# বঙ্গের বাঙ্গালীর প্রথম শাসক “শশাঙ্ক”

Author: নার্গিস রশিদ
Published: 2026-08-31
Category: ইতিহাস ঐতিহ্য
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%ac%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a5%e0%a6%ae-%e0%a6%b6/

**(১৬ পর্ব ) শশাঙ্ক বঙ্গ আর বাঙ্গালী,শেকড়ের খোঁজে,শশাঙ্ক**

    ![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2026/08/Screen-Shot-2025-01-06-at-17.05.51.png)

**বাংলার প্রথম বাঙ্গালী সম্রাটের গল্প**

**প্রাচীন কালের  প্রথম বাঙ্গালী সম্রাটঃ** 

বাঙ্গালী সম্রাট আবার কে ?

অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করে বলতে  পারেন ।

প্রাচীন আর্যাবর্ত বাঙ্গালীর আভিজাত্য স্বীকার করত না।

বরং  তারা বলতো বাঙ্গালী “হরিজনের” সামিল ।

হরিজন মানে “গরিব অস্পৃশ্য” ।এটি  একটি

অপমান জনক শব্দ ।

  বর্তমানে হরিজন অর্থাৎ ‘দলিত” । আর দলিত মানে যারা  সমাজের নিচু শ্রেণীর এবং তারা অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বীকার । তারা বলতো বঙ্গে গেলে জাত জায়।

তাই বাঙ্গালী মানে তাদের ললাটে এই  ছিল লিখন যে তারা

ম্লেছ , এই ভাবনা ছিল বাঙ্গালী সম্পর্কে  আর্য

দের ।

প্রথম বাঙ্গালী সম্রাট শশাঙ্ক  দেব তার বুদ্ধিমত্তা আর বীরত্ব দিয়ে তাদের কে পরাজিত করে বাঙ্গালীকে সন্মান জনক স্থানে নিয়ে যান ।

এই সব কুৎসার মধ্যে বাঙ্গালী সম্রাটের নাম করলে প্রথমে মানুষ চমকে যাবেই ।

তবে একজন বাঙ্গালী সম্রাট ছিল না ছিল অনেক। তবে “ম্লেচ্ছ বাঙ্গালীর”  মধ্যে সর্ব প্রথম সম্রাটই  হচ্ছেন রাজা শশাঙ্ক দেব ।

এর আগে  বঙে ছিল জনপদ আর মহা জনপদ। বিশ্ব বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রাখাল দাস বন্ধোপাদ্ধায় তাকে সম্রাট বলেই পরিচিত করেছেন।

ইতিহাসে শশাঙ্কই বাংলার প্রথম সম্রাট ।

তবে জনসাধারণ তার কথা ভাল করে যানে না কেন ?

এই জিজ্ঞাসার কারন হল কোনো প্রাচীন কবি বা লেখক তার পক্ষ গ্রহণ করেনি বলে।

বিশাখা দত্ত লিখিত “মুদ্রারাক্ষস” নাটক এবং গ্রীক পর্যটক “মেগাস্থিনিস” গ্রন্থে তাই ভারত বর্ষের মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের কাহিনী লিখে গেছেন চৈনিক পর্যটক “ফা-হিয়েন” লিখে গেছেন দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্ত বা বিক্রমাদত্তের কাহিনী । বান ভটের  হর্ষ চরিতে এবং হিউ-এন-সাং এর ভ্রমণ কাহিনী তে আমরা পাই হর্ষ বর্দ্ধনের  কাহিনী। “কহলন” লিখিত “রাজতরঙণী” গ্রন্থে অমর হয়ে আছে কাশ্মীরের অনেক রাজার কাহিনী । “সমুদ্র গুপ্ত” যিনি ছিলেন শক্তিশালী রাজা এমন কি তার নামও অন্ধকারে ছিল । হরিসেনের লিপি আবিষ্কারের পরে দৈববতী তে অল্প কিছু জানা যায় ।

তবে দুর্ভাগ্য বশত শশাঙ্ক দেবের কথা চিরকাল বঞ্চিত রয়ে আছে। নইলে আজ তিনি ইতিহাসে  কোণঠাসা না হয়ে তিনিও হর্ষ বর্ধনের মত বিখ্যাত হতে পারতেন।

গৌণ ভাবে কেউ কেউ লিখে গিয়েছেন । পুরাতন মুদ্রা এবং শিলালিপি পাওয়াতে ,তাছাড়া ছড়ানো ছিটানো টুকরো  টুকরো নজির থেকে তাকে উদ্ধার করা হয় ।

**যেখানে যেখানে তার নাম পাওয়া  যায়ঃ** 

১) মেদিনীপুরের দুটি তারিখ হীন তাম্র শাসন, ২) এগরা তাম্র শাসন, ৩) দ্বিতীয় মাধা বর্মণের লিপি, ৪) শশাঙ্কের স্বর্ণ মুদ্রা, ৫) বানভাটের  হর্ষচরিত, ৬) আর্যমঞ্জুর্সিকল্প তবে এসব জায়গায় শশাঙ্কের পূর্ব জীবন কথা কোথাও  নাই।

