# “বঙ্গ” আর “বাঙ্গালি” শেকড়ের খোঁজে,পুণ্ড্র নগরের প্রত্নতাত্ত্বিক  নিদর্শন

Author: নার্গিস রশিদ
Published: 2026-04-16
Category: ইতিহাস ঐতিহ্য
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97-%e0%a6%86%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a7%87%e0%a6%b0-9/

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2026/04/Screen-Shot-2026-03-02-at-16.57.02.png)

**১২ F “বঙ্গ” আর “বাঙ্গালী” শেকড়ের খোঁজে (১২ F )** 

**পুণ্ড্র নগরের  প্রন্ততাত্বিক নিদর্শন** 

মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা ৩৫০০ বছরের নীরবতা । বগুড়ার এই বিস্তীর্ণ প্রান্তর এক সময় ছিল এশিয়ার শক্তিশালী বন্দর নগরী।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2026/04/Screen-Shot-2026-04-27-at-11.47.55-300x175.png)

প্রথমে ছিল গ্রামীন সমাজ তারপরে বন্দর এবং পরে  দুর্গ আরও  পরে  রাজ ধানী ।

যার নাম ছিল সে সময় “পুণ্ড্র নগর” । পুণ্ড্র নগর পুণ্ড্র রাজ্যের কেন্দ্র বিন্দু।

যে রাজ্য সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের অনার্য পূর্ব পুরুষ দের হাত ধরে ।

প্রথমে তারা এখানে আসে শিকারী  বা মাছ ধরা পেশা জীবি  হিসাবে। তার পরে থিতু হয়।  গৃহী হয়ে কৃষিকে পেশা হিসেবে নিয়ে বসবাস করতে থাকে । একটি “গ্রামীণ সমাজ” গড়ে উঠে তাদের মাধ্যমে।

উৎপাদন করতে থাকে ধান, ইক্ষু , কার্পাস, শাকসবজি ।

প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে তারা এই পুণ্ড্র অঞ্চল তথা বরেন্দ্র অঞ্চলে তারা থিতু হয়। । তার পরে অনেক সময় বয়ে যায় ।

অর্থ করী  ফসল রেশম আর কার্পাস দিয়ে বুনা মূল্য বান কাপড় প্রস্তুত হয়ে চলে যেতে লাগল নানা দেশে , আরব আর পারস্যে ।

প্রমত্তা করতোয়া তখন বিশাল জলরাশি  বুকে নিয়ে সমুদ্রে

গিয়ে মিশত । সেই নদী পথ ব্যাবহার করে গড়ে উঠে বন্দর।

আর তা থেমে থাকিনি । শুধু উত্থান  আর উত্থান। আশপাশের বসবাস কারি মানুষ আর রাজা উভই ছিল অনার্য বাঙ্গালী ,আমাদের পূর্ব পুরুষ ।

সব রাজা দের নাম জানা যায় নি । শুধু মাত্র শেষ অনার্য রাজা পাণ্ডুরিক বাসুদেবের নাম জানা যায় ।  যাকে পরাজিত করে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়।  তার নাম জানা যায় বৈদিক ধর্ম গ্রন্থ থেকে।

যখন একটি রাজ্য শক্তিশালী হয় অর্থ নৈতিক দিক দিয়ে তখন আশপাশের ক্ষমতাধর রাজ্যের রাজার  আক্রমণের লক্ষ্য বস্তু হয়ে পড়ে সেই রাজ্য  টি।

পুণ্ড্র বর্ধনের বেলাই তাই হয়েছে। ক্রমাগত ভাবে এসেছে মৌর্য ,গুপ্ত ,পাল আর   সেন বংশের  ।

 রেখে গেছে তাদের চিহ্ন ।

মন্দির, মুর্তি, রাজ প্রাসাদ, বিহার ,স্তূপ, সুউচ্চ প্রতিরক্ষা দেয়াল, মেধ, সৈন্য দের থাকার স্থান আর দিন রাত পর্যবেক্ষণ করা শত্রু পক্ষ আসছে কিনা তা লক্ষ্য করার গোপন অবযার ভেসান সেন্টার ,পানি নিষ্কাসনের ড্রেন, বিরাট বিরাট গেট এবং তাদের ব্যাবহার কৃত তৈজস পত্র, মুদ্রা, শিলা লিপি, তাম্র লিপি,  এবং জুয়েলারী  ।

প্রত্নতত্ত্ব বিদরা খননের ফলে কি পেয়েছেন ?

