# বাংলা ও বাঙালী

- Author: [রিতু জাহান](https://sonelablog.com/author/mounata/)
- Published: 2016-03-28T15:37:28+00:00
- Updated: 2016-03-28T17:09:43+00:00
- Category: [একান্ত অনুভূতি](https://sonelablog.com/category/misc/personal/)
- Tags: বাংলা ও বাঙালী
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%93-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80/

---

[!\[12919257_794769880628092_229196254_n\](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2016/03/12919257_794769880628092_229196254_n.jpg)](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2016/03/12919257_794769880628092_229196254_n.jpg)  
আমি গর্বিত আমি বাঙালী। বাংলা আমার মায়ের মুখের ভাষা, আমার মুখের বুলি। আমার ভাষা তাই মায়েরই অংশ। এই চির সবুজ দেশ আমার ষড়ঋতুর দেশ। গাজির গান, পালা গান , রবীন্দ্র নজরুল , বাউল গান সবই আমার অস্তিত্ব। আমার দেশের মতো পৃথিবীর আর কোনো দেশে এই ষড়ঋতুর প্রকৃতির খেলা আছে কিনা সন্দেহ। ঋতুর বৈশিষ্ট আনুযায়ী বাঙালী লালন করে আছে আজও হাজার বছরের ইতিহাস ও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিই যে বাঙালীর প্রাণ। কিন্তু এই সংস্কৃতিই যদি বিকৃত করি, আমি আমরা যে জাত হারাব, আমাদের ঐতিহ্য হারাব। কিন্তু এ দায় কার? কাকে দায়ী করব আমরা? সময়কে না পশ্চিমা সংস্কৃতিকে?

উন্নয়নের জন্য বা সামনে আগানোর জন্য, বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে ইংরেজী ভাষা অবশ্যই রপ্ত করতে হবে। অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হবে কিন্তু তা জাত নষ্ট করে নয়। নিজের মাতৃভাষা নষ্ট করে নয়। কথায় আছে, যা চির সত্যঃ বাঙালী যেদিন পশ্চিমা সংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাবে সেদিন তার আর বাঙালিত্ব থাকবে না।কারণ আমি মানি, সৌন্দর্য্য মানে একটি স্বাভাবিক সমন্বয়। যেমন পাত্রের সাথে তার নিজস্ব স্থানের সমন্বয়। ঠিক বাংলা, বাঙালী, সংস্কৃতি ও ভাষার মতো।

তাই বলে আমি বলছি না অন্য ভাষা, অন্য সংস্কৃতি খারাপ। সব দেশের ভাষা , সংস্কৃতি তার তার দেশেই মানানসই। আলাদা সৌন্দর্য। আর এই সৌন্দর্য্য হল সার্বিক পরিপূর্ণতা বোধ। পাত্রকে তার নিজস্ব স্থানে স্থিত রাখলে যে সৌন্দর্য্য ফুটে ওঠে ,এও ঠিক তাই।  
“সোনার হাতে সোনার কাঁকন  
কে কার অলংকার”

যাইহোক আমি যা বলব বলে আজ কলম ধরেছি; বাঙালী জাতি আজ আসলে অনেকটা আধুনিক হতে চাইছে নিজের বাঙালিত্ব বাদ দিয়ে। প্রত্যক ক্রিয়ারই একটি সমান এবং বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া আছে। নিউটনের এই বিশ্বজনীন সূত্র কেবল বস্তু জগতের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানব জীবনের ক্ষেত্রেও ও তা প্রযোজ্য। মানুষ চলার পথে নতুন যা ধারণ করে, তারও রয়েছে সমান এবং বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া। যেমনঃ বাঙালী এক সময় একে অপরের সাথে পরিবার পরিজন নিয়ে সহঅবস্থানে বসবাস করত। তারা ছিল একই সুখ দুঃখের গাঁথা মালা। আজ সেখানে পশ্চিমা ঢেউ এসেছে। মানুষ হয়ে গেছে একটু বেশিই যান্ত্রিক। আত্ম সন্মান বোধ, ব্যাক্তি স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে কেউ কাউকে একফোঁটা ছাড় দিতে রাজি নই। এই দৃষ্টি ভঙ্গির করণে মানুষ আজ নিজে নিজেই বড় একা।

