# বিমূর্ত গোধূলি

Author: রিতু জাহান
Published: 2022-06-13
Category: ছোটগল্প
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a7%82%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%a7%e0%a7%82%e0%a6%b2%e0%a6%bf/

নৌকায় ফিরছি, চিলমারী আমার গন্তব্য। নৌকায় এক বাবা তার মেয়েকে খুব সাবধানে আগলে রেখে সূর্যাস্ত দেখাচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে এটা ওটা খাওয়াতে ব্যস্ত।  
আমি যদিও এসব দৃশ্য দেখে একবুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেই সব সময়।  কারণ, আমার জীবনে এমন কোনো দৃশ্য নেই৷।  
না এতিম নই। আমার বাবা নামক মানুষটি পৃথিবী থেকে এখনো বিলীন হয়নি। তিনি বেঁচে আছেন বেশ ভালো আছেন। আলহামদুলিল্লাহ।  দোয়া করি তিনি ভালো থাকুন তার মতো করে।

তবু অসহ্য যন্ত্রণা ওঠে এমন সব দৃশ্যে। আমার বাবার প্রতি তীব্র ঘৃণায় আমার সারা শরীর বিষিয়ে ওঠে। যা আমি হতে দিতে চাই না। কাউকে ঘৃনা করে বেঁচে থাকাটা খুব কস্টের। আর তা যদি নিজের জন্মদাতা পিতা হয়৷

কে যেনো লিখেছে কোথাও ,’ স্বামী খারাপ হলেও পৃথিবীর কোনো বাবাই খারাপ না!’  
আমার তাদের ডেকে দেখাতে ইচ্ছে করে আমার বাবা নামক মানুষটিকেও।  
বাহ! আমি অটোমেটিক তাকে মানুষ বললাম ভাগ্যিস কোনো পশু বলিনি। কারণ, পশুরাও সন্তানদের দারুনভাবে আগলে রাখে। মানবিক সমস্ত গুণাবলী নিয়েও কিছু মানুষ যেনো মানুষ হতে পারে না৷  
কিছু বাবা এমনও হয়! আমার বাবার মতো,,,  
কোনো খোঁজ খবর না নিয়ে বউ বাচ্চা রেখে দিব্যি গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে। কোনো খরচ না দিয়ে দিব্যি নিজের সুখটুকুর কথা চিন্তা করতে। অন্য শহরে আরাম আয়েশে থাকতে পারে অন্য নারীর সাথে।  
যখন বাইরে কোথাও তার শরীর ও মনের মনোরঞ্জনের খোরাক জোগাতে অক্ষম তখন মায়ের কাছে আসে এক রাতের জন্য।  
আমার ছোটো ভাই এর সাথে আমার বয়সের পার্থক্য পনেরো বছরের।  
মায়েরা যে কেনো অপমানগুলো ভোলে না! কেনো যে এই প্রশ্রয়টুকু দেয়!

যে ফেরে না সে কোনোভাবেই আসলে কোনো টানেই ফেরে না সে ছেলে হলেও ফেরে না।  
শুধু নতুন এক একটা জীবন পৃথিবীতে এনে তাকে চরম বিপদের মধ্যে ফেলে।

গর্ভধারণ একজন নারীর চরম গৌরবের তাই বলে এমন অনিশ্চয়তার জীবনের মধ্যে কেনো?  
যে নারীর আশ্রয় নেই, স্বামীর স্থিরতা নেই সে নারীর এই মাতৃত্বের স্বাদটুকু গৌরব অর্জনের মোহোটুকু ত্যাগ করা উচিৎ বলে আমার মনে হয়।  
খুউব যখন ছোটো তখন মাকে দেখতাম খুব সেজেগুজে বাবার জন্য বসে থাকতো,, যদি বাবার মন ফেরে!