তাই এখন দেখার পালা ।

**স্থাপনা**

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2026/04/Screen-Shot-2026-04-27-at-11.48.31-239x300.png)

মৌর্য  শাসন আরম্ভ হয় খ্রিস্ট পূর্ব  তিন শতকে । কিন্তু তারও অনেক আগে এখানে সাধারণ মানুষের বসবাস আরম্ভ হয়। এবং তাদের শক্তি  শালী রাজা পউন্দ্রিক  বাসু দেবের নাম আমরা জানি।

নগরের কাছেই বৃহদবুটি   গ্রাম । সেই গ্রামে বাস করতেন সে সময়ের কবি সন্ধ্যাকর নন্দী । তাঁর লেখা ঐতিহাসিক কাব্য “রামচরিত” । সেখানে তিনি পুণ্ড্রবর্ধন  কে “বরেন্দ্র মণ্ডলের মুকুট মনি” বলে উল্লেখ করেন।

এ থেকে অনুমান করা  যায় এই নগর দুর্গের বাইরে খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী তে শহরতলিতে বহু সংখ্যক সম্ভ্রান্ত নাগরিকের বসবাস ছিল। আর নগরের উপকণ্ঠে  বিস্তীর্ণ এলাকাতে  বস বাস করতেন সাধারণ নাগরিক ।

**যাদের মাধ্যমে এই ধ্বংসাবশেষ সনাক্ত হয়ঃ**

পুণ্ড্র নগর সম্বন্ধে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইংরেজ প্রশাকদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয় সব চেয়ে আগে ।

১৮০৮ সালে ডাঃ ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন সর্ব প্রথম মহাস্থানের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে এক বিরাট বিবরন লিপিবদ্ধ করেন । তাঁর পড়ে মিঃ হান্টার, মি. ও’ডোনেল, মি. বেভারিজ, মি. ওয়েস্ট মেকট এবং আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম । তারা সবায় মহাস্থান সম্পর্কে বিশদ ও তথ্য বহুল বিবরণ প্রকাশ করেন।

**এটিই সেই ইতিহাসের  “পুণ্ড্রবর্ধন”, প্রমাণ করেন ইতিহাসবিদ  ক্যানিংহাম** 

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2026/04/Screen-Shot-2026-03-02-at-16.56.49.png)

তবে আলেকজান্ডার ক্যানিংহামের সবচেয়ে কৃতিত্ব বেশি । কারন  তিনি  গবেষণা করে যে তথ্য পান তা থেকে প্রমাণিত করেন এটিই সেই ইতিহাসের “পুণ্ড্রবর্ধন” ।

৭ম শতাব্দী তে চৈনিক পরিব্রাজক উয়ান-চোইয়াং এর ভারত ভ্রমণ থেকে এই অঞ্চলের অনেক তথ্য পাওয়া যায়।  পুণ্ড্র বর্ধনের আয়তন ১০ কিঃ মি । তাঁর বিবরণে সেখানে ২০ টি সঙ্ঘারাম ( বৌদ্ধ বিহার) যেখানে ৩০০০ শিক্ষার্থি, ১০০ টি হিন্দু দেবালয় এর বর্ণনা আছে।

সেই বিবরণ থেকে ক্যানিং হাম,  সেই সব কথিত স্তূপের নাম, একটি থেকে আর একটির দূরত্ব ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে ১৮৭৯ সালে প্রমাণ করেন যে এটাই সেই  “পুণ্ড্রবর্ধন”  ।

১৯৩১  সালে পাওয়া ব্রাক্ষী অক্ষরে মাগধি ভাষায় লিখিত একটি শিলালিপি আবিষ্কার হয় ,যেখানে দুর্ভিক্ষ নিবারণের জন্য পুণ্ড্র নগরের মহামাত্র কে একটি  নির্দেশ দেওয়ার নির্দেশ  লেখা ছিল ।শিলালিপি টি রাজা অশোকের সময়ের ।

 এই “পুণ্ড্র নগর” লেখাটি আর একটি প্রমাণ যে এটা সেই “পুণ্ড্র নগর” ।

**“করতোয়া মাহাত্ত” ১০ম শতাব্দী তে লেখা কাব্য গ্রন্থ ,যে গ্রন্থ সাহায্য করে প্রমাণ করতে যে এটাই সেই ইতিহাসের “পুণ্ড্রবর্ধন”**

