বোনদের উপর অকথ্য নির্যাতন , ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা পুরো বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উদ্দেশ্য, দানবীয় ত্রাস সৃষ্টি করা, মনোবল ভেঙ্গে দেয়া, বাঙালি নারীর গর্ভে পকিস্তানী সন্তানের বিস্তারের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে নির্মূল করা, আর বাঙালি নারীর শরীরকে শত্রু দ্বারা কলঙ্কিত করে বাঙালি পুরুষের গর্বকে নষ্ট ও ধ্বংস করা। শুধু মাত্র যৌন চাহিদাকে চরিতার্থ করার জন্য একাত্তরে পাকি জানোয়ারেরা আমাদের মা- বোনের উপর নির্যাতন করে নি। উপরিউক্ত বিষয়টিও এক্ষেত্রে বিবেচ্য ছিল। যেটা একাত্তরে ধর্ষিত মা বোনের বয়স বিবেচনা করেই বলা যায়। ওরা যেমনি ভাবে ৭ থেকে ১৩ বছরের বাচ্চাদেরও ওদের ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই দেয় নি। তেমনি প্রায় ৬০-৮০ বছর বয়সের বৃদ্ধাদের রেহাই দেয় নি।

**এনবিসি নিউজ** ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একটি রিপোর্ট করে। যাতে জানা যায় ৭ থেকে১৩ বছরের মেয়েরাও ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সেই সময়ে। আবার **সুসান ব্রাউনমিলার** তাঁর **Against Our Will Men Women and Rape** বইয়ে লিখেছেন-

> ” Rape in Bangladesh had hardly been restricted to beauty. Girls of eight and grandmothers of seventy-five had been sexually assaulted during the nine-month repression. Pakistani soldiers had not only violated Bengali women on the spot; they abducted tens of hundreds and held them by force in their military barracks for nightly use. The women were kept naked to prevent their escape.”

৮ থেকে ৮৭ বছর বয়সের নারীদের উপর পাকি হায়নারা অকথ্য নির্যাতন চালায় একাত্তরে। একবার নয়, একদিনের জন্য নয় বারবার অনেক দিন ধরে অমানবিক পরিবেশে আটক থেকে। আত্মহত্যা করারও উপায় ছিল না। মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সিলিংয়ে ঝুলে পড়তে না পারে। ‘ধর্ষণ’ শব্দটি তাদের নিপীড়নের ভয়াবহতার পুরোটা প্রকাশের জন্য যথেষ্ঠ নয়। সুতরাং, ৭১ এ শুধুমাত্র আমাদের এই দেশ নয়, সেই সাথে আমাদের মা বোনের পবিত্র শরীরকেও ঐ পাকি শূয়রেরা একেকটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবেই বিবেচনা করেছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী জানোয়ারেরা আমাদের মা বোনের উপরে যে নির্যাতন চালিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনো বীভৎসতা, নিকৃষ্টতাকে হার মানায়। একাত্তরের ২৫ শে মার্চ রাত থেকেই ওরা আমাদের মা বোনের উপরে নির্যাতন শুরু করে। ২৫শে মার্চের পর রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাকিস্থানি হায়েনাদের গণহত্যা, নারী নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের নারকীয় দৃশ্যাবলী প্রত্যক্ষ করেছেন সেখানকার সুইপার **রাবেয়া খাতুন**। পাকিস্থানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তার একটি প্রামাণ্য দলিল রাবেয়া খাতুনের এ জবানবন্দি, যা নেওয়া হয়েছে **‘বাংলাদেশের স্বাধীণতা যুদ্ধ ও দলিলপত্র: অষ্টম খন্ড’** থেকে। তিনি এই জবানবন্দি দিয়েছেন ১৯৭৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী তারিখে। তার সেই জবানবন্দিটি নিচে দেওয়া হলোঃ-