এর জন্য মানুষের দৃষ্টি ভঙ্গি, ভারতীয় টিভি চ্যানেলের প্রতি অতি ভালোবাসা,পশ্চিমা সংস্কৃতিই বেশি দায়ী। হ্যাঁ, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে ইংরেজী শিখতে হবে অবশ্যই কিন্তু তা সুষ্ঠু ভাবে। বিকৃতি করে নয়। তাকে তার জায়গাতে রাখতে হবে। সে মেহমান। আর মেহমান বাড়ির বাইরের ঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। শোবার ঘরে তার স্থান হলে আর নিজস্বতা থাকল কোথায় ?

এখনকার অতি আধুনিক ছেলেমেয়েরা বাংলার নিজস্ব অনেক উৎসবই জানেনা। বাংলার মূল ধারার সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই। বাংলার সংস্কৃতি এখন হয়েছে নামে মাত্র একদিনের ফ্যাশন। নতুন নতুন পার্বনে নতুন নতুন কাপড় পরে রাস্তায় ঘোরাটা ই এখন যেন উৎসব! যাই হোক আমি দুটো উৎসবের পার্থক্য তুলে ধরি, যার বর্তমান ও অতীতের চিত্র।

মূল বাঙালীর পহেলা বৈশাখ, অতীতে যেটা হতঃ পহেলা বৈশাখ , বাংলা বছরের প্রথম দিন। একটা ভাল বছরে প্রবেশ করার প্রার্থনার দিন। তাই বছরের শুরুটা যেন ভাল হয়, সেই আশায় তখনকার মানুষ, ঘরে ঘরে ভালমন্দ রান্না করত। পুকুর থেকে বড় মাছ ধরত, চিকন চালের ভাত রান্না করত। বাড়ির গরুর দুধের খেজুর পায়েস রান্না করত। কারো বাড়ি থেকে কোনো কিছু ধার নিত না। বিকালে গ্রামের মাঠে বসত বৈশাখি মেলা। সেই মেলায় থাকত, মুড়ি, মুড়কি, মাটির খেলনা, নাগরদোলা, চূড়ি ফিতার দোকান। কিশোরী মেয়ের লাল ফিতায় বেণি বুনে, ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপিস্টিক দিয়ে মেলায় ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য ছিল পটে আঁকা ছবির মতো। সন্ধ্যায় মোড়ল বাড়ি অথবা গেরস্ত বাড়ির উঠানে বসত বিভিন্ন পালাগান, জারিগান, পুঁথি পড়া, গাজি কালুর গীত। সেই গানে থাকত বাংলার মানুষের কথা। সেই মাটির গানে সূচনা হত নতুন কোনো কপোত কপোতীর প্রেম। গান শুনতে শুনতে প্রথমে চোখাচোখি তারপর ভাবের আদান প্রদান। গ্রামের সাধারণ সাজের যুবতীর কাজল টানা মায়াবী চোখের চাহনি, এক অতল সমুদ্র ডুবে যেতে ইচ্ছে করে কোনো এক যুবকের।

এখন বলি বর্তমান পহেলা বৈশাখঃ  যাদের প্রতিটা দিনই শুরু হয় এক কাপ চা দিয়ে, তারা যখন গরম ভাতে পানি দিয়ে হাজার টাকার ইলিশ দিয়ে পহেলা বৈশাখে পান্তা খায় তখন বড় বেমানান লাগে। গ্রামের সাধারণ কৃষককে কটাক্ষ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই পহেলা বৈশাখ পালন করতে গৃহকর্তা হয় দিশেহারা। হাজার টাকার ইলিশ, দামি শাড়ি, ছেলেমেয়ের দামি পোষাক, সব মিলিয়ে গৃহকর্তা শেষ। পান্তা খাওয়ার পরে তরুন প্রজন্মের আনন্দ করার পালা। মেলা বলতে তাদের পার্টি, গানের নামে পশ্চিমা সংগীতের ব্যান্ড বাজনা, নতুবা হিন্দি গানঃ ঢিংকা চিংকা, যার শব্দে মাথা ঝালাপালা, সাথে তাদের পানিয়, টাইগার।