“করতোয়া মাহাত্ত” পাওয়া,  পুণ্ড্র নগরের  বিবরণে পাওয়া যায়,  বিষ্ণুর স্থায়ী আবাস, ১৯ টি বিশেষ গুনের জন্য “মহাস্থান” নাম প্রাপ্তি ,

চারদিকে পাঁচ মাইল পুণ্ড্র ক্ষেত্রের মধ্যে গোবিন্দ মন্দির এবং স্কন্ধ  এক মাইলের মধ্যে ।

এই সব তথ্য দিয়ে ক্যানিংহাম প্রমাণ করেন এটাই  সেই “পুণ্ড্র বর্ধন”, যা মহাস্থান নামেও পরিচিত ।কারন সেই মাপ অনুযায়ী তিনি নিজেও মাপ জোখ করে দেখে প্রমাণ মিলান  ।

এরপরে অনেক ইতিহাসবিদ দের আগ্রহ বৃদ্ধি পায় । তার মধ্যে বগুড়ার ইতিহাস গ্রন্থের লেখক শ্রী প্রভাস চন্দ্র সেন দেব বর্মণ এবং রাখাল দাস বন্ধপাদ্ধায় বিখ্যাত ।

**তার পরে শুরু হয় আর্কেওলজিক্যাল বৈজ্ঞ্যানিক পদ্ধতিতে  প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং গবেষণার কাজঃ**

প্রথম খনন কাজ ১৯২৮-২৯ সালে কয়েকটি ঢিবি তে খনন ও  পরীক্ষা চলে ।পাকিস্তান আমলে ১৯৬০-৬১ এবং ১৯৬৫ সালে। স্বাধীনতা উত্তর কালে ১৯৭৩ এর পরে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে গুরুত্ব পুর্ন প্রত্নস্থান গুলোতে খনন কাজ পরিচালনা করা হয় । বিশেষ করে ভাসু বিহার গ্রামে ।

১৯৮৮ সাল থেকে পুনরায় মূল গড়ে খনন কাজ শুরু হয় ফ্রেঞ্চ এবং বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে ।

**প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপঃ**

১৯৭৬/৭৭ সালে বগুড়া জেলায় ব্যাপক প্রত্নতাত্ত্বিক  জরিপ পরিচালনা করায় মহাস্থানের আসে পাশে ১০/১২ কি.মি  পর্যন্ত অনেক গুলো প্রত্নস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।শত শত ঢিপি এবং তার সাইট রেকর্ড করা হয়। অনেক গুলো ঢিপি ধ্বংস হয়ে গেছে।

**পুরাকীর্তির বিবরণঃ**

প্রতিরক্ষা প্রাচীর চার দিক দিয়ে ঘেরা , উত্তর দক্ষিণে ১৫২৫ মিটার লম্বা, পূর্ব পশ্চিমে ১৩৭০ মিটার প্রস্থ এবং যার  উচ্চতা পাঁচ মিটার ।

সূদৃহ প্রতিরক্ষা দেওয়াল ছাড়াও উত্তর,দক্ষিন এবং পশ্চিমে পরিখা এবং পশ্চিমে করতোয়া নদী দ্বারা সুরক্ষিত ছিল।

গড়ের উত্তর দেওয়ালে তিনটি প্রবেশ দ্বার , দেওয়ালের পূর্বে + সনাতন সাহেবের গলি + ঘাগর দুয়ার + কাটা দুয়ার ।

পশ্চিম দেওয়ালে “তাম্র দরজা” । দক্ষিণে দুর্গের বাইরে পরশুরামের সভা বাটিতে যাওয়ার জন্য আর একটা প্রবেশ পথ আছে।

নগর দুর্গের ভিতরে বিচ্ছিন্ন  কয়েকটি ঢিবিতে  খনন কাজ চালানো হয় । খোদার পাথর ভীটা , মানকালীর  ভিটা ও কুণ্ড ,পরশুরামের বাড়ি , জিয়ৎকুণ্ড  , বৈরাগীর ভীটা  এবং মুনির ঘোন  নামে পরিচিত ।

**বৈরাগীর ভিটা ও  তার আশপাশের পুরাকীর্তিঃ** 

উত্তরের প্রতিরক্ষা প্রাচীর থেকে ৭৬ মি দক্ষিণে অবস্থিত বৈরাগীর ভিটা খননের ফলে পাল আমলের ২ টি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় ।

পাল আমলকে বলা হয় পুণ্ড্রবর্ধনের বসন্ত কাল ,কারন এই সময়ে সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছিল। এই মন্দিরটি পূর্ব পশ্চিমে ২৯.৮৬ মি.লম্বা এবং উত্তর দক্ষিণে ১২.মি.