> **১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ রাতে হানাদার পাঞ্জাবী সেনারা যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উপর অতর্কিতে হামলা চালায় তখন আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এস.এফ. ক্যান্টিনে ছিলাম। আসন্ন হামলার ভয়ে আমি সারাদিন পুলিশ লাইনের ব্যারাক ঝাড়ু দিয়ে রাতে ব্যারাকেই ছিলাম। কামান, গোলা, লাইট বোম আর ট্যাঙ্কারের অবিরাম কানফাটা গর্জনে আমি ভয়ে ব্যারাকের মধ্যে কাত হয়ে পড়ে থেকে থর থরিয়ে কাঁপছিলাম। ২৬ মার্চ সকালে ওদের কামানের সম্মুখে আমাদের বীর বাঙালি পুলিশ বাহিনী বীরের মতো প্রতিরোধ করতে করতে আর টিকে থাকতে পারেনি। সকালে ওরা পুলিশ লাইনের এস.এফ. ব্যারাকের চারিদিকে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ব্যারাকের মধ্যে প্রবেশ করে। বাঙালি পুলিশের নাকে মুখে সারা দেহে বেয়নেট বেটন চার্জ করতে করতে বুটের লাথি মারতে মারতে বের করে নিয়ে আসছিল।**
> 
> **ক্যান্টিনের কামরা থেকে বন্দুকের নলের মুখে আমাকেও বের করে আনা হয়। আমাকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়া হয় এবং আমার উপর প্রকাশ্যে পাশবিক অত্যাচার করছিল আর কুকুরের মতো অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ছিল। আমার উপর উপর্যুপরি অত্যাচার করতে করতে যখন আমাকে একেবারে মেরে ফেলার উপক্রম হয় তখন আমার বাঁচার আর কোনো উপায় না দেখে আমি আমার প্রাণ বাঁচাবার জন্য ওদের নিকট কাকুতি মিনতি জানাচ্ছিলাম। আমি হাউমাউ করে কাঁদছিলাম, আর বলছিলাম আমাকে মেরো না, আমি সুইপার, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পায়খানা ও নর্দমা পরিষ্কার করার কেউ থাকবে না, তোমাদের পায়ে পড়ি তোমরা আমাকে মেরো না, মেরো না, মেরো না! আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পুলিশ লাইন রক্ত ও লাশের পঁচা গন্ধে মানুষের বাস করার অযোগ্য হয়ে পড়বে।**
> 
> **তখনো আমার উপর এক পাঞ্জাবী কুকুর, কুকুরের মতোই আমার কোমরের উপর চড়াও হয়ে আমাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করছিল। আমাকে এভাবে ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলে দিলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন পরিষ্কার করার জন্য আর কেউ থাকবে না একথা ভেবে আমাকে এক পাঞ্জাবী সেনা ধমক দিয়ে বলতে থাকে, ঠিক হায়, তোমকো ছোড় দিয়া যায়েগা জারা বাদ, তোম বাহার নাহি নেকলেগা, হার ওয়াকত লাইন পার হাজির রাহেগা। একথা বলে আমাকে ছেড়ে দেয়।**
> 
> **পাঞ্জাবী সেনারা রাজাকার ও দালালদের সাহায্যে রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা এবং অভিজাত জনপদ থেকে বহু বাঙালি যুবতী মেয়ে, রূপসী মহিলা এবং সুন্দরী বালিকাদের জিপে, মিলিটারি ট্রাকে করে পুলিশ লাইনের বিভিন্ন ব্যারাকে জামায়েত করতে থাকে। আমি ক্যান্টিনের ড্রেন পরিষ্কার করছিলাম, দেখলাম আমার সম্মুখ দিয়ে জিপ থেকে আর্মি ট্রাক থেকে লাইন করে বহু বালিকা, যুবতী ও মহিলাকে এস.এফ. ক্যান্টিনের মধ্য দিয়ে ব্যারাকে রাখা হলো। বহু মেয়েকে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং-এর উপর তলার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো, আর অবশিষ্ট মেয়ে যাদেরকে ব্যারাকের ভেতরে জায়গা দেয়া গেলো না তাদের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। অধিকাংশ মেয়ের হাতে বই ও খাতা দেখলাম, তাদের মধ্যে অধিকাংশ মেয়ের চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু পড়ছিলো।**
> 
