# প্রিয় শমশেরনগর চা’ বাগান(প্রতিযোগিতা)

Author: নীলাঞ্জনা নীলা
Published: 2017-03-21
Category: একান্ত অনুভূতি
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a7%9f-%e0%a6%b6%e0%a6%ae%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a6%97%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%aa/

প্রিয় শমশেরনগর চা’ বাগান,

কেমন আছো তুমি? তোমার উঁচু-নীচু টিলায় জন্মে থাকা চা গাছ, চায়ের পাতার ঘ্রাণ, ধূলো-কাদা মাখা পথ, সবুজ মাঠ, মাঠের চারদিক ঘিরে বাগান স্টাফদের বাসা, বিশাল বড়ো সেই দশ আর ছয় নম্বর লেক, গলফ ফিল্ড, নীল আকাশ, বাগান লাইনে বসবাসরত চা’ শ্রমিক, মসজিদ, একটা খুব ছোট্ট গির্জা, কালভৈরব দেবতা- মা দুর্গা মন্দির, আর নেপালের মন্দিরের আদলে সেই শিবমন্দির, তাদের সবাইকে নিয়ে তুমি সেই আগের মতোই ভালো আছো তো? নেপালি মন্দিরের আদলে গড়া ওই শিবমন্দিরের ছবি বহু পর্যটক এসে তুলে নিয়ে যেতো। আচ্ছা আমাদের সেই আনন্দমাখা বাসাটাকে কেমন রেখেছো তুমি? এখনও কি সেভাবেই আন্তরিক সময় দিয়ে মাতিয়ে রাখো সন্ধ্যাবেলাকে? বৃষ্টি তার নূপুর পড়ে টিনের চালে নেচে বেড়ায়? ঝমঝম শব্দ করে পড়া বৃষ্টির জল গান গেয়ে ওঠে কি? ভোরের উঠোনে শিউলি গাছের নীচে কি এখনও বিশাল পাটি পাতিয়ে রাখা হয় ফুল কুড়োনোর জন্য? আমাদের সাতসিঁড়ি দিয়ে বাঁধানো সেই তুলসী বেদিটা, যা শুধু সন্ধ্যা পূজোর জন্যই নয়, স্টাফ কোয়ার্টারে কারো জ্বর এলেই ঔষধ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তুলসী গাছের থেকে খুব বেশী দূরে নয় ওই যে মেহেদি গাছ, সেটা কি আছে? যেদিন গাছটাকে এনে নিজের হাতে লাগাই, কে জানি একজন এসে বলেছিলো হিন্দু বাড়ীতে মেহেদী গাছ লাগানো ঠিক না। সেসব কথাকে কেউ পাত্তাই দেইনি। ওদিকে ছোট্ট সেই মেহেদী আর তুলসী গাছ একই সাথে ডালপালা ছড়াতে লাগলো। তবে বহুদিন ছোট্ট মনে এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজে গেছি, গাছ কিভাবে হিন্দু আর মুসলমান হয়! তার উত্তর পেয়েছিলাম অনেকগুলো বছর পরেই। একবার কিছুক্ষণের জন্য সেই বাসায় গিয়েছিলাম, সময় ছিলো খুবই কম। ভেতরের উঠোনের দিককার বারান্দায় দাঁড়ালাম, দেখি তুলসী বেদি নেই, আর সেই তুলসী গাছ…নেই! তবে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে মেহেদী গাছটা। পথের পাশে অযত্নে পড়ে থাকা গাছটিকে তুলে নিয়ে এসেছিলো এই হিন্দু মেয়েটি। তারপর আর কিছুই দৃষ্টিকে দেখতে দেইনি। যদি কোনো আঘাত পেয়ে যাই, তাহলে?

আমি জানিনা কেন এখনও তোমাকে মনে করি! এমন এক সবুজ বন্ধনে আটকে আছি, আমার চোখে আর কোনো সবুজ লাগেনা, একই আকাশ তোমার কাছে, এখানেও। তাও দীর্ঘদিন বাস করার পরেও এই আকাশকে অপরিচিত মনে হয়। এখন বুঝি দেশভাগ হবার পর সেই সব মানুষদের যন্ত্রণা। প্রিয় শমশেরনগর চা’ বাগান জানো আমি কতোগুলো দেশ ঘুরেছি? অঢেল সৌন্দর্য দেখেছি, ডুয়ার্সের গহীন সবুজের ভেতর চায়ের বাগান,  নাহ টানেনি আমায়। অনেকগুলো দেশের আরণ্যক সৌন্দর্যে রাত কাটিয়েছি, অথচ আমার মনে পড়তো তোমার ছোট ছোট টিলা, আর পথের দু’পাশে বড়ো বড়ো রেইন ট্রি, শিরিষ গাছগুলোর কথা। চলতি পথে বৃষ্টি এলে গাছের নীচে দৌঁড়ে চলে যেতাম। তোমার ওই আকাশের মতো আমার এখানেও একটা আকাশ আছে। রাতের বেলায় অবশ্য তারা দেখতে পাওয়া যায়না, কৃত্রিম আলোর দাপটে বহু দূরের নক্ষত্রগুলো হেরে যায়। তাতে কি! ঘর অন্ধকার করে দিয়ে শুয়ে থাকলে দেখি জ্যোৎস্নার আলোয় ভিঁজে যাচ্ছে আমার বিছানা। আচ্ছা শুনেছি তোমার পথঘাট এখন খুব সুন্দর? আগের মতো নাকি আর বড়ো পুকুর, ছোট পুকুর তৈরী হয়না শ্রাবণের বৃষ্টিতে?  প্রকৃতি দিনকে দিন হেরে যাচ্ছে কৃত্রিমতার কাছে।