লম্বা। মন্দিরের  একটি ১১ মিটার লম্বা ড্রেন পাওয়া যায় ।

আবার নর্দমা ব্যাবহারের পাথর গুলো গুপ্ত যুগের ধ্বংস প্রাপ্ত মন্দির থেকে সংগৃহীত ।

১১ শতকের শেষ দিকে পাল যুগে নির্মিত যে মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ  পাওয়া গেছে সেখানে পাথরের কয়েকটি স্তম্ভের গোড়া  এবং চৌকাঠের বাজু আবিষ্কার হয়। মন্দিরের পূর্বে ২৪ টি ইট বাঁধানো ১.১৪বাই ১.০৬ মি. ঢালু সারিবদ্ধ  মেঝের কুঠুরি  এবং ইটের বাঁধানো চৌবাচ্চা  পাওয়া গেছে যা সম্ভবত স্নানের জন্য ব্যবহৃত  হতো  ।  এখানে পাল যুগের আরও মন্দির পাওয়া যায় ।

খননে পাওয়া প্রত্ন দ্রব্যাদি পরীক্ষা করে জানা যায় এগুলো গুপ্ত আমলের ।

বৈরাগীর ভিটায় পাওয়া অনেক গুলো মন্দিরের দেয়াল ভিটি ,  মঞ্চ এবং মণ্ডপ পাওয়া যায় ।  মঞ্চের চারপাশে ৯১ সে.মি পরিধি বিশিষ্ট পাঁচটি পাতকুয়া পাওয়া যায়।

**মুনির ঘোনঃ**

শিলা লিপির ঘাট সংলগ্ন দুর্গ প্রাচীর এবং দুটি বুরুজের নিদর্শন পাওয়া যায় । সম্ভবত এগুলো নদী পথে আগত শত্রু পক্ষের আক্রমণ  থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নির্মিত। বুরুজ 3.35মিটার চওড়া ৩.০৪ মিটার উঁচু।

**সাম্প্রতিক কালের খনন কার্জ** 

দুর্গ প্রাচীরের বাইরে গোবিন্দ ভিটার দক্ষিণে ৪টি  নিরমান যুগের নিদর্শন পাওয়া যায় । ১৫/১৬ শতকে মুসলমান আমলের, পাল আমলের , গুপ্ত যুগের এবং মৌর্য আমলের। গুপ্ত আমলে করা মঞ্চ, খুঁটি পুঁতার গর্ত, প্রবেশ পথ আর প্রহরীদের  ছোট ছোট ঘর,প্রবেশ দ্বার যার নিচে গুপ্ত আমলেরও   প্রবেশ দ্বার ছিল ,কারন গুপ্ত আমলের একটি সীল পাওয়া যায় এখানে।

মৌর্য আমলের মাটির দেয়াল যা ৪.  ২৬ মিটার চওড়া দ্বিতীয় এবং তৃতীয়  পাল আমলে নির্মাণ দেয়াল ৩.৬৫ মিটার চওড়া ।

গড়ের মধ্যে রাজা পরশুরামের রাজ প্রাসাদ পাওয়া গেছে ,১৯৬১ সালে খনন করে চার টি  মহল ,প্রত্যেক টি তে দুটি করে কক্ষ ও বারান্দ্রা সহ পাওয়া গেছে। একটি বড় মাটির হাঁড়া টাইপের পাত্রে একটি নরকঙ্কাল (মাথা ছাড়া) ছাই সহ এবং কিছু খুঁটি পুড়া অবস্থায় গর্ত সহ আর কয়লা পাওয়া যায়। ধারনা করা হয় কোন সময় হয়তো শত্রু পক্ষ  আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে ছিল ।

