# বারমুডায় বক্সী – ৬

- Author: [নবকুমার দাস](https://sonelablog.com/author/nabakumar-das/)
- Published: 2021-07-24T03:25:10+00:00
- Updated: 2021-07-24T03:30:23+00:00
- Category: [উপন্যাস](https://sonelablog.com/category/%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b8-2/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%ac%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b8%e0%a7%80-%e0%a7%ac/

---

**[ সাতাশে মে ,বারমুডা আইল্যান্ড ]**

গতপরশু বারমুডা আইল্যান্ডে পৌঁছেছি।  
বিপদ সংকুল এই সাগর অতিক্রম করতে করতে অনেক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়েছে আমাদের। সহযোগী রিচার্ড রীতিমত উৎফুল্ল। আমিও। আসলে অতলান্তিক মহাসাগরের উপর দিয়ে অনেকবার প্লেনে যাওয়া আসা করলেও এই প্রথম ছোট্ট একটা জাহাজে করে আমরা রহস্যময় বারমুডা ত্রিকোণের একটি পয়েন্ট মিয়ামি থেকে নির্বিঘ্নে অন্য পয়েন্ট বারমুডা আইল্যান্ডে পৌঁছেছি।  
তবে এই পথ টুকু অতিক্রম করতে গিয়ে বুঝেছি বিপদ বা বিপদের সম্ভাবনাগুলো শুধুমাত্র আকাশে বা বাতাসে নেই। সমুদ্রতটে বা সমুদ্রের গভীরেও আছে।  
সমুদ্রতটের গভীরতা সব জায়গায় সমান হয়না এটা সবাই জানে কিন্তু জলের অগভীর নিচে চোরা পাহাড় বা ডুব পাহাড়ের ধাক্কায় ডুবে যাওয়া অনেক ইয়াট ও জাহাজে টুকরো টাকরার হাদিস পেয়েছি। ধংসাবশেষ ভাসতে ভাসতে সারাগোসা সাগরের জলঝাঁঝিতে আটকেছে তার নিদর্শন ও পেয়েছি।  
তবে সাগরের নিচের শিলাস্তরে  যে চৌম্বকক্ষেত্র আছে তার আকর্ষণ-বিকর্ষণেও দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা এড়ানো যাবে না বলে রিচার্ডের বিশ্বাস।  
স্থানীয় ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ বারমুডা গিয়েছিলাম আজ। এই দ্বীপের আশেপাশের অঞ্চলের অন্তত তিনশোটি জাহাজডুবির তথ্য-প্রমান এখানে দেখলাম। এর মধ্যে প্রায় তিরিশটা জাহাজডুবি ঘটেছিল বারমুডা  ত্রিকোণ অঞ্চলে। এই সব জাহাজ বা নৌ-যানগুলোকে আমরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম।  আমাদের এগুলি খুবই কাজে লাগবে বুঝতে পারছি।  
তবে মিউজিয়ামের কিউরেটর স্যান্ডির মতে এই দুর্ঘটনাগুলোর কারন যতটা না বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্য তার চেয়েও বিশ্বাসযোগ্য কারন হল দ্বীপমালা সন্নিহিত দুশ বর্গ মাইল সমুদ্রের জলে কোরাল রিফের উপস্থিতি এবং সেই সঙ্গে এই এলাকার প্রবল সামুদ্রিক ঢেউ।

অতীতে জাহাজের নাবিকদের উন্নত সরঞ্জাম ছিল না বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র কম্পাসের উপর নির্ভর করতেন। কিন্তু কম্পাস জলের নিচের লুকিয়ে থাকা ডুবো পাহাড় বা কোরাল রিফ যা কিনা সাগরের তলা থেকে খাড়া উঠে এসেছে তা  চিহ্নিত করতে পারেনা। ফলে আচমকা দুর্ঘটনা আকছার ঘটতো। পরবর্তীকালে ডুবুরিরা ডুবে যাওয়া বা ভেঙে পড়া জাহাজের হারিয়ে যাওয়া অনেক মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধার করেছে। সেই সব সামগ্রীও প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে। ট্রেজার কয়েন বিভাগে এমন অনেক দুষ্প্রাপ্য মুদ্রার দেখা মিলল।  তার মধ্যে প্রায় সারা পৃথিবীর মুদ্রা আছে। সোনা রুপা ইত্যাদি দামি ধাতুর মুদ্রার পাশাপাশি অনেক শিল্পকলার নমুনা দেখতে পেলাম।