> **এরপরই আরম্ভ হয়ে গেল সেই বাঙালি নারীদের উপর বীভৎস ধর্ষণ। লাইন থেকে পাঞ্জাবী সেনারা কুকুরের মতো জিভ চাটতে চাটতে ব্যারাকের মধ্যে উন্মক্ত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে প্রবেশ করতে লাগলো। ওরা ব্যারাকে প্রবেশ করে প্রতিটি যুবতী, মহিলা ও বালিকার পরনের কাপড় খুলে একেবারে উলঙ্গ করে মাটিতে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বীভৎস ধর্ষণে লেগে গেল। কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সেই নিরীহ বালিকাদের উপর ধর্ষণে লেগে গেল। আমি ব্যারাকে ড্রেন পরিস্কার করায় অভিনয় করছিলাম আর ওদের বীভৎস পৈশাচিকতা দেখছিলাম। ওদের উন্মত্ত উল্লাসের সামনে কোনো মেয়ে কোনো শব্দ পর্যন্তও করে নাই, করতে পারে নাই। উন্মত্ত পাঞ্জাবী সেনারা এই নিরীহ বাঙালি মেয়েদের শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয় নাই, আমি দেখলাম পাক সেনারা সেই মেয়েদের পাগলের মতো উঠে ধর্ষণ করছে আর ধারালো দাঁত বের করে বক্ষের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে। ওদের উদ্ধত ও উন্মত্ত কামড়ে অনেক কচি মেয়ের স্তনসহ বক্ষের মাংস উঠে আসছিল। মেয়েদের গাল, পেট , ঘাড়, বক্ষ, পিঠের ও কোমরের অংশ ওদের অবিরাম দংশনে রক্তাক্ত হয়ে গেল।**
> 
> **যে সকল বাঙালি যুবতী ওদের প্রমত্ত পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করল দেখলাম তৎৰণাৎ পাঞ্জাবী সেনারা ওদেরকে চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছোঁ মেরে টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ওদের যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল, বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে সেই বীরঙ্গনাদের পবিত্র দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। অনেক পশু ছোট ছোট বালিকাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে ওদের রক্তাক্ত দেহ বাইরে এনে দুজন দু’পা দু’দিকে টেনে ধরে চড় চড়িয়ে ছিড়ে ফেলে দিল, আমি দেখলাম সেখানে বসে বসে, আর ড্রেন পরিষ্কার করছিলাম। পাঞ্জাবীরা মদ খেয়ে খেয়ে কুকুরের মতো যার যে মেয়ে ইচ্ছা তাকেই ধরে ধর্ষণ করছিল।**
> 
> **শুধু সাধারণ পাঞ্জাবী সেনারাই এই বীভৎস পাশবিক অত্যাচারে যোগ দেয়নি। সকল উচ্চ পদস্থ পাঞ্জাবী সামরিক অফিসাররা মদ খেয়ে হিংস্র বাঘের মতো হয়ে দুই হাত বাঘের মত নাচাতে নাচাতে সেই উলঙ্গ বালিকা, যুবতী ও বাঙালি নারীদের ওপর সারাক্ষণ পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ কাজে লিপ্ত থাকতো। কোনো মেয়ে-নারী-যুবতীকে এক মুহূর্তের জন্য অবসর দেয়া হয়নি। হানাদারদের উপর্যুপরি ধর্ষণ ও অবিরাম অত্যাচারে বহু কচি বালিকা সেখানে রক্তাক্ত দেহে কাতরাতে কাতরাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। পরের দিন এই সকল মেয়ের লাশ অন্য মেয়েদের সম্মুখে ছুরি দিয়ে কেটে কুচি কুচি করে বস্তার মধ্যে ভরে বাইরে ফেলে দিত। এ সকল নারী, বালিকা ও যুবতীর নির্মম পরিণতি দেখে অন্য মেয়েরা আরো ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তো এবং স্বেচ্ছায় পশুদের ইচ্ছার সম্মুখে আত্মসমর্পণ করতো।**
> 
> **যে সকল মেয়েরা প্রাণের ভয়ে বাঁচার জন্য ওদের সঙ্গে মিল দিয়ে ওদের অতৃপ্ত যৌনক্ষুধা চরিতার্থ করার জন্য সর্বোতভাবে সহযোগিতা করে তাদের পেছনে ঘুরে বেরিয়েছে তাদের হাসি তামাশায় দেহ-মন দান করেছে তাদেরকেও ছাড়া হয় হয় নাই। পদস্থ সামরিক অফিসাররা সেই সকল মেয়েদের উপর সম্মিলিতভাবে ধর্ষণ করতে করতে হঠাৎ একদিন তাকে ধরে ছুরি দিয়ে তার স্তন কেটে পাছার মাংস কেটে, যোনি ও গুহ্যদারের মধ্যে সম্পূর্ণ ছুরি চালিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে তারা আনন্দ উপভোগ করতো।**
> 
> **এরপর উলঙ্গ মেয়েদেরকে গরুর মতো লাথি মারতে মারতে পিটাতে পিটাতে উপরে হেডকোয়ার্টারের দোতলা, তেতালা ও চার তলায় উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পাঞ্জাবী সেনারা চলে যাবার সময় মেয়েদেরকে লাথি মেরে আবার কামরার ভেতরে ঢুকিয়ে তালা বন্ধ করে চলে যেত। এরপর বহু যুবতী মেয়েকে হেডকোয়ার্টারের উপর তলার বারান্দায় মোটা লোহার তারের উপর চুলের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রতিদিন পাঞ্জাবীরা সেখানে যাতায়াত করতো। সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ যুবতীদের কেউ এসে তাদের উলঙ্গ দেহের কোমরের মাংস বেটন দিয়ে উন্মক্তভাবে আঘাত করতে থাকতো, কেউ তাদের বক্ষের স্তন কেটে নিয়ে যেতো, কেউ হাসতে হাসতে তাদের যৌনপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ উপভোগ করতো। কেউ ধারালো চাকু দিয়ে কোনো যুবতীর পাছার মাংস আস্তে আস্তে