জীয়ৎকুন্ড ,মানকালীর কুণ্ড , খোদার পাথর ভিটা, নেতাই ধোপানীর ধাপ, ষষ্ঠী তলা, লক্ষিন্দরের মেধ, গোকুল মেধ, গোদার বাড়ি ধাপ, মাথুরা পলাশ বাড়ি, রামসাহেবের ধাপ, কানাই ধাপ, দুলু মাঝির ভিটা, কুটির ধাপ, নরপতি ধাপ, সন্যাসির ভিটা, ছাগল নাইয়া ধাপ, পদ্মার বাড়ি, যোগীর ধাপ, ছন্দের ধাপ, গণেশের ধাপ, ওঝা ধর্মান্তরির ভিটা, চান্দ সওদাগরের ভিটা, কুটির ধাপ, সিংনাথের ধাপ, বিসমারধান , কাঞ্জির হারি ধাপ, মালিনীর ধাপ, (মোট ৫৬ ধাপের সব্ধান পাওয়া গেছে)   ও মসজিদ, ধর্মান্তরিত ঝাড়ুদার  হরগোপালের কবর সহ ইসলাম ধর্ম প্রচার কারি মহিসয়ার এর কবর পাওয়া গেছে। ।

**গড়ের বাইরে পুরাকির্তীঃ**

 গোবিন্দ ভিটা, পশ্চিম দিকের মন্দির, পূর্ব দিকের মন্দির, শিলাদেবীর ঘাট, গোকুল মেধ , স্কন্ধের ধাপ, ভাসু বিহার , বিহার ধাপ, মঙ্গল কোট।

গোকুল মেধ ছিল “মেজ” যা কিনা  প্রধান গেটের কাছে।  শত্রু পক্ষ প্রবেশ করলে ধাঁধার মধ্যে পড়বে। সেখান থেকে ভিতরে প্রবেশ করা কঠিন ব্যাপার ।এটি একটি “মিলিটারি মাসটার পিস” এবং “একটি টাইম মেশিন” ।

**খননে আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তুঃ**

চারটি খাত সহ মোট পাঁচটি স্থানে খননের ফলে বিভিন্ন সভ্যতা স্তরে যে সব প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে তার মধ্যে **পাল** **আমলের** পোড়ামাটির চিত্র ফলক, ছবি আঁকা ইট , পাথরের তৈরি জিনিস, পাথরের গুটি ও বোতাম ,লোহা  তামা,ও ব্রোঞ্জের  তৈরি দ্রব্য, অলংকার, পোড়ামাটির অনেক বল, ক্ষেপণ করার গোলক ও কড়ি ।

 **মুদ্রাঃ** 

ছাঁচে ঢালা চারকোনা এবং গোল আকারের তামার মুদ্রা , কিছু ছাপ  সহ কিছু ছাপ  ছাড়া মুদ্রা, ছাপ যুক্ত মুদ্রায় উভয় পাশে স্বস্তিকা, চক্র, ক্রস, হরিণ, হাতি, বৃষ, গাছপালা ইত্যাদির প্রতীক চিহ্ন দেখা যায়। ছাপ যুক্ত তামার মুদ্রা খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত চালু ছিল । ছাপ ছাড়া মুদ্রা মৌর্য আমলের  আগে থেকেই ছিল।

এই সব মুদ্রা আবিষ্কার নগর সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে মহাস্থানের প্রাচীনত্বের  সাক্ষী বহন করে।

**মূর্তিঃ**

**শুঙ্গ যুগের** পোড়ামাটির চিত্র ফলক, যা জমকালো পোশাক ও অলংকারে সজ্জিতা দেবী মূর্তি এবং তাদের মাথার দুপাশে ত্রিশূল, বজ্র, অংকুশ ও তীর অংকিত রয়েছে। অন্য তিনটি চিত্র ফলকে হাতির  পাশে চামর বহনকারী ও একটিতে ঘোরায় টানা রথ।

**গুপ্ত যুগের** পোড়ামাটির মুকুট পরিহিতা একটি কমনীয় নারীর মাথা এবং একটি গোলাকার সিল ,সেই সিলে তিনটি গমের  শীষ তাঁর পাশে ২২ টি  অক্ষর রয়েছে।

তা ছাড়া বেলে পাথরের গণেশ মূর্তি, কালো পাথরের নরসিংহ মূর্তি বেলে পাথরের  দাঁড়ানো বৌদ্ধ মূর্তি, কালো পাথরের বিষ্ণু মূর্তি, নীলাভ পাথরের মূর্তি, পাথরের স্বর্ণের গয়না তৈরির ছাঁচ  এবং কালো পাথরের নন্দী মূর্তি।

**আবিষ্কৃত ধাতব দ্রব্যঃ**

তামার বালা, আংটি, সুরমা দণ্ড, পদক, লোহার বর্শা ফলক, তীর ছুরি, চাকু, পেরেক, অষ্টও ধাতুর বালা, ব্রোঞ্জের আয়না, ব্রোঞ্জের প্রদীপ,  এবং একটি সোনার কবজ অন্যতম ।