এবার আসি অতি আধুনিক কিছু ছেলেমেয়ের ইংরেজী ভাষার অতি ব্যাবহার নিয়ে। তাদের আমেরিকান স্টাইল উচ্চারন! ছ্যাঃ জালা ধরায় আমার। যেমনঃ hi, bro, what’s up, lol, pops, pipes nice, ইত্যাদি। ইংরেজী গ্রামার এর ধারে কাছেও যায় না। Syllable তো মানেই না। মুখে যদিও উচ্চারন করছে,খাতায় একশোটার মধ্যে নিরানব্বইটি ভুল। তাই তো বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগে কোটাই পূরণ হয় না।

আমি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বয়সের অভিজ্ঞতায় যেটুকু বুঝি Syllables মেনে না চললে সঠিক উচ্চারন সম্ভব নয়। নয় সঠিকভাবে এর বানান লেখা। তাই ইংরেজী ভাষা সঠিক ভাবেই শিখতে হবে। পাশাপাশি নিজের সংস্কৃতি ও ভাষাকে ভালোবাসতে হবে।

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন , পৃথিবীর মানুষ যেন জানতে পারে, শুনতে পারে বাঙ্গালির ভাষা কেমন, গলা কেমন, কতটা মধুর তার উপস্থাপন। তাই তিনি জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সেই বক্তৃতা মঞ্চটিতে আরোহন করলেন ২৪সে সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে। ভাষন শুরু করেন তিনি তার নিজের মাতৃভাষা বাংলাতে। তিনি বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। বাংলায় ভাষন দিয়ে। আজ বাংলাভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা।

আমি বলছি না ইংরেজী ভাষা ব্যাবহার করা যাবে না। করতে হবে কিন্তু সঠিক ভাবে।

এবার অন্যান্য উৎসব নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। বর্তমানে বিবিসির এক তথ্যমতে বাঙালী যতো উৎসব পালন করে তা অন্য কোনো দেশ তা পালন করে কিনা সন্দেহ। নবান্নে পৌষ মাসে যে পিঠা মেলার আয়োজন করা হয় সেখানেও থাকে ফার্স্ট ফুডের ছড়াছড়ি। উৎসব পালন করব ঠিকই কিন্তু তা দেশীয় সংস্কৃতিকে ধারন করে।

এই প্রজন্ম আসলেই বড় অভাগা । সব কিছুতেই তাদের ধরাবাধা নিয়ম। কোনো কিছুতেই যেন এদের কোনো প্রাণ নেই, যান্ত্রিক যেন সব কিছু। এরা বড় হচ্ছে হিন্দি গান শুনে, পশ্চিমা সঙ্গীত শুনে। লোকসংস্কৃতি মানেই তো এরা জানেনা। যে লোক সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের কথা বলে জীবনের কথা বলে। লোক কথার অর্থ হল , একটি পরিবার, একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির বিকাশ। এই লোকগানের মধ্যেই শিল্পী ফুটিয়ে তোলে তার কথা ও সুরে একটি এলাকার জনগোষ্ঠীর আচার আচরন, জীবন জীবিকা, খাওয়া দাওয়া চলাফেরা। আর এই সংস্কৃতির প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে তারা যে সকল রীতি বেছে নেয় তা একই রকম হয়। এ কারনে অঞ্চলভেদে সংস্কৃতির মাধ্যমগুলোর ভিন্নতা প্রকাশ পায়। যেমনঃ উত্তরের ভাওয়াইয়া এবং দক্ষিণের ভাটিয়ালির মধ্য তাই পার্থক্য সহজেই বোঝা যায়। আমি দক্ষিণের মেয়ে তাই শুনেছি গাজির গান, হালই গান, অষ্টক গান, পট গান ইত্যাদি।

শুধুমাত্র একদিন নবান্ন পালন, পহেলা বৈশাখ পালন, ফাল্গুন পালন করলেই কি বাঙালী হওয়া যায়?

---

Comments: 21 — https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%93-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80/#comments