এক রাতের এই খন্ডকালিন স্বামীত্বের অধিকার না দিলে কি খুব ক্ষতি হয়?  
যেমন আমার এই অনিশ্চয়তা জীবনে আমি কাউকে টেনে আনতে চাইনি।  
প্রেম যে আসেনি তা না এসেছে,, কিন্তু যখন কাউকে প্রথমেই আমার জীবন খাতা মেলে ধরতাম তখনই কেমন এক বিষাদ আর করুনার ছাপ দেখতাম সে মুখে তাই প্রেমটাকে আমার দূরেই ভালো লাগে।  
প্রেমে পড়া সুন্দর মধুর কিন্তু প্রেম করা কঠিন ও অসুন্দর মনে হয় আমার কাছে।

আমি বুঝি আমার মা ‘তালাক প্রাপ্তা ‘ শব্দটার হাত থেকে বাঁচতে সহ্য করে গেছে সবকিছু।  
এ সমাজ অন্তত তালাক প্রাপ্তাদের দেখলে নাক সিটকাতে ভোলে না।  
আমার মায়ের গায়ের রঙ কালো বলে শশুরবাড়ির মুখটাও সে কখনো দেখেনি। স্মার্ট সুদর্শন বাবা আমার তার হাতটা ধরে নিতে লজ্জা পেয়েছে! ফেলে রেখেছে অযত্ন অবহেলায়।  
বিয়ের পরের দিন মাকে রেখে চলে গেছে তারপর হুটহাট এক দুইবার এসেছে পরিবারের চাপে কিন্তু আমার জন্মের পরে আমি মেয়ে তারউপর আমার গায়ের রঙ আমার মায়ের মতো তাই সে আরো অজুহাতের সুযোগ পেয়েছিলো দূরে থাকার।

ছয় মাসে এক আধবার আসতো হাতে গুজে দিতো এক দুইশো টাকা।  
তারপর আর কোনো খবর নেই। নানুবাড়িতে মা ছিলো সবার ফাই ফরমেশ খাটার নিরব এক গৃহকর্মী।  
আমি সব বুঝতাম।

চরের পর চর হেঁটে হেঁটে দু’পা একেবারে ক্লান্ত এখন। পুরো শরীর জুড়ে অবসাদ। ঘেমে নেয়ে একাকার। ঘাম বা ঝিরঝিরানি বৃষ্টিতে  ভেজা জামা আজকাল গায়েই শুকিয়ে যায়। তবু হাঁটা থামে না। তাপে পোড়া তপ্ত বালু আস্ত এক ফ্রাই প্যান। আমি তাতে যেনো ভাজতে থাকা জীবন্ত মাংস পিন্ড।  
আচ্ছা! কতোটা পথ হাঁটলে আসলে জীবন পাওয়া যায়?  
জীবন মানে আমার কাছে এক টুকরো নিরাপদ আশ্রয়, দুই বেলা আহার। খাদ্য বিলাসিতা না হোক কোনোরকম আহারই হোক। তবু তা জোটার নিশ্চয়তাটুকু হোক।

ম্যাপ মতে প্রতিটা তথ্য সংগ্রহ এখন আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। থামা চলবে না। কিছু জীবনের জন্য ‘থামা’ শব্দটা কেমন যেনো। পরিবারের দায়িত্ব, নিজের বেঁচে থাকার লড়াই, সব মিলিয়ে আমি চলছি।  
দূর দূর কোনো বড় গাছ নেই ছায়া পাব এমন।  
ঝোপ ঝাড়ে কোমর পর্যন্ত ছায়া ফেললেও মাথাটা আর ঢাকে না এ ছায়ায়।  
সন্ধ্যা নামার মুখে ব্রহ্মপুত্র নদী যেনো এক মায়া কানন। তার সৌন্দর্য উপভোগের প্রসঙ্গ আসলেই মুজে আসে চোখ আমার কিন্তু আমার গন্তব্য চোখ মুজে আসতে দেয় না।  
বাড়ি ফিরতে হবে আবারও কাজে ফেরার তাগিদ নিয়ে। ক্লান্তিতে হেলানে এক নিশ্চিন্ত আশ্রয় আমার। এক ভাই আর মাকে নিয়ে এই জীবন।  
এখন বয়স পঁয়ত্রিশ,, নানুবাড়ির কথার তীর সহ্য করতে না পেরে মাকে নিয়ে একটা ছোটো ভাড়া বাড়িতে উঠেছি।

আমার বিয়ে হচ্ছে না বলে নানুবাড়ি ও আশপাশের মানুষর ঘুম নেই। একটা মেয়ের জীবনে বিয়ে আর বাচ্চা হওয়ানোটাই যেনো বড় এবং একমাত্র কাজ।  
অথচ কেউ জানতেও চাইলো না যে সেই কবে থেকে দায়িত্ব নামক জীবন শুরু আমার। আমি যদিও নিজেই আজকাল মনে করতে পারি না আমি কবে থেকে জীবনকে বুঝে গেছিলাম।  
নিজে কেমন করে যেনো কোনোরকম মাস্টার্সটা শেষ করে ফেললাম এই চাকরি টিউশনের পাশাপাশি।