তোমার ওই সবুজ মাঠ বর্ষাকালে কি কাদা কাদা হয়ে যেতো, চৈত্র মাসে তো একেবারে সব হলুদ। ঘাস দেখাই যেতোনা। অযত্নের দাগ তোমার সারা শরীরে। বিকেলে ফুটবল খেলা চলতো, দেশের ফুটবলের কি খারাপ অবস্থা, অথচ ওই মাঠের খেলা দেখলে মনে হতো কোনো একদিন আমাদের দেশ নিশ্চিত বিশ্বকাপে খেলবে। ক্রিকেট খেলাও হতো। তবে ঘরোয়াভাবে আমার ক্রিকেট খেলা হতো যখন ঢাকা থেকে আমার ভাই-বোন, মামারা সবাই আসতো। মনে পড়ে তোমার, আমাকে রাখা হতো দুধ-ভাত করে? বসে থাকতাম যদি সুযোগ পাই খেলার! যদিও জীবনে একটা রানও নেয়া হয়নি, ব্যাট নিয়ে দাঁড়াতাম আর কিভাবে জানি স্ট্যাম্প উড়ে যেতো। আমাকে বল দেয়া হতো, উইকেট পাওয়া তো দূরের কথা, আমার ওভারে কম করে হলেও ৩৬ রান করে ফেলতো বিপক্ষ দল। আর আমাদের বাসার সামনে কোর্ট কেটে সন্ধ্যাবেলায় ব্যাডমিন্টন খেলা হতো, মনে আছে? ওখানে ছেলে-মেয়ে সকলে একসাথে খেলতো, ব্যবধান শব্দটার সাথে পরিচয় হয়নি তখনও। মনে আছে আমার বাপি ব্যাডমিন্টনের পুরো সেট (নেট-লাইট-র‍্যাকেট-ফ্লাওয়ার) কিনে দিয়েছিলো সকলের জন্য? যাতে ছেলে-মেয়েরা অযথা বাজে সময় না কাটায়। সন্ধ্যা থেকে প্রতিদিন খেলা হতো। ওখানে বয়সের  কোনো সীমারেখা ছিলোনা, তাই আঙ্কেল থেকে আপু, ভাইয়া, ছোটরা কেউই বাকি থাকতো না। আচ্ছা শুনলাম এখন নাকি সূর্যাস্ত হবার আগেই মাদকের আসর বসে মাঠের পশ্চিম কোণায়? জানো বেলজিয়ামে রোজ আমি ব্যাডমিন্টন খেলতাম স্পোর্টস সেন্টারে গিয়ে? কতো সুন্দর চারদিক, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, লাইটের পোকা নেই, খেলতে খেলতে ঘেমেও যেতাম না। তারপরেও কেন ওখানে আমি সেই আনন্দ পাইনি?

প্রিয় শমশেরনগর চা বাগান, তুমি যদি দেখতে এখানকার একেকটি লেক কি যে সুন্দর! কিন্তু স্মৃতির বাক্স খুলে গিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় দশ নম্বর লেক। আমি আর আনন্দ নিতে পারিনা। বরং দশ নম্বর লেকের পাড়ে জোঁকে ভরা ঘাসের মধ্যে গিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। পৃথিবীর যেখানেই যাই, আমাকে টানে তোমার মাটি। কোথাও আমার ভালো লাগেনা প্রিয় বাগান। বিকেলের সোনাঝুরি রোদ খুঁজে ফিরি আজও, জানি আর ফেরা হবেনা তোমার কাছে। আজন্ম এভাবেই ভাবনার ভেতরে লুকোচুরি খেলা করেই যাবে। আমার লেখার প্রতিটি পাতা জুড়ে থাকবে তোমারই গল্প। জীবনের একেকটি বেলার কথা। আমার অস্তিত্বে মিশে আছো, থাকবেও। আমার প্রিয় শমশেরনগর চা’ বাগান তুমি কি সত্যি ভালো আছো কৃত্রিমতার মিশেলে আধুনিক হয়ে, বলো তো? অনেক বড়ো হয়ে গেলো চিঠিটা, তাই না? অথচ এখনও অনেক কথাই জানার/বলার বাকি রয়ে গেছে। কোনো আরেকদিন লিখবো হয়তো, কি জানি কি! হয়তো, হয়তো না!!! ভালো রেখো।

হ্যামিল্টন, কানাডা  
২০ মার্চ, ২০১৭ ইং।