খুব যত্ন করে সাজানো সংগ্রহ দেখে প্রতিটি দুর্ঘটনার খুঁটিনাটি জানা যায় খুব সহজেই।

ক্যাপ্টেন জর্জ সমার্স ১৬০৯ সাল নাগাদ সি ভেঞ্চার জাহাজে বেশ কিছু সেটলার বা কলোনি স্থাপনকারী মানুষদের নিয়ে এই পথে যেতে গিয়ে কাকতলীয় ভাবে বারমুডা দ্বীপের পূর্ব দিকে প্রবল সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়লেন। জাহাজডুবী  ঘটলো এবং এই দুর্ঘটনা এই দ্বীপের ইতিহাসটাই বদলে দিল। কারন কোনো মতে উদ্ধার পাওয়া মানুষগুলোই এখানে প্রথম বসতি স্থাপন করলেন। সেই হিসাবে বলা যায়  সি ভেঞ্চার জাহাজের দুর্ঘটনা বারমুডা দ্বীপে জনবসতি স্থাপনে ঐতিহাসিকভাবে ভূমিকা নিয়েছিল।

তবে বারমুডা উপকূলে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্করতম সামুদ্রিক জাহাজডুবির তালিকায় প্রথমে থাকবে ক্রিস্টোবল কোলন নামে প্রমোদতরীর আচমকা ডুবে যাওয়া। ইউরোপ ও দুই আমেরিকা মহাদেশের মধ্যে চলাচলকারী এই স্পেনীয় প্রমোদতরণী যাত্রী ও কর্মী মিলিয়ে চারশো নিরানব্বই জনকে নিয়ে দ্বীপের উত্তর উপকূলের কাছে ১৯৩৬ সালের ২৫শে অক্টবর হঠাৎ ডুবে যায়। ১৯২৩ সালে তৈরী জাহাজটি বেশ শক্তপোক্ত ছিল। অদ্ভুত ব্যাপার যে এই জাহাজটি লম্বায় ছিল চারশো নিরানব্বই ফুট এবং মুখ্যত নিউ ইয়র্ক ও মধ্য আমেরিকার মধ্যে চলাচল করত। বলা হয়ে থাকে জাহাজের ক্যাপ্টেন ক্রিসেনসিয়া দেলগাদো একটি অফশোর যোগাযোগ কেন্দ্রকে ভুল করে গিবস হিল লাইটহাউস ভেবে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। ১৯৪৩ সালে দি কনস্টেলেশন নামের ১৯২ ফুট লম্বা স্কুনার-ডুবির দুর্ঘটনা ফেলনা নয়। এছাড়া ১৯৮৫ সালে ১৬৫ ফুট লম্বা দি হার্মেস জাহাজের দুর্ঘটনা এখনো দগদগে ঘায়ের মত জ্বলজ্বল করছে।