কেটে কেটে আনন্দ করতো। কেউ উঁচু চেয়ারে দাঁড়িয়ে উন্মুক্ত বক্ষ স্তন মুখ লাগিয়ে ধারাল দাঁত দিয়ে স্তনের মাংস তুলে নিয়ে আনন্দে অট্টহাসি করতো। কোনো মেয়ে এসব অত্যাচারে কোনো প্রকার চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার যৌনিপথ দিয়ে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৎৰণাৎ হত্যা করা হতো। প্রতিটি মেয়ের হাত বাঁধা ছিল ও পেছন দিকে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। অনেক সময় পাঞ্জাবী সেনারা সেখানে এসে সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েদের এলোপাতারি বেদম প্রহার করে যেতো।**
> 
> **প্রতিদিন এভাবে বিরামহীন প্রহারে মেয়েদের দেহের মাংস কেটে রক্ত ঝরছিলো, মেয়েদের কারো মুখের সম্মুখের দাঁত ছিলনা। ঠোঁটের দুদিকের মাংস কামড়ে টেনেছিড়ে ফেলা হয়েছিল। লাঠি ও লোহার রডের অবিরাম পিটুনিতে প্রতিটি মেয়ের আঙ্গুল হাতের তালু ভেঙ্গে থেতলে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এসব অত্যাচারিত ও লাঞ্ছিত নারী ও মেয়েদের প্রস্রাব ও পায়খানা করার জন্য হাতের ও চুলের বাঁধন এক মুহূর্তের জন্যও খুলতে দেয়া হতো না। হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় বারান্দায় এই ঝুলন্ত মেয়েরা হাত বাধা অবস্থায় লোহার তারে ঝুলে থেকে সামনে পায়খানা-প্রস্রাব করতো। আমি প্রতিদিন গিয়ে এসব পায়খানা পরিষ্কার করতাম।**
> 
> **আমি স্বচক্ষে দেখেছি অনেক মেয়ে অবিরাম ধর্ষণের ফলে নির্মমভাবে ঝুলন্ত অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিদিন সকালে গিয়ে সেই বাধন থেকে অনেক বাঙালি যুবতীর বীভৎস মৃতদেহ পাঞ্জাবী সেনাদের নামাতে দেখেছি। আমি দিনের বেলায়ও সেখানে সব বন্দি নারীদের পূত গন্ধ প্রশ্রাব পায়খানা পরিষ্কার করার জন্য সারাদিন উপস্থিত থাকতাম। প্রতিদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ব্যারাক থেকে এবং হেডকোয়ার্টারের অফিসের উপর তলা হতে বহু ধর্ষিতা মেয়ের ক্ষতবিক্ষত বিকৃত লাশ ওরা পায়ে রশি বেঁধে টেনে নিয়ে যেত এবং সেই জায়গায় রাজধানী থেকে ধরে আনা নতুন নতুন মেয়েদের চুলের সঙ্গে ঝুলিয়ে বেঁধে নির্মমভাবে ধর্ষণ আরম্ভ করে দেয়। এসব উলঙ্গ নিরীহ বাঙালি যুবতীদের সারাক্ষণ সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেনারা প্রহরা দিত। কোনো বাঙালিকেই সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হতো না। মেয়েদের হাজার কাতর আহাজারিতেও আমি ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাঙালি মেয়েদের বাঁচাবার জন্য কোনো ভূমিকা পালন করতে পারি নাই। এপ্রিল মাসের দিকে আমি অন্ধকার পরিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে খুব ভোরে হের্ডকোয়ার্টারের উপর তলায় সারারাত ঝুলন্ত মেয়েদের মলমূত্র পরিষ্কার করছিলাম। এমন সময় সিদ্ধেশ্বরীর ১৩৯ নং বাসার রানু নামে এক কলেজের ছাত্রীর কাতর প্রর্থনায় আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়ি এবং মেথরের কাপড় পরিয়ে কলেজ ছাত্রী রানুকে মুক্ত করে পুলিশ লাইনের বাইরে নিরাপদে দিয়ে আসি। স্বাধীণ হওয়ার পর সেই মেয়েকে আর দেখি নাই।**
> 
> **১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনী বাংলাদেশ মুক্ত করার পূর্ব পর্যন্ত পাঞ্জাবী সেনারা এ সকল নিরীহ বাঙালি মহিলা, যুবতী ও বালিকাদের উপর এভাবে পাশবিক অত্যাচার ও বীভৎসভাবে ধর্ষণ করে যাচ্ছিল। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে মিত্রবাহিনী ঢাকায় বোমা বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের চোখের সামনে মেয়েদের নির্মমভাবে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। রাজারবাগ হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় সমস্ত কক্ষে বারান্দায় এই নিরীহ মহিলা ও বালিকাদের তাজা রক্তে জমাট বেঁধেছিল। ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রাজধানীতে বীর বিক্রমে প্রবেশ করলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সকল পাঞ্জাবী সেনা আত্মসমর্পণ করে।**  
> **রাবেয়া খাতুন**  
> **১৮-০২-১৯৭৪**