**মৃৎপাত্রঃ**

মহা স্থানে অসংখ্য বিভিন্ন রঙ এবং আকারের মাটির পাত্র এবং পাত্রের ভাঙ্গা টুকরা পাওয়া গেছে। উত্তর অঞ্চলের মৌর্য আমলের চক চকে কালো রঙের টুকরা (N.B.P ware) উল্লেখ যোগ্য ।

খ্রিস্টীয় ১ম এবং ৪র্থ শতকের লাল এবং ধূসর মাটির পাত্র যা তে ছিল নানা প্রতিকৃতির নকসা ।

তা ছাড়া পাল আমলের সাধারণ মাটির পাত্র পাওয়া গেছে।

**তুলনাঃ**

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ গবেষণায়  বলা হয় দুইটি পুরাকীর্তির  সাথে তুলনা করা যায়।

১) ইরানের Bam এবং ইরানীয় হাই প্ল্যাটু (৬ষ্ঠ থেকে ৪ বিসি) মরুভূমির  মেডিভ্যাল টাউন

২) Vatphou Laos নেচার এবং হিউমেনিটি Champa

  কালচারের সাথে । Tradition  এবং Humanity এর মেলনবন্ধ ।

**এখান থেকে সর্ব শেষ প্রত্নতাত্ত্বিক যে অবকাঠামো পাওয়া গেছে যা কিনা চলমানঃ**

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে  বগুড়াতে  খননের কাজ শুরু হয় । প্রাচীন পুণ্ড্র নগরের ইতিহাস খুঁজতে এটি নুতুন মাত্রা যোগ করবে। প্রাচীন বসতির এই লীলা ভূমিতে গড়ের বাইরে “বিশ মর্দন” এলাকাতে প্রত্নতাত্ত্বিক রা খুঁজে পান ইটের তৈরি একটি ৮ শত বছরের পুরানো পাল আমলের প্রাচীন মন্দির। সমতল থেকে ধাপে ধাপে পাঁচ মিটার উঁচুতে বিশাল এই অবকাঠামো । যা কিনা একটি মন্দিরের অংশ । এতে প্রমাণ মিলে যে মূল দুর্গ নগর থেকে এর সীমানা ছিল আরও বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

**প্রত্ন বস্তু যা পাওয়া গেছেঃ** (২০ ২৬সাল)

আলংকৃত ইট, পোড়ামাটির ফলক, পটারী, টি সি  বল, নেট  সিঙ্গার ।

গড়ের ভিতরে এবং বাইরে স্থাপত্যের কতটা মিল ছিল তা  যাচায় করা ছিল এই খননের উদ্দেশ্য ।

কিছুটা সফলতাও পেয়েছেন আর তা  হল “একটা লম্বা সময় ধরে এখানে বসতির ধারা বাহ্যিকতা ছিল” ।

 বলেন আঞ্চলিক প্রত্নত্বাতিক একে এস সাইফুর রহমান । তাঁর মতে এই পূরো বিরাট  এলাকা জুড়ে আর্লি হিস্টরিক সময় থেকে মেদিভ্যাল পর্যন্ত লম্বা সময় ধরে মন্দির গুলো নির্মাণ হয়।

পৃথিবীর অধিকাংশ অংশ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত তখন এই বাংলাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক মেগা সিটি যা কিনা পুরো  দক্ষিণ  এশিয়ার পাওয়ার হাউস । যার ড্রেনিং ব্যাবস্থা আজকের প্রকৌশল কেও হার মানাবে। প্রাচীর ছিল মরণ ফাঁদ , দেয়ালের ছিদ্র দিয়ে প্রহরীরা নজর রাখতো সব দিকে  । আজকের সিসিটিভির মতো প্রহরীরা চারদিকে খেয়াল  রাখতো।

প্রবেশ দ্বার  ছিল গোলক ধাঁধার মতো । শত্রু একবার ঢুকলে আর বের হতে পারতো  না।

এটি ছিল সামরিক দুর্গ থেকে অ্যাধ্যাত্যিক কেন্দ্র ।

পুণ্ড্র বর্ধন বা মহাস্থান গড় একটি খোলা বই , যে বই পড়ে  জানা যায়  প্রাচীন বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ।

এই দুর্গ নগরীর প্রতিটা ইট যেন গবেষণার জন্য অপেক্ষা করছে।

চলবে