**[ সাতাশে মে ,বারমুডা আইল্যান্ড, রাত্রি নয় টা  ]**

রিচার্ড ও আমি বিকেল নাগাদ ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ বারমুডা থেকে হোটেল বারমুডায় ফিরে এসেছি।  কয়েকটা বিষয় ও পরিসংখ্যান আমাকে  ভাবাচ্ছে।  
              এতদিন ধরে বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলে যত দুর্ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশের উপযুক্ত কারন বা ব্যাখ্যা থাকা সত্বেও একশ্রেণীর লেখক ও প্রতিবেদক রং চড়িয়ে সমস্ত ঘটনাগুলোকে এমন ভাবে উপস্থাপনা করে এসেছেন যে সারা পৃথিবীর মানুষ   ভেবেছেন ওই এলাকায় অতিপ্রাকৃত কিছু একটা আছে যা কিনা এই সমস্ত ঘটনাগুলির একমাত্র কারন। অন্তরালে থেকে বার বার সাবধান করে দিচ্ছে যেন।  অথবা তাদের এলাকায় অনধিকার প্রবেশের জন্য প্রতিশোধ নিচ্ছে যেন । কিন্তু অনেক দিন থেকেই প্রায় প্রতিটি ঘটনার পিছনের কারণগুলো খতিয়ে দেখা হলেও তা যেন প্রকাশ্যে আনা হয়নি বা ব্যাপক প্রচার করা হয়নি। রিচার্ডকে আমার ভাবনার কথাগুলো বলার চেষ্টা করলাম। রিচার্ড মন দিয়ে শুনল।  
বললাম ,” আরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক লরেন্স ডেভিড কুশ্চের বা ল্যারি কুশ্চের কথা ভাবো। কমার্শিয়াল পাইলট হবেন বলে প্রশিক্ষণ নিয়েও ভদ্রলোক শেষ পর্যন্ত হলেন একজন লাইব্রেরিয়ান ও গবেষক। দুনিয়ার তথ্য ঘেঁটেঘেঁটে প্রায় চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছর আগেই দেখিয়েছেন অধিকাংশ দুর্ঘটনা বা জাহাজ কিংবা নৌকাডুবির পিছনে সঙ্গত কারন ছিল। ল্যারি কুশ্চের ‘দি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল মিস্ট্রি ~ সল্ভড’ বইটা নিশ্চয় পড়ে থাকবে। ভদ্রলোক খুব যত্ন নিয়ে সেই সব তথ্য ও পরিসংখ্যানগুলোকে গুরুত্বদিয়ে বিচার করেছেন যে সব বিষয়গুলি অন্যেরা ইচ্ছাকৃত ভাবে এড়িয়েগিয়ে রহস্যকে ঘনীভূত করার চেষ্টা করেছেন।  তিনি দেখালেন অনেকগুলো দুর্ঘটনাকে যতটা আকস্মিক বা অদ্ভুতুড়ে বলে চালানো হয়েছে আদপে সেগুলো তেমনটা  ছিল না ।  কখনো কখনো রহস্য লেখকেরা হয়ত লিখছেন একটা জাহাজ কিংবা প্লেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও শান্ত সমুদ্র বা আবহাওয়ায় হঠাৎই বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে ,বাস্তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্ভরযোগ্য রেকর্ড  বলছে সেই সময়ে  সমুদ্র উত্তাল হচ্ছিল কিংবা সত্যিই ঝড় উঠছিল। অনেকে দাবি করেছেন জাহাজগুলি রহস্যজনকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে বাস্তবে কিন্তু সেগুলোর ধংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গিয়েছে এবং সেগুলোর তলিয়ে যাওয়ার কারনও  ব্যাখ্যাকরা গেছে । একটা ঘটনা তো হাস্যকরভাবে গাঁজাখুরি তার প্রমান পাওয়া গিয়েছে , আটলান্টিক মহাসাগর থেকে তিন হাজার মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের বলে চালানোর চেষ্টা হয়েছে। গল্পের গরু এভাবেই সিঁড়ি বেয়ে গাছে উঠেছে।  
        উনিশ শ পঁচাত্তর সালে অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য ঘটনার উপস্থাপনার ক্ষেত্রে বিখ্যাত ফেট পত্রিকার সম্পাদক ‘লয়েড অফ লন্ডন ‘-এর দুর্ঘটনার রেকর্ডবুক এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখান পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের সমুদ্রের মতই সমান বিপদজনক, বেশিও না আবার কমও না  ।   মার্কিন কোস্ট গার্ড-এর রেকর্ড ও সেই কথা বলে এবং এই নিয়ে কোন রকম বিতর্কের সুযোগও নেই। ”  
রিচার্ড বলল,” ঠিক , আসলে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের গুলগল্প একশ্রেণীর পাঠক ও লেখকের কাছে আকর্ষণীয় মনে হলেও সারবত্তা কম বলেই আমার মনে হয়। ”  
       আমি বললাম ,”শুধু মনে করলেই হবে না রিচার্ড ,বরং আমাদের তা প্রমান করতে হবে ,নইলে সন্দেহবাদীরা বিশ্বাস করবে না। ”  
         রিচার্ড বলল, “একদম তাই।”  
আমি বললাম,” তবে এটা অস্বীকার করা যায় না ঘটনাক্রমে এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এলাকা অসংখ্য সামুদ্রিক দুর্ঘটনার সাক্ষী।তাছাড়া এমনটাই হওয়ার কথাও ,কারন এই পৃথিবীর ব্যস্ততম যাত্রাপথগুলির অন্যতম এটি। সমুদ্রের এই অঞ্চলটিতে অসংখ্য ছোট ছোট নৌকার পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলে। আকাশে সরকারি , বেসরকারি ও সামরিক প্লেন যাতায়াত করে। কাছের এবং দূরের দুই রকম গন্তব্যেরই। ইউরোপ ,দুই আমেরিকা ও আফ্রিকা মিলিয়ে চার মহাদেশের কমন স্পেস এটাই। উপরন্তু এখানকার অদ্ভুত ক্ষণেক্ষণে পরিবর্তনশীল আবহাওয়া যাত্রাপথকে দুর্গম করে তোলে।  “  
          আমি বললাম ,”সে কথা না হয় ,তোমার আমার মত কিছু লোক বুঝলো ,কিন্তু  বেশিভাগ মানুষই রহস্য রোমাঞ্চ চায়। আর গাঁজাখোর লিখিয়েরা অদ্ভুতুড়ে কাহিনী বুনে আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। “  
রিচার্ড বলল ,”হুম ,কথাটা মন্দ বলোনি। এই সব কাহিনী লিখে আর সিনেমা বানিয়ে কত লোকে যে কোটি কোটি ডলার কমিয়ে ফেলল। “  
         কথায় কথায় বেশ রাত হয়ে গিয়েছে। রিচার্ড কে শুভ রাত্রি জানিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছি । আগামী কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে।  (  ক্ৰমশঃ ) 

---

Comments: 7 — https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%ac%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b8%e0%a7%80-%e0%a7%ac/#comments