বিহারের রোহাতোস গড়ের দুর্গে তার একটা  সিল পাওয়া গেছে যেখানে লিখা আছে “মহাসামন্ত শশাঙ্ক” । মহাসেন গুপ্তের অধিনস্ত একজন সামন্ত ছিল যিনি এই বঙের ভূমী পুত্র।

বিশেষজ্ঞ এবং ঐতিহাসিক রা  সেই  অল্প অল্প পাওয়া অপ্রতুল মালমশলা থেকে শশাঙ্কের শাসন কাল এবং জীবন কাহিনী বের করে,  সে সবের সাহায্য নিয়ে আজ আমরা শশাঙ্ক কে খুঁজে পাই।

সেই আবিষ্কারের কাজ আজও  চলছে । হয়তো আমরা শশাঙ্ক কে আমরা পুরো পুরি যানতে পারবো ।

তবে যা পাওয়া গেছে তার মধ্যে তর্কাতর্কি আছে।

ভিনসেন্ট স্মিথ ,রাখাল দাস বন্দোপাদ্ধায় মনোমোহন  চক্রবর্তী,রাধা গোবিন্দ বশাক,  রমেশ চন্দ্র মজুমদার ,কে,পি,জাসওয়াল  এবং দিষই গাঙ্গুলী বিভিন্ন ভাবে শশাঙ্ক কে নিয়ে নানা ভাবে লিখে গেছেন ।

ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ কাল,  এক বিরোধ পুর্ন গুপ্ত কালের শেষ সময়ঃ

গুপ্ত সাম্রাজ্যের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে । ধুলায় লুণ্ঠিত সম্রাটের শাসন দণ্ড ।

ভারত বর্ষে তখন যে রাজা ছিল না তা নয়,  ছিল হাজার হাজার শাসক ।

সাম্রাজ্য তখন খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত ।সবায় নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা দিচ্ছে।

একে অপরের  সাথে লড়াই  করছে ।

বাংলার গৌড়ে তখন শাসন করতেন শশাঙ্ক নামে এক নরপতি । তার রাজ্যের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ পুর।  যা কিনা মুর্শিদাবাদের বহরমপুর শহরের দক্ষিণ পশ্চিমে ছয় মাইল দূরে,রাঙ্গা মাটি নামে এক গ্রামে।

সেখানে একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে । যেখানে লেখা ছিল “শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক দেবস্য”।

**সামন্ত কাকে বলেঃ**

সামন্ত হল অধীন রাজা ।

মহা সামন্ত  বড় রাজা হলেও স্বাধীন নন ।  এ থেকে বুঝা যায় প্রথম জীবনে তিনি স্বাধীন ছিলেন না। কোন এক বড় রাজার অধীনে ছিলেন ।

কে হতে  পারেন সেই বড় রাজা , যার অধীনে শশাঙ্ক মহা  সামন্ত ছিলেন ?

ঐতিহাসিক দের মতে সেই বড় রাজা হল  “মহাসেন গুপ্ত”।

মহাসেন গুপ্ত কে?   বিক্রমাদিত্যের প্রথম পুত্র “কুমার গুপ্ত” ,পিতার মৃত্যুর পরে সিংহাসনে বসেন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্রের নাম গোবিন্দ গুপ্ত ।

কালক্রমে গুপ্ত সাম্রাজ্য লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় । এবং কুমার গুপ্তের বংশ ধরেরা মগধ এবং গৌড় প্রভৃতি রাজ্যের মহারাজা নামে আখ্যায়িত হন। এবং সেই “মহাসেন গুপ্ত” সেই বংশের সন্তান।

যদিও এসব যথাযত ভাবে প্রমাণিত হয় নি তবে এটি ঠিক এবং ভাল ভাবেই জানা যায়  ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগে

“মহাসেন গুপ্ত” ছিল মগধের অধিপতি । মগধ হল প্রাচীন ভারতের একটি রাজ্য যা বিহার রাজ্যের দক্ষিণে ছিল।

শশাঙ্ক ছিল তারি অধীনে সামন্ত রূপে কাজ করতেন বলে আন্দাজ করা যায় ।

এখন প্রশ্ন উঠে শশাঙ্ক কে? কেমন করে তিনি সিংহাসনে পেলেন? তাঁর পিতৃ পরিচয় কি?

