# বিউটি সার্কাস: কর্পোরেট ভিক্ষা এবং চ্যানেল আইয়ের মুখোশে ইউনুসের গ্রামীন ব্যাংক

Author: তির্থক আহসান রুবেল
Published: 2022-10-19
Category: মুভি রিভিউ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%89%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%8b%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%9f-%e0%a6%ad/

প্রায় অর্ধযুগের স্ট্রাগলের পর অবশেষে মুক্তির আলো দেখলো মাহমুদ দিদারের ‘বিউটি সার্কাস’। সার্কাস, প্রেম এবং প্রতিশোধের গল্পের ‘বিউটি সার্কাস’ নিয়ে বলার পর একটু ভিন্ন ভাবনা জানাবো আজ।

সার্কাসের বিশাল তাবু গেড়ে সার্কাসের নানান কসরতের পাশাপাশি সার্কাস ঘিরে যে দোকানগুলো গড়ে উঠে অর্থাৎ মেলার আবহটা একদম সত্যিকারের লুকআপে ছিল। বিশাল তাবু, শতশত দর্শক এবং গেট আপনাকে নস্টালজিক করতে পারে। অর্থাৎ যারা সার্কাস দেখেছেন বা পরিবারের বড়দের কাছে সার্কাসের গল্প শুনেছেন। সিনেমাতে জমজমাট একটি সার্কাস দলের পাশাপাশি আছে তিন ধরণের প্রেমিক পুরুষের রূপ। একটি কামুক প্রেম, একটি সুবিধাবাদী প্রেম আরেকটা প্লেটোনিক প্রেম। আর আছে ছোট করে ধর্মীয় সন্ত্রাস, বোমা হামলা, ধর্মের নামে হত্যাকান্ড, ৭১ এর চিহ্নিত রাজাকারের জঙ্গী সংগঠন গড়ে তোলা। জঙ্গী সর্দার চরিত্রে গাজী রাকায়াত ডায়লগের পাশাপাশি চোখ দিয়ে খেলেছেন বেশ ভালভাবে। তার আস্তানায় প্রতিষ্ঠিত এক চোখের শয়তান বা ইলুমিনাতি’র চিহ্ন প্রতিকীভাবে ‘সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ গোষ্ঠীর’ ধর্মের লেবাসে মূলত শয়তান উপসনার ব্যপারটা চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছে।

নেগেটিভ চরিত্রের ফেরদৌস সব সময়ই দূর্দান্ত। তৌকির আহমেদকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু থাকে না। তবে হ্যা, কথ্য ভাষা এবং এংরিম্যান লুকে এবিএম সুমন আলাদাভাবে নজর কেড়েছে। সুমনকে দেখলে যে ইমেজটা যে কারো চোখে ভেসে আসে, তার শত সহস্র ভাগ ব্যাতিক্রমভাবে পর্দায় হাজির হয়েছে সুমন। পর্দার নিজের উপস্থিতিকে সফল করেছেন এত দূর্দান্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভিড়েও। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী চরিত্রে শতাব্দী ওয়াদুদের একটা ডায়লগ: “আমার কোন ধর্ম নাই। টাকাই আমার ধর্ম।” যা বর্তমান সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ধর্ম বাণিজ্যকে সামনে আনে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছে আমার বন্ধুবর হুমায়ুন সাধু। মৃত্যুর আগে এটাই বোধহয় তার শেষ কাজ ছিল। সাধু, সাধুর মতোই জমিয়ে রেখেছিল। সর্বশেষ জয়া আহসান। বহুবছর পর ধীর গতি এবং সামান্য মুখ খুলে বহু কষ্টে ডায়লগ দেয়ার বাইরে এবার পাওয়ার সেল জয়াকে দেখা গেল। জয়ার বাইরে আর কাউকেই ভাবা যায় না এই চরিত্রে।

সিনেমার ক্যামেরা কাজ, সম্পাদনা, মিউজিক, কস্টিউম, লোকেশন ইত্যাদি সবকিছুই মান ধরে রেখেছে। গল্পের তিন প্রেমিক পুরুষের তিন রকম সমাপনীটাও ভিন্নতা দেখিয়েছে। হত্যা, প্রেম, প্রতিশোধ তিনটি বিষয় কোনটাই কোনটার সাথে সম্পর্কিত ছিল না। এটাও গল্পের বৈচিত্রতা রেখেছে। যদিও প্রতিশোধের অংশটা চমৎকার নির্মাণ হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এটাকে ফ্যান্টাসী হিসেবেই বিবেচনায় নিচ্ছি। তবে দৃশ্যায়ন চমৎকার। এই দেশের সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এত সহজে দমানো যাবে না, যদি না মানুষ জাগ্রত না হয়। সিনেমার শেষ দৃশ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত খালি মাঠে শত মানুষের ভিড়ে রিং-এ দুলতে দুলতে সংলাপ দেয়া জয়া যেন আগুনে পুড়ে আবার জেগে উঠা ফিনিক্স পাখি। যে স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।