চাকরিটা পারমানেন্ট না,, ইউনিসেফ এর একটা প্রোজেক্ট। দিন এনে দিন খাওয়ার মতো।  
পার্থক্য মাস শেষে একবারে দিনগুনে বেতন।

তারপর সারা মাসের খরচের হিসাব বাকির খাতায় থাকা টাকা মেটাতে মেটাতে হাত ঐ শূন্যই থাকে সব সময়।  
নিজের শখ কোনোকালে পূরণ হওয়া তো দূর কিছু শখ আল্হাদ উঁকিও দিতে অপারগ যেনো।  
অফিসের প্রোজেক্ট করতে একটা স্মার্ট ফোন খুব দরকার হয়। তাও কস্টেশীস্টে এক যায়গা থেকে জোগাড় করে চালিয়ে নিচ্ছি।

কলেজ লাইফগুলোতে যে সময়টা মেয়েরা সেজেগুজে প্রেম নামক অনুভূতি প্রকাশে ব্যস্ত তখন আমি টিউশন পড়াতে অস্থির। নতুন টিউশন খুঁজতে অস্থির।  
অন্যের নোট বই একবেলার জন্য এনে কোনোরকম আমি পাশ করেছি।

যে সময়গুলোতে প্রোজেক্ট এর কাজ থাকে না তখন সংসারটা চলবে কি করে এই মানসিক স্ট্রেচে যখন মাথা ফেটে যায় তখন মনে হয় এই পড়াশুনা না করে চরে কোনো কারো ঘরনি হলে মন্দ হতো না।  
তিন বেলা কিল ঘুষির বদলে দুইবেলা আহার তো জুটতো! তারপর একদিন ধুপুস করে মরে যেতাম। যে জীবনে জীবনের স্বাদ পূরনের উচ্ছে জাগতো না, কোনো হাহাকারের তীব্র যন্ত্রণা উঠতো না জ্ঞানের। হুম শিক্ষা জ্ঞানেরও যন্ত্রণা আছে এটা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জনে না।  
জ্ঞানের আহরণ, অক্ষর শব্দের কারুকাজের যে আলো তারও তীব্র এক যন্ত্রণা আছে। আরো আরো পাবার যন্ত্রণা। পৃথিবী দেখার তীব্র ইচ্ছার যন্ত্রণা।

এই প্রত্যন্ত চরে প্রোজেক্ট এর কাজ করতে গিয়ে নিজের মায়ের জীবন মিলিয়ে দেখেছি নারী তোর জন্ম আজন্ম পাপ। বিয়ে নামক বন্ধন যেনো এক কয়েদখানা এখানে। ঐ ক্রীতদাস প্রথার মতো।  
মনে হয় ভুল বললাম৷ বাবার সংসারে কিশোরি মেয়েটিকেও আমি দেখি সারাদিন কাজ করছে, বাবার গালমন্দ পিঠাপিঠি ভাইটাকে তারই মানুষ করে উঠতে হচ্ছে।  
তাই এমন যায়গায় নারী ঐ ক্রীতদাসই। সে শিশু হোক বা গৃহবধূ হোক।

বেশকিছুদিন আগে প্রোজেক্ট এর কাজ করতে গিয়ে একটা ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম।  
এক গৃহবধূ নিজ বুদ্ধিমত্তায় দিন রাতের পরিশ্রমে যিনি সেই কিশোরি বধূ হতে পরিণত বয়স আসা অবধি এক টুকরো ভিটে আর দিন মজুর স্বামীর সংসারটাকে এক বড় গেরস্ত বাড়ি করে ফেলেছিলো।  
যে সব হলে আসলে গেরস্ত বলা যায়- গোয়াল ভরা গরু, কয়েকবিঘা জমি, পাকা ঘর, ব্যাংকে গচ্ছিত বেশ কিছু টাকাও। স্বপ্ন দেখেছিলো মেয়েটা কোলের বাচ্চাকে শহর বড় করবে। আমাকে দেখলেই মোড়া এগিয়ে দিতো। কি পড়লে ভালো হবে সব শুনতো মোনোযোগ দিয়ে।  
স্বপ্ন বোনার মুহূর্তগুলোয় মানুষের মুখটা যেনো একটা পুরো স্বর্গ। আমি সে স্বর্গ দেখতাম অপলোক।  
সবই ঠিকঠাক চলছিলো কিন্তু ঐ যে পুরুষ চঞ্চল ভারি! মোড় ঘুরালো মনের। পথ হারালো তার স্বামী। ভেসে গেলো অন্য প্রেমে। একদিন রাতে গলাটিপে বউটাকে মেরে ফেলল। পাশে ঘুমন্ত বাচ্চার পাশেই।