রাবেয়া খাতুনের এই জবানবন্দিটি পড়লেই বোঝা যায় যে ৭১ এ পাকি হায়েনারা আমাদের মা বোনের উপর কি নারকীয় বীভৎসতা চালিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের হলেও সত্যি যে যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে এই ঘটনাগুলো নানান কারণে চাপা পরে গেছে ইতিহাসের অন্তরালে। সেই সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যদিও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সেই ইতিহাস থেকে বাদ পরে গেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ অধ্যায়। যেই অধ্যায়কে বাদ দিয়ে কিছুতেই পরিপূর্ণ হতে পারে না আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস…

**\[চলবে…\]**

তথ্যসুত্রঃ-  
(০১)দু’শো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা  
\-মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ নুরুল কাদির।  
(০২)মুক্তিযুদ্ধের ছিন্ন দলিলপত্র  
\-মুনতাসীর মামুন  
(০৩)বজলুর রহমান স্মৃতিপদক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদন (২০০৮-২০১২)  
(০৪) আমি বীরঙ্গনা বলছি  
\-নীলিমা ইব্রাহীম  
(০৫) http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29061376

(০৬) যুদ্ধ ও নারী  
\-ডা. এম এ হাসান।

প্রথম পর্বঃ [বিস্মৃতির অতলে চাপা পড়া এক কল্পনাতীত নিকৃষ্টতা এবং নাম না জানা কিছু মা-বোনের ইতিহাস(১ম পর্ব)](//sonelablog.com/archives/36520)