সিনেমাটি দেখতে পারেন। স্ক্রীনে বড় ক্যানভাস, বড় আয়োজনের সিনেমা এই দেশে সচরাচর হয় না। সিনেমাটি খারাপ লাগবে না। তবে হ্যা, চটুল গল্প আর হৈ হৈ গান চাইলে সিনেমাটি আপনার জন্য নয়।

### **এবার ভিন্ন কথা।**

একদমই আমার মতো করে গল্প সাজাচ্ছি শুরু থেকে শেষটুকু নিয়ে।

মাহমুদ দিদার তখন টিভি নাটকের খুব নামী পরিচালক। বেশ উচ্চমূল্যে তার নাটক বিক্রি হয়। স্পন্সররাও তার নাটকের অপেক্ষা করতো। তার গল্প এবং নির্মাণ সবাইকে মুগ্ধ করছিলো। সে সময় তিনি সরকারী অনুদানে সিনেমাটির কাজ শুরু করেন। এত বড় আয়োজনের সিনেমা স্বাভাবিকভাবেই ব্যয়বহুল। কিন্তু অত টাকা আসবে কোথা থেকে! অনুদান, নিজের সঞ্চয় আর এর বাইরে ভরসার জায়গা এতদিনের অর্জিত সুনাম। কিন্তু না! এবার তিনি দেখলেন কর্পোরেট নগ্নতা। সিনেমাটির স্পন্সরে কেউ এগিয়ে আসে নি। অনেক দরজা থেকে খালি হাতে ফিরে দীর্ঘ হতাশায় নিমজ্জিত দিদারকে সহযোগীতা করতে এগিয়ে আসে দারাজ। তাদের সহযোগীতায় সিনেমার কাজ আরেকটু এগিয়ে যায়। কিন্তু তাতেও সিনেমা শেষ হবে না। আরো টাকা দরকার। ঠিক সে সময় গ্রামীণ ব্যাংকের মতো ঘটি-বাটি-চটি সব গ্রাস করতে এগিয়ে আসে চ্যানেল আই। চ্যানেল আই হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠান যারা বসে থাকে কারো সিনেমা আটকে যাবার আশায়। হতাশাগ্রস্থ নির্মাতা সব সময়ই তাদের কাছে প্রিয়। তারপর চা-বিস্কুটের দামে সিনেমার নাড়ি-ভুড়ি সব কিনে নেয়। এখানেও তাই হলো। তারপর একদিন কোনমতে সিনেমাটি শেষ হয়।

সিনেমার পোষ্টারে বেশ কিছু লোগো আছে। যারা চ্যানেল আই কিনে নেয়ার পর যুক্ত হয়েছে। অথচ সিনেমাটির মার্কেটিং-প্রমোশন কোন কিছুতেই চ্যানেল আই যুক্ত হয় নি। অথচ এটা চরমভাবে সত্য যে, সিনেমাটি প্রথম দফায় কিংবা করোনা সংকট না এলে ২য় প্রচেষ্টায় মুক্তি পেলে শুধুমাত্র মাহমুদ দিদারকে দেখেই অন্তত নাটক পাড়ার সংশ্লিষ্টরা ঝাঁপিয়ে পড়তো। তবে এটাও সত্য যে, তখন আর এতগুলো লোগো পোষ্টারে থাকতো না। কারণ বাংলাদেশের কর্পোরেটওলারা গোপনে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাথে অনেকাংশেই সহমতে জড়িত। তাদের দেশ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, কৃষ্টি, ইতিহাস এসবের প্রতি নূন্যতম দায়বোধেও নাই। যতটুকু আছে, সেটাও শুধুমাত্র বিশেষ দিবসে বাণিজ্যিক প্রচারণা জন্য। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের একটা বিজ্ঞাপনের ছোট একটু অংশ দিলেও সিনেমাটা মাথা উঁচু করে জ্বলজ্বল করতো।

ফলে সম্ভাবনাময় একটা চলচ্চিত্রের মৃত্যু হলো সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণে। সকলে বলতে মাহমুদ দিদারের কর্মক্ষেত্রের লোকজন, কর্পোরেট দুনিয়া এবং দর্শককেই বোঝালাম। অর্থাৎ আমি আপনি সবাই মিলে একটি সিনেমাকে হত্যা করলাম।

টিকিট কেটে হলে বসে সিনেমা দেখুন।

জয় হোক বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের।