রাখাল দাস বন্ধোপাদ্ধায়ের   মতে ছোটো তরফের গুপ্ত বংশের একজন মহাসেন গুপ্তের পুত্র । এটা মেনে নিলে মগধের উপর অধিকারের উপর একটা  যুক্তি মেলা যায় । তবে অনেক ইতিহাসবিদ এই মত মানতে রাজী  নন ।

আসল কথা শশাঙ্কের পূর্ব পুরুষের কথা এখনো নিশ্চিত করে জানা যায়নি । তবে প্রবাদে আছে “পুরুষ ধন্য হয় সনানি” । অর্থাৎ তাঁর বংশ পরিচয় আমাদের না জানলেই চলবে।

ঐতিহাসিক রা বলেন শশাঙ্ক শুধু গৌড়ের নয়  সমস্ত উত্তর পূর্ব ভারত অধিকার করেন।

কি করে এটা সম্ভব?

কারন ষষ্ঠ শতাব্দীর  শেষ পর্বে উত্তর ভারত কে পড়তে হয়েছিল অশান্তির আবর্তে । তাঁর ফলে শশাঙ্কের ভাগ্য  পরিবর্তন হয় ।

অশান্তির কারন কি ?

প্রথমতঃ মধ্য প্রদেশে কালাচুরী বংশীয় এক রাজার হাতে গৌড় এবং মগধের রাজা মহাসেন গুপ্তের শোচনীয় পরাজয় হয়। তাঁর পরে তাঁর কথা আর শুনা যায়নি । সম্ভবত তিনি মারা যান।

দ্বিতীয়ত তিব্বতের শক্তিশালী রাজা স্রং সান এর  প্রচণ্ড আক্রমণে ছোটো তরফের গুপ্ত রাজ্য লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

তৃতীয়ত দাক্ষীন্যাত্যের চালুক্য  রাজা কীতি বর্মণ অঙ্গ,বঙ্গ,কলিঙ্গ এবং মগধের উপর অধিকার বিস্তার করে।

বেশ বুঝা যায় যোগ্য রাজার অভাবে ষষ্ঠ শতাব্দীর  শেষ দিকে উত্তর ভারতের উপর বয়ে গিয়েছিল ভয়াবহ বিপ্লবের তরঙ্গের  পর তরঙ্গ ।

এই রকম বিপ্লব যখন শুরু হয় তখন উদ্যমী আর সাহসী সব পুরুষ রা পায় আত্ম প্রতিষ্ঠার সুযোগ ।

শশাঙ্ক শুধু তেজী, সাহসী, এবং কর্মঠই ছিলেন তা নয় শশাঙ্ক ছিলেন সুচতুর,সুকৌশলী এবং রাজনীতিতে পরম অভিজ্ঞ ।

তিনি শক্তিশালী স্বরে বলেন বিদেশী শত্রু দের হাতে সোনার বাংলা ছার খার হতে বসেছে এ দৃশ্য সহ্য করা সম্ভব নয়। আমি আমার সাধ্য মত আমার বাংলাকে রক্ষা করব । আমি  স্বাধীন স্বদেশ স্থাপন করবো ।শশাঙ্কের মুখে এই কথা শুনে জেগে উঠে সমস্ত জনতা।

যেমন বলে থাকে যুগে যুগে সাহসী এই বঙের বাঙ্গালি নেতারা ।

তিনি ক্ষুদ্র গৌড়ের ক্ষুদ্র মুকুট পরে বসে থাকেন নি । স্বদেশে স্থাপন করলেন স্বরাজ্য । শুধু তাই নয় উত্তর ভারতের মগধ,অঙ্গ,কলিঙ্গ ও  কসম্বী পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন ।

শশাঙ্ক হর্ষবর্ধনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এতে  হর্ষবর্ধন প্রতিশোধ নিতে চান ।

শশাঙ্ক হর্ষবর্ধনের ভাই রাজ্যবর্ধন কে আমন্ত্রণ করেন  একটি শান্তি চুক্তিড় জন্য। ।

রাজ্যবর্ধন সেই আমন্ত্রণে আসলে তাকে শশাঙ্ক হত্যা করে।

ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে হর্ষবর্ধন শশাঙ্কের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং শশাঙ্ক হেরে যান।

শশাঙ্কর মৃত্যুর পরে গৌড় রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে । শশাঙ্ক ৬৩৭ সালে মারা যায় তবে সঠিক সাল এটা নাও হতে পারে।

তার সম্বন্ধে নিগেতিভ কথা শুনা যায় যেমন তিনি বৌদ্ধ ধর্ম পছন্দ করতেন না এবং তিনি অনেক বৌদ্ধ স্তূপ ধ্বংস  করেন।

নিগেটিভ গুল বাদ দিলে এটা তো সত্য যে তিনি বাংলাকে স্বাধীন করেছিলেন ।

পরবর্তী এক শত  বছর গৌড় বাঙ্গলায় অরাজকতা ছিল ।যাকে বলে মাৎস্যয়ান এর যুগ । তার পরে পাল বংশ বাঙ্গালার অধিপতি হন।

এই ছিল বাংলার প্রথম বাঙ্গালী অধিপতির গল্প ।