সাক্ষীর অভাবে সেরকম সাজা হলো না লোকটার।  
কয়েকমাস জেল খেটে সে বাড়িতে এখন অন্য মহিলার বাস।  
দ্বিতীয় বউ দেখলাম পোয়াতি হয়েছে।  
বড় বউ এর বাচ্চাটা নাকের পানি চোখের পানি মিশিয়ে দলাপাকানো ভাত গিলছে কোনোরকম।  
আহ! জীবন।  
এই গল্পের উপর আমি কিছু শব্দ জুড়েছিলাম কৃষাণীকে নিয়ে-হয়তো সেই মুহূর্তটায় মেয়েটি এমনই কিছু বলতে চেয়েছিলো স্বামী নামক পুরুষটিকে।

                   “কৃষাণীর স্বপ্ন”  
ক্লান্ত শ্রান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় গা ছাড়তেই  
দু’চোক্ষে তহন এক সমুদ্র গভীর ঘুম আমার।  
মৃদু পায় শিয়র পাশে উঠে এসে দাঁড়ালে স্বামী।  
টের পাইলাম, রাত গভীর  
একটু আড়মোড়া ভাঙলাম মিথ্যে ঘুমের বাহানায়,,  
ও হাতের একটু আদর একটু ছোঁয়ার আশায়।  
নারীধর্ম আমার  
মুখ ফুটতে মানা  
লাজে আটকে যেতো আল্হাদ শব্দ যা।  
কি করে বলি তোমারে  
কতো বাসনা আমার ও বাহুতে তোমার!

শরীর এলায় সমার্পন দিছি ও বাহুতে বারংবার  
চোক্ষে আমার শরম ছিলো  
চোখ মেলিনি তাই,,

কিন্তু হায়!  
একি গো,  
যে হাতে তুমি আলতো করে ধরতে গো মুখখানি  
আজ সে হাত শক্ত বড়,  
দম বন্ধ হলো যে আমার!  
যে চোখে তোমার প্রেম ছিলো  
তাতে কেনো আগুন এতো?

সেই প্রথম যখন এসেছি এ ঘরে  
কতো বিজয় আনন্দ ছিলো ও দু’চোখে তোমার।  
আমি জেনেছিলাম,  
এ জগতখানা আমার।  
একটুখানি ভিটে তোমার  
স্বর্গ হলো আমার।  
সেই মোরগ ডাকার ভোরে জেগে এ কাজ সে কাজ!  
আমরা দুজন গড়ব এ সোনার সংসার।  
দিন গেছে বেলা গেছে  
গাওখানি রোদে পুড়ে  
গড়লাম এক ভিটে থেকে আর এক ভিটে ধানি জমি,  
ছনের চালায় আজ পাকা ছাদ বাড়ি।  
তোমারই ঔরসজাত সন্তান করতে হবে মানুষ।  
এসব গড়ত গড়তে নিজেরে দেখার সময় গেলো চলে।  
অধৈর্য তুমি ভেসে গেলে অন্য প্রেমে।

মেরো না মেরো না আমায়,  
এখন যে বড় সুখের সময় আমার। “

বড্ড তেতো লাগছে গলার ভিতরটা,, সারাদিন আজ আমার খাওয়া হয়নি। মানুষের এ এক অদ্ভুত সমস্যা। দুঃখের কোনোকিছু মনে পড়লে গলার কাছে গুটলি পেকে কিছু একটা বসে থাকে। কিছুতেই নামতে চায় না।

চিলমারি ঘাট দেখা যাচ্ছে,, কাঁধের ব্যাগটি গুছিয়ে নিলাম দুঃখগুলোর মতো। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে আবারও এমনই পুনরাবৃত্তি দিনের অপেক্ষায়।

,,,রিতু জাহান,,  রংপুর।